বাড়ির পোষ্য বিড়ালের আঁচড়কে অনেকেই তেমন গুরুত্ব দেন না। ক্ষতস্থান ধুয়ে ফেলেই নিশ্চিন্ত হয়ে যান। কিন্তু চিকিৎসকদের সতর্কবার্তা, বিরল হলেও এই সামান্য আঁচড় থেকেই শরীরে বাসা বাঁধতে পারে এমন এক ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ, যা দীর্ঘদিনের জ্বর, লিম্ফ নোড ফুলে যাওয়া, এমনকী পুঁজ জমার মতো জটিল সমস্যার কারণ হতে পারে।
সম্প্রতি নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিনে প্রকাশিত একটি কেস রিপোর্টে উঠে এসেছে এমনই এক ঘটনা। ৪০ বছর বয়সি এক নারী টানা এক মাস জ্বরে ভুগছিলেন। তাঁর সঙ্গে ছিল ডান বগলে তিন সপ্তাহ ধরে অসহনীয় ব্যথা ও ফোলা। প্রথমে কারণ স্পষ্ট না হলেও আল্ট্রাসাউন্ডে দেখা যায়, বগলের একাধিক লিম্ফ নোড অস্বাভাবিকভাবে বড় হয়ে গেছে এবং সেখানে তরলও জমেছে। পরে পরীক্ষায় ধরা পড়ে, এর নেপথ্যে রয়েছে ক্যাট স্ক্র্যাচ ডিজিজ (Cat Scratch Disease) নামে পরিচিত একটি ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ।
আরও পড়ুন:
কী এই ক্যাট স্ক্র্যাচ ডিজিজ?
এটি বারটোনেলা হেনসেলে (Bartonella henselae) নামের ব্যাকটেরিয়ার কারণে হওয়া একটি সংক্রমণ। আক্রান্ত বিড়ালের আঁচড়, কামড় বা কখনও ক্ষতস্থানে বিড়ালের লালা লাগলেও এই জীবাণু মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। বিশেষ করে বিড়ালছানার শরীরে এই ব্যাকটেরিয়া বেশি দেখা যায়, যদিও তারা নিজেরা সাধারণত অসুস্থ হয় না। বিড়ালের মধ্যে জীবাণু ছড়াতে ফ্লি (Flea) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
আরও পড়ুন:

কী কী লক্ষণ দেখা দেয়?
সাধারণত আঁচড় লাগার ৩ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে উপসর্গ দেখা দিতে শুরু করে। যেমন—
- আঁচড়ের কাছাকাছি লিম্ফ নোড ফুলে যাওয়া ও ব্যথা
- দীর্ঘস্থায়ী জ্বর
- অতিরিক্ত ক্লান্তি
- মাথাব্যথা
- খিদে কমে যাওয়া
- আঁচড়ের জায়গায় ছোট ফুসকুড়ি বা ফোস্কা
- শরীর ও পেশিতে ব্যথা
৪০ বছর বয়সি ওই মহিলার ক্ষেত্রে হাতে আঁচড় লাগার কারণে সংক্রমণের প্রতিক্রিয়ায় বগলের লিম্ফ নোড ফুলে যায় এবং সেখানে পুঁজ জমতে শুরু করে।
কেন লিম্ফ নোড ফুলে যায়?
লিম্ফ নোড শরীরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কোনও জীবাণু শরীরে প্রবেশ করলে সেটিকে ধ্বংস করার জন্য লিম্ফ নোড সক্রিয় হয়ে ওঠে। ফলে সেগুলো বড় হয়ে যেতে পারে এবং ব্যথা অনুভূত হয়। কখনও কখনও সংক্রমণ এতটাই বেড়ে যায় যে সেখানে পুঁজ জমে অ্যাবসেস তৈরি হয়।
লিম্ফ নোডের ফোলা যদি দু-তিন সপ্তাহের বেশি থাকে বা ক্রমশ বাড়তে থাকে, তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
কীভাবে রোগ নির্ণয় করা হয়?
রোগ নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসক সাধারণত—
- বিড়ালের সংস্পর্শে আসার ইতিহাস জানতে চান
- শারীরিক পরীক্ষা করেন
- বারটোনেলা হেনসেলে শনাক্তের জন্য রক্ত পরীক্ষা করান
- আল্ট্রাসাউন্ড বা অন্যান্য ইমেজিং করেন
- প্রয়োজনে লিম্ফ নোড থেকে নমুনা সংগ্রহ বা পুঁজ বের করে পরীক্ষা করেন
চিকিৎসা কী?
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রোগটি কয়েক সপ্তাহের মধ্যে নিজে থেকেই সেরে যায়। তবে সংক্রমণ গুরুতর হলে চিকিৎসক অ্যান্টিবায়োটিক দিতে পারেন। পাশাপাশি ব্যথা কমানোর ওষুধ, গরম সেঁক এবং প্রয়োজনে পুঁজ বের করার চিকিৎসাও করা হয়। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকলে চিকিৎসা আরও দীর্ঘ ও নিবিড় হতে পারে।

কীভাবে নিজেকে সুরক্ষিত রাখবেন?
- বিড়ালের আঁচড় বা কামড়ের সঙ্গে সঙ্গে সাবান ও পরিষ্কার জল দিয়ে ধুয়ে ফেলুন
- বিড়ালের সঙ্গে সাবধানে খেলুন
- পোষ্যের শরীরে ফ্লি নিয়ন্ত্রণে রাখুন
- কোনও ক্ষত বিড়ালকে চাটতে দেবেন না
- নিয়মিত বিড়ালের নখ কাটুন
- আঁচড়ের পরে জ্বর, লালচে ভাব, ফোলা বা ব্যথা বাড়লে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যান।
কখন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হবেন?
যদি আঁচড় লাগার পর—
- কয়েক দিনের বেশি জ্বর থাকে
- বগল, ঘাড় বা কুঁচকির লিম্ফ নোড ফুলে যায়
- ক্ষতস্থান থেকে পুঁজ বের হয়
- ব্যথা বা ফোলা বাড়তেই থাকে
- দীর্ঘদিন ক্লান্তি কাটতে না চায়
তাহলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
বিড়ালের আঁচড়কে কখনও হালকাভাবে নেবেন না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটি ক্ষতিকর নয়, কিন্তু বিরল কিছু ক্ষেত্রে এর আড়ালে লুকিয়ে থাকতে পারে এমন সংক্রমণ, যা সময়মতো চিকিৎসা না হলে জটিল আকার নিতে পারে। তাই আঁচড়ের পর অস্বাভাবিক জ্বর, ব্যথা বা লিম্ফ নোড ফুলে গেলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
রোগ সারাতে বাংলাদেশিদের ভরসা কলকাতাই! দেড় লক্ষ ভিসা আবেদনে মেডিক্যাল ট্যুরিজমে জোয়ার
-
মেসির গায়ে শুকোচ্ছে লেপ-কাঁথা-কম্বল! বিশ্বকাপের মাঝে এ কী অবস্থা সেই ‘বিখ্যাত’ মূর্তির
-
‘আরএন রবি বলছি’, রাজ্যপালের নামে অগ্নিমিত্রা-দুধকুমারকে ফোন, বালি থেকে যুবককে ধরল পুলিশ
-
জল জীবন মিশন প্রকল্পে সাড়ে ১৪ কোটি টাকা দুর্নীতির অভিযোগ, চাঞ্চল্য দার্জিলিংয়ে
-
বিশ্বকাপে ধুন্ধুমার! অস্ট্রেলিয়া ম্যাচের আগে পুলিশের সঙ্গে হাতাহাতি মিশর কোচের, হলটা কী?