জেলে ঢুকলেই যে নেশার অভ্যাস থেমে যায়, তা নয়। বরং দেশের জেলগুলিতে নেশাজাতীয় পদার্থের ব্যবহার নিয়ে হওয়া গবেষণায় উঠে এসেছে তারই প্রমাণ। ৭ হাজারেরও বেশি বন্দিকে নিয়ে করা সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, অর্ধেকের বেশি জীবনে কোনও না কোনও সময়ে মদ্যপান করেছেন। প্রায় ২০ শতাংশের গাঁজা এবং ১১ শতাংশের মাদকজাতীয় ওষুধ (ওপিওয়েড) ব্যবহারের ইতিহাস রয়েছে। এমনকী জেলে বন্দি থাকার সময়ও ৫.৯ শতাংশ নেশাজাতীয় পদার্থ ব্যবহার করেছেন।
‘ইন্ডিয়ান জার্নাল অফ মেডিক্যাল রিসার্চ’-এ প্রকাশিত এই গবেষণায় দেশের ৯টি রাজ্যের ১৭টি জেলের ৭,০০৪ জন বন্দির তথ্য খতিয়ে দেখা হয়েছে। গবেষকদের দাবি, ভারতীয় জেলগুলিতে নেশার প্রবণতা বোঝার ক্ষেত্রে এটিই এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে বড় তথ্যভিত্তিক সমীক্ষা।
গবেষণায় অংশ নেওয়া বন্দিদের ৫১ শতাংশ জানিয়েছেন, বন্দিজীবনে কোনও সময়ে তাঁরা মদ্যপান করেছেন। ২০ শতাংশের গাঁজা এবং ১১ শতাংশের মাদকজাতীয় ওষুধ ব্যবহারের অভিজ্ঞতা রয়েছে। শুধু নেশার ইতিহাসই নয়, জেলে ঢোকার আগে কতটা নিয়মিত নেশা চলত, তার ছবিও উঠে এসেছে গবেষণায়। কারাবন্দি হওয়ার আগের এক মাসে মদ্যপানকারীদের ২১ শতাংশ প্রতিদিন মদ খেতেন। গাঁজা সেবনকারীদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল ৩০ শতাংশ এবং ওপিওয়েডের ক্ষেত্রে ৪৫ শতাংশ।
আরও পড়ুন:

জেলের ভিতরেও চলছে নেশা
জেলে থাকার সময় নেশাজাতীয় পদার্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সামনে এসেছে গাঁজা। ৩.৯ শতাংশ বন্দি জানিয়েছেন, বর্তমান কারাবাসের সময় তাঁরা গাঁজা সেবন করছেন। সব ধরনের নেশাজাতীয় পদার্থ ধরলে, জেলে থাকার সময় ৫.৯ শতাংশ বন্দি নেশা করেছেন।
গবেষণার প্রধান গবেষক, নয়াদিল্লির অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেস-এর ন্যাশনাল ড্রাগ ডিপেনডেন্স ট্রিটমেন্ট সেন্টারের অধ্যাপক ডা. রবীন্দ্র রাও জানিয়েছেন, এই পরিসংখ্যান জেল-স্বাস্থ্য ব্যবস্থার একটি বড় ঘাটতির দিকে ইঙ্গিত করছে। জেলে ঢোকার সময় নেশার সমস্যা শনাক্ত করা, নেশা বন্ধ করার পর তৈরি হওয়া উপসর্গের চিকিৎসা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নেশামুক্তির বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা, এই ব্যবস্থাগুলিকে আরও শক্তিশালী করা জরুরি।
নেশা বন্ধ করলেই সমস্যা মিটছে না
গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল ‘উইথড্রয়াল’ বা নেশা বন্ধ করার পর তৈরি হওয়া শারীরিক ও মানসিক উপসর্গ। দেখা গিয়েছে, জেলে থাকার সময় যাঁদের উইথড্রয়ালের সমস্যা হয়েছিল, তাঁদের মধ্যে কারাগারে থেকেও নেশা করার প্রবণতা বেশি।
মদ, গাঁজা এবং ওপিওয়েড—তিন ধরনের নেশার ক্ষেত্রেই উইথড্রয়ালের সঙ্গে জেলের ভিতরে ফের নেশা করার সম্পর্ক পাওয়া গিয়েছে। অর্থাৎ, নেশার উপর নির্ভরশীল কোনও ব্যক্তিকে শুধু জেলে পাঠিয়ে দিলেই সমস্যা মিটছে না। চিকিৎসা না হলে নেশা বন্ধ করার শারীরিক-মানসিক যন্ত্রণা তাঁকে আবার নেশার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
কাদের ঝুঁকি বেশি, তাও চিহ্নিত করেছে গবেষণা। কমবয়সি বন্দি, আগে একাধিকবার জেলে গিয়েছেন এমন ব্যক্তি এবং জেলে ঢোকার আগে গাঁজা সেবন করতেন, এমন বন্দিদের মধ্যে কারাগারে থেকেও নেশা করার প্রবণতা বেশি। বিশেষ করে, আগে গাঁজা ব্যবহার করেছেন এমন বন্দিদের ক্ষেত্রে জেলে থেকেও নেশা করার সম্ভাবনা অন্যদের তুলনায় পাঁচ গুণের বেশি।

জেলে ঢোকার সময়ই নজরদারি জরুরি
গবেষণায় দেখা গিয়েছে, অংশগ্রহণকারী বন্দিদের ৭৭ শতাংশই প্রথমবার জেলে এসেছেন। ৬৫ শতাংশ ছিলেন বিচারাধীন বন্দি। অর্থাৎ, সাজা ঘোষণার আগেই বহু মানুষ জেলে আসছেন, যাঁদের মধ্যে কারও কারও নেশা-সংক্রান্ত সমস্যা আগে থেকেই রয়েছে।
গবেষকদের মতে, তাই জেলে প্রবেশের সময়ই প্রত্যেক বন্দির নেশার ইতিহাস জানার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। কারও নেশার উপর নির্ভরতা থাকলে দ্রুত তা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা শুরু করতে হবে। বিশেষ করে মদ বা ওপিওয়েডের মতো নেশা হঠাৎ বন্ধ করার ক্ষেত্রে যে শারীরিক সমস্যা তৈরি হতে পারে, তার জন্যও চিকিৎসকের নজরদারি জরুরি।
নিয়মিত স্ক্রিনিং, উইথড্রয়াল সামলানোর চিকিৎসা এবং প্রমাণভিত্তিক নেশামুক্তি পরিষেবা চালু হলে বন্দিদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার পাশাপাশি পুনর্বাসনের পথও সহজ হতে পারে। জেল থেকে বেরিয়ে ফের নেশায় জড়িয়ে পড়া এবং অপরাধের পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি কমাতেও এই চিকিৎসা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
বন্যায় কাঁদছে অসম! এখনও ক্ষতিগ্রস্ত লক্ষাধিক মানুষ, ১১ হাজার হেক্টর কৃষিজমি জলমগ্ন, মৃত ১০০
-
পরমাণু চুক্তি নিয়ে সুর নরম, ইরান হরমুজে খুলে দিলেই নিষ্ফলা যুদ্ধে ইতি টানবেন ট্রাম্প!
-
মোটা মাইনের চাকরির টোপ দিয়ে কলকাতার যুবকদের উজবেকিস্তানে ‘পাচার’, তারপর…
-
রাজারহাটের অভিজাত আবাসনে পানীয় জলদূষণ! অসুস্থ বহু বাসিন্দা, তুমুল উত্তেজনা এলাকায়
-
অটো চালিয়ে অসুস্থকে বিনামূল্যে পৌঁছে দেন হাসপাতালে, ভাইরাল গভীর রাতের ‘শেরনি’