কেবল রোনাল্ডো-নেইমাররাই নন, বিশ্বকাপের মাধুরী অধরা থেকেছে বহু কিংবদন্তির
কেউ একাধিকবার ব্যালন ডি’অর জিতেছেন। কেউ একাধিক ট্রফি। কিন্তু কখনও বিশ্বকাপের শিরোপা জেতেননি।
ম্যাচ প্রতি তাঁর গোলের পরিসংখ্যান একের কাছাকাছি। অবিশ্বাস্য এই রেকর্ডের মালিক ফেরেঙ্ক পুসকাস। ফুটবল ভক্তরা তাঁকে ডাকতেন ‘গ্যালোপিং মেজর’। অর্থাৎ বিদ্যুৎ গতির মেজর। হাঙ্গেরির জার্সিতে ৮৫ ম্যাচে ৮৪ গোল। তাঁর নেতৃত্বে ‘মাইটি ম্যাজার্স’ ১৯৫৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে। কিন্তু পশ্চিম জার্মানির কাছে ২-৩ গোলে হার মানতে হয়। যা ‘মিরাকল অফ বার্ন’ নামে পরিচিত। ফাইনালে গোলও করেও বিশ্বজয়ের স্বপ্ন অধরাই থাকে পুসকাসের।
আরও পড়ুন:
তাঁকে ডাকা হত ‘সাদা পেলে’ নামে। অনবদ্য ড্রিবলিং ও ফ্রি-কিকের জন্য বিখ্যাত ছিলেন জিকো। ১৯৭৮, ১৯৮২ ও ১৯৮৬ সালে ব্রাজিলের হয়ে বিশ্বকাপ খেললেও ট্রফি জিততে পারেননি। ১৯৮২ সালের ব্রাজিল দলকে অন্যতম সেরা দল মনে করা হলেও তারা দ্বিতীয় রাউন্ড থেকে বিদায় নেয়। ব্রাজিলের হয়ে ৭১টি ম্যাচে ৪৮টি গোল করেছিলেন। তবে কখনওই কোয়ার্টার ফাইনালের গণ্ডি পেরতে পারেননি।
পর্তুগালের সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার ইউসেবিও ১৯৬৫ সালে জিতেছিলেন ব্যালন ডি’অর। দেশের জার্সিতে তিনি খেলেছিলেন মাত্র একটি বিশ্বকাপ। ১৯৬৬ সালে। সেই টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত ফর্মে থাকা পর্তুগাল সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের কাছে হেরে যায়। এরপর আর কখনও দেশের হয়ে কোনও বড় আন্তর্জাতিক ট্রফি জেতার সুযোগ পাননি ইউসেবিও।
টোটাল ফুটবলের জনক জোহান ক্রুয়েফ ইউরোপীয় ফুটবলের সর্বকালের অন্যতম সেরা কিংবদন্তি। ক্লাব ফুটবলে আয়াখস ও বার্সেলোনার হয়ে জিতেছেন অসংখ্য শিরোপা। কিন্তু দেশের জার্সিতে সেই সাফল্য আর ধরা দেয়নি। ১৯৭৪ বিশ্বকাপে ক্রুয়েফের নেতৃত্বে নেদারল্যান্ডস অবিশ্বাস্য ফুটবল খেলেছিল। গোটা টুর্নামেন্টে আধিপত্য দেখিয়েও ফাইনালে আয়োজক পশ্চিম জার্মানির কাছে ২-১ গোলে হেরে বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন ভেঙে যায় ডাচদের।
আরও পড়ুন:
১৯৮৩ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত টানা তিনবার ব্যালন ডি’অর জয়ী মিশেল প্লাতিনি। ফ্রান্সের জার্সিতে ৭২ ম্যাচে ৪১টি গোল করেছেন। ১৯৮২ ও ১৯৮৬, দুই বিশ্বকাপেই সেমিফাইনালে পৌঁছেছিলেন। তবে দু’বারই পশ্চিম জার্মানির কাছে পরাজিত হন। ১৯৮২ সালে পেনাল্টি শুটআউটে হেরে যায় ফ্রান্স। ১৯৮৬ সালে আবারও পশ্চিম জার্মানির কাছেই পরাস্ত হয় ফরাসি বাহিনী।
পনিটেল চুলের স্টাইলের জন্য বিখ্যাত রবার্তো বাজ্জো ইতালির সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার হিসেবে বিবেচিত। অসাধারণ নৈপুণ্যে তিনি ১৯৯৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে তুলেছিলেন ইতালিকে। পুরো টুর্নামেন্টে দলের ভরসা হলেও ফাইনালে ব্রাজিলের বিরুদ্ধে টাইব্রেকারে তাঁর পেনাল্টি বারের ওপর দিয়ে উড়ে যায়। সেই এক মুহূর্তই ভেঙে দেয় ইতালির বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন। ১৯৯৩ সালে ব্যালন ডি’অর জিতলেও দেশের হয়ে আর কোনও বড় আন্তর্জাতিক ট্রফি জেতা হয়নি বাজ্জোর।
ডেভিড বেকহ্যাম ১৯৯৮, ২০০২ ও ২০০৬ - টানা তিনটি বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের অধিনায়ক ছিলেন। ১৯৯৮ বিশ্বকাপে দিয়েগো সিমিওনকে ফাউল করার পর মাটিতে শুয়ে থাকা অবস্থায় তাঁকে হালকা লাথি মেরে লাল কার্ড দেখেন বেকহ্যাম। চার বছর পর, ২০০২ বিশ্বকাপে সেই আর্জেন্টিনার বিপক্ষেই পেনাল্টি থেকে গোল করে জবাব দেন তিনি। তবে অধিনায়ক হিসাবে তিনটি বিশ্বকাপের কোনওটিতেই ইংল্যান্ডকে কোয়ার্টার ফাইনালের বাধা পেরিয়ে সেমিফাইনালে তুলতে পারেননি।
অলিভার কান জার্মানির সর্বকালের অন্যতম সেরা গোলরক্ষক। দেশের জার্সিতে ৮৬টি ম্যাচ খেলেছেন। ২০০২ বিশ্বকাপে ফাইনালের আগে পর্যন্ত পুরো টুর্নামেন্টে মাত্র একটি গোল হজম করেছিলেন। তবে ফাইনালে ব্রাজিলের কাছে দু’টি গোল হজম করে জার্মানির শিরোপা জয়ের স্বপ্ন ভেঙে যায়। ক্লাব পর্যায়ে তিনি আটটি বুন্দেশলিগা ও একটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতেছেন। একাধিকবার উয়েফার বর্ষসেরা গোলরক্ষকের স্বীকৃতিও পেয়েছেন। কিন্তু কখনও বিশ্বকাপ জেতা হয়নি তাঁর।
ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক গোলদাতা ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো। ২০০৬ সাল থেকে ছ'টি বিশ্বকাপ খেলেছেন। মোট ১১টি গোল করেছেন। সেরা সাফল্য ২০০৬ সালে চতুর্থ। অধরা স্বপ্নপূরণে ৪১ বছর বয়সে মাঠে নেমেছিলেন। সেই অধরা স্বপ্ন পূরণ হয়নি। স্পেনের কাছে হেরে বিদায় নিতে হয়েছে পর্তুগালকে। পাঁচটি ব্যালন ডি'অর, উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতা এই মহাতারকার বিশ্বকাপ জেতা হয়নি।
২০১৪ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত চারটি বিশ্বকাপ খেলেছেন। গোল করেছেন ৯টি। প্রাপ্তির ঝুলিতে রয়েছে অলিম্পিকে সোনা থেকে কনফেডারেশনস কাপ জয়। দক্ষিণ আমেরিকার বর্ষসেরা ফুটবলারও হয়েছেন দু’বার। ১৩০ ম্যাচে ৮০ গোল করা এই খেলোয়াড় ব্রাজিলের জার্সিতে বিশ্বকাপ জেতেননি। প্রি-কোয়ার্টারে নরওয়ের কাছে হেরে বিদায় নিতে হয়েছে সেলেকাওদের।