সকালই বলে দেয় দিনটা কেমন যাবে। বহু পুরনো এই প্রবাদ সব সময় সত্যি হয় না। হলে ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্টের সকালটা এমন রোদ ঝলমলে হত না। ছোট্ট মেয়ে মিচিকো কোদামা আজ ৮৮ বছরের বৃদ্ধা। কিন্তু আজও তাঁর চোখে স্পষ্ট ভাসে সবটা। সকাল সোয়া আটটায় রোদ্দুরমাখা সকালে যখন তিনি স্কুলে গিয়েছিলেন, কে জানত আর কিছুক্ষণের মধ্যেই জীবনটাই বদলে যাবে চিরতরে। একটা সাদা আলোর ঝলকানি… মিচিকোর চোখের সামনে জেগে উঠেছিল এক মৃত্যুপুরী… সেই বিবরণ আজও মুহূর্তে আমাদের নিয়ে যায় আট দশকেরও বেশি পুরনো সেই দিনটায়। পৃথিবী কোথা থেকে কোথায় চলে গিয়েছে। কিন্তু সময় আজও থমকে আছে সেই মানুষগুলোর মনে, যাঁরা চোখের সামনে দেখেছিলেন কেমন করে ‘লার্জার দ্যান লাইফ’ মৃত্যু হানা দিচ্ছে গডজিলার (স্রষ্টা ইসিরো হন্ডা স্বীকার করেছিলেন, পারমাণবিক বিস্ফোরণ না দেখলে ওই দানব তাঁর কল্পনাতেও আসত না) মতো।
শুরু থেকে বলা যাক। জাপানজুড়ে যখন নির্বিচারে হামলা চালাচ্ছিল আমেরিকা, তখনও হিরোশিমা ও নাগাসাকি অক্ষতই ছিল। সবটা বদলে গেল ৬ আগস্ট। সেদিন ছোট্ট মিচিকো বসেছিল স্কুলের ডেস্কে। তার কথায়, ”ক্লাসে বসেছিলাম। হঠাৎই সাদা বিদ্যুৎরেখা ঝলসে উঠল যেন! ধসে গেল সব দেওয়াল। আমার হাতে ছিটকে এসে বিঁধে গেল একটা কাচ। আমি ও আমার চারপাশের সবাই নিমেষে নিজেদের আবিষ্কার করলাম একটা ধ্বংসস্তূপের মধ্যে। কিন্তু কীভাবে যেন… সকলেই বেঁচেছিল।”
আরও পড়ুন:
সকাল সোয়া আটটায় রোদ্দুরমাখা সকালে যখন তিনি স্কুলে গিয়েছিলেন, কে জানত আর কিছুক্ষণের মধ্যেই জীবনটাই বদলে যাবে চিরতরে। একটা সাদা আলোর ঝলকানি… মিচিকোর চোখের সামনে জেগে উঠেছিল এক মৃত্যুপুরী… সেই বিবরণ আজও মুহূর্তে আমাদের নিয়ে যায় আট দশকেরও বেশি পুরনো সেই দিনটায়।
শিক্ষিকারা দ্রুত ছাত্রীদের শুশ্রুষা শুরু করে দেন। পর্দার কাপড় দিয়ে ব্যান্ডেজ করে দেওয়া হয় মিচিকোকে। শিগগিরি তাকে বাড়ি নিয়ে যেতে আসেন বাবা। তাঁর কাঁধে করে যেতে যেতে ছোট্ট মিচিকো দেখেছিল চারপাশের ধ্বংসস্তূপ ও মৃত্যুদীর্ণ জনপদকে। মিচিকো জানিয়েছেন, ”৭৯ বছর পরেও আমি সেই দৃশ্যগুলো ভুলতে পারি না। প্রায় অধিকাংশ শরীর পুড়ে যাওয়া এক মা তাঁর শিশুর ঝলসে যাওয়া দেহটি বুকে জড়িয়ে ধরে আছেন, চোখ উপড়ে যাওয়া মানুষরা উদ্দেশ্যহীনভাবে হামাগুড়ি দিচ্ছে, নিজেদের নাড়িভুঁড়ি হাতে নিয়ে টলমল পায়ে হেঁটে চলেছে আরও কত মানুষ!” পরবর্তী সময়ে মিচিকো জানতে পেরেছিলেন ঠিক যেখানে বোমাটি পড়েছিল, অর্থাৎ বিস্ফোরণের কেন্দ্রবিন্দু থেকে প্রায় ৩.৫ কিলোমিটার দূরেই ছিল তাঁর পাড়া তাকাসু! ফলে কালো বৃষ্টির (ছাই, জল ও তেজস্ক্রিয় বর্জ্যের বিষাক্ত মিশ্রণ) সবচেয়ে ভয়াল চেহারা যে সব অঞ্চলে দেখা গিয়েছিল, তার মধ্যে অন্যতম ছিল সেই এলাকা।

মিচিকো একজন হিবাকুশা। পারমাণবিক বোমাবর্ষণের কবলে পড়েও বেঁচে যাওয়া মানুষদের এই নামেই ডাকা হয়। জীবনের পরবর্তী পর্যায়েও সেই অভিশাপ তাঁকে বয়ে নিয়ে যেতে হয়েছে। তবে সরাসরি ক্ষতি সেই অর্থা কমই হয়েছিল তাঁর। মিচিকোর মা, বাবা, ছোট ভাই হিডেনোরি এবং ছোট বোন ইউকিকো— কেউই নিহত বা গুরুতর আহতও হননি। তবে সেই সময় তাঁর মা ছিলেন অন্তঃসত্ত্বা। হামলার কয়েক মাস পরেই আরেকটি পুত্রসন্তানের জন্ম দেন তিনি। কিন্তু জন্মের অল্প কিছুদিনের মধ্যেই শিশুটি মারা যায়। মিচিকোর দৃঢ় বিশ্বাস, এর নেপথ্যে নিশ্চিতভাবেই ছিল তেজস্ক্রিয়তার বিষক্রিয়া।
পরবর্তী সময়ে মিচিকো জানতে পেরেছিলেন ঠিক যেখানে বোমাটি পড়েছিল, অর্থাৎ বিস্ফোরণের কেন্দ্রবিন্দু থেকে প্রায় ৩.৫ কিলোমিটার দূরেই ছিল তাঁর পাড়া তাকাসু! ফলে কালো বৃষ্টির (ছাই, জল ও তেজস্ক্রিয় বর্জ্যের বিষাক্ত মিশ্রণ) সবচেয়ে ভয়াল চেহারা যে সব অঞ্চলে দেখা গিয়েছিল, তার মধ্যে অন্যতম ছিল সেই এলাকা।
পরমাণু বোমায় মিচিকোর বাড়িটি ধ্বংস হয়নি। আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া সেই বাড়িই হয়ে উঠেছিল অসংখ্য আহত ও গৃহহীন আত্মীয়স্বজনের আশ্রয়স্থল। মিচিকোর আজও অবিকল মনে আছে সবটা, ”তাঁদের অনেকেই ছিলেন মারাত্মকভাবে আহত। শরীর থেকে চামড়া ও মাংস খসে খসে পড়েছিল।” চোদ্দো বছরের খুড়তুতো দিদির মৃত্যুটা আজও চোখের সামনে অবিকল ফুটে ওঠে মিচিকোর।

বিস্ফোরণের পর বাড়িতে ছিল না বিদ্যুৎ, জল ও গ্যাসের সংযোগও। এমনকী চিকিৎসার সরঞ্জামও। এমন সংকটের মধ্যেই বাড়ির উঠোনে থাকা কুয়োটা অনেক সাহায্য করেছিল। তৃষ্ণা মেটাতে তার ঠান্ডা জল সকলের পরম উপকারে এসেছিল। পাশাপাশি আহতদের ক্ষত পরিষ্কারও করা হয়েছিল ওই কুয়োর জলেই।
তবুও জীবন থেমে থাকেনি। জীবনের থেমে থাকার হুকুম নেই বলেই হয়তো! এক সপ্তাহের মধ্যেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করে। রেললাইন অক্ষত ছিল। তাই ট্রেনগুলো শহরের দগ্ধ ধ্বংসাবশেষের মধ্য দিয়ে চলাচল করছিল। বিক্রেতারা তাঁদের বিধ্বস্ত দোকানপাটেই বসে পড়লেন পসরা নিয়ে। সবই চলছিল। কিন্তু নেপথ্যে থেকে গিয়েছিল ব্যাঙের ছাতার মতো এক মৃত্যুর অতিকায় মেঘের হুমকি! স্বচ্ছল পরিবারে জন্মানো মিচিকো দেখতে পেয়েছিল, কীভাবে রাতারাতি পরমাণু বোমা এসে এসে সবটা বদলে দিয়েছিল। আঙিনা বেয়ে প্রবেশ করে দারিদ্র। মিচিকো বলছেন, ”আমি আর আমার ছোট ভাই হিডেনোরি ঘাসফড়িং ধরতে বেরোতাম সেগুলো কড়াইয়ে ভেজে খেতাম। ব্যাপারটা নিষ্ঠুর মনে হতে পারে। কিন্তু ওটাই ছিল আমাদের প্রোটিনের উৎস। এছাড়া নদীতে শামুক-ঝিনুক ধরতেও যেতাম।”
তবুও জীবন থেমে থাকেনি। জীবনের থেমে থাকার হুকুম নেই বলেই হয়তো! এক সপ্তাহের মধ্যেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করে। রেললাইন অক্ষত ছিল। তাই ট্রেনগুলো শহরের দগ্ধ ধ্বংসাবশেষের মধ্য দিয়ে চলাচল করছিল।
এভাবেই গ্রাসাচ্ছেদন। এভাবেই জীবনের জন্য লড়াই। ধীরে ধীরে ছোট্ট বালিকা মিচিকো তরুণী হয়ে ওঠেন। পড়াশোনা শেষ করে চাকরিও জোগাড় করেন। এক সহকর্মীর সঙ্গে প্রেমও হয়ে গেল। কিন্তু বিয়ে হল না। সেই তরুণের বাবা যুদ্ধে মারা গিয়েছিলেন। তাঁদের পরিবার হিরোশিমার বাইরেই বসবাস করত। তরুণটির মা সটান বলে দিলেন, এই বিয়ে হতে পারে না। কেননা মিচিকো একজন হিবাকুশা। তাঁর সঙ্গে ছেলের বিয়ে দিলে নাতি-নাতনির শরীরে মিশে যাবে বিষরক্ত!
পরে অবশ্য আরেকজনের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ান মিচিকো। বিয়ে হয়। কিন্তু সন্তান? কত রাত দু’জনে জেগে কাটিয়েছেন নতুন কোনও প্রাণকে এই পৃথিবীতে আনবেন কিনা তা নিয়ে। ভয় ছিল তার শরীরেও মিশে থাকবে পরমাণু বোমার ‘বিষ’! কিন্তু শেষে দেখা যায়, দুই সন্তানই একেবারে স্বাভাবিক ও সুস্থ! তেজস্ক্রিয়তার অভিশাপ তাদের স্পর্শও করতে পারেনি।
হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে ঠিক কতজন হতাহত হয়েছিলেন, তার সঠিক সংখ্যা আজও জানা যায়নি। আসলে সেটা ছিল অসম্ভব। যুদ্ধকালীন জাপানে কোনও আদমশুমারিই যে হয়নি। তবে মার্কিন হিসাব অনুযায়ী, হিরোশিমায় ৭০ হাজার এবং নাগাসাকিতে ৪০ হাজার মানুষ প্রাণ হারান। এদিকে অ্যালবার্ট আইনস্টাইন প্রতিষ্ঠিত মার্কিন অলাভজনক সংস্থা ‘বুলেটিন অফ দ্য অ্যাটমিক সায়েন্টিস্টস’-এর মতে, নিহতের সংখ্যা হিরোশিমায় প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার, নাগাসাকিতে ৭০ হাজারের কাছাকাছি। পরবর্তী সময়ে আরও ১ লাখ ২০ হাজার হিবাকুশা দগ্ধ হয়ে এবং তেজস্ক্রিয়তাজনিত আঘাতের কারণে প্রাণ হারান। তথাকথিত ‘রেডিয়েশন সিকনেস’ বা তেজস্ক্রিয়তাজনিত অসুস্থতার লক্ষণগুলোর মধ্যে ছিল অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ, বমি, মুখ ও গলায় প্রদাহ, ডায়রিয়া এবং তীব্র জ্বর।
হিরোশিমা ও নাগাসাকি আজ স্বাভাবিক দু’টো শহর। তবু বাতাসে এখনও মৃত্যুর গন্ধ। তাছাড়া এটা তো শুধু দুই শহরের ইতিহাস নয়। গোটা বিশ্বের কাছে একটা দুঃস্বপ্নের মতো আজও জেগে আছে পরমাণু বিস্ফোরণের সেই ভয়াল স্মৃতি। পরবর্তী সময়ে হিদাকুশাদের নিয়ে গঠিত হয়েছিল নিহন হিদানকিও। যে সংগঠনের কাজ বিশ্ববাসীকে সচেতন করা। ২০২৪ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কারও তারাই পেয়েছে। সেই সংগঠনের অন্যতম সদস্য মিচিকো। বয়স শরীরকে ন্যুব্জ করে তুললেও হৃদয় আজও সক্রিয়। এখনও তিনি কাজ করে যাচ্ছেন শান্তির বার্তা সকলের কাছে পৌঁছে দেওয়ার। দশকের পর দশক পেরিয়ে মনের কোণে গেঁথে থাকা শৈশবের সেই ভয়াল স্মৃতির কথা তুলে ধরাই এখন তাঁর কাজ। নিজের এই দীর্ঘ জীবনের উপলব্ধির কথা শোনাতে বসে মিচিকো জানিয়েছেন, ”অল্প বয়স থেকেই আমি বুঝতে পেরেছিলাম জীবনের মর্যাদা এবং মৃত্যুর ভয়ংকরতার দিকটি। জীবনের নানা অভিজ্ঞতা আমাকে আরও শক্তিশালী মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছে। পারমাণবিক হামলার বিকট সত্য তরুণ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে চেষ্টা করে গিয়েছি। এটা যে বিরাট জরুরি এক বার্তা। কেননা আমিও যেকোনও দিন মারা যেতে পারি।” সময় পেরিয়ে গিয়েছে। সেই বীভৎসতাকে আজও ভোলেননি মিচিকো। ভুলবেন না জীবনের বাকি দিনগুলোতেও।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
ছেলের মাসপূর্তিতে উপহারের সম্ভার! খেলনা থেকে মিক্সার মেশিন, দেখিয়ে কী বললেন ইউটিউবার সুস্মিতা?
-
ফেজ টুপির উপর পরতেই হবে হেলমেট! খিদিরপুর-পার্কসার্কাস-রাজাবাজারের আরোহীদের নির্দেশ স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বতের
-
বাংলায় ‘রক্তচুরি’! ব্লাড ব্যাঙ্কের অনিয়ম নিয়ে কেন্দ্রকে রিপোর্ট দেবে রাজ্য
-
টানা তিনবার বিশ্বকাপে যোগ্যতা অর্জনে ব্যর্থ! টিকিট পেতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ভরসা কোন সমীকরণ?
-
আসানসোলে বিজেপির কর্মসূচিতে কয়লা মাফিয়া আনোয়ার! টেনে সভাস্থল থেকে বের করল কর্মীরা