Advertisement
Advertisement
Advertisement
Sangbad Pratidin
  • ২৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
  • বুধবার
  • ১২ আগস্ট ২০২৬
Sahel Region

কাবুল-সিরিয়া ছাড়িয়ে ‘গ্লোবাল জেহাদে’র ভরকেন্দ্র সাহেল, গদ্দাফির মৃত্যুর মাশুল গুনছে মধ্য আফ্রিকা

রাষ্ট্রসংঘের মতে, সাহেল এখন বিশ্ব সন্ত্রাসবাদের ভরকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। যদি দ্রুত এই অঞ্চলে সন্ত্রাসবাদের উপর লাগাম পরানো না যায়, তবে পুরো আফ্রিকা এদের কবলে চলে যেতে পারে।

অমিত কুমার দাস
অমিত কুমার দাস

শেষ আপডেট: আগস্ট ১২, ২০২৬, ১৪:৩৬

link
অমিত কুমার দাস
অমিত কুমার দাস

শেষ আপডেট: আগস্ট ১২, ২০২৬, ১৪:৩৬

options
link
কাবুল-সিরিয়া ছাড়িয়ে ‘গ্লোবাল জেহাদে’র ভরকেন্দ্র সাহেল, গদ্দাফির মৃত্যুর মাশুল গুনছে মধ্য আফ্রিকা zoom
'গ্লোবাল জেহাদে'র ভরকেন্দ্র সাহেল।
Advertisement

২০১১ সালে লিবিয়াতে যে বোমাটা ন্যাটো ফাটিয়েছিল, সেই বিস্ফোরণের আঁচে আজও পুড়তে হচ্ছে গোটা আফ্রিকাকে। এক সময় বিশ্বসন্ত্রাসের কেন্দ্রবিন্দু ছিল কাবুল-সিরিয়া। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সন্ত্রাসের সেই ভরকেন্দ্র পরিবর্তিত হয়েছে। আইসিস থেকে আল কায়দা, সন্ত্রাসের বীভৎস কালো মুখগুলির খোলা মঞ্চ এখন হয়ে উঠেছে মধ্য আফ্রিকার সাহেল অঞ্চল। রাষ্ট্রসংঘের রিপোর্ট বলছে, শেষ তিন বছর ধরে আফ্রিকার এই অঞ্চল সন্ত্রাসবাদে শীর্ষস্থানে বসে রয়েছে। ২০২৪ সালে গোটা বিশ্বে সন্ত্রাসী হামলায় ৭৫৫৫ জনের মৃত্যু হয়, এর অর্ধেকেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে শুধুমাত্র সাহেলে। কিন্তু প্রশ্ন হল, গোটা বিশ্ব যেখানে প্রযুক্তি ও উন্নয়নের প্রতিযোগিতায় মেতে, সেখানে আফ্রিকা কেন ধীরে ধীরে আরও অন্ধকার, রক্ত ও মৃত্যুর কুহরে ঢুকতে শুরু করেছে? তথ্য বলছে, সাহেলের (Sahel Region) এই ভয়ংকর পরিণতির অদৃশ্য তার বাঁধা রয়েছে লিবিয়ায় গদ্দাফির পতনের সঙ্গে।

সাহারার দক্ষিণ আটলান্টিক থেকে লোহিত সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত মধ্য আফ্রিকার এই সাহেল অঞ্চল। মৌরিতানিয়া, মালি, বুরকিনা ফাসো, নাইজার, চাদ, সুদান, নাইজেরিয়ার উত্তর অংশ মিলিয়ে ৫ হাজার বর্গকিমি এলাকা এই অঞ্চলের মধ্যে পড়ে। বর্তমানে এইসব অঞ্চলকে ভয়ংকর বললেও কম বলা হয়। চরম অন্ধকারে ডুবে থাকা এই দেশগুলিতে রক্তপাত, মৃত্যু, নৃশংসতা অতিসাধারণ ঘটনা। বিস্তীর্ণ এই অঞ্চল বর্তমানে বিশ্ব সন্ত্রাসের ‘প্রোটো স্টেট’। এতগুলি দেশে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে ৩ ভয়ংকর জঙ্গি সংগঠন।
১. আল কায়দা ঘনিষ্ঠ জেএনআইএম (JNIM), এদের কার্যকলাপ চলে মালি, বুরকিনা ফাসোতে।
২. ইসলামিক স্টেটের দুই শাখা আইএসজিএস (ISGS) ও আইএসডব্লুপি (ISWAP) এবং
৩. বোকো হারাম। চরম দারিদ্রে ডুবে থাকা আফ্রিকায় এই অঞ্চলগুলিতে গভীরভাবে দাঁত ফুটিয়েছে জেহাদের রাক্ষস। শুধু তাই নয়, এদের অস্ত্রশস্ত্রও উন্নত বিশ্বের মতো আধুনিক। ড্রোনের ব্যবহার থেকে ক্রিপ্টো কারেন্সি, যুদ্ধের আধুনিক পন্থা রপ্ত করে বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাস চালাচ্ছে জঙ্গি সংগঠনগুলি।

Advertisement

 ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠার নামে খনিজ সম্পদে পূর্ণ এইসব অঞ্চলের অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণও এখন জঙ্গিদের হাতে। মালি ও বুরকিনা ফাসোতে রয়েছে সোনার খনি, চাদ, নাইজারে রয়েছে জ্বালানি তেলের ভাণ্ডার। চোরা বাজারে এই সব খনিজ সম্পদ বিক্রি করে বিপুল অর্থ আয় করছে জঙ্গিরা।

ওয়াকিবহাল মহলের মতে, আফ্রিকার দেশগুলিতে দুর্বল সরকার, দুর্নীতি, অপশাসন আখড়া ছিল চিরকাল। ঠিক সেই ফাঁক দিয়েই এখানে পা রাখে জেহাদের বীজ। তবে সন্ত্রাসবাদ মাত্রাছাড়া আকার নেয় ২০১১ সালে লিবিয়ায় গদ্দাফি সরকারের পতনের পর। ন্যাটোর হামলায় একনায়ক শাসকের পতনে লিবিয়া ৩ টুকরো হয়। দক্ষিণ সীমান্তে কোনও সরকার না থাকায় সেটাই হয়ে ওঠে জঙ্গিদের হাইওয়ে, ট্রেনিং ক্যাম্প ও অস্ত্রের বাজার। গদ্দাফির মৃত্যুর পর লিবিয়ার অস্ত্রাগার লুট হয়। হাজার হাজার ট্রাক ভর্তি একে-৪৭, রকেট লঞ্চার, গোলা-বারুদ সাহারা পেরিয়ে চলে আসে সাহেল অঞ্চলে। সেই অস্ত্রের নৃশংসতা আজও বহাল রয়েছে অঞ্চলগুলিতে।

Sahel Region: Militants are patrolling the village
গ্রামে টহল দিচ্ছে জঙ্গিরা।

শুধু তাই নয়, গদ্দাফির হয়ে লড়াই করা তুয়ারেগ, চাদিয়ান ও নাইজেরিয়ান প্রশিক্ষিত ভাড়াটে যোদ্ধারা অস্ত্র-সহ এইসব অঞ্চলে ফিরে আসে। ২০১২ সালে এরাই মালির উত্তরে শুরু করে তুয়ারেগ বিদ্রোহ। সেই ফাঁক দিয়েই আল-কায়দা ইসলামিক মাগরেব (AQIB)। যা পরে ভাগ হয়ে জন্ম নেয় একের পর এক সন্ত্রাসী সংগঠন। দেশগুলির শহরাঞ্চলে সরকার নামের বস্তু টিকে থাকলেও গ্রামগুলিতে এদের দাপট ক্রমশ বাড়তে থাকে। বন্ধ হয় স্কুল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র। খাদ্যাভাব, নিরাপত্তাহীনতা ও সরকারের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে হাজার হাজার স্থানীয় জনগণকে নিয়োগ করে জঙ্গিরা। এরপর ধীরে ধীরে মধ্যআফ্রিকার বিরাট ভুখণ্ড হয়ে সন্ত্রাসের অবাধ বিচরণভূমি। এই সন্ত্রাস শুধুমাত্র সাহেল অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নেই ক্রমশ গিনি উপসাগরের উপকূলীয় দেশ বেনিন, টোগোতেও ছড়াতে শুরু করেছে। ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠার নামে খনিজ সম্পদে পূর্ণ এইসব অঞ্চলের অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণও এখন জঙ্গিদের হাতে। মালি ও বুরকিনা ফাসোতে রয়েছে সোনার খনি, চাদ, নাইজারে রয়েছে জ্বালানি তেলের ভাণ্ডার। চোরা বাজারে এই সব খনিজ সম্পদ বিক্রি করে বিপুল অর্থ আয় করছে জঙ্গিরা। অর্থের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে সন্ত্রাস। দাবি করা হয়, ২০২৫ সালে সাহেল অঞ্চলে সন্ত্রাসের বলি হয়েছেন ৯৮০০-র বেশি মানুষ। গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছে জঙ্গিরা। প্রাণ ভরে ঘরছাড়া হয়েছেন লক্ষাধিক মানুষ।

Islamic State’s growing influence in the Sahel Region
সাহেল অঞ্চলে ইসলামিক স্টেটের দাপট।

রাষ্ট্রসংঘের রিপোর্ট অনুযায়ী, আফ্রিকার সাহেল অঞ্চল থেকে ২০২২ সাল নাগাদ সেনা প্রত্যাহার করে নেয় ফ্রান্স। এরপর থেকে এই অঞ্চলে সন্ত্রাসের জেরে মৃত্যুর ঘটনা প্রায় ১০ গুণ বেড়েছে। ফ্রান্সের শূন্যস্থান পূরণে মালি ও বুরকিনা ফাসোর মতো দেশগুলো রাশিয়ার ভাড়াটে সৈন্য ‘ওয়াগনার’ ও ‘আফ্রিকা কর্পসে’র উপর নির্ভরতা বাড়িয়েছে। তাতে অবশ্য বিশেষ ফল হচ্ছে না। এই পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে রাষ্ট্রসংঘ। তাদের মতে, সাহেল এখন বিশ্ব সন্ত্রাসবাদের ভরকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। যদি দ্রুত এই অঞ্চলে সন্ত্রাসবাদের উপর লাগাম পরানো না যায়, তবে পুরো আফ্রিকা এদের কবলে চলে যেতে পারে। যা আধুনিক বিশ্বের জন্যেও খুব একটা সুখকর হবে না।

Advertisement

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Share this article on

The article link is copied.