দেশের ‘ব্ল্যাক ম্যাজিক’ রাজধানী! আশ্চর্য এই ছোট্ট গ্রামই এবার হয়ে উঠুক আপনার ‘ডেস্টিনেশন’
লোকমুখে মায়ং পরিচিত ভারতের ‘ব্ল্যাক ম্যাজিক ক্যাপিটাল’ হিসেবে। এককালে যে নাম শুনলে মানুষ ভয় পেত, এখন সেই টানেই সেখানে ভিড় জমান পর্যটকরা। শান্ত গ্রামের প্রতিটি ধূলিকণায় যেন জড়িয়ে আছে পুরনো দিনের সেই রহস্যময় আবেশ।
আরও পড়ুন:
মায়ং-এর পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে অজস্র গল্প। শোনা যায়, মহাভারতের বীর ঘটোৎকচ এখানেই জাদুবিদ্যা শিখেছিলেন। প্রাচীনকালে এই গ্রামের তান্ত্রিকরা নাকি শত্রুপক্ষকে নিমেষে অদৃশ্য করে দিতেন। বুনো বাঘকে পোষ মানানো থেকে শুরু করে হাতের তালুতে জাদু দেখানো— মায়ং-এর বাসিন্দাদের কাছে ছিল জলভাত। এই সব লোকগাথাই আজ গ্রামটিকে বিশ্বের দরবারে অনন্য করে তুলেছে।
মায়ং-এর মূল চালিকাশক্তি ছিলেন এখানকার 'বেজ' বা ওঝারা। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে তাঁরা এই বিশেষ বিদ্যা আয়ত্ত করে এসেছেন। তাঁরা মূলত মন্ত্রের সাহায্যে বিভিন্ন রোগ সারাতে পারদর্শী ছিলেন। এই বিদ্যাকে তাঁরা মা কামাখ্যার আশীর্বাদ মনে করতেন। বর্তমানে জাদুর প্রকোপ অনেকটা কমলেও, প্রবীণদের স্মৃতিতে এবং পুরনো পুঁথির পাতায় আজও সেই গৌরবময় দিনগুলোর উল্লেখ মেলে।
আরও পড়ুন:
এই জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে ১৩ থেকে ১৯ শতকের প্রাচীন সব মন্ত্র পুঁথি। সাঁচি গাছের ছাল বা হাতে তৈরি কাগজে লেখা এই পুঁথিগুলো আজও অমলিন। সেখানে লেখা আছে নানা ধরনের রোগের প্রতিকার এবং বিচিত্র সব মন্ত্রের কৌশল। বিরল সব লিপিতে লেখা এই পুঁথিগুলো মায়ং-এর প্রাচীন বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার এক জ্বলন্ত প্রমাণ হিসেবে রয়ে গিয়েছে।
জাদুঘরের সংগ্রহের মধ্যে রয়েছে প্রাচীন সব অস্ত্রশস্ত্র। তার মধ্যে বড় আকারের তলোয়ার বিশেষ নজর কাড়ে। লোকমুখে শোনা যায়, প্রাচীনকালে এখানে নরবলির মতো প্রথা প্রচলিত ছিল। বলাইবাহুল্য এই তলোয়ারগুলো সেই কাজেই ব্যবহৃত হত। এছাড়া মাটি খুঁড়ে পাওয়া পোড়ামাটির মূর্তি এবং বিচিত্র আকৃতির পাত্রগুলো গ্রামের প্রাচীন তান্ত্রিক আচার ব্যবস্থার নিদর্শন।
মায়ং-এর প্রাচীন চিকিৎসার ঐতিহ্য আজও কিছুটা টিকে আছে। স্থানীয় বেজরা জড়িবুটি এবং ঝাড়ফুঁকের মাধ্যমে ব্যথা বা ছোটখাটো সমস্যার সমাধান করেন বলে শোনা যায়। তবে ২০২৪ সালে অসম সরকার 'অসম হিলিং প্র্যাকটিস বিল' পাস করেছে। এর উদ্দেশ্য হল ক্ষতিকর কুসংস্কার ও অবৈজ্ঞানিক জাদু চিকিৎসা বন্ধ করা। পর্যটকরা এখানে জাদু দেখতে এলেও গ্রামের মূল ধারা এখন অনেক বেশি সচেতন।
মায়ং-এর মানুষ আজ তাঁদের লৌকিক ইতিহাসকে রক্ষা করতে বদ্ধপরিকর। তন্ত্র ও জাদুকে কুসংস্কারের তকমা থেকে বের করে তাঁরা ঐতিহ্যের আসনে বসাতে চাইছেন। এই মিউজিয়ামটি কেবল প্রদর্শনশালা নয়, এটি এক হারিয়ে যাওয়া সংস্কৃতির আর্কাইভ। মায়ং আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, বিজ্ঞান আর যুক্তির বাইরেও এক বিশাল জগত আছে, যার নাম বিশ্বাস।