কৈলাশে মহাপ্রলয়। কেন এমন পরিস্থিতি? বাংলার জন্য কতটা ঝুঁকি রয়েছে? কলম ধরলেন নদী বিশেষজ্ঞ কল্যাণ রুদ্র।
বিশ্ব উষ্ণায়নের চরম মাশুল গুনছে হিমালয় পার্বত্য অঞ্চল। প্রতিশোধ নিচ্ছে প্রকৃতি। মাত্রাতিরিক্ত তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে নদী বিশেষজ্ঞ হিমবাহ গলে পিছিয়ে যাচ্ছে। সামনে তৈরি হচ্ছে হিমবাহ হ্রদ। এখনও পর্যন্ত হিমালয় জুড়ে এমন ২০০টিরও বেশি বিপজ্জনক হিমবাহ হ্রদের হদিশ মিলেছে। এর মধ্যে শুধু সিকিমেই রয়েছে ১৭টি, যেগুলিতে কোনও দুর্ঘটনা ঘটলে সরাসরি প্রভাবিত হবে পশ্চিমবঙ্গ। নেপালের বিপর্যয়ের (Nepal Flash Flood) প্রভাবও বিহার হয়ে পশ্চিমবঙ্গে পড়বে। আসলে ভূ-প্রাকৃতিক গঠন অনুযায়ী নেপালের গণ্ডকী ও কোশি নদীর ঢাল অত্যন্ত খাড়া। ফলে পাহাড়ি উপত্যকায় মেঘভাঙা বৃষ্টি, ভূমিকম্প কিংবা ধসের কারণে প্লাবনভূমির দু’পাশ ধসে নদীখাত অবরুদ্ধ হয়। এরপর জমা জল হঠাৎ বাঁধ ভেঙে নেমে এলে তৈরি হয় বিধ্বংসী ‘হড়পা বান’ বা গ্লেসিয়ার লেক বার্স্ট ফ্লাড। যে এলাকায় বিপর্যয় নেমেছে সেখানে বা আশেপাশের অঞ্চলে কোনো ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছিল না। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গিয়েছে মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে প্রায় ৩৩ ফুট (১০ মিটার) উঁচু কাদা, পাথর ও জলের একটি বিশাল দেয়াল আছড়ে পড়ে। কোনো আবহাওয়া সংক্রান্ত সতর্কবার্তাও ছিলনা। তাই স্থানীয় মানুষ ও প্রশাসন সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত ছিলেন।
পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং ও কালিম্পং জেলায় এই গোত্রর বিপর্যয়ের ঝুঁকি রয়েছে। সিকিমের গ্লেসিয়ার লেক ফাটলে তিস্তা নদীপথে জল ও ডেব্রিস নেমে এসে উত্তরবঙ্গে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটাতে পারে।
নেপালের প্লাবনভূমিতে অনিয়ন্ত্রিত জনবসতি ও অপরিকল্পিত নির্মাণের ফলে এই দুর্যোগের তীব্রতা ও ক্ষয়ক্ষতি বহুগুণ বেড়ে যায়। প্রাথমিকভাবে যতটুকু জেনেছি তা হল, নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী তিব্বতে একটি বিরাট বরফ ও পাথরের ধস নেমেছিল। এই ধসের জেরে লেন্দে খোলার প্রবাহ আটকে ব্যারাজের মতো জল জমে। পরে সেই জল একসঙ্গে প্রবল বেগে নিচে নেমে আসায় ভোট কোশি ও ত্রিশূলি নদীতে হড়পা বান নামে। ঘটনার সময় তিব্বত অঞ্চলে ৪.৪ মাত্রার একটি ভূকম্পন রেকর্ডবন্দিও হয়। এখন দেখা হচ্ছে এই ভূমিকম্পের জেরে হিমবাহ বা পাহাড়ি ধস নেমেছিল কি না। আন্তর্জাতিক পর্বত উন্নয়ন কেন্দ্রের মতে, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তনে হিমালয় অঞ্চলে এ ধরনের আকস্মিক বিপর্যয় ও তুষারধসের মাত্রা ও পুনরাবৃত্তি দ্রুত বাড়ছে।
১৯৮০ সালের তামোরের নাগমা পোখারি, ১৯৮১-র ঝাংঝাংবো হ্রদ, ১৯৮৫-র দুধ কোশির এবং ১৯৯৮-র ট্যাম পোখরি বিপর্যয় উল্লেখযোগ্য। ১৯৮১ সালে ঝাংঝাংবো হ্রদ ভেঙে এক ঘণ্টায় প্রায় ১.৯ কোটি ঘনমিটার জল নেমেছিল। ২০১৩ সালের জুনে কেদারনাথের চুরাবারি হিমবাহ সংলগ্ন হ্রদ ফেটে ও মেঘভাঙা বৃষ্টিতে হড়পা বানে কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। ২০২৩ সালের অক্টোবরে সিকিমের দক্ষিণ লোঙ্ক হিমবাহ হ্রদ ফেটে তিস্তা নদীতে ভয়াবহ প্লাবন হয়। ধ্বংস হয় বিদ্যুৎ প্রকল্প। ২০২৫-এর আগস্টে উত্তরকাশীর ধারালিতে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ধসে ক্ষিপ্রগতির ডেব্রিস ফ্লো এবং হড়পা বানে লোকালয় তছনছ হয়ে যায়। উপগ্রহ চিত্র এবং আন্তর্জাতিক পরিবেশ গবেষণার তথ্য নিশ্চিত করে যে, হিমালয়ের হিমবাহ সংকোচন অত্যন্ত দ্রুত হারে ঘটছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে জল জমে নতুন নতুন হ্রদের আয়তন প্রতিদিন বাড়ছে। নেপাল, উত্তরাখণ্ড ও সিকিমের এই প্রাকৃতিক ভাঙন কেবল পাহাড়ি অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; এটি গঙ্গা ও তিস্তা অববাহিকা ধরে পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের সমতলভূমির নিরাপত্তা ও নদী-বাস্তুতন্ত্রের ওপর স্থায়ী বিপজ্জনক ছায়া ফেলছে। ফারাক্কা ব্যারাজও নদীর পলি পরিবহণ ও তলদেশের চরিত্র বদলেছে।
পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং ও কালিম্পং জেলায় এই গোত্রর বিপর্যয়ের ঝুঁকি রয়েছে। সিকিমের গ্লেসিয়ার লেক ফাটলে তিস্তা নদীপথে জল ও ডেব্রিস নেমে এসে উত্তরবঙ্গে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটাতে পারে। আগেও এর প্রমাণ মিলেছে। পাশাপাশি অতিবৃষ্টি, মেঘভাঙা বৃষ্টি ও দুর্বল পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির কারণে ভূমিধস ও হড়পা বান সৃষ্টি হয়। নদীতে অতিরিক্ত পলি জমা, অপরিকল্পিত নির্মাণ এবং নদীতীর ও পাহাড়ি ঢালে জনবসতি ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়। তিস্তা, রংপো, রিয়াং, মহানন্দা, বালাসন, তোর্সা ও জলঢাকা অববাহিকা বিশেষভাবে বিপজ্জনক। তাই আগাম সতর্কতা, সঠিক ভূমি-ব্যবহার পরিকল্পনা, নদীখাত সংরক্ষণ ও দুর্যোগ-প্রস্তুতি অত্যন্ত জরুরি।
সর্বশেষ খবর
-
স্ত্রীকে চাকরি, অর্থ সাহায্য, সুনীল সিংয়ের নিহত আপ্ত সহায়কের পরিবারের পাশে অর্জুন
-
‘সংখ্যাগরিষ্ঠ জেন জি আরএসএসে আছে’, দাবি বিজেপি নেতার
-
৭২ ঘণ্টায় ভাঙবে চিনের আরও এক হিমবাহ হ্রদ! ‘মৃত্যুপুরী’ নেপালে নয়া আতঙ্ক, ‘বন্ধুত্বে’র খেসারত দিচ্ছে কাঠমান্ডু?
-
বিজেপির বাংলা জয়ে ১০ লাখের মিষ্টি বিলিয়েছেন আদানি! জানালেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু
-
মুখে মুখে তর্ক করছে একরত্তি? শিশুকে সম্মানের গুরুত্ব বোঝাতে মাথা ঠান্ডা রেখেই এই ৪ জবাব দিন