কোভিড-১৯ বিশ্বকে শিখিয়েছে, অদৃশ্য এক জীবাণু মুহূর্তেই থামিয়ে দিতে পারে সভ্যতার গতি। সেই অভিজ্ঞতার পর বিশ্ব জুনোসিস দিবস (World Zoonoses Day) আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পরবর্তী মহামারির সূচনা হয়তো ইতিমধ্যেই কোনও প্রাণীর শরীরে নীরবে ঘটছে। তাই এখনই প্রয়োজন সতর্কতা, বিজ্ঞানভিত্তিক নজরদারি এবং মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশকে একসঙ্গে সুরক্ষিত রাখার সমন্বিত উদ্যোগ।
প্রতি বছর ৬ জুলাই পালিত হয় বিশ্ব জুনোসিস দিবস । ১৮৮৫ সালের এই দিনেই ফরাসি বিজ্ঞানী লুই পাস্তুর প্রথম সফলভাবে জলাতঙ্কের (রেবিস) টিকা প্রয়োগ করেছিলেন। সেই ঐতিহাসিক ঘটনাকে স্মরণ করেই দিনটি পালিত হয়। তবে বর্তমানে এই দিবসের তাৎপর্য আরও গভীর। কারণ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু)-সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য বলছে, মানুষের মধ্যে নতুন করে দেখা দেওয়া সংক্রামক রোগের প্রায় ৭৫ শতাংশই প্রাণী থেকে মানুষের শরীরে এসেছে। অর্থাৎ, ভবিষ্যতের বড় স্বাস্থ্যঝুঁকির অন্যতম উৎস হল জুনোটিক বা প্রাণীবাহিত সংক্রমণ।
আরও পড়ুন:

আরও পড়ুন:
কী এই জুনোটিক রোগ?
জুনোটিক রোগ হল এমন সংক্রমণ, যা ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক বা পরজীবীর মাধ্যমে প্রাণী থেকে মানুষের শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। সংক্রমিত প্রাণীর সরাসরি সংস্পর্শ, মশার মতো বাহক পোকামাকড়, দূষিত খাবার বা জল, এমনকী প্রাণীর লালা, রক্ত, প্রস্রাব বা মলের মাধ্যমেও এসব রোগ ছড়াতে পারে।
কোভিড-১৯, নিপাহ ভাইরাস, বার্ড ফ্লু, সোয়াইন ফ্লু, ইবোলা, এমপক্স, রেবিস, লেপ্টোস্পাইরোসিস, অ্যানথ্রাক্স, জাপানিজ এনসেফালাইটিস, ডেঙ্গু, জিকা ও চিকুনগুনিয়াসহ বহু পরিচিত সংক্রামক রোগের সঙ্গে প্রাণীর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। এদের মধ্যে অনেক রোগ সীমিত পরিসরে থাকলেও কিছু রোগ দ্রুত মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে মহামারির রূপ নিতে পারে।

কেন বাড়ছে ঝুঁকি?
বিশেষজ্ঞদের মতে, পৃথিবীর পরিবেশগত পরিবর্তনের সঙ্গে জুনোটিক রোগের ঝুঁকিও দ্রুত বাড়ছে। দ্রুত নগরায়ণ, বনভূমি ধ্বংস করা, জলবায়ু পরিবর্তন, বন্যপ্রাণীর অবাধ বাণিজ্য, নিবিড় পশুপালন এবং মানুষের ক্রমাগত বনাঞ্চলে প্রবেশের ফলে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর দূরত্ব কমে যাচ্ছে। এর ফলে ভাইরাস ও অন্যান্য রোগজীবাণুর নতুন প্রজাতির শরীরে প্রবেশ এবং অভিযোজিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
অনেক সময় কোনও জীবাণু প্রাণী থেকে মানুষের শরীরে প্রবেশ করার পর এমনভাবে নিজেকে পরিবর্তন করে যে তা সহজেই একজন থেকে আরেকজনের মধ্যে সংক্রমিত হতে শুরু করে। আর তখনই বড় আকারে তার প্রাদুর্ভাব বা মহামারির ঝুঁকি তৈরি হয়।
অন্যদিকে, অনেক জুনোটিক সংক্রমণের উপসর্গ সাধারণ ভাইরাল জ্বরের মতোই হওয়ায় রোগ শনাক্ত করতে দেরি হয়। অথচ কিছু ক্ষেত্রে তা নিউমোনিয়া, মস্তিষ্কের সংক্রমণ, একাধিক অঙ্গ বিকল হওয়া বা প্রাণঘাতী জটিলতার কারণ হতে পারে। তাই দ্রুত রোগ শনাক্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সমাধানের পথ ‘ওয়ান হেলথ’
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে বিশেষজ্ঞরা ‘ওয়ান হেলথ’ ধারণার উপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। এই নীতির মূল বিষয় হল, মানুষের স্বাস্থ্য, প্রাণীর স্বাস্থ্য এবং পরিবেশের স্বাস্থ্য একে অপরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। তাই ভবিষ্যতে মহামারি প্রতিরোধ করতে হলে চিকিৎসক, পশুচিকিৎসক, পরিবেশবিদ, গবেষক, প্রশাসন এবং সাধারণ মানুষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। পাশাপাশি বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল রক্ষা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং উন্নত জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলাও সমানভাবে জরুরি।

কীভাবে কমবে ঝুঁকি?
কিছু সাধারণ অভ্যাসই জুনোটিক রোগের ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে দিতে পারে। প্রাণী সংস্পর্শে আসার পর ভালোভাবে হাত ধোয়া, অসুস্থ বা মৃত প্রাণীর সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা, মাংস, ডিম ও মাছ সঠিক তাপমাত্রায় রান্না করে খাওয়া, দুধ সঠিক তাপমাত্রায় ফুটিয়ে ব্যবহার, ফল ও সবজি ভালোভাবে ধুয়ে খাওয়া, মশার কামড় থেকে সুরক্ষিত থাকা, পোষ্য প্রাণীর নিয়মিত টিকাকরণ এবং অসুস্থ হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সচেতনতাই ভবিষ্যতের সুরক্ষা
কোভিড-১৯ আমাদের শিখিয়েছে, একটি সংক্রমণ কত দ্রুত গোটা পৃথিবীকে বিপর্যস্ত করে দিতে পারে। তাই পরবর্তী মহামারি শুরু হওয়ার অপেক্ষা না করে এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়াই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।
বিশ্ব জুনোসিস দিবসের একটাই লক্ষ্য, পরবর্তী মহামারি ঠেকানো। আর সেই লড়াই শুরু হোক আজকের সচেতনতা থেকে। প্রাণী, প্রকৃতি এবং মানুষের স্বাস্থ্যকে একই সুতোয় বেঁধে রাখতে পারলেই গড়ে উঠবে আরও নিরাপদ ও সুস্থ আগামী।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
রাতদখলে ‘হুজুগ’ দেখেছিলেন মমতা, বারুইপুরে ‘জাস্টিস’ স্লোগান চুরি করেই পথে! এ কেমন দ্বিচারিতা?
-
এল নিনোর রক্তচক্ষু এড়িয়ে ১১ শতাংশ বেশি বৃষ্টি জুলাইয়ে! তৈরি নয়া নজির
-
ইন্দোনেশিয়ার আকাশে মোদিকে স্বাগত জানাল এফ-১৬, সুখোই! অভিভূত প্রধানমন্ত্রী
-
‘উলটো করে ঝোলাব বলেছিলাম’, গুন্ডাদমন থেকে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি নিয়ে শুভেন্দুর প্রশংসা শাহের
-
‘সিএএতে নাগরিকত্ব দেওয়ার কাজ দ্রুত শেষ হবে’, শ্যামাপ্রসাদের জন্মদিবসে বড় বার্তা শাহের