দেশ স্বাধীন হয়েছে মাস চারেক। বহু রক্তপাত, ত্যাগ ও তিতিক্ষার পর পরে এসেছে কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা। তবু ভারতের মাথায় তখনও অব্যাহত আশঙ্কার মেঘ। দেশভাগের তরবারিতে দু’টুকরো হয়েছে দেশ। সেই সময়, ১৯৪৮ সালের জানুয়ারি মাসে জীবনের শেষ অনশনে বসেছেন মহাত্মা মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী। যে অনশনের ফলেই ভারত পাকিস্তানকে ৫৫ কোটি টাকা হস্তান্তর করতে বাধ্য হয়েছিল। ইতিহাসের এ এক অপেক্ষাকৃত কম আলোচিত অধ্যায়।
সারা জীবনে ১৮ বার অনশন করেছেন গান্ধী। যে সময়ের কথা হচ্ছে, তার মাত্র কয়েক মাস আগেই তিন দিনের অনশন করেন ‘জাতির জনক’। দেশভাগের উত্তাল অভিঘাতে তৈরি হওয়া দাঙ্গা পরিস্থিতিতেই তাঁর সেই অনশন। কিন্তু আটচল্লিশের জানুয়ারিতে কেন ফের তিনি বেছে নিলেন সেই পথ। তখনও তিনি জানেন না মাসের শেষে তাঁর দিকে ছুটে আসবে ঘাতকের বুলেট… সেটা ৩০ জানুয়ারি। আমরা এখানে বলব ১২ জানুয়ারির কথা।
আরও পড়ুন:
১৯৪৮ সালের জানুয়ারি মাসে জীবনের শেষ অনশনে বসেন মহাত্মা মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী। যে অনশনের ফলেই ভারত পাকিস্তানকে ৫৫ কোটি টাকা হস্তান্তর করতে বাধ্য হয়েছিল।
স্থান তৎকালীন আলবুকার্ক রোড। এখন যার নাম তিস জানুয়ারি রোড। এখানেই বিড়লা হাউসে জীবনের শেষ ১৪৪ দিন কাটিয়েছিলেন মহাত্মা গান্ধী। ২০০৫ সালে এই ভবনে ইটারনাল গান্ধী মাল্টিমিডিয়া মিউজিয়াম চালু হয়েছে। যাক, সে অন্য কথা। ১৯৪৮ সালের ১২ জানুয়ারি। গভর্নর জেনারেল মাউন্টব্যাটেন এসেছেন গান্ধীর কাছে। যদিও মহাত্মা তখন মৌনব্রত পালন করছেন। ফলে জবাব দিচ্ছেন হাতে লিখেই। সেদিন থেকেই তিনি শুরু করেন তাঁর অনশন। ইতিহাসবিদ ও লেখক রামচন্দ্র গুহ তাঁর ‘গান্ধী: দ্য ইয়ার্স দ্যাট চেঞ্জড দ্য ওয়ার্ল্ড ১৯১৪-১৯৪৮’ বইয়ে উল্লেখ করেছেন, সেদিনই প্রার্থনা সভায় গান্ধী বলেন, “সাম্প্রতিক দাঙ্গা পুলিশ ও সেনার পদক্ষেপের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হলেও মানুষের অন্তরে যে ঝড় বয়ে চলেছে, তা যে কোনও মুহূর্তে বিস্ফোরিত হতে পারে। তাঁর অনশন তখনই শেষ হবে, যখন তিনি নিশ্চিত হবেন যে কোনো বাহ্যিক চাপ ছাড়াই, বরং কর্তব্যবোধের তাগিদে, সমস্ত সম্প্রদায়ের মানুষের হৃদয়ের মিলন ঘটেছে।”

ওই ঘোষণার আগে, সেদিনের সকালে মাউন্টব্যাটেনের সঙ্গে কথোপকথনের সময় (গান্ধী লিখেই উত্তর দিয়েছিলেন তা আগেই বলা হয়েছে) উত্তাল পাঞ্জাব ও দিল্লির প্রসঙ্গ উঠে এসেছিল। আর তখনই মাউন্টব্যাটেন বলেন, পাকিস্তানের প্রাপ্য ৫৫ কোটি টাকার কথা। জানান, ওই টাকা পড়শি দেশকে না দিলে বিশ্বের কাছে ভারতের অবস্থান নষ্ট হবে। এপ্রসঙ্গে আরও কিছু বলার আগে জানানো দরকার, ওই টাকাটা কীভাবে পাওনা হল পাকিস্তানের?
১৯৪৭ সালে ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় বলা হয়েছিল, ব্রিটিশ ভারতের কাছে পড়ে থাকা ‘স্টার্লিং ব্যালেন্স’ দুই দেশের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হবে। সেই হিসেবে পাকিস্তানের প্রাপ্য ছিল ৭৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২০ কোটি টাকা আগেই দেওয়া হয়েছিল। বাকি ছিল আরও ৫৫ কোটি টাকা। কিন্তু স্বাধীনতার পরই ‘স্বমূর্তি’ ধারণ করে পাকিস্তান। পাকিস্তান-সমর্থিত বাহিনী কাশ্মীর আক্রমণ করার পরই সদ্য স্বাধীন দেশ দুটির মধ্যে সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটে যায়। এহেন পরিস্থিতিতে বল্লভভাই প্যাটেল ও জওহরলাল নেহরু সিদ্ধান্ত নেন ওই টাকা তাঁরা পাকিস্তানকে দেবেন না। আর এই ব্যাপারটা একদমই ভালো লাগছিল না গান্ধীর। ভারতের সিদ্ধান্তটি তাঁকে পীড়া দিচ্ছিল। আসলে নেহরুদের কাছে ওই টাকা আটকে রাখার সিদ্ধান্তের নেপথ্যে ছিল নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগ। তাঁদের বিশ্বাস ছিল, ওই অর্থে কাশ্মীরে লড়াই চালানোর পিছনেই খরচ করবে পাকিস্তান। কিন্তু গান্ধীর কাছে বিষয়টি ছিল নীতিগত। আর তাই তিনি বেছে নিলেন অনশনের পথ।
পাকিস্তানের প্রাপ্য ছিল ৭৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২০ কোটি টাকা আগেই দেওয়া হয়েছিল। বাকি ছিল আরও ৫৫ কোটি টাকা। কিন্তু স্বাধীনতার পরই ‘স্বমূর্তি’ ধারণ করে পাকিস্তান। এহেন পরিস্থিতিতে বল্লভভাই প্যাটেল ও জওহরলাল নেহরু সিদ্ধান্ত নেন ওই টাকা তাঁরা পাকিস্তানকে দেবেন না।
অনশন শুরু হতেই ছুটে এলেন নেহরু। এলেন প্যাটেলও। কিন্তু গান্ধী নিজের সিদ্ধান্তে অনড়। ক্রমে পাকিস্তানের ৫৫ কোটি নিয়ে আলোচনার পথ খোলার সিদ্ধান্ত হল। এদিকে এই অনশনের কারণে হিন্দু ও শিখ শরণার্থীরা তাঁর উপরে ক্ষুব্ধও হয়ে উঠলেন। তাঁদের অনেকেরই ধারণা ছিল, পাকিস্তান থেকে চলে আসা শরণার্থীদের থেকে ‘মুসলমানদের স্বার্থ’কেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন গান্ধী! এমনকী বিড়লা হাউসের বাইরে শরণার্থীদের বিক্ষোভও দেখাতে দেখা যায়। গান্ধী শুনতে পেলেন জানলার বাইরে থেকে ভেসে আসছে স্লোগান। তিনি জানতে চাইলেন, ওরা কী বলতে চাইছে। তাঁকে জানানো হল, ”ওরা বলছে গান্ধী মরুক।”
সময় পেরোয়। শীর্ণকায় গান্ধীর স্বাস্থ্য ভেঙে পড়তে থাকে। ১৭ জানুয়ারি এক প্রার্থনা সভায় গান্ধী বললেন, “আমার এই অনশন কোনও অর্থেই রাজনৈতিক পদক্ষেপ নয়। বিবেক ও কর্তব্যের অমোঘ আহ্বানের প্রতি সাড়া দিয়েছি।”

শেষপর্যন্ত অনশন ভাঙার জন্য সাতটি শর্ত পেশ করেন গান্ধী। যার মধ্যে ছিল দখলকৃত মসজিদগুলি পুনরুদ্ধার, মুসলমানদের অবাধ চলাচল ও নিজেদের বাড়িতে ফিরে আসার নিশ্চয়তা দেওয়ার মতো নানা শর্ত। ১৮ জানুয়ারি হিন্দু, মুসলিম ও শিখ নেতারা গান্ধীর শর্তাবলি পূরণের প্রতিশ্রুতি দেন। আশ্বস্ত হয়ে গান্ধী এক গ্লাস লেবুর শরবত পান করে অনশন ভঙ্গ করেন।
এই অনশনের কারণে হিন্দু ও শিখ শরণার্থীরা তাঁর উপরে ক্ষুব্ধও হয়ে উঠলেন। তাঁদের অনেকেরই ধারণা ছিল, পাকিস্তান থেকে চলে আসা শরণার্থীদের থেকে ‘মুসলমানদের স্বার্থ’কেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন গান্ধী!
তবে অনশন ভাঙার পরও পাকিস্তানকে ওই অর্থ দেওয়া নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত ছিল। আসলে যে দেশটি তখনও নিহতদের শোকে মুহ্যমান এবং লক্ষ লক্ষ শরণার্থীর আশ্রয়ের ব্যবস্থা করতে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে ওই অর্থ পাকিস্তানকে না দিয়ে তা শরণার্থীদের পুনর্বাসনে কাজে লাগানোর দাবি উঠেছিল। নেহরুও তেমনটাই চেয়েছিলেন। কিন্তু গান্ধীর যুক্তি ছিল, ভারত যদি একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গড়তে চায় সেক্ষেত্রে সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা দিতে হবে। এবং পাকিস্তানের সঙ্গে শান্তি বজায় রাখতে চাইলে তাকে দেওয়া আর্থিক প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে হবে। দেশভাগের রেশ কাটিয়ে উঠতে চাইলে প্রতিশোধের রাজনীতিকে চিরতরে বিসর্জন দেওয়ার ডাক দিয়েছিলেন তিনি।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
রাজ্যপালের দিকে পিছন ঘুরে দাঁড়ানোর ‘শাস্তি’! ৪ বছর ধরে কুচকাওয়াজে ব্রাত্য মাউন্টেড পুলিশের ঘোড়া
-
সাহগেল হোসেনের ফ্ল্যাটে উদ্ধার সোনা, বিপুল সম্পত্তির নথি! আটক অনুব্রতর প্রাক্তন দেহরক্ষী
-
স্বাধীনতা দিবসের রাতে নদিয়ায় জোড়া খুন! গুলিতে ঝাঁঝরা কংগ্রেস নেতা এবং তাঁর ছেলে
-
অন্ধপ্রদেশ থেকে ২০০ আইফোন চুরি! বাংলাদেশে পাচারের আগেই ফরাক্কায় ধৃত চার কীর্তিমান
-
‘ডিম থেরাপি’ নিয়ে প্রথমবার মুখ খুলল এবিভিপি, উপাসনার উপর হামলা নিয়ে কী বক্তব্য?