রথের চাকার ঘর্ঘর ধ্বনি আর ‘জয় জগন্নাথ’ রবে মুখরিত চারদিক। প্রতি বছর আষাঢ়ের এই বিশেষ তিথিতে পুরীর রাজপথে আছড়ে পড়ে লক্ষ লক্ষ ভক্তের আবেগ। মন্দিরের গর্ভগৃহের নিভৃত অন্ধকার ছেড়ে রাজপথে নেমে আসেন বিশ্বচরাচরের নাথ। সনাতন ধর্মের প্রচলিত প্রথাকে ভেঙে দিয়ে ভগবান নিজেই আসেন ভক্তের দ্বারে। কিন্তু আমরা কি সত্যিই এই মহামিলনের গভীর আধ্যাত্মিক মর্মার্থ অনুধাবন করতে পারি? লিখছেন ভক্তিবেদান্ত রিসার্চ সেন্টারের ডিন ড. সুমন্ত রুদ্র।

আরও পড়ুন:
সাধারণত মানুষ ঈশ্বরের খোঁজে মন্দিরে ছোটেন। রথযাত্রার মাহাত্ম্য এই চিরন্তন ধারাকে সম্পূর্ণ উলটে দেয়। এখানে জাতি, বর্ণ, ধর্ম কিংবা সামাজিক ভেদাভেদ মুছে যায়। জগন্নাথদেব শ্রীমন্দির থেকে গুন্ডিচা বাটির উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন সকলের জন্য নিজেকে উন্মুক্ত করে। এই যাত্রা প্রমাণ করে ঈশ্বরের পরম কৃপা কোনও গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়, তা সর্বজনীন।
গৌড়ীয় বৈষ্ণব দর্শনের প্রখ্যাত আচার্যদের মতে, প্রকৃত দর্শন চোখের দেখা নয়। ‘আমি ঈশ্বরকে দেখেছি’—এই অহংকার ত্যাগ করাই সাধনা। বরং পরমেশ্বরের কাছে বিনম্র প্রার্থনা হওয়া উচিত, তিনি যেন কৃপা করে ভক্তের দিকে তাকান। ভগবানের সেই করুণাময় দৃষ্টির স্পর্শেই মানুষের হৃদয়ে ভক্তি ও সেবার আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত হয়। দৃষ্টিভঙ্গির এই সূক্ষ্ম পরিবর্তনই আধ্যাত্মিকতার মূল চাবিকাঠি।

ইতিহাসের পাতায় এই ঐশী কৃপার এক অবিস্মরণীয় দৃষ্টান্ত মেলে। সালটা ছিল ১৮৭৪। রথযাত্রার পুণ্যলগ্নে জগন্নাথদেবের রথের সামনে উপস্থিত করা হয়েছিল শিশু বিমল প্রসাদকে। ঠিক সেই মুহূর্তে মহাপ্রভুর কণ্ঠের দিব্য পুষ্পমাল্য খসে পড়েছিল ওই শিশুর ওপর। এই ঘটনাকে ঈশ্বরের পরম আশীর্বাদ ও অলৌকিক স্বীকৃতি হিসেবেই গণ্য করা হয়েছিল। এই শিশুই পরবর্তীকালে বিশ্ববন্দিত গৌড়ীয় বৈষ্ণব আচার্য শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর নামে পরিচিত হন। তিনি বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের অন্তরে কৃষ্ণভক্তির আলো জ্বেলেছিলেন।

রথযাত্রা আসলে বাইরের কোনও পথপরিক্রমা নয়, এটি অন্তরের এক পরম তীর্থযাত্রা। রথের রশি টানার অর্থ অহংকার থেকে বিনয়ে উন্নীত হওয়া। ধর্মের বাহ্যিক আচার ছেড়ে নিঃস্বার্থ সেবায় আত্মনিয়োগ করাই এর আসল শিক্ষা। রথের গন্তব্য কেবল গুন্ডিচা মন্দিরেই শেষ হয় না। এর আসল গন্তব্য মানুষের অন্তরের মণিকোঠা। জগন্নাথদেবের সেই মায়াময় দৃষ্টি যখন মানুষের চিন্তা ও আচরণকে পবিত্র করে, তখনই এই উৎসব সার্থকতা পায়। জীবনের প্রতি পদে সেই চিরন্তন বার্তাকে ধারণ করাই রথযাত্রার প্রকৃত সার্থকতা।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
একুশে জুলাই শহিদ সমাবেশ করবে NCPI-ও? কাকলির কথায় বড় ইঙ্গিত
-
হাসপাতালের পরিত্যক্ত ভবনে ওষুধ-স্যালাইনের স্টোররুম! স্টোর কিপার-সহ ৫ জনকে শোকজ
-
‘অভিষেকের জন্য জেলে গিয়েছি, কেউ থাকবে না’, ঋত-তৃণমূলে যোগ অনুব্রতর
-
দুর্নীতিতে জিরো টলারেন্স! মহাকাল সেনার নামে তোলাবাজির অভিযোগ, দুর্গাপুরে গ্রেপ্তার ২
-
প্রথা ভাঙছে ফিফা, বিশ্বকাপ ফাইনালে আধ ঘণ্টার হাফটাইম শো! সমস্যায় পড়বেন ফুটবলাররা?