হিমালয়ের কোলে কঙ্কাল সরোবর, ঠান্ডা বাতাসে ভেসে আসে অতৃপ্ত দীর্ঘশ্বাস! যাবেন নাকি রূপকুণ্ডে?
হিমালয় মানেই এক অপার বিস্ময়। কোথাও বরফে ঢাকা শৃঙ্গ, কোথাও আবার গহন অরণ্য। আর এখানেই সন্ধান মেলে হাজারো অলৌকিক রহস্যের। এখানেই উত্তরাখণ্ডের চামোলি জেলায় রয়েছে রূপকুণ্ড। বিশ্বজুড়ে এই স্থানটির পরিচয় ‘স্কেলিটন লেক’ বা কঙ্কাল হ্রদ নামে। রোমাঞ্চপ্রিয় পর্যটকদের কাছে এই জায়গাটি যেমন আকর্ষণের, তেমনই এর ইতিহাস আজও কুয়াশাবৃত।
আরও পড়ুন:
প্রথম যখন এই হাড়গোড় আবিষ্কৃত হয়, তখন ভাবা হয়েছিল এগুলি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জাপানি সেনাদের মৃতদেহ। ব্রিটিশ সরকার আতঙ্কিত হয়ে তদন্ত শুরু করে। কিন্তু পরীক্ষার পর জানা যায়, এই কঙ্কালগুলি কয়েক দশকের নয়, বরং কয়েকশো বছরের পুরনো। আজও বরফ গললে হ্রদের পাড়ে বা অগভীর জলে ইতস্তত ছড়িয়ে থাকা নর করোটি জল থেকে মাথা তুলে তাকায়।
বিজ্ঞানীদের মতে, এক ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয় কেড়ে নিয়েছিল শত শত প্রাণ। অনেক করোটিতে দেখা গিয়েছে গভীর ফাটল। মনে করা হয়, ক্রিকেট বলের আকারের বিশাল শিলাবৃষ্টির কবলে পড়েছিলেন ওই মানুষগুলো। খোলা আকাশের নিচে মাথা গোঁজার জায়গা না পেয়ে ঝড়ের দাপটে প্রাণ হারান তাঁরা। ঠান্ডায়, তুষারঝড়ে তাদের সলিলসমাধি হয় রূপকুণ্ডে।
সাম্প্রতিক ডিএনএ পরীক্ষায় এক অভাবনীয় তথ্য উঠে এসেছে। রূপকুণ্ডের মৃত ব্যক্তিরা কোনও একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর নন। গবেষকরা দেখেছেন, এদের মধ্যে কিছু মানুষের যোগসূত্র রয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে। আবার অনেকের বংশগতি ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের। অর্থাৎ, বিভিন্ন সময়ে বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষ এখানে এসে প্রাণ হারিয়েছেন, যা এই রহস্যকে আরও ঘনীভূত করেছে।
আরও পড়ুন:
লোকগাথা অনুযায়ী, কনৌজের রাজা যশধওয়াল তাঁর অন্তঃসত্ত্বা রানি বালমপা এবং অনুচরদের নিয়ে নন্দা দেবী দর্শনে যাচ্ছিলেন। যাত্রাপথে রানি সন্তান প্রসব করলে দেবী রুষ্ট হন। দেবীর অভিশাপে ভয়ংকর তুষারঝড় শুরু হয় এবং রাজপরিবারসহ গোটা দলটির সলিলসমাধি ঘটে এই কুণ্ডে। স্থানীয়রা আজও বিশ্বাস করেন, সেই অভিশাপেই হ্রদের জল আজও অতৃপ্ত।
পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে আজও ঘুরে বেড়ায় এই অতৃপ্ত আত্মারা। বলা হয়, অপঘাতে মৃত্যু হওয়ায় এই মানুষগুলোর আত্মা আজও মুক্তি পায়নি। ট্রেকাররা অনেক সময় বরফশীতল বাতাসে এক অদ্ভুত দীর্ঘশ্বাস শুনতে পান। গাড়ির সামনে থেকে ছুটে বেরিয়ে যায় অদ্ভুত ছায়াসৈন্য। পাহাড়ের নির্জনতায় সেই দৃশ্য শিরশিরানি ধরিয়ে দেয়। তাই এখানে আসার আগে অনেক পুণ্যার্থী পুজো দিয়ে বিপদ কাটাতে চান। এড়াতে চান অতৃপ্ত আত্মার অভিশাপ!
যাত্রাপথে পড়বে বেদনি আর আলি বুগিয়াল। দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ তৃণভূমি বা বুগিয়ালগুলো দেখলে মনে হয় সবুজ কার্পেট পাতা রয়েছে সর্বত্র। তাঁবু খাটিয়ে এই বিশাল চরাচরে রাত কাটানো এক অনন্য অভিজ্ঞতা। একদিকে রহস্যের হাতছানি, অন্যদিকে হিমালয়ের অপার্থিব সৌন্দর্য—এই দুইয়ের মেলবন্ধনেই রূপকুণ্ড হয়ে উঠেছে পর্যটকদের কাছে এক ‘হিডেন জেম’ বা লুকানো রত্ন।