Advertisement
Advertisement
Advertisement
Sangbad Pratidin
  • ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৮ জুন ২০২৬
Hunger and Malnutrition

খিদে মিটবে সিধে পথে?

এই দেশে উৎপাদিত খাদ্যশস্যের ৪০ শতাংশ নষ্ট হয়।

Advertisement
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: নভেম্বর ২২, ২০২৫, ১১:৫৪

link
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: নভেম্বর ২২, ২০২৫, ১১:৫৪

options
link
খিদে মিটবে সিধে পথে? zoom

‘বিশ্ব ক্ষুধা সূচক’-এ ভারতের অবস্থান ২০২৫ সালে ১০২ (১২৩টি দেশের মধ্যে)। প্রশ্ন: শক্তিশালী কৃষিব্যবস্থা, পর্যাপ্ত খাদ্যভাণ্ডার ও খাদ্যশস্যে ‘সারপ্লাস’ দেশ হওয়া সত্ত্বেও কেন বছরের পর বছর ক্ষুধা ও অপুষ্টিতে পিছনের সারিতে থাকা দেশগুলির সঙ্গে পাল্লা দিতে হচ্ছে? লিখছেন গৌতম সরকার

অডিটোরিয়াম কানায় কানায় পূর্ণ। দর্শকাসনে উপবিষ্ট দেশ-বিদেশের মান্যগণ্য অতিথিবর্গ। প্রত্যেকে নিবিষ্ট হয়ে শুনছেন, বক্তা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তিনি বলে চলেছেন, ‘ভারতে এখন আর খাবারের কোনও অভাব নেই। দেশে খাবারের জোগান এখন চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি। এবার বিশ্বকে খাবার রফতানি করবে ভারত।’

Advertisement

গত বছর আগস্ট মাসে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণা– ‘ডেটা’ বা পরিসংখ্যানের বিচারে অযৌক্তিক বলার উপায় ছিল না। কারণ, ২০২৪ সালের হিসাবে, ওই বছর দুধ, পাট এবং ডাল উৎপাদনে ভারত ছিল বিশ্বে প্রথম। ধান, গম, চিনাবাদাম, আখ, ফল ও সবজি উৎপাদনে দ্বিতীয়। এছাড়াও ভারত বিশ্বের বৃহত্তম বাজরা উৎপাদনকারী দেশ। বিশ্বের মোট কৃষি উৎপাদনের ৭.৫ শতাংশ আসে ভারত থেকে। ২০২২-’২৩ আর্থিক বর্ষে কৃষি রফতানির পরিমাণ ছিল ৫৩.১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

ওই বছরেই ভারত থেকে কেবলমাত্র উৎকৃষ্ট চায়েরই রফতানি হয়েছে ২৫৭ মিলিয়ন কিলোগ্রাম। তাই সরকারের তরফে প্রধানমন্ত্রীর গলা তুলে নিজেদের জয়ঢাক বাজানোর যথেষ্ট সুযোগ ছিল, এবং তিনি ঝোপ বুঝে সেই কোপটা মেরে বিশ্ব রাজনীতিতে আপন ইমেজ বাড়িয়ে নিতে পেরেছিলেন। কারণ, সেদিন দর্শকাসন থেকে কেউ তঁার দিকে প্রশ্নগুলো ছুড়ে দেননি– খাদ্যশস্যে ‘সারপ্লাস’ দেশ হওয়া সত্ত্বেও বছরের পর বছর ‘বিশ্ব ক্ষুধা সূচক’-এ আপনার দেশ কেন পিছনের সারিতে থাকে? কেন চিকিৎসার এত উন্নতির পরও প্রতি বছর ২.১ শতাংশের বেশি নবজাতক শিশুমৃত্যু ঘটে? দেশের কত শতাংশ মানুষ দু’-বেলা পেটভরে খেতে পায়?

প্রশ্নগুলি সেই সমাবেশে উঠে আসেনি, তাই সেসব অস্বস্তিকর প্রশ্নের উত্তর দেওয়ারও কোনও দায়ভার প্রধানমন্ত্রীকে নিতে হয়নি। শুধু আমরা হতাশার অন্ধকারে দিক্‌ভ্রষ্ট হই– যখন আবার ‘ওয়ার্ল্ড হাঙ্গার ইনডেক্স’-এর হিসাব বেরয়, এবং জানতে পারি, ২০২৫ সালের ‘বিশ্ব ক্ষুধা সূচক’-এ ১২৭টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান হয়েছে ১০২। প্রতিবেশী প্রায় সমস্ত দেশ, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা আমাদের তুলনায় অনেক কম ক্ষুধার স্তরে অবস্থান করছে। অর্থাৎ সেই দেশগুলির সরকার তাদের জনগণকে অনেক বেশি খাদ্য এবং পুষ্টিতে নিরাপত্তা দিতে পারছে।

একদিকে প্রযুক্তির একের পর এক চমকে জীবনযাত্রার সংজ্ঞা বদলে যাচ্ছে, অন্যদিকে খাদ্যাভাব ও অপুষ্টি নিয়ে কিছু মানুষ চরম দারিদ্র‌র মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। এক পৃথিবীতে আয়ের ক্রমাগত বৃদ্ধি, উজ্জ্বল জীবন, বিনোদন ও ভোগের যুগলবন্দিতে জীবনের উপভোগ বঁাধনছাড়া; অন্য এক পৃথিবীতে যুদ্ধ, অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা, দুর্বল শাসনব্যবস্থা, সংঘাত, বাস্তুচ্যুতি, প্রাকৃতিক বিপর্যয় মানুষের বেঁচে থাকাকে অসহনীয় করে তুলেছে। তা না হলে ভাবা যায়, এই ২০২৫ সালে এসেও বিশ্বের প্রতি দশজন মানুষের মধ্যে একজন মানুষ অনাহারে দিন কাটায়। কত শিশু একবেলা ঠিকমতো খেতে পায় না! হিসাব বলছে, এই গ্রহে ৬৭ কোটি ৩০ লক্ষ মানুষ দীর্ঘস্থায়ী খিদে নিয়ে দিনাতিপাত করছেন।

সম্প্রতি, ২০২৫ সালের বিশ্ব ক্ষুধা সূচকে দেখা যাচ্ছে ক্ষুধার প্রশ্নে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা আফ্রিকা ও এশিয়ার দেশগুলির। এদের মধ্যে বেশ কয়েকটি দেশকে ‘উদ্বেগজনক’ বা ‘গুরুতর ক্ষুধার দেশ’ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে, এবং সূচকে তাদের স্কোর ৩১ থেকে ৪২.৬-এর মধ্যে। তালিকায় সবচেয়ে বেশি ক্ষুধার্ত দেশের মধ্যে প্রথম দশে স্থান করে নিয়েছে– সোমালিয়া (৪২.৬), সাউথ সুদান (৩৭.৫), ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অফ কঙ্গো (৩৭.৫), মাদাগাস্কার (৩৫.৮), হাইতি (৩৫.৭), চাদ (৩৪.৮), নাইজার (৩৩.৯), সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক (৩৩.৪), নাইজিরিয়া (৩২.৮)।

ভারতের অবস্থানও যথেষ্ট উদ্বেগজনক, তালিকায় স্থান হয়েছে ১০২ নম্বরে, স্কোর ২৫.৮। বিশেষজ্ঞদের মতে, আফ্রিকার দেশগুলির এই গণদারিদ্রের ভিন্ন-ভিন্ন কারণ থাকলেও মূল কারণগুলি হল চলমান সংঘাত, প্রাকৃতিক বিপর্যয় এবং বাস্তুচ্যুতি, যে বিষয়গুলো শুধু মানুষের খাদ্যের অভাবই ঘটায় না, চাষাবাদ প্রক্রিয়া এবং ক্রয়ক্ষমতার উপরও থাবা বসায়।
বিশ্ব ক্ষুধা সূচকে ভারতের অবস্থান কী? ২০২৪ সালের বিশ্ব ক্ষুধা সূচকের মাপকাঠিতে ভারতের স্থান ছিল ১০৫ (১২৭টি দেশের মধ্যে), ২০২৫ সালে হয়েছে ১০২ (১২৩টি দেশের মধ্যে)। স্কোর ২৭.৩ থেকে হয়েছে ২৫.৮। কেন হল এই অবস্থা! শক্তিশালী কৃষিব্যবস্থা ও যথেষ্ট খাদ্যভাণ্ডার থাকা সত্ত্বেও কেন দেশ বছরের পর বছর ক্ষুধা ও অপুষ্টিতে পিছনের সারিতে থাকা দেশগুলির সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে?

বিশেষজ্ঞরা এই অসম দারিদ্রের নেপথ্যে যেসব কারণ খুঁজে পেয়েছেন সেগুলি হল– খাদ্যের অসম বণ্টন, শিশুমৃত্যু, শিশুদের অপুষ্টি ও অস্বাস্থ্যকর শৌচব্যবস্থা। এছাড়া জনসংখ্যার আধিক্য এবং গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের বিভিন্ন প্রদেশের পরিচালন ব্যবস্থার অসাম্য যে খাদ্য উৎপাদনের প্রবল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও খাদ্য নিরাপত্তা ও সামগ্রিক পুষ্টি সরবরাহের শৃঙ্খলে বড় রকমের চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে, যেটা খুব স্পষ্টভাবে ‘ওয়ার্ল্ড হাঙ্গার ইনডেক্স’-এ প্রতিফলিত হয়েছে।

ভারতে ‘জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইন, ২০১৩’ ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য ছিল গ্রামীণ জনসংখ্যার ৭৫ শতাংশ এবং শহরের জনসংখ্যার ৫০ শতাংশ মানুষের জন্য গণবণ্টন ব্যবস্থার মাধ্যমে ভরতুকিযুক্ত খাদ্যশস্য সরবরাহ করা। এই ব্যবস্থায় দেশের ৮০ কোটি মানুষকে রেশনের মাধ্যমে বিনামূল্যে চাল-গম দেওয়া হয়। অন্যদিকে, ‘ফুড সেফটি অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ডস অথরিটি অফ ইন্ডিয়া’ প্রকল্পের মাধ্যমে মানুষের জন্য নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর খাদ্যের জোগান নিশ্চিত করা ছিল সরকারের দারিদ্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের আর-একটি অস্ত্র। স্কুলস্তরে চালু রয়েছে ‘মিড ডে মিল’ প্রকল্প। এরপরও তথ্য বলছে– দেশের ১৪.৭ শতাংশ মানুষ অপুষ্টির শিকার, তার মধ্যে শিশুর সংখ‌্যা ৩৫.৫ শতাংশ। ২.১ শতাংশ শিশু জন্মের ৫ বছরের মধ্যে মারা যায়, ২৭.৭ শতাংশ শিশু কম ওজন নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। শিশুদের মধ্যে স্টান্টিংয়ের (বয়সের তুলনায় উচ্চতা কম) হার ৩৫.৫ শতাংশ, এবং ওয়েস্টিংয়ের (উচ্চতার তুলনায় ওজন কম) শতকরা হার ১৮.৭ শতাংশ। পঞ্চাশের কমবয়সি মহিলাদের ৫৩ শতাংশ রক্তাল্পতায় ভোগে। সুতরাং প্রকল্প ও তার রূপায়ণের মধ্যে এই বিস্তর ফারাকের জবাবদিহি তো প্রধানমন্ত্রীকেই করতে হবে!

দেশের মানুষের ক্ষুধা মেটাতে গেলে শুধু উৎপাদন বাড়ালেই চলবে না, এবং সেই উৎপাদন বৃদ্ধির ঢক্কানিনাদে সাময়িকভাবে কোনও এক সমাবেশে হাততালি পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু শস্যের সঠিক এবং সুষম বণ্টন না-হলে, দেশের সমস্ত মানুষের কাছে সেই উৎপাদনের সুবিধা পৌঁছে দিতে না-পারলে উৎপাদন আর ক্ষুধার মধ্যে শত সহস্র যোজন দূরত্ব থেকেই যাবে। ভাবতে অবাক লাগে, সুষ্ঠু সংরক্ষণ ও বণ্টনের অভাবে এই দেশে উৎপাদিত খাদ্যশস্যের ৪০ শতাংশ নষ্ট হয়। তাই খাদ্যশস্য উৎপাদনে পৃথিবীর প্রথম সারির দেশ হয়েও এবং বিপুল খাদ্যভাণ্ডার থাকা সত্ত্বেও দেশের বহু মানুষ দু’-বেলা খেতে পায় না। এর জবাব প্রধানমন্ত্রী আপনাকেই দিতে হবে কিন্তু! সব সমাবেশে সুধী জনতা ও শ্রোতৃবর্গ থাকবে না, কোনও একদিন দর্শকমণ্ডলী থেকে কেউ একজন দঁাড়িয়ে উঠে আঙুল তুলে প্রশ্ন করতেই পারে, ‘রাজা তোর কাপড় কোথায়?’

(মতামত নিজস্ব)

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Advertisement

Share this article on

The article link is copied.