Advertisement
Advertisement
Advertisement
Sangbad Pratidin
  • ৩ আষাঢ় ১৪৩৩
  • শুক্রবার
  • ১৯ জুন ২০২৬
Anik Dutta

ভূত হতে বসা বাংলা সিনেমার ভবিষ্যৎদ্রষ্টা, এক ছবিতে বাজিমাত করেও পথ হারালেন অনীক?

অনীকের প্রথম ছবি 'ভূতের ভবিষ্যৎ' কেবল বক্সঅফিস হিট ছিল না, ভালো 'বাঙালি ছবি' হিসাবেও স্বীকৃতি আদায় করেছিল। কেবল শহরের ছবি ছিল না। শহরতলি, এমনকী মফস্বলের বাঙালিও মজেছিল সব্যসাচী চক্রবর্তী, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়, পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায় অভিনীত ছবিটিতে।

Advertisement
কিশোর ঘোষ
কিশোর ঘোষ

শেষ আপডেট: মে ২৭, ২০২৬, ১৯:০১

link
কিশোর ঘোষ
কিশোর ঘোষ

শেষ আপডেট: মে ২৭, ২০২৬, ১৯:০১

options
link
ভূত হতে বসা বাংলা সিনেমার ভবিষ্যৎদ্রষ্টা, এক ছবিতে বাজিমাত করেও পথ হারালেন অনীক? zoom
'ভূতের ভবিষ্যৎ'-এর শ্রষ্ঠা

‘দুর্ঘটনা’য় আচমকা প্রয়াত হলেন অনীক দত্ত (Anik Dutta)। মনখারাপের পাশপাশি বঙ্গ চলচ্চিত্র পরিচালকের অকালপ্রয়াণে স্তম্ভিত সিনেপ্রেমী বাঙালি। এই ঘটনা অনীকের অমর সৃষ্টি ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’কেই মনে করাচ্ছে! বাংলা ছবির একঘেয়ে, মন্দ সময়ে আচমকা বিস্ফোরণ ঘটান অনীক। বড় পর্দার গড্ডলিকা প্রবাহে ২০১২ সালে মুক্তি পায় অদ্ভুতুড়ে কল্পনা, আশ্চর্য মজা এবং মিষ্টি ভয়ের ছবি ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’। সিনে-ক্ষুধার্ত বাঙালির স্মৃতিতে এখনও টাটকা সেই অভূতপূর্ব আনন্দ। কতদিন পর হলমুখো হয়েছিল বাঙালি। না, কোনও প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, দেব বা জিতের জন্য নয়। এমনকী ফেলুদা-ব্যোমকেশ বা তথাকথিত থ্রিলার দেখতে নয়, বরং একটি ঝকঝকে চিত্রনাট্য, বেশ কয়েকজন চোস্ত অভিনেতার দাপুটে অভিনয় উপভোগ করেছিল দর্শক। নেপথ্য কারিগর জনৈক ‘স্মার্ট’ পরিচালক। আপামর জনতা স্বাগত জানিয়েছিল অভিষেকেই সেঞ্চুরি হাঁকানো বঙ্গসন্তানকে। কিন্তু তার পর? অনীকের ভবিষ্যৎ কি পথ হারাইল?

অনীক দত্তের জন্ম ১৯৬০ সালে। তাঁর কথা লিখতে বসে মনে পড়ছে আরেক বাঙালি পরিচালকের কথা। তিনি অনীকের থেকে বয়সে ৪৭ বছরের বড়। জন্ম ১৯১৩ সালে। ভদ্রলোকের নাম নির্মল দে। নামটি সকলের জানা না থাকলেও ১৯৫৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘সাড়ে চুয়াত্ত’র ছবিটি দেখেননি এমন বাঙালি মেলা কঠিন। তুমুল হাস্যরস আর সহজ ভালোবাসায় ভরা সেই ছবি ছিল বাংলা সিনেমার এক মাইলস্টোন। যদিও নির্মল দে-র সিনেমা ‘চাঁপা ডাঙার বউ’ কিংবা ‘বিয়ের খাতা’ কালের চোরাবালিতে হারিয়ে গিয়েছে। কিছুটা ভেসে রয়েছে ১৯৫২-তে মুক্তি পাওয়া ‘বসু পরিবার’। নেপথ্যে সেকালের ‘ফ্লপ মাস্টার’ উত্তমের নায়ক হিসাবে প্রথম বড় সাফল্য। নির্মল দে-র উত্থান ও পতনের সঙ্গে বিজ্ঞাপনের জগৎ থেকে আসা অনীক দত্তের ‘কেরিয়ারগ্রাফ’ আশ্চর্যভাবে মিলে যায়।

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'ফুটবল বিশ্বযুদ্ধ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন
Advertisement

অনীকের প্রথম ছবি ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ কেবল বক্সঅফিস হিট ছিল না, ভালো ‘বাঙালি ছবি’ হিসাবেও স্বীকৃতি আদায় করেছিল। কেবল শহরের ছবি ছিল না। শহরতলি, এমনকী মফস্বলের বাঙালিও মজেছিল সব্যসাচী চক্রবর্তী, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়, পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায অভিনীত ছবিটিতে। ঠিক যেমন ‘সাড়ে চুয়াত্তর’-এর একাধিক সংলাপ মুখস্থ বাঙালির, তেমনই বহুদিন বাদে ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ ছবিটির ‘পোমোদ প্রধান’, ‘হাতকাটা কার্তিক’ কিংবা ‘টিকে গুছাইতে’র চূড়ান্ত মজার সব ডায়ালগ না চাইতেই ঠোঁটস্থ করে ফেলছিল ইন্টারনেট-মোবাইল যুগের বাঙালিও।

ভূতের ভবিষ্যতের পরে একের পর এক অ্যাভারেজ ছবিতে যেন নিজের কাছেই হেরে যাচ্ছিলেন অনীক! ‘আশ্চর্য প্রদীপ’ (২০১৩) হোক কিংবা ‘মেঘনাদ বধ রহস্য’ (২০১৭), ‘বরুণবাবুর বন্ধু’ (২০২০) হোক কিংবা ‘ভবিষ্যতের ভূত’ (২০১৯), প্রথম ছবি সাফল্যের কুতুব মিনারের পাশে এসবই নেহাত বেঁটে বামন ছাড়া কিছু নয়।

কয়েক দশক পরে কোনও বাংলা সিনেমার সাফল্যে নড়েচড়ে বসেছিল বলিউডও। সেই কারণেই দু’বছর পর ২০১৪ সালে মুক্তি পায় সতীশ কৌশিক পরিচালিত ‘গ্যাং অফ ঘোস্টস’। যা আসলে ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’-এর ব্যর্থ হিন্দি সংস্করণ। চলেনি সে ছবি। চলার কথাও নয়। আদ্যন্ত বাঙালিআনায় মোড়া একটি স্ক্রিপ্টকে খানিক ভোল পালটে হিন্দি করা যায় না। বোঝা উচিত ছিল হিন্দিওলাদের। কিন্তু বাঙালি ভেবেছিল, ওদের যাই হোক, আমাদের নতুন পরিচালক এসে গিয়েছেন। বিপুল প্রত্যাশা তৈরি করেছিলেন অনীক। তিনি কি সেই প্রত্যাশা পূরণ করলেন?

‘ভূতের ভবিষ্যতে’র পরে একের পর এক অ্যাভারেজ ছবিতে যেন নিজের কাছেই হেরে যাচ্ছিলেন অনীক! ‘আশ্চর্য প্রদীপ’ (২০১৩) হোক কিংবা ‘মেঘনাদ বধ রহস্য’ (২০১৭), ‘বরুণবাবুর বন্ধু’ (২০২০) হোক কিংবা ‘ভবিষ্যতের ভূত’ (২০১৯), প্রথম ছবি সাফল্যের কুতুবমিনারের পাশে এসবই নেহাত বেঁটে বামন ছাড়া কিছু নয়, কিছুটা হয়তো নম্বর পাবে ‘বরুণবাবুর বন্ধু’। একথা বোধহয় নিজেও অনুভব করেছিলেন পরিচালক। তাই সত্যজিৎ রায়ের জন্মশতবর্ষে (২০২২) ‘অপরাজিত’ নির্মাণের ভাবনা। প্রথম ছবি পরবর্তী ‘আঁতেল দর্শন’ ভাবনার ছবিগুলি থেকে বেরিয়ে এসে ‘মেকিং অফ পথের পাঁচালি’ তৈরি করলেন। এক সাক্ষাৎকারে অনীক বলেছিলেন, “সত্যজিৎ রায়ের ১০০ বছরে এ রকম একটা কিছু করব ভেবেছিলাম।”

প্রথম ছবি মুক্তির ঠিক এক দশক পর ‘অপরাজিত’ সাফল্য এনে দেয় অনীককে। বক্সঅফিস হিট তো বটেই, পাশাপাশি শিক্ষিত বাঙালির একাংশের পছন্দ হয়েছিল ছবিটি। চোখের সামনে সত্যজিৎ রায়কে ‘পথের পাঁচালি’ শুট করতে দেখে মুগ্ধ হন তাঁরা। অপু-দুর্গা, কাশবন, নিশ্চিন্দিপুরের বিনির্মাণে একালের বাঙালি তাঁর সোনালি অতীতকে খানিক চেখে দেখার সুযোগ পায়। হয়তো দুধের সাধ ঘোলে। তাই বা মেলে কই! এই কারণেই তরুণ মজুমদারের মতো ‘স্বর্ণযুগে’র পরিচালক ছবিটি দেখে আবেগবিহ্বল হন, ভূয়সী প্রশংসা করেন।

‘অপরাজিত’র পর ২০২৫ সালে অনীকের শেষ ছবি ‘যত কাণ্ড কলকাতায়’। মাত্র এক বছরেই সেই ছবি বিস্মৃতির অতলে। হয়তো কোনওদিন ফিরে দেখবে বাঙালি, বা দেখবে না। কিন্তু যতদিন বাংলা ভাষা থাকবে, বাঙালি সংস্কৃতি থাকবে, টিকে থাকবে বাংলা সিনেমা, ততদিন ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’কে কেউ ভুলতে পারবে না। ‘অপরাজিত’ ও ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’-এর বাইরে অনীকের বামপন্থী পরিচয়, নন্দন চত্বর থেকে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবি সরানো নিয়ে বিতর্ক, তাঁর ছবি নিয়ে ‘রাজনৈতিক জটিলতা’ এবং আচমকা অপঘাতে মৃত্যুর কথাই মনে রাখবে বাঙালি। ঠিক যেন সাড়ে চুয়াত্তরের নির্মল দে, সাহিত্যের অদ্বৈত মল্লবর্মণ। এক সৃষ্টিতে বাজিমাত! তবু, অনীক দত্তের এই অকালপ্রয়াণ কি মানা যায়!

একটি দৈনিক সংবাদপত্রে দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে পরিচালক বলেছিলেন, “জগদ্বিখ্যাত অনেক পরিচালককে দেখবেন, তাঁদের শেষের দিকে ছবিগুলি একই মানের হয় না। তাঁরা অসুস্থ হয়েছেন। তার ছাপ পড়েছে তাঁদের কাজে। খুব কম মানুষ আছেন, যাঁরা সময়ে থেমে যান।” সেই পথেই কি হাঁটলেন দীর্ঘদিন ধরে একাধিক অসুস্থতায় ভোগা ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’-এর পরিচালক! সময় থামছে না বুঝে নিজেই উদ্যোগী হয়ে সময়কে থামিয়ে দিলেন!  

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'ফুটবল বিশ্বযুদ্ধ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Advertisement

Share this article on

The article link is copied.