দাপুটে তৃণমূল নেত্রী, বাড়িতে তাল তাল সোনা, তেহট্টের টিনার সঙ্গে কী সম্পর্ক সব্যসাচীর?
নদিয়া জেলা পরিষদের সদস্য টিনা বরাবর সাংসদ মহুয়া মৈত্রর কট্টর বিরোধী বলে পরিচিত।
নদিয়ার রাজনীতিতে টিনা ভৌমিক সাহা যেমন একাধারে প্রভাবশালী-চেনা মুখ, তেমনই ঘাসফুল শিবিরের অভ্যন্তরীণ সমীকরণের টানাপোড়েনে তাঁর অবস্থান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মহিলা নেত্রী হিসেবে বেশ খ্যাতি রয়েছে টিনার। পরপর দু'বার জেলা পরিষদের সদস্য হওয়ার পর দাপট ক্রমশ বাড়তে থাকে। কালীঘাট তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়েরও বেশ ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন টিনা। নিজের এলাকার একটি বড় অংশ তাঁর নিজস্ব ‘ভোটব্যাঙ্ক’!
আরও পড়ুন:
পেশায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা টিনা ভৌমিক সাহা। তাঁর বাপের বাড়ি এবং শ্বশুরবাড়ি — দুই পরিবারই যথেষ্ট সচ্ছল ও প্রভাবশালী। তাঁর বিলাসবহুল জীবনযাত্রা, দামি গাড়ি এলাকায় চর্চার কেন্দ্রে ছিল। 'কৃষ্ণভক্ত' টিনার নিত্যনতুন ডিজাইনের ভারী ভারী সোনার গয়না দেখে অনেকেই বেশ সন্দেহ করেছিলেন। সেই থেকে টিনার 'স্বর্ণভাণ্ডার' নিয়ে কৌতূহলের অন্ত ছিল না। হার, বালা থেকে শুরু করে কানের দুল, আংটি - সবই অত্যন্ত আকর্ষণীয়।
এভাবে ক্রমশ প্রতিপত্তি ও বৈভব বাড়িয়ে এলাকায় জনপ্রিয়তার শিখর প্রায় ছুঁয়ে ফেলা টিনার রাস্তা অবশ্য মসৃণ ছিল না। এলাকার প্রয়াত বিধায়ক তাপস সাহা এবং কৃষ্ণনগরের সাংসদ মহুয়া মৈত্রের সঙ্গে তাঁর আদায়-কাঁচকলায় সম্পর্ক ছিল। এই দুই প্রভাবশালী নেতার সঙ্গে চরম বিরোধের জেরে জেলার রাজনীতিতে বেশ কিছুদিন তিনি একপ্রকার কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলেন।
এবার বিজেপি সরকার রাজ্যের ক্ষমতায় আসার পর তৃণমূল নেতানেত্রীদের বেআইনি সম্পত্তি নিয়ে পুলিশ কাটাছেঁড়া শুরু করে। রাডারে আসেন কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকার প্রভাবশালী নেতারা। চলতি মাসে বিধাননগর পুরনিগমের প্রাক্তন মেয়র সব্যসাচী দত্তকে গ্রেপ্তারের পর তাঁর বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে প্রায় সাড়ে ৩ কেজি সোনা, রসিদ উদ্ধার হয়। সেই সূত্রে নদিয়া জেলা পরিষদের সদস্য টিনা ভৌমিক সাহার বাড়িতে সোনার 'খনি'র হদিশ মেলে।
আরও পড়ুন:
তেহট্ট ও করিমপুরে টিনার দুই বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে উদ্ধার হয় ৩ কেজি সোনার গয়না, যার দাম প্রায় সাড়ে চার কোটি! অনুমান, বিধাননগরের প্রাক্তন দাপুটে বিধায়ক সব্যসাচী দত্তর 'বান্ধবী' হওয়ার সুবাদে সোনায় নিজেকে মুড়ে ফেলেছেন টিনা। তবে তাঁর ও সব্যসাচীর সম্পর্ক, আর্থিক লেনদেন নিয়ে প্রশ্ন করলে টিনা জবাব দিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে স্রেফ রাজনীতির সম্পর্ক। এমনকী সব্যসাচীর প্রভাবেই যে তাঁর এত বৈভব, অস্বীকার করেছেন তাও।
তবে কানাঘুষোয় শোনা যায় অন্য গল্প। টিনার সঙ্গে সব্যসাচীর 'গোপন' সম্পর্ক খুব বেশিদিনের নয়। সে কথা পারিবারিক স্তরে জানাজানি হওয়ায় সাংসারিক অশান্তিও হয়। পরিস্থিতি আরও ঘোরাল হয় সব্যসাচী ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনে হারের পর। তাঁর নানা অবৈধ কাজকর্ম তদন্তের আওতায় আসে। রাজারহাটের ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার হয় সোনা এবং সোনা কেনার রসিদ। তার বেশিরভাগই ২০২১ অর্থাৎ সব্যসাচী বিধায়ক হওয়ার পর কেনা।
পরে সব্যসাচীকে সঙ্গে নিয়েই তেহট্টে টিনার বাড়িতে তল্লাশি চালায় পুলিশ। তাঁর ঘরে সোনার গয়নার ভাঁড়ার দেখে তাজ্জব তদন্তকারীরাও। এত গয়না যে তাঁরই, তা বোঝাই যায় টিনার সোশাল মিডিয়া পেজে চোখ রাখলে। সেখানে নিত্যনতুন শাড়ি-গয়নায় সেজে ছবি পোস্ট করতেন নদিয়া জেলা পরিষদের সদস্য। সেসব উদ্ধারের খবর পেয়ে খোদ মুখ্যমন্ত্রীও রসিকতা করেছেন। শুভেন্দু অধিকারীর খোঁচা, ''বান্ধবীদের সোনায় মুড়ে রাখতেন তৃণমূল নেতারা।''