ইউরোপজুড়ে রেকর্ড ভাঙা তাপপ্রবাহ। জার্মানির রাজধানী বার্লিনে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি পৌঁছাতেই প্রশাসন নিল এক অভিনব সিদ্ধান্ত। সাধারণত দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত বিশাল জলকামান এবার মোতায়েন করা হল মানুষের শরীর ঠান্ডা রাখতে! শহরের গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে কামান থেকে সূক্ষ্ম জলধারা ছিটিয়ে গরমে হাঁসফাঁস করা পর্যটক ও বাসিন্দাদের স্বস্তি দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
ব্র্যান্ডেনবার্গ গেট, পটসডামার প্লাৎস এবং রাইখস্টাগের সামনে জলকামানের ঠান্ডা জলধারায় ভিজে খানিক স্বস্তি পাচ্ছেন মানুষজন, এমন দৃশ্য মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক মাধ্যমে। কিন্তু এই দৃশ্যের বাইরেও উঠে এসেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, শরীরে জল ছিটিয়ে কি সত্যিই তাপদাহের ক্ষতি কমানো যায়, নাকি এটি কেবল সাময়িক আরামের অনুভূতি?
আরও পড়ুন:

আরও পড়ুন:
এইভাবে শরীর ঠান্ডা করার পেছনে বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা
চিকিৎসকদের মতে, এই পদ্ধতি শুধু চোখে পড়ার মতো অভিনব নয়, এর পেছনে রয়েছে সুস্পষ্ট বৈজ্ঞানিক ভিত্তি। স্বাভাবিক অবস্থায় শরীর ঘামের মাধ্যমে নিজের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। ত্বকের উপর জমে থাকা ঘাম বাষ্পে পরিণত হওয়ার সময় শরীর থেকে অতিরিক্ত তাপ শোষণ করে নিয়ে যায়। কিন্তু প্রচণ্ড গরমে, বিশেষ করে যখন বাইরের তাপমাত্রা শরীরের তাপমাত্রার কাছাকাছি বা তার চেয়েও বেশি হয়, তখন এই প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়ে।
এমন পরিস্থিতিতে শরীরে বাইরে থেকে জল ছিটিয়ে দিলে সেই জলও ধীরে ধীরে বাষ্পীভূত হয় এবং ত্বক থেকে তাপ শোষণ করে। ফলে শরীর দ্রুত কিছুটা ঠান্ডা হয়।
শুধু স্বস্তি নয়, কমে হৃদযন্ত্রের উপর চাপও
প্রচণ্ড গরমে শরীরের তাপ বাইরে বের করে দিতে হৃদযন্ত্রকে স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি পরিশ্রম করতে হয়। ত্বকের দিকে অতিরিক্ত রক্ত প্রবাহিত করে শরীর নিজেকে ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ত্বকের তাপমাত্রা কমে গেলে হৃদযন্ত্রের এই অতিরিক্ত পরিশ্রমও কমে যায়। বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তি, হৃদরোগী এবং যাঁদের শরীর সহজে ঘামতে পারে না, তাঁদের জন্য এই ধরনের শরীর ঠান্ডা করার ব্যবস্থা বেশ উপকারী হতে পারে।

সব জায়গায় কি এই পদ্ধতি একইভাবে কাজ করবে?
এর উত্তর হল, না। এই পদ্ধতির কার্যকারিতা অনেকটাই নির্ভর করে বাতাসের আর্দ্রতার উপর। শুষ্ক আবহাওয়ায় জল দ্রুত বাষ্পীভূত হয়, ফলে শরীর দ্রুত ঠান্ডা হয়। কিন্তু আর্দ্রতা বেশি থাকলে জল সহজে শুকোয় না। তাই শরীর ভিজলেও কাঙ্ক্ষিত শীতলতা পাওয়া যায় না। জার্মানির সাম্প্রতিক তাপপ্রবাহে বাতাস তুলনামূলকভাবে শুষ্ক থাকায় জলকামানের এই উদ্যোগ কার্যকর হয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শও একই কথা বলছে
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) তাপপ্রবাহের সময় শরীর ঠান্ডা রাখতে ঠান্ডা জলে স্নান, ভেজা তোয়ালে ব্যবহার, মিস্টিং ফ্যান বা শরীরে ঠান্ডা জল ছিটিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দেয়। অর্থাৎ, জলকামান হোক বা সাধারণ স্প্রে, মূল নীতি একই। শরীরের তাপমাত্রা দ্রুত কমিয়ে তাপজনিত অসুস্থতার ঝুঁকি কমানো।
তবে হিটস্ট্রোকে শুধু জল যথেষ্ট নয়
চিকিৎসকরা সতর্ক করে দিচ্ছেন, শরীরে জল ছিটিয়ে দেওয়া কখনওই হিটস্ট্রোকের চিকিৎসা নয়। যদি কারও শরীরের তাপমাত্রা বিপজ্জনকভাবে বেড়ে যায় এবং বিভ্রান্তি, মাথা ঘোরা, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, দ্রুত হৃদস্পন্দন বা আচরণে পরিবর্তনের মতো লক্ষণ দেখা দেয়, তাহলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে। পাশাপাশি রোগীকে ঠান্ডা পরিবেশে নিয়ে যাওয়া, শরীর দ্রুত ঠান্ডা করা এবং পর্যাপ্ত জল বা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

ভবিষ্যতে কি এভাবেই তাপপ্রবাহ মোকাবিলা করবে?
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রতি বছরই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাপপ্রবাহ আরও তীব্র হচ্ছে। তাই শুধু বার্লিন নয়, ইতালি, ফ্রান্স, স্পেন, পোল্যান্ডসহ ইউরোপের একাধিক শহর এখন জনসমাগম এলাকায় মিস্টিং স্টেশন, ওয়াটার কার্টেন, অস্থায়ী ফোয়ারা ও কুলিং জোন তৈরি করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী দিনে এই ধরনের ‘কুলিং ইনফ্রাস্ট্রাকচার’ শহুরে জীবনের অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠতে পারে।
বার্লিনের জলকামান হয়তো প্রথম দেখায় ব্যতিক্রমী মনে হতে পারে, কিন্তু এর কার্যকারিতার পেছনে রয়েছে সুপ্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞান। শরীরে হালকা জলধারা ত্বকের তাপমাত্রা কমায়, শরীরের স্বাভাবিক শীতলীকরণ প্রক্রিয়াকে সহায়তা করে এবং হৃদযন্ত্রের উপর বাড়তি চাপও কমাতে পারে।
তবে এটিকে কখনওই তাপপ্রবাহ থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হিসেবে দেখা উচিত নয়। প্রচণ্ড গরমে পর্যাপ্ত জল পান করা, সরাসরি রোদ এড়িয়ে চলা, হালকা পোশাক পরা এবং অসুস্থ বোধ করলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়াই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে বার্লিনের উদ্যোগ দেখিয়ে দিল, কখনও কখনও একটি সাধারণ জলধারাও জনস্বাস্থ্য রক্ষায় বড় ভূমিকা নিতে পারে।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
স্কটিশ চার্চে অভিনব উদ্যোগ, চালু হল বিনামূল্যে ডেটা সায়েন্স ও সংবাদ পাঠের কোর্স
-
ভারতের রাষ্ট্রপতি কে? সাধারণ জ্ঞান নিয়ে আলিয়াকে খোঁচা! ‘আলফা’ জবাব কাপুরবধূর
-
দীর্ঘদিনের খরা কাটিয়ে বিশ্বকাপ নকআউটে জয়, বাঁধনভাঙা উচ্ছ্বাসে দমবন্ধ হয়ে মৃত ৩ সমর্থক
-
‘মেসি আরও গোল করুক, বিশ্বকাপটা আমার চাই’, ফ্রান্সকে শেষ ষোলোয় তুলে হুঙ্কার এমবাপের
-
‘যদি অর্থের লোভ থাকত…’, অভয়ার বাবার প্রণামী বাক্স ‘দখলের চেষ্টা’ নিয়ে কী বললেন রত্না দেবনাথ?