‘মায়ের হাতে মদের গেলাস!’ সঞ্জয় গান্ধীর রোষানলেই নিষিদ্ধ হয় সুচিত্রা সেনের ছবি?
পরে কোন দৃশ্যের অন্তর্ভুক্তিতে মন গলে কংগ্রেসের?
১৯৭৫ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি মুক্তি পেয়েছিল 'আঁধি'। ছবিটি মুক্তি পাওয়ার পর প্রায় ২২ সপ্তাহ কেটে গিয়েছিল। সেই সময় কান চলচ্চিত্র উৎসবে দেখানোর কথা ছিল ওই ছবি। আচমকাই গুলজার জানতে পারেন ছবিটি দেখানো যাবে না। কেননা ভারতে আচমকাই নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে 'আঁধি'! গুলজার বুঝতে পারছিলেন না মুক্তির এতদিন পরে আচমকা কী হল? সেন্সর বোর্ডও যেখানে ছবিটি নিয়ে টুঁ শব্দ করেনি!
আরও পড়ুন:
আসলে ১৯৭৫ সালের ২৫ জুন রাত থেকে গোটা ভারতে জারি হয় এমার্জেন্সি। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর পরামর্শে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ফখরুদ্দিন আলি আহমেদ তা জারি করেছিলেন। আর এই সময় থেকেই চালু হয়ে গিয়েছিল এক আশ্চর্য সেন্সরশিপ। যার ফল ভুগতে হয় 'আঁধি'কে। জুলাই মাসেই নিষিদ্ধ হয় ছবিটির প্রদর্শন। শেষে গুলজারকে ছবিটিতে একটি দৃশ্য সংযোজন করতে বলা হয়। তবেই মেলে ফের মুক্তির অনুমতি।
মহম্মদ বাশিরের 'গুলজারস আঁধি: ইনসাইটস ইনটু দ্য ফিল্ম' গ্রন্থে জানানো হয়েছে, প্রথম থেকেই 'আঁধি' নিয়ে এক গুঞ্জন ছিল। কেননা ছবির নায়িকা সুচিত্রা সেনের লুকে স্পষ্ট ইন্দিরা গান্ধীর আদল! চুলের রুপোলি রেখা, শরীরী ভাষা এমনকী হাঁটাও যেন অবিকল! আরতি নাম্নী চরিত্রটিও রাজনীতি করে। ফলে সমীকরণ অনায়াসেই মিলে যাচ্ছিল।
ইন্দিরার স্বামী ফিরোজের ছিল হোটেলের ব্যবসা। এখানে নায়ক সঞ্জীব কুমার হোটেলের ম্যানেজার। এভাবেই একের পর এক মিল যেন স্পষ্ট করে দিয়েছিল এই ছবি ইন্দিরার জীবনেরই প্রতিফলন! কিন্তু এতদসত্ত্বেও তৎকালীন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী আইকে গুজরাল (পরে যিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী হন) এই ছবিতে আপত্তির কিছু পাননি। ফলে অনায়াসেই মুক্তি পেয়েছিল ছবিটি।
আরও পড়ুন:
ছবিতে একটি দৃশ্য ছিল, যেখানে জনসভায় সুচিত্রা সেনের উপরে পাথর ছোড়া হয়। একই ঘটনা ঘটেছিল ১৯৬৭ সালে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গেও। এতেই গুঞ্জন আরও জোরালো হয়। কিন্তু শেষপর্যন্ত ছবিটি নিষিদ্ধ হয় সঞ্জয়ের নির্দেশেই! পরে গুজরাল সাহেব নিজেই একথা জানান গুলজারকে। সঞ্জয়ের আপত্তি ছিল ছবিতে মদ্যপ সুচিত্রাকে নিয়ে। তাছাড়া ছবির নায়িকার সঙ্গে মায়ের জীবনের যেটুকু মিল, সেটাও ছিল তাঁর নাপসন্দ।
এরপর ছবির একটি দৃশ্যের নতুন করে শুটিং হয়। কী সেই দৃশ্য? সেখানে ছিল আরতি ও তার বাবা (অভিনয় করেছিলেন রহমান)। যেখানে সুচিত্রা স্পষ্ট করে দিচ্ছিলেন তিনি বিয়ে করবেন। কথা বলেন নিজের রাজনীতি করা নিয়েও। তখন তাঁর ব্যবসায়ী বাবা হতাশ হয়ে জানায়, তার ইচ্ছে ছিল মেয়েও ব্যবসা করে। এখানেই শেষ নয়, সে সুচিত্রাকে ডেকে একটি ছবিও দেখায়।
সেই ছবিতে দেখা যায় জওহরলাল নেহরু ও তাঁর কন্যা ইন্দিরাকে। এরপর রহমান অভিনীত চরিত্রটি বলে, তার ইচ্ছে ছিল ছিল তার মেয়ে যেন এরকম হয়। সুচিত্রা জানান, ইন্দিরা তাঁর আদর্শ। এই দৃশ্যের উদ্দেশ্য ছিল দু'টি। এক, নবীন এক নেত্রী ইন্দিরাকেই আদর্শ মানছেন। দুই, এটাও প্রমাণিত হল ছবির নায়িকা ও ইন্দিরা আসলে দু'জন আলাদা মানুষ।
'আঁধি' ব্যান হওয়ার পর তা নিয়ে সারা দেশে শোরগোল পড়ে যায়। অথচ ১৯৭৭ সালের নির্বাচনে ইন্দিরার পরাজয়ের পর ওই ছবি টেলিভিশনেও দেখানো হয়। সুচিত্রা সেনের কেরিয়ারের এক উজ্জ্বল ছবি হয়ে রয়ে গিয়েছে গুলজারের এই ছবি। এটাই তাঁর শেষ হিন্দি ছবি। ১৯৭৮ সালে রুপোলি পর্দাকে বিদায় জানান বাংলার 'গ্রেটা গার্বো'। আঁধি আজও রয়ে গিয়েছে এক অসামান্য ছবি হয়ে।