সালটা ১৯৫৬। সুয়েজ খালের দখল নিতে অগ্রসর হচ্ছিল ব্রিটিশ-ফ্রান্সের সামরিক বাহিনী। অন্যদিকে, সিনাইয়ের উদ্দেশে রওনা দিয়েছিল ইজরায়েলের সাঁজোয়া যান। মিশরের বিরুদ্ধে এই সামরিক পদক্ষেপের নিন্দা করেছিল ভারত। পাশাপাশি সুয়েজের উপর মিশরের অধিকারের পক্ষেও সুর চড়িয়েছিল দিল্লি। এর ৫ বছর পর ১৯৬১ সালে গোয়ায় পর্তুগিজদের দখলমুক্ত করতে সামরিক অভিযান শুরু করে ভারত। সেই সময় সুয়েজ খাল ধরে অগ্রসর হওয়া পর্তুগিজ সেনার বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল মিশর। এটা দুটি উদাহরণ মাত্র। নয়াদিল্লি ও কায়রোর কয়েক দশকের বন্ধুত্বে এই ধরনের বহু উদাহরণ রয়েছে। এহেন পরিস্থিতির মাঝেই সম্প্রতি সামরিক জোট (মক্কা চুক্তি) গঠন করেছে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক। যাকে ‘ইসলামিক ন্যাটো’ হিসেবে দাবি করছে ওয়াকিবহাল মহল। জল্পনা শুরু হয়েছে, এখানে চতুর্থ দেশ হিসেবে যোগ দিতে পারে মিশর। তবে ‘পিরামিডের দেশ’ এখনও এই বিষয়ে কোনও উচ্চবাচ্য করেনি। অনুমান করা হচ্ছে, বন্ধু ভারতের বিরুদ্ধে গিয়ে এহেন জোটে বিশেষ আগ্রহ নেই মিশরের। পাশাপাশি এই জোট উলটে পালটে দিতে পারে দেশটির কূটনৈতিক হিসেব নিকেশ। সবকিছু মাথায় রেখেই ‘ইসলামিক ন্যাটো’কে এড়িয়ে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ বলে মনে করছে দেশটি।
সৌদি, পাকিস্তান ও তুরস্কের তৈরি ইসলামিক জোটের মূল শর্ত হল, যদি এই তিন দেশের কোনও একটিতে হামলা হয়, তবে বাকি দুই দেশ এই হামলাকে নিজেদের উপর হামলা হিসেবে গণ্য করবে। সেই হিসেবে এই জোটের নিশানায় পাকিস্তানের উলটো দিকে রয়েছে ভারত, তুরস্কের উলটো দিকে রয়েছে গ্রিস ও সাইপ্রাস। এছাড়া জোটের প্রধান নিশানা থাকবে ইরান, ইজরায়েলের মতো দেশের দিকে। ঠিক সেখানেই আপত্তি মিশরের। প্রতিটি দেশের সঙ্গে কায়রোর সুসম্পর্ক জোটের শর্তে প্রধান বাধা হয়ে উঠবে। ভারতের দিক থেকেই যদি ধরা হয়, তবে ১৯৫৬ সাল, ১৯৬১ সালের ঘটনার পর থেকে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক ভালো রকম মজবুত। ২০২৩ সালে কায়রো-দিল্লি কৌশলগত ক্ষেত্রে হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করছে। পাশাপাশি বর্তমানে মিশরে রয়েছে ৭০০-র বেশি ভারতীয় সংস্থা, ৫.৫ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ। যেখানে মিশরের ৪০ হাজারের বেশি মানুষ চাকরি করেন। গত অর্থবর্ষে দুই দেশের মধ্যে ৬.৫ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য হয়েছে। ফলে কোনওভাবেই ভারতকে চটাতে চায় না মিশর।
আরও পড়ুন:
মক্কা চুক্তিতে গেলে ইরান, হাউথি, ইজরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরশাহী, গ্রিস, সাইপ্রাস এবং ভারত সবার বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হবে মিশরকে।
শুধু ভারত নয়, মধ্যপ্রাচ্যের আঙ্গিক থেকে যদি দেখা হয়, তবে সৌদি আরবই চায় না মিশর এই জোটে যোগ দিক। কারণ, ২০১৩ সালে মিশর সরকারকে ২৫ বিলিয়ন ডলার সাহায্য দিয়েছিল সৌদি আরব। তবে অভিযোগ, বদলে সৌদি সেভাবে সাহায্য পায়নি। ইয়েমেনে হাউথিদের বিরুদ্ধে মিশরের কোনও পদক্ষেপ ছিল না। ফলে সৌদির মতে পাকিস্তান ও তুরস্কই জোটের জন্য উপযুক্ত। পাশাপাশি রিপোর্ট বলছে, সংযুক্ত আরব আমিরশাহীর সঙ্গে মিশরের সামরিক চুক্তি রয়েছে। ইজরায়েলের সঙ্গেও ১৯৭৩ সাল থেকে তাঁরা চুক্তিতে আবদ্ধ। অন্যদিকে, তুরস্কের সঙ্গে সংঘাতে লিপ্ত গ্রিস ও সাইপ্রাস মিশরের ভালো বন্ধু। এই অবস্থায় ‘মক্কা চুক্তি’তে গেলে ইরান, হাউথি, ইজরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরশাহী, গ্রিস, সাইপ্রাস এবং ভারত সবার বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হবে মিশরকে।

কূটনৈতিক মহলের মতে, ঠান্ডা লড়াইয়ের সময় আমেরিকা ও রাশিয়া কোনও পক্ষে যোগ না দিয়ে এনএএম (Non-Aligned Movement) বানিয়েছিল ভারত ও মিশর। মক্কা চুক্তির ক্ষেত্রেও ঠিক একই পথে হাঁটছে তারা। আমেরিকা বনাম ইরান, সৌদি বনাম আমিরশাহী, তুরস্ক বনাম গ্রিস কিংবা পাকিস্তান বনাম ভারতের রাস্তায় না হেঁটে সকলের সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্ক রাখতে চাইছে কায়রো। ফলে মিশর সরাসরি ‘না’ বলছে না। মিশরের বয়ান হল, ‘এখন না’।
তবে তুরস্ক চায় আফ্রিকার দেশ মিশর এই জোটে যোগ দিক। কারণ বর্তমানে ৪.৪ লক্ষ সেনা রয়েছে মিশরের। দেশটির হাতে রয়েছে ইউরোপ-এশিয়ার বাণিজ্যপথ সুয়েজ খাল। মার্কিন অস্ত্রে সজ্জিত মিশরের সামরিক বাহিনী। ফলে যুদ্ধের ময়দানে কৌশলগত দিক থেকে মিশর অন্যতম বড় শক্তি। তবে সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে ইসলামী আবেগের হুজুগ নয়, বরং বুদ্ধিমান মিশর মেপে পা ফেলতেই বেশি আগ্রহী।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
‘আমরা আসছি’, ভারত সফরের আগে সোশাল মিডিয়ায় বিশেষ বার্তা ব্রাজিল দলের
-
প্রোমোটারের কাছ থেকে ১ লক্ষ টাকা ঘুষ! কনস্টেবলকে হাতেনাতে ধরল দুর্নীতি দমন শাখা
-
বাংলার পর অসমের মামলাতেও জামিন, ১৩ বছর পর বিরাট স্বস্তিতে সারদা কর্তা সুদীপ্ত সেন
-
পুকুরে ভেসেই কাটছিল জীবন! অনন্ত আম্বানির হস্তক্ষেপে মুম্বইয়ে চিকিৎসা পাচ্ছে মুর্শিদাবাদের সেই ইকবাল
-
এবার রাজ্য ও জাতীয় টেবিল টেনিস দলকে স্পনসর করবে রাজ্যের পর্যটন দপ্তর! বড়সড় ইঙ্গিত মন্ত্রীর