জলাতঙ্কে মৃত্যু তরুণ ব্যাঙ্ককর্মীর, আতঙ্ক কমাতে ১০ দিনের নিয়ম পালনের পরামর্শ বিশেষজ্ঞের
কুকুরের কামড় কখনও কখনও শুধু শারীরিক আঘাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, সঙ্গে নিয়ে আসে দীর্ঘ অনিশ্চয়তা ও ভয়। বিশেষ করে জলাতঙ্কের মতো প্রাণঘাতী রোগের নাম জড়িয়ে গেলে আতঙ্ক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এক তরুণের মৃত্যু সেই ভয়কেই নতুন করে সামনে এনেছে।
এই প্রেক্ষাপটে চিকিৎসকরা এক গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক তথ্য সামনে এনেছেন, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক কমাতে সাহায্য করতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একটি সুপরিচিত নীতি রয়েছে, যাকে সাধারণভাবে '১০ দিনের নিয়ম' বলা হয়। এই নিয়ম অনুযায়ী, যে কুকুর কামড়েছে সেটি যদি পরবর্তী ১০ দিন সম্পূর্ণ সুস্থ ও স্বাভাবিক থাকে, তবে কামড়ানোর সময় তার শরীরে রেবিস সংক্রমণ সক্রিয় ছিল না।
আরও পড়ুন:
এই নিয়মের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি রয়েছে ভাইরাসের স্বভাব ও সংক্রমণ প্রক্রিয়ার মধ্যে। রেবিস ভাইরাস কুকুরের শরীরে প্রবেশ করার পর ধীরে ধীরে স্নায়ুতন্ত্রে ছড়িয়ে পড়ে এবং একসময় লালায় পৌঁছে সংক্রামক হয়ে ওঠে। কিন্তু একবার যখন ভাইরাস লালায় উপস্থিত হয় এবং প্রাণীটি অন্যকে সংক্রমিত করতে সক্ষম হয়, তখন খুব দ্রুত তার মধ্যে উপসর্গ দেখা দিতে শুরু করে।
সংক্রমণ কুকুরের আচরণে পরিবর্তন আনে। হঠাৎ অস্বাভাবিক উত্তেজনা, আগ্রাসী আচরণ, অতিরিক্ত লালা ঝরা, খেতে না পারা বা অদ্ভুত ভীতি—এসব লক্ষণ দ্রুত প্রকট হয়। এই পর্যায়ে রোগের অগ্রগতি এত দ্রুত হয় যে সাধারণত ১০ দিনের মধ্যেই প্রাণীটির মৃত্যু ঘটে। তাই এই সময়সীমা চিকিৎসাবিজ্ঞানে ঝুঁকি নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
যদি কামড়ানো কুকুরটিকে চেনা বা খুঁজে পাওয়া যায়, যেমন পোষা কুকুর, প্রতিবেশীর পোষ্য় বা নিয়মিত এলাকায় ঘোরাফেরা করা কোনও পরিচিত কুকুর, তাহলে তাকে পর্যবেক্ষণে রাখা সম্ভব হয়। জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় এই পর্যবেক্ষণ একটি স্বীকৃত পদ্ধতি। ১০ দিন পরেও যদি প্রাণীটি সুস্থ, সবল ও স্বাভাবিক আচরণ করে, তাহলে সেই কুকুরের কামড় থেকে জলাতঙ্ক সংক্রমণের সম্ভাবনা থাকে না।
আরও পড়ুন:
তবে চিকিৎসদের কথায়, এই ১০ দিনের নিয়ম কখনওই চিকিৎসার বিকল্প নয়। কুকুর কামড়ানোর সঙ্গে সঙ্গেই ক্ষতস্থান ভালোভাবে সাবান ও প্রবাহমান জলে অন্তত ১৫ মিনিট ধুতে হবে এবং যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া দরকার। নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী অ্যান্টি-রেবিস টিকা শুরু করা অত্যন্ত জরুরি এবং তা এক মুহূর্তের জন্যও বিলম্ব করা উচিত নয়।
রেবিসের ক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় মানুষের উদ্বেগ বাড়ায়, সেটি হল এর দীর্ঘ ইনকিউবেশন পিরিয়ড। ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করার পর উপসর্গ প্রকাশ পেতে কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। বিরল ক্ষেত্রে এই সময়সীমা এক বছর পর্যন্তও দীর্ঘ হতে পারে। এই দীর্ঘ সময় অনেককে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে, কারণ তারা অনিশ্চয়তার মধ্যে বাস করতে থাকেন।
চিকিৎসকের মতে, কেউ যদি নির্দেশিকা মেনে অ্যান্টি-রেবিস টিকার সব ডোজ সঠিক সময়ে সম্পূর্ণ করেন এবং কামড়ানো কুকুরটি ১০ দিন পরেও সুস্থ থাকে, তাহলে ওই নির্দিষ্ট ঘটনার ক্ষেত্রে জলাতঙ্কের কোনও ঝুঁকি থাকে না। বৈজ্ঞানিক তথ্য ও বাস্তব পর্যবেক্ষণ মিলিয়ে দেওয়া হয় এই নিশ্চয়তা। সঠিক তথ্য জানলে অকারণ ভয় অনেকটাই কাটে।
৩০ বছর বয়সী আয়াস বিশ্বনাথ আমিনের মৃত্যু রেবিস নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। তিনি একটি ব্যাংকে কর্মরত ছিলেন। পরিবারের বক্তব্য, কয়েক দিন আগে একটি পথকুকুর তাকে কামড়ায়। এরপর তিনি চিকিৎসকের পরামর্শ নেন এবং নিয়ম মেনে অ্যান্টি-রেবিস টিকা নেওয়ার প্রক্রিয়াও শুরু করেছিলেন। তবু ভয় ও মানসিক চাপে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে।