কিছু চরিত্র ইতিহাসে বারবার পুনরাবৃত্ত হয়। কেউ সমাজে রেখে যাওয়া মহান অবদানের জন্য। আবার কেউ সম্পূর্ণ বিপরীত কারণে। তাঁদের নৃশংসতা, অত্যাচারপ্রবণতা বারবার আলোচনায় উঠে আসে। সোজা কথায়, কেউ ইতিহাসের নায়ক। কেউ খলনায়ক! আর ইতিহাসের খলনায়ক তথা ‘ভিলেন’ বললেই যাঁর কথা সবার প্রথমে মনের ভিতরে ভেসে ওঠে, তিনি মাছি-গোঁফের এক মানুষ… খোদ চার্লি চ্যাপলিন যাঁকে আক্রমণ করেছিলেন ‘দ্য গ্রেট ডিক্টেটর’ ছবিতে… আজও বিশ্ব ইতিহাসে কোনও স্বৈরাচারী শাসকের আগমন হলে তাঁর সঙ্গেই তুলনা করা হয়- তিনি অ্যাডলফ হিটলার। ইহুদিদের প্রতি তাঁর আচরণ আজও বিস্মিত করে দেয়! এহেন এক মানুষের অন্তরের ঘৃণার এক লিখিত দলিলের নাম ‘দ্য টেবিল টকস’। কী করে একজন মানুষ হিটলার হয়ে ওঠে, তা নিয়ে গত আট দশক ধরেই ভেবে চলেছে সভ্যতা। এই বইকে ফুয়েরারের মনের আয়না হিসেবে দেখেন অনেকেই। যেখানে ছায়া পড়েছে ভারতেরও! ভারতীয়দের সম্পর্কে এমন মন্তব্য করেছিলেন হিটলার, যা শুনলে নতুন করে ঘৃণারই জন্ম হয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুতেই হিটলারের সাফল্যে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে যায় ইউরোপ। তবে এই মহাযুদ্ধের সবচেয়ে চমকপ্রদ ঘটনা ছিল রাশিয়া ও জার্মানির মধ্যে হওয়া অনাক্রমণ চুক্তি। এক ফ্যাসিস্ট শক্তির সঙ্গে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের এহেন সমঝোতায় যেন সিঁদুরে মেঘ দেখেছিল পশ্চিমি শক্তি। একে একে পোল্যান্ড, নরওয়ে, ডেনমার্ক সব দখল করে নেয় নাৎসিরা। হল্যান্ড, বেলজিয়াম কিংবা ফ্রান্সও টিকতে পারল না তাদের সামনে। তাদের সঙ্গে দুরন্ত লড়াই হল ব্রিটেনের। কিন্তু এহেন পরিস্থিতিতে হিটলারের মুখোশ খসে পড়ল। সটান ‘বন্ধু’ রাশিয়ার দিকেই ঘুরে গেল জার্মান কামানের মুখ! স্তম্ভিত হয়ে গেলেন স্তালিন। এভাবে যে হিটলার বিশ্বাসঘাতকতা করবেন কে ভেবেছিল?
আরও পড়ুন:

এই তখন অবস্থা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তখন চরমে। ইউরোপ পুড়ছে। নাৎসি জার্মানি মেতেছে গণহত্যার খেলায়। সেই সময় প্রায়ই সন্ধেবেলা নানা কথা বলতেন হিটলার। না, সেগুলো কোনও মঞ্চের ভাষণ বা রেডিও সম্প্রচারে বলা গা গরম করা ‘বুকনি’ নয়। যেন একধরনের স্বগতোক্তি। যুদ্ধ, ধর্ম, সংস্কৃতি, রাজনীতি ও নিজের মতাদর্শ নিয়ে তার ব্যক্তিগত ভাবনা প্রকাশ পায় (১৯৪১ থেকে ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত সময়কাল) এই সব বক্তব্যে। কোনও রেকর্ডিং নয়, হিটলারের ব্যক্তিগত সহকারী হেনরি পিকার, হেইনরিম হেইম এসব কথোপকথন লিখে রেখেছিলেন স্মৃতি থেকে। ফলে তার সত্যতা নিয়েও অনেকে প্রশ্ন তোলেন বটে।
যাক, সে অন্য প্রসঙ্গ। আমরা বরং ভারতীয়দের সম্পর্কে তাঁর মতামতের প্রসঙ্গে কথা বলি। বইয়ে আছে, হিটলার বারাণসীর শবদাহ দেখে মন্তব্য করেছিলেন, ‘আমরা যদি ওখানে থাকলে আমাদের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা ক্রোধে ফেটে পড়তেন। এই জঘন্য প্রথা দমন করার জন্য কঠোরতম শাস্তির বিধান দিয়ে অভিযান শুরু করতেন! প্রতিদিন সরকারি রসায়নবিদরা এসে নদীর জল পরীক্ষা করতেন। এবং অল্প সময়ের মধ্যেই একটি নতুন ও ব্যাপক স্বাস্থ্যমন্ত্রক স্থাপন করা হত! অন্যদিকে, ব্রিটিশরা শুধু বিধবাদের সহমরণ নিষিদ্ধ করেই সন্তুষ্ট থেকেছে। ভারতীয়রা নিজেদের ভাগ্যবান মনে করতে পারে যে আমরা ভারত শাসন করি না। আমরা ওদের জীবন দুর্বিষহ করে তুলতাম! শুধু ভাবুন তো! যেখান থেকে আধপোড়া দেহ গঙ্গার জলে ফেলে দেওয়া হয়, তার মাত্র দু’শো গজ দূরত্বে সেই নদীরই জল পান করা হয়! এতে কারও কোনও ক্ষতি হয় না। কিন্তু আমরা কি এমন একটা ব্যাপার সহ্য করতাম?’

হিটলারের এহেন মন্তব্য নিয়ে পরবর্তী সময়ে বারবার কাটাছেঁড়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটা মোটেই কোনও তাৎক্ষণিক মন্তব্য নয়। বরং এর নেপথ্যে নাৎসি মতাদর্শের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা কয়েকটি গোঁড়া মনোভাবকেই তা তুলে ধরে। যেমন, নাৎসিরা বিশ্বাস করত ইউরোপীয় সভ্যতা, বিশেষত জার্মান সভ্যতা সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ। স্বাভাবিক ভাবেই অ-ইউরোপীয় সংস্কৃতি বা আচারগুলিকে অযৌক্তিক বা অস্বাস্থ্যকর হিসেবে তারা দেখবে এতে আর আশ্চর্য কী! তাছাড়া এই মন্তব্যে ঔপনিবেশিক ঔদ্ধত্য উপচে পড়ছে। ব্রিটিশ শাসনের নির্মমতা সকলেরই জানা। হিটলারও তা জানতেন না, এমন হতে পারে না। তবু তিনি মনে মনে কল্পনা করেছিলেন সম্ভব হলে তিনি ভারতীয়দের প্রতি ব্রিটিশদের চেয়েও বেশি নিষ্ঠুর হতেন। তিনি বরাবরই নজরদারির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের গভীর নিয়ন্ত্রণকেই গুরুত্ব দিয়ে এসেছেন। ভারত যদি জার্মানির উপনিবেশ হত, তাহলে সেখানেও একই ভাবে শোষণ, দমন-পীড়ন চালাতেন অ্যাডলফ হিটলার। নিজেই বলেছেন, ‘আমরা ওদের জীবন দুর্বিষহ করে তুলতাম!’ আরেকটা বিষয়। পরিচ্ছন্নতা, দূষণ এবং রোগ নিয়ে হিটলারের শূচিবায়ুগ্রস্ততার নানা কাহিনি শোনা যায়। তাঁর ইহুদিদের প্রতি ঘৃণার নেপথ্যেও কিন্তু এই মনোভাবই কাজ করেছিল। আর সেই একই মানসিকতা এখানেও দৃশ্যমান, যেখানে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানকে এককথায় নাকচ করে দিতে বাঁধেনি তাঁর।
সারা বিশ্বের বেশিরভাগ ইতিহাসবিদ অবশ্য ভারত সম্পর্কে জানার জন্য হিটলারের ‘টেবিল টক’ থেকে উদ্ধৃত করেন না। বরং হিটলারকে বোঝার জন্যই এটিকে খুঁটিয়ে দেখেন। বেনারস সম্পর্কিত হিটলারের ওই মন্তব্য তাই মূল্যবান। নাৎসি নেতারা অ-ইউরোপীয় সমাজগুলিকে কীভাবে দেখতেন, ঔপনিবেশিক চিন্তাভাবনা কীভাবে ব্রিটিশ ক্ষমতার বিরোধিতাকারী শাসনব্যবস্থাগুলোকেও প্রভাবিত করেছিল সেটাও বোঝা যায় এই একটি অনুচ্ছেদ থেকে। সময় বদলেছে। কিন্তু হিটলারের সেই সংলাপ তাই বহুমাত্রিক হয়ে আজও একনায়কের কণ্ঠস্বরের প্রতীক হয়ে রয়ে গিয়েছে।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
ভেঙে খানখান সাধের দল! ‘বিদ্রোহী’দের ফেরাতে জনে জনে ফোন করছেন মমতা
-
গেট খুললেই জুতোর বাড়ি! প্রতারণার অভিযোগে দুর্গাপুরে তৃণমূলের নেতার বাড়ির সামনে ধরনা
-
অতি ঘনিষ্ঠতাতেই ভাঙছে সেতু! সম্পর্ক বাঁচাতে দূরত্ব প্রয়োজন, বলছেন মনোবিদরা
-
একমাসে দু’বার মাইনে! অভিনব আইডিয়া উদ্যোগপতির, কতটা উপকৃত হবেন কর্মীরা?
-
ফেডারেশনের বৈঠকে ইট থেকে ডিমবৃষ্টি, টলিপাড়ায় ধুন্ধুমারে কাকে দায়ী করলেন রুদ্রনীল?