আজকের তরুণ প্রজন্মের সামনে সুযোগ যেমন অনেক, তেমনই প্রত্যাশার চাপও কম নয়। পরীক্ষায় ভালো ফল, কেরিয়ার, সম্পর্ক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেকে তুলে ধরা—সব ক্ষেত্রেই যেন নিজেকে প্রমাণ করার প্রতিযোগিতা। বাইরে থেকে স্বাভাবিক ছন্দে চললেও এই চাপ অনেক সময় নিঃশব্দে প্রভাব ফেলে তরুণদের মনে।
পড়াশোনার প্রতিযোগিতা, কেরিয়ার নিয়ে অনিশ্চয়তা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের সঙ্গে নিজের তুলনা এবং বন্ধুদের প্রত্যাশা—সব মিলিয়ে তৈরি হতে পারে মানসিক চাপ। কিন্তু এই চাপের কথা সবসময় মুখে আসে না। অনেক তরুণই ভয় পান, নিজের সমস্যার কথা বললে তাঁকে দুর্বল ভাবা হবে, বাবা-মা হতাশ হবেন বা বন্ধুরা তাঁকে বুঝতে পারবেন না।
আরও পড়ুন:
এই জায়গাতেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ইমোশনাল সেফটি, অর্থাৎ, এমন একটি মানসিক পরিবেশ, যেখানে নিজের কথা বলার জন্য কাউকে ভয় পেতে হবে না।
আরও পড়ুন:

প্রতিদিনের তুলনা, প্রতিদিনের চাপ
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তরুণদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যোগাযোগ, সৃজনশীলতা ও নতুন কিছু শেখার সুযোগের পাশাপাশি এর অন্য একটি দিকও রয়েছে। প্রতিদিন অন্যের সাফল্য, সুন্দর চেহারা, সম্পর্ক, ভ্রমণ বা জীবনযাপনের ছবি দেখতে দেখতে নিজের জীবনকেও তার সঙ্গে তুলনা করতে শুরু করেন অনেকে।
মনোবিজ্ঞানীদের কথায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মূলত মানুষের জীবনের বাছাই করা এবং সাজানো মুহূর্তগুলিই সামনে আসে। ফলে তরুণদের মনে কখনও কখনও এমন ধারণা তৈরি হতে পারে যে, অন্যেরা সবাই এগিয়ে যাচ্ছে, শুধু তিনিই পিছিয়ে পড়ছেন।
এর সঙ্গে রয়েছে পড়াশোনা ও কেরিয়ারের চাপ। ভালো নম্বরের পাশাপাশি একাধিক দক্ষতা, অতিরিক্ত কার্যকলাপ, ইন্টার্নশিপ এবং ভবিষ্যৎ কেরিয়ার নিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রত্যাশা তৈরি হচ্ছে অল্প বয়সেই। প্রতিটি সিদ্ধান্তই ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে, এই ভাবনা তরুণদের মধ্যে চাপ, উদ্বেগ এবং ব্যর্থতার ভয় বাড়িয়ে দিতে পারে।
বন্ধুত্বও কখনও হয়ে ওঠে চাপের কারণ
কৈশোর ও তারুণ্যে বন্ধুমহলের গুরুত্ব অনেক। ভালো বন্ধুত্ব আত্মবিশ্বাস বাড়ায়, একাকিত্ব কমায় এবং কঠিন সময়ে পাশে থাকার অনুভূতি দেয়। কিন্তু উলটো দিকও রয়েছে। বন্ধুদের মতো আচরণ করতে বা তাদের মতো জীবনযাপন করতে গিয়ে অনেক তরুণ নিজের পছন্দ-অপছন্দকে পিছনে সরিয়ে দেন। ‘সবাই করছে, আমাকেও করতে হবে’, এই মানসিকতা ধীরে ধীরে চাপ তৈরি করতে পারে।

‘ভালো আছি’ বললেই কি সত্যিই ভালো থাকা?
তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে তাই শুধু তাঁরা কী করছেন, তা নয়, তাঁরা ভিতরে ভিতরে কেমন আছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। ইমোশনাল সেফটি বলতে বোঝায় এমন একটি পরিবেশ, যেখানে নিজের ভয়, দুশ্চিন্তা, রাগ, হতাশা, প্রশ্ন বা ভুলের কথা বললেও অপমানিত বা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয় থাকে না।
অনেক তরুণ মনে করেন, তাঁদের সবসময় আত্মবিশ্বাসী, সফল এবং মানসিকভাবে দৃঢ় থাকতে হবে। ফলে মন খারাপ হলেও তাঁরা চুপ থাকেন, ব্যর্থ হলেও তা লুকিয়ে রাখেন, সমস্যায় পড়লেও সাহায্য চান না।
ইমোশনাল সেফটি মানে তরুণদের জীবন থেকে সমস্ত সমস্যা সরিয়ে দেওয়া নয়। বরং এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে ব্যর্থতা নিয়ে কথা বলা যায়, ভুল স্বীকার করা যায় এবং প্রয়োজন হলে নির্দ্বিধায় সাহায্য চাওয়া যায়।
বাবা-মায়ের কাজ সব সমস্যার সমাধানে উপদেশ দেওয়া নয়
সন্তান কোনও সমস্যা নিয়ে কথা বলতে এলে সঙ্গে সঙ্গে উপদেশ দেওয়ার বদলে আগে তাঁর কথা শোনা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কখনও কখনও তরুণের প্রয়োজন সমাধান নয়, শুধু এমন একজন মানুষ যিনি তাঁকে বিচার না করে শুনবেন।
পড়াশোনা, কেরিয়ার, বন্ধুত্ব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা ব্যক্তিগত কোনও সমস্যা, যে বিষয়ই হোক, নিয়মিত এবং স্বচ্ছন্দ কথোপকথনের অভ্যাস থাকলে সাহায্য চাওয়াটা সহজ হয়। তাঁকে এটাও বোঝানো দরকার যে পরীক্ষার নম্বর, চাকরি বা সামাজিক সাফল্য কোনও মানুষের সম্পূর্ণ পরিচয় নয়।

মানসিকভাবে দৃঢ় হওয়া মানেই একা লড়াই করা নয়
মানসিক ভাবে দৃঢ় থাকা মানে সব সমস্যা নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে একাই লড়াই করা নয়। বরং সমস্যা এলে তা চিনতে পারা, আবেগ সামলানো, প্রয়োজন অনুযায়ী পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া এবং প্রয়োজনে অন্যের সাহায্য চাওয়াই প্রকৃত মানসিক স্থিতিস্থাপকতার লক্ষণ।
নিয়মিত ঘুম, শরীরচর্চা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সংযম, নিজের পছন্দের কাজের জন্য সময় রাখা, মননশীলতার চর্চা এবং কাছের মানুষদের সঙ্গে সময় কাটানোও মানসিক সুস্থতা ধরে রাখতে সাহায্য করতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ, মন খারাপ বা অতিরিক্ত চাপ থাকলে বা তা পড়াশোনা, কাজ, সম্পর্ক বা দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করতে শুরু করলে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া উচিত।
তরুণদের শুধু সাফল্যের জন্য প্রস্তুত করলেই হবে না। এমন একটি নিরাপদ জায়গাও দিতে হবে, যেখানে তারা ব্যর্থ হতে পারে, মন খারাপের কথা বলতে পারে, প্রশ্ন করতে পারে এবং প্রয়োজন হলে বলতে পারে, ‘আমার একটু সাহায্য দরকার।’
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
যত বড় ভুঁড়ি, তত দর! সবচেয়ে মোটা পুরুষই পান ‘হিরো’র খেতাব, আজব এই উৎসবের কথা জানেন?
-
নেপালে জলপ্রলয়, বিপাকে আরামবাগের পর্যটক বোঝাই বাস, আতঙ্কে প্রহর গুনছে ৬০ পরিবার
-
সাড়ে তিন বছর ধরে টিম ইন্ডিয়াকে ফেলেছেন বিপাকে! কামব্যাক সিরিজে লজ্জার জোড়া রেকর্ড জাড্ডুর
-
ইন্ডিয়া জোটে বড়সড় অশান্তি, ‘বেইমান’ ওমর আবদুল্লার সঙ্গে দূরত্ব বাড়াচ্ছে কংগ্রেস
-
নেপালের বন্যার থাবা ভারতেও, নিখোঁজ অন্তত ১৪! ‘নারায়ণী রহস্যে’ বিপদ বাড়ছে উত্তরপ্রদেশ-বিহারে