সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক: আহমেদাবাদে এয়ার ইন্ডিয়ার এআই-১৭১ ফ্লাইটের মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটি শুধু একটি প্রযুক্তিগত ব্যর্থতা নয়, বরং একাধিক স্তরে কর্তব্যে চূড়ান্ত গাফিলতির ইঙ্গিত মিলছে। আহমেদাবাদ বিমানবন্দর থেকে লন্ডনের গ্যাটউইক অভিমুখে যাত্রা শুরুর কয়েক মিনিটের মধ্যেই বোয়িং ৭৮৭-৮ ড্রিমলাইনার বিমান মাটিতে আছড়ে পড়ে ধ্বংস হয়ে যায়। বিমানটি একটি জনবহুল এলাকায় পড়েছিল। বিমানের যাত্রী ও স্থানীয় মিলিয়ে এখনও পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ২৭৯। ধ্বংসস্তূপ থেকে এখনও দেহ উদ্ধারের কাজ চলছে। বেসরকারি মতে, মৃতের সংখ্যা ৫০০-র বেশি।
ফ্লাইট এআই-১৭১ নামেই এখন আতঙ্ক! দুর্ঘটনার জেরে এয়ার ইন্ডিয়া তাদের সংস্থার কোনও উড়ানেই ১৭১ ব্যবহার করবে না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যাত্রীদের মানসিক আঘাত কমাতেই বিমান সংস্থাটি এই সিদ্ধান্ত। ১৭ জুন থেকে আহমেদাবাদ থেকে গ্যাটউইক (লন্ডন) যাওয়ার ফ্লাইটটির নম্বর বদল হয়ে হবে এআই ১৫৯। ফিরতি ফ্লাইটটির নম্বর পাল্টে হবে এআই ১৬০। বৃহস্পতিবার দুর্ঘটনার পর থেকেই বলা হচ্ছিল, বিমানের ইঞ্জিনে পাখির ধাক্কার কারণে বিপর্যয়। তবে সেই দাবি ছাপিয়ে ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে যে, গাফিলতির কারণেই এতগুলি প্রাণ গেল। জাতীয় অ্যারোস্পেস ল্যাবরেটরিজ (এনএএল)-এর প্রাক্তন ডেপুটি ডিরেক্টর শালিগ্রাম জে মুরলীধর একে ভারতের সাম্প্রতিক ইতিহাসে ‘সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক বিমান দুর্ঘটনা’ বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি প্রাথমিকভাবে সম্ভাব্য ‘ফুয়েল কনট্যামিনেটেড’ বা ‘জ্বালানি দূষণের’ দিকে ইঙ্গিত করেছেন, যা বিমানের দুটি ইঞ্জিনের একসঙ্গে বিকল হওয়ার পিছনে মূল কারণ হতে পারে।
সংবাদসংস্থা এএনআই-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মুরলীধর বলেছেন, বোয়িং ড্রিমলাইনার একটি অত্যাধুনিক এবং সর্বাধিক সুরক্ষিত বিমান। এমন প্রযুক্তিনির্ভর বিমানে দুটি ইঞ্জিনের একসঙ্গে থ্রাস্ট লস সাধারণত দেখা যায় না, যদি না জ্বালানিতে দূষণ থাকে।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিমানের জ্বালানি দূষণ মানে হল বিমানে যে জ্বালানি ব্যবহার হয়, সাধারণত অ্যাভিয়েশন টারবাইন ফুয়েলে (এটিএফ) অন্য কোনও পদার্থ মিশে থাকে। তা বৃষ্টির জল, অপরিষ্কৃত ট্যাঙ্ক থেকে মিশে যাওয়া ধুলো ময়লা, জৈব পদার্থ বা ব্যাকটেরিয়া (দীর্ঘদিন ধরে সঞ্চিত জ্বালানিতে ব্যাকটেরিয়া জন্মাতে পারে), অন্য রাসায়নিক পদার্থ, যেমন ডিজেল বা পেট্রল ভুলবশত মিশে যাওয়া, ট্যাঙ্কের অভ্যন্তরীণ ক্ষয় থেকে লোহাচূর্ণ বা মরিচা মিশে যাওয়া। এই জ্বালানি দূষণ বিমানের ইঞ্জিনে মারাত্মক সমস্যার কারণ হতে পারে, এবং অনেক সময় তা দুর্ঘটনার দিকে ঠেলে দেয়। কারণ, জ্বালানি ঠিকভাবে ইঞ্জিনে পৌঁছতে পারে না। ফুয়েল লাইন ব্লক হয়ে যায়। ফলে মাঝ আকাশে ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যেতে পারে। শুধু তাই নয়, রাসায়নিক বিক্রিয়ায় মাঝ আকাশে বিমানে বিস্ফোরণও ঘটতে পারে। জ্বালানি দূষণ শনাক্ত করতে বিমানবন্দরে এবং মেনটেন্যান্স পয়েন্টে কিছু স্ট্যান্ডার্ড পদ্ধতি রয়েছে। প্রতিটি বিমানে উড়ানের আগে স্যাম্পল টেস্ট করা হয়। মনে রাখতে হবে, দুর্ঘটনাগ্রস্ত বিমানে পাইলট ‘মোডে’ বার্তায় বলেছিলেন, “ইঞ্জিনে থ্রাস্ট নেই, শক্তি হারাচ্ছি, তুলতে পারছি না।” এর অর্থ ইঞ্জিনে ঠিকভাবে জ্বালানি পৌঁছচ্ছিল না। কনট্যামিনেটেড ফুয়েল, ক্লোগড ফিলটার্স অথবা ফুয়েল প্রেশার রেগুলেটর ফেলিওর যদি দুর্ঘটনার সম্ভাব্য কারণ হয়, তবে প্রশ্ন উঠছে, জ্বালানি পরীক্ষায় কার গাফিলতি ছিল?
মুরলীধরের মতে, এখন মূল গুরুত্ব পাওয়া উচিত ফ্লাইট ডেটা রেকর্ডার (এফডিআর) ও ককপিট ভয়েস রেকর্ডার (সিভিআর)-এর ডেটা বিশ্লেষণের দিকে। এই তথ্যগুলি থেকেই বোঝা যাবে পাইলটের শেষ মুহূর্তের কথোপকথন, ইঞ্জিনের অবস্থা ও বিমানের উচ্চতা বা গতি সংক্রান্ত তথ্য। দুর্ঘটনার প্রকৃতি বিচার করে তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, পাখির ধাক্কা লাগলেও দুটি ইঞ্জিন একসঙ্গে বন্ধ হতে পারে না। কিন্তু এখানে তা-ই ঘটেছে। এর অর্থ, এখানে আরও গভীর কোনও প্রযুক্তিগত ত্রুটি বা জ্বালানি দূষণের সম্ভাবনা রয়েছে। সূত্র অনুযায়ী, এআই-১৭১ ফ্লাইটে প্রায় ৩৫ টনের বেশি জ্বালানি ছিল লন্ডন পৌঁছনোর জন্য। সেই জ্বালানির দূষণই যদি ঘটিয়ে থাকে ইঞ্জিন থ্রাস্ট লস, তবে এটি স্পষ্টতই গ্রাউন্ড টেকনিক্যাল টিম ও কোয়ালিটি কন্ট্রোল বিভাগের গাফিলতি। ক্যাপ্টেন সুমিত সাবারওয়াল, যিনি লাইন ট্রেনিং ক্যাপ্টেন হিসাবে ৮,২০০ ঘণ্টার উড়ানে অভিজ্ঞ এবং সহকারী ফার্স্ট অফিসার ক্লাইভ কুন্দার, যাঁর ফ্লাইং আওয়ার ছিল ১,১০০- এত অভিজ্ঞ পাইলটদের পক্ষেও বিমানটি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। ফলে প্রশ্ন উঠছে, বহু স্তরে প্রস্তুতির ঘাটতি ছিল কি না।
দুপুর ১টা ৩৯ মিনিটে বিমানটি রানওয়ে ২৩ থেকে ওড়ে। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই এয়ার ট্র্যাফিক কন্ট্রোল (এটিসি)-তে ‘মেডে’ বার্তা আসে, কিন্তু পরবর্তী কোনও উত্তর পাওয়া যায়নি। বিমানটি বিমানবন্দর এলাকা পেরোনোর আগেই মাটিতে আছড়ে পড়ে এবং সঙ্গে সঙ্গে এক ভয়াবহ আগুনের গোলায় পরিণত হয়। এই দুর্ঘটনা ভারতীয় অসামরিক বিমান চলাচলের সুরক্ষা ব্যবস্থার এক ভয়াবহ ত্রুটির প্রতিফলন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরাই প্রশ্ন তুলছেন, জ্বালানির মান পরীক্ষার নিয়ম কি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল? কী কারণে এত আধুনিক বিমান একেবারেই উচ্চতা না পেয়ে ভেঙে পড়ল? বোয়িং সংস্থা ও এয়ার ইন্ডিয়ার অভ্যন্তরীণ নজরদারি কোথায় ছিল? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পেতে আরও বিস্তৃত ও স্বচ্ছ তদন্ত এখন সময়ের দাবি। কারণ এই দুর্ঘটনা শুধুমাত্র প্রযুক্তিগত নয়, এটি ‘গাফিলতি ও নজরদারির চূড়ান্ত ব্যর্থতার প্রতীক’ হয়ে উঠেছে।
সর্বশেষ খবর
-
তৃণমূল নেতাদের গ্রেপ্তারে খুশি! দলের ভরাডুবির মধ্যে বিস্ফোরক দেবাংশু
-
৭ মাসের প্যালেস্তিনীয় শিশুকে গুলি করে মারল ইজরায়েলি সেনা! বর্বরতায় স্তম্ভিত বিশ্ব, হাহাকার পরিবারের
-
বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়া ইরাকি ফুটবলারকে হেনস্তা, মার্কিন মুলুকে ‘জঙ্গি’ সন্দেহে আটক, ৭ ঘণ্টা জেরা!
-
ডায়মন্ড হারবার মডেলে নতুন বিতর্ক, তৃণমূল প্রধানের বাড়িতে মিলল পুলিশের পোশাক, গুলির খোল!
-
বুড়ো হাড়ে ভেলকি! বেঙ্গল প্রো টি-টোয়েন্টিতে নেমেই হ্যাটট্রিক শামির, জাতীয় দলের দরজা কি খুলবে?