Advertisement
Advertisement
Advertisement
Sangbad Pratidin
  • ২৮ ভাদ্র ১৪৩৩
  • মঙ্গলবার
  • ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Chhau Artist

প্লাস্টিকের কৃত্রিম পায়েই পুনর্জন্ম! ছৌ নাচে দুর্গার ভূমিকায় দুর্দান্ত ‘জীবনজয়ী’ অক্ষয়

১৯৯২ সালে পুরুলিয়ায় বন্যায় ঠিক পুজোর সময়ে ঝাড়গ্রাম থেকে 'জয়পুর ফুট' নিয়ে এসে দুর্গার নাচ শুরু করেন অক্ষয়। এখন তাঁর নিজের দলও রয়েছে।

সুমিত বিশ্বাস
সুমিত বিশ্বাস

শেষ আপডেট: সেপ্টেম্বর ১৫, ২০২৬, ১৪:৪৯

link
সুমিত বিশ্বাস
সুমিত বিশ্বাস

শেষ আপডেট: সেপ্টেম্বর ১৫, ২০২৬, ১৪:৪৯

options
link
প্লাস্টিকের কৃত্রিম পায়েই পুনর্জন্ম! ছৌ নাচে দুর্গার ভূমিকায় দুর্দান্ত ‘জীবনজয়ী’ অক্ষয় zoom
প্লাস্টিকের কৃত্রিম পায়ে ছৌ লোকশিল্পে দুর্গা নাচেন অক্ষয় সহিস। ছবি: সুমিত বিশ্বাস।
Advertisement

নাচতে কষ্ট হয় না? উত্তর- “কষ্ট হলে কি নাচতে পারি?”

ভেঙে যাওয়া ডান পা পচন ধরে যাওয়ায় হাঁটুর নিচ থেকে কেটে বাদ দিতে হয়। না হলে সারা শরীরে ছড়িয়ে মৃত্যুর আশঙ্কা ছিল। ফলে ‘জয়পুর ফুট’ বা প্লাস্টিকের কৃত্রিম পায়েই বীররসের ছৌ নাচেন তিনি। নাচেন দুর্গা। কখনও আবার ছৌ পালা অনুযায়ী, নর্তকী বা সখিও সাজেন। লৌহকঠিন মানসিকতায় তিনি ভেবেছিলেন শুরু থেকে যদি শেষ হতে পারে! তাহলে শেষ থেকে কেন শুরু হবে না?

দুর্গাপুজো ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'দেবীপক্ষ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন
Advertisement

১৯৮৪ সালে ১৩ বছর বয়সে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় ফুটবলের মাঠে গোল বাঁচাতে গিয়ে ভেঙে গিয়েছিল তাঁর ডান পা। আঘাতের গুরুত্ব না বুঝে শুধু বেঁধে রাখা হয়েছিল। ফলে ওই ডান পায়ে ধরে গিয়েছিল পচন।

পুজোর আবহে মায়ের আগমনীতে বরাত পেতে পুরুলিয়ার গ্রামে গ্রামে চলছে এখন মহিষাসুরমর্দিনী পালা। তাই ওই প্লাস্টিকের পায়েই দুর্গা নাচের অনুশীলন করছেন ছৌ শিল্পী অক্ষয় সহিস। শিল্পী মহলে তিনি ‘পুরুষ সুধা চন্দ্রন’ নামে পরিচিত। পুরুলিয়ার পুঞ্চা ব্লকের কেন্দা গ্রাম পঞ্চায়েতের হরিহরপুর গ্রামের ৫৫ বছরের অক্ষয় সহিসের যে অনুপ্রেরণা সুধা চন্দ্রন-ই! প্রখ্যাত ভরতনাট্যম ওই নৃত্য শিল্পীর জীবন যুদ্ধের সঙ্গে অনেকটাই মিল ছৌ শিল্পী অক্ষয়ের।

১৯৮১ সালে ১৬ বছর বয়সে সুধা পথ দুর্ঘটনার মুখোমুখি হয়ে ডান পায়ে গুরুতর চোট পান। চিকিৎসায় ত্রুটির কারণে তাঁর ওই পায়ে গ্যাংগ্রিন হয়ে যায়। বাদ দিতে হয় ডান পায়ের হাঁটুর নিচের অংশ। ঠিক একই অবস্থা হয়েছিল অক্ষয়ের। ১৯৮৪ সালে ১৩ বছর বয়সে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় ফুটবলের মাঠে গোল বাঁচাতে গিয়ে ভেঙে গিয়েছিল তাঁর ডান পা। আঘাতের গুরুত্ব না বুঝে শুধু বেঁধে রাখা হয়েছিল। ফলে ওই ডান পায়ে ধরে গিয়েছিল পচন।

Chhau Artist Akshay Sahis Dances as Durga With Jaipur Foot, Inspires With His Life Story
‘জয়পুর ফুট’ নিয়ে এসে দুর্গার নাচ শুরু করেন অক্ষয়। নিজস্ব চিত্র।

সুধার মতনই অক্ষয়েরও ডান পায়ের হাঁটুর নিচে অংশ কেটে দিতে হয়। অক্ষয়ের দুর্ঘটনার বছরই ১৯৮৪ সালের ২৮ জানুয়ারি কৃত্রিম পায়ে জয়পুর ফুটে মঞ্চে ফিরেছিলেন সুধা চন্দ্রন। কিন্তু নুন আনতে পান্তা ফুরানোর সংসারে অক্ষয়ের ডান পা গ্যাংগ্রিন হয়ে যাওয়ায় চিরতরে বন্ধ হয়ে যায় ফুটবল মাঠে জালের পাশে দাঁড়িয়ে থেকে গোল আটকানো। কিন্তু শিল্পী প্রতিভা থেমে থাকেনি।

সুধাকে পাথেয় করে খানিকটা দেরিতে হলেও ১৯৯২ সালে পুরুলিয়ায় বন্যায় ঠিক পুজোর সময়ে ঝাড়গ্রাম থেকে ‘জয়পুর ফুট’ নিয়ে এসে দুর্গার নাচ শুরু করেন অক্ষয়। এখন তাঁর নিজের দলও রয়েছে। অক্ষয়ের কথায়, “১২ বছর বয়স থেকে আমি গোলকিপার। ফুটবল যেমন খেলতাম তেমনই আমি সখি, নর্তকী নাচি। ঘোড়া নাচও করি। তারপর ছৌ নাচে সাজতাম দুর্গা। গ্রামের শিল্পী চিত্তরঞ্জন মাহাতোর কাছে নাচ শিখি। ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় আমাদের গ্রাম থেকে প্রায় ২৫ কিমি দূরে মহিষপুর পাহাড়াডি গ্রামে ফুটবল ম্যাচ খেলতে যাই। গোল বাঁচাতে গিয়ে উলটো দিক থেকে আসা খেলোয়াড় আমার পায়ে মেরে দেয়। তবুও আমি লাফিয়ে বলটা হাতে নিয়ে গোলটা বাঁচাতে পারি।” তারপর ভাঙা পায়ে শুধু-ই লড়াই। পায়ে পচন ধরে যাওয়ায় ক্র্যাচ নিয়ে স্কুলে যাওয়া। কিন্তু অভাবের কারণে অষ্টম শ্রেণির পর আর এগোয়নি লেখাপড়া।

Akshay Sahis’ Inspiring Journey: From Losing a Leg to Performing Chhau as Goddess Durga
টালির ঘরের সামনে এক হাতে ত্রিশূল, আরেক হাতে তলোয়ারে অক্ষয় যেন ছৌ পোশাকে সাক্ষাৎ দুর্গা! -অভয়াশক্তি বলপ্রদায়িনী তুমি জাগো। নিজস্ব চিত্র।

এখন ওই প্লাস্টিকের কৃত্রিম পা ডান পায়ের হাঁটুর সঙ্গে বেল্ট দিয়ে বাঁধা থাকে। ছৌ নাচার আগে ঝাঁকড়া- ঝাঁকড়া চুল আঁচড়ে পোশাক গায়ে জড়িয়ে যেমন প্রস্তুত হন। তেমনই হাঁটুর সঙ্গে ওই কৃত্রিম পা বেল্ট দিয়ে জোরে বাঁধেন। পা ভেঙে যাওয়ার পর থেকেই বাবা-মা হারা অবিবাহিত অক্ষয়কে আগলে রাখেন তার দিদি পুঙ্গুলা সহিস। তাঁর কথায়, “ভাই বলে ওর কষ্ট হয় না। কিন্তু আমার বুকটা ফেটে যায়। যখনই কৃত্রিম পা হাঁটুর সঙ্গে জোরে করে বেল্ট দিয়ে বাঁধে। তারপর ধামসা-মাদলের আওয়াজে নাচতে থাকে। তখন আমি দূরে চলে যাই। ওই দৃশ্য দেখতে পারি না।”

কষ্ট হলে, ভয় পেলে জীবনটাই থেমে যেতো। দুর্গা মুখোশ মুখে বাঁধতে-বাঁধতে এই কথা-ই বলছিলেন শিল্পী অক্ষয়। “যতটা না ডান পায়ে চোট ছিল। তার চেয়ে বেশি ছিল মানসিক আঘাত। ফুটবল খেলতে না পারলেও ঠিক আছে। কিন্তু নাচতে পারবো না! এই আশঙ্কায় আমার চোখে অন্ধকার নেমে এসেছিল। ভাঙা পা, তারপর পচন ধরে যাওয়ায় কেটে বাদ দেওয়া। আটটা বছর পর ওই প্লাস্টিকের ‘জয়পুর ফুট’ পেয়েছিলাম। তখন মনে হচ্ছিল যেন নতুন জীবন পেলাম।” আক্ষরিক অর্থেই সুধা চন্দ্রনের মতো ছৌ শিল্পী অক্ষয় সহিসের পুনর্জন্ম! সুধার লড়াই পাঠক্রমে ঠাঁই পেলেও তাঁর প্রেরণাতেই অক্ষয়ের আরেক লড়াই আড়ালেই রয়ে গিয়েছে। টালির ঘরের সামনে এক হাতে ত্রিশূল, আরেক হাতে তলোয়ারে অক্ষয় যেন ছৌ পোশাকে সাক্ষাৎ দুর্গা! -অভয়াশক্তি বলপ্রদায়িনী তুমি জাগো।

দুর্গাপুজো ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'দেবীপক্ষ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন
Advertisement

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Share this article on

The article link is copied.