গত শতকের পাঁচের দশকে দেশভাগ, অর্থনৈতিক সংকট ও পরিচয়হীনতায় ভোগা বাঙালি সমাজ যেমন উত্তমকুমারের (Uttam Kumar) মধ্যে আশার আলো ও সাংস্কৃতিক আশ্রয় খুঁজে পেয়েছিল। আবার এ যুগেও তাঁর অভিনয়শৈলী এবং অভিনয়-রীতির ব্যাকরণ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
বাঙালি যৌথচেতনায় কিছু ‘নাম’ কেবল ব্যক্তির পরিচয়ে সীমাবদ্ধ থাকে না; তারা পরিণত হয় মিথ এবং সংস্কৃতির এক-একটি চিরন্তন প্রতীকে। ১৯২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ভবানীপুরের গিরীশ মুখার্জি রোডের যৌথ পরিবারে যাঁর জন্ম হয়েছিল ‘অরুণকুমার চট্টোপাধ্যায়’ নামে, তিনি যে পরবর্তীতে বাংলা চলচ্চিত্রের অবিসংবাদিত ‘মহানায়ক’ হয়ে উঠবেন, তা হয়তো তৎকালীন সমাজ-বাস্তবতায় অতি কল্পনা বলেই মনে হত।
২০২৬ সালে, যখন আমরা তাঁর জন্মশতবর্ষ উদ্যাপন করছি, তখন বর্তমান ভারত ও পশ্চিমবঙ্গের সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটটি অত্যন্ত জটিল ও অস্থির। তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণ, পরিচয়সত্তার উগ্র রাজনীতি, সাংস্কৃতিক অবক্ষয় এবং নাগরিক চেতনার বিভ্রান্তির এই যুগে প্রশ্ন ওঠে– সাড়ে চার দশক আগে প্রয়াত একজন অভিনেতা কেন এখনও বাঙালির কাছে সমান প্রাতিষ্ঠানিক ও আবেগীয় গুরুত্ব বহন করেন?
উত্তমকুমারকে ঘিরে গড়ে ওঠা রোম্যান্টিক মিথ এবং ‘মহানায়ক’ ইমেজের আতিশয্যে তাঁর ভিতরের প্রথাবিরোধী অভিনেতার বিশ্লেষণাত্মক মূল্যায়ন অনেক সময়ই ঢাকা পড়ে যায়। গত শতকের পাঁচের দশকে দেশভাগ, অর্থনৈতিক সংকট ও পরিচয়হীনতায় ভোগা বাঙালি সমাজ যেমন উত্তমকুমারের মধ্যে এক ধরনের আশার আলো ও সাংস্কৃতিক আশ্রয় খুঁজে পেয়েছিল, তেমনই হালের বিভ্রান্তিকর সামাজিক কোলাহলের যুগেও তাঁর অভিনয়শৈলী এবং অভিনয়-রীতির ব্যাকরণ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
উত্তমকুমারকে ঘিরে গড়ে ওঠা রোম্যান্টিক মিথ এবং ‘মহানায়ক’ ইমেজের আতিশয্যে তাঁর ভিতরের প্রথাবিরোধী অভিনেতার বিশ্লেষণাত্মক মূল্যায়ন অনেক সময়ই ঢাকা পড়ে যায়।
মূল প্রশ্নটি এখানেই: থিয়েটারের অতি-নাটকীয়তা ভেঙে উত্তমকুমার কীভাবে সিনেমার ‘আন্ডারস্টেটমেন্ট’ বা স্বাভাবিকতায় রূপান্তর করেছিলেন, অথচ দেহাভিনয় ও পোশাকের নান্দনিকতা দিয়ে নাটকেরই ড্রামাটিক স্ট্রাকচার ধরে রেখেছিলেন? ‘উত্তমকুমার’ নামক অভিনয় প্রতিষ্ঠানটিকে অনুধাবন করতে হলে কেবল তাঁর জনপ্রিয় ছবির বাণিজ্যিক ইতিহাস বা রোম্যান্টিক ইমেজের উপর ভেসে থাকলে চলবে না; প্রয়োজন অভিনয়-ব্যাকরণের একটি বহুমুখী, গভীর ব্যবচ্ছেদ। কয়েকটি নির্দিষ্ট ‘অক্ষ’ বা ডায়ামেনশনে বিশ্লেষণ আবশ্যিক–

বাচনভঙ্গি, সুরের কারুকাজ
থিয়েটারের ‘স্টেজ প্রোজেকশন’-এর উচ্চকিত বাচনভঙ্গি ভেঙে তিনি সিনেমায় নিয়ে আসেন ‘মাইক্রো-পজ’ ও শ্বাসের খেলা। সংলাপে প্রথাগত ‘ফুলস্টপ’ বা ‘কমা’-র বাইরে গিয়ে ডায়ালগের মাঝখানে থেমে যাওয়া, একটি দীর্ঘশ্বাস বা মৃদু হাসির সাহায্যে এক ধরনের ‘ইন্টিমেট টোন’ তৈরি করতেন। ‘বিচারক’ বা ‘নায়ক’-এ স্বর খাদে নামিয়ে তাঁর সংলাপ উচ্চারণ– প্রথাগত নাটকীয়তাকে ভেঙে খাঁটি সিনেমার ব্যাকরণ তৈরি করেছিল।
২০২৬ সালে, যখন আমরা তাঁর জন্মশতবর্ষ উদ্যাপন করছি, তখন বর্তমান ভারত ও পশ্চিমবঙ্গের সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটটি অত্যন্ত জটিল ও অস্থির।
কাইনেসিক্স ও শরীরী ভাষা
থিয়েটারের রৈখিক হাঁটাচলার বিপরীতে সিনেমায় তিনি নিয়ে আসেন এক স্বতঃস্ফূর্ত ছন্দ। ‘দ্য উত্তম ওয়াক’-এর মধ্যে ছিল স্বাভাবিক রাজকীয়তা ও আত্মবিশ্বাসের দোলা, যা তৎকালীন ধুতি-পাঞ্জাবি পরা বাঙালি মধ্যবিত্ত পুরুষত্বকে এক নতুন মাত্রা দেয়। ‘ঝিন্দের বন্দী’ বা ‘সপ্তপদী’-তে পুরো শরীরকে বাদ্যযন্ত্রের মতো ব্যবহার করা বা ‘নায়ক’-এ চেনা ভঙ্গিতে সিগারেট ধরানোর দৃশ্যগুলি কেবল অভিনয়ের অনুষঙ্গ ছিল না; তা ছিল অরিন্দম মুখার্জির সামাজিক আভিজাত্য ও ভিতরের নিঃসঙ্গতাকে উন্মোচনের একেকটি ‘চাক্ষুষ রূপক’।
পোশাকের সিমিওটিক্স
একপাশে ভাঁজ করা শাল ও ধুতি-পাঞ্জাবি পরার স্টাইল দিয়ে তিনি উত্তর-ঔপনিবেশিক কলকাতায় ‘আদর্শ ভদ্রলোক’-এর যে-ইমেজ তৈরি করেছিলেন, তা উত্তর-স্বাধীন ভারতের সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের প্রতীক হয়ে ওঠে। আবার ‘সপ্তপদী’ বা ‘নায়ক’-এ ওয়েস্টার্ন স্যুট বহন করার ভঙ্গি প্রমাণ করেছিল যে, পোশাক অভিনেতাকে গ্রাস করবে না, বরং অভিনেতা পোশাককে চরিত্রায়নের হাতিয়ার বানাবেন।
যৌথ অভিনয়ের রসায়ন
সহ-অভিনেত্রীর ধরন বুঝে তিনি নিজের অভিনয় সামঞ্জস্য করতেন। সুচিত্রা সেনের শক্তিশালী স্ক্রিন প্রেজেন্সের বিপরীতে নিজের অভিনয় কিছুটা সংযত করে তিনি পর্দায় দুর্লভ ভারসাম্য আনতেন। সুপ্রিয়া দেবীর সঙ্গে পার্থিব বাস্তবতার সংবেদনশীলতা (‘স্ত্রী’), মাধবী মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে অসামান্য আন্ডারস্টেটমেন্ট (‘শঙ্খবেলা’) এবং সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ের প্রখর থিয়েট্রিকাল টাইমিংয়ের সঙ্গে রোম্যান্টিক-কমেডির মেজাজ তৈরি করা– সবই তাঁর অভিনয়ের অনন্য নমনীয়তার প্রমাণ।
‘ঝিন্দের বন্দী’ বা ‘সপ্তপদী’-তে পুরো শরীরকে বাদ্যযন্ত্রের মতো ব্যবহার করা বা ‘নায়ক’-এ চেনা ভঙ্গিতে সিগারেট ধরানোর দৃশ্যগুলি কেবল অভিনয়ের অনুষঙ্গ ছিল না; তা ছিল অরিন্দম মুখার্জির সামাজিক আভিজাত্য ও ভিতরের নিঃসঙ্গতাকে উন্মোচনের একেকটি ‘চাক্ষুষ রূপক’।
থিয়েটারের পুনর্নির্মাণ ও ‘ওথেলো’
‘সপ্তপদী’-তে (১৯৬১) শেক্সপিয়রের ‘ওথেলো’ নাটকের দৃশ্যে তিনি একই সঙ্গে কৃষ্ণেন্দু, ওথেলোর অভিনেতা, এবং রিনা ব্রাউনের প্রেমিক– এই ত্রিস্তরীয় মনস্তাত্ত্বিক সংঘাত ফুটিয়ে তুলেছিলেন। ভিক্টোরিয়ান থিয়েটারের সংলাপ উচ্চারণের সঙ্গে চোখের ক্লোজ-আপে যে মানসিক টানাপোড়েন তিনি সৃষ্টি করেছিলেন, তা তৎকালীন ভারতীয় সিনেমায় বিরল।
‘মেথড অ্যাক্টিং’ ও দেশীয় প্রয়োগ কোনও প্রথাগত অ্যাক্টিং স্কুলে না গিয়েও বাস্তব জীবন পর্যবেক্ষণ করে তিনি ‘মেথড অ্যাক্টিং’-এর এক অনন্য দেশীয় রূপ দেন। সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’-এ অরিন্দম মুখার্জির অন্তর্লীন বিষণ্ণতা ও মানসিক ক্ষয় প্রকাশ কিংবা মৃণাল সেনের আধুনিক চলচ্চিত্র ভাবনার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করা প্রমাণ করে যে, তিনি কেবল বাণিজ্যিক স্টারডমে আটকে না-থেকে নতুন যুগের আধুনিক সিনেমার পথপ্রদর্শক হতে চেয়েছিলেন।
এখনকার ভারত ও পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার দিকে তাকালে দেখা যায়– সংস্কৃতিতে আগ্রাসী মেরুকরণ, অসহিষ্ণুতা এবং কৃত্রিম কোলাহলের দাপট বাড়ছে। মানুষের মেলবন্ধন এবং সামাজিক সৌহার্দ্য যখন প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জের মুখে, তখন উত্তমকুমারের শিল্পের দিকে ফিরে তাকানো কেবল অতীত-কাতরতা নয়; বরং তা আমাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক শিকড় ও উদার মানবিকতাবোধকে নতুন করে আবিষ্কার করার সংগ্রাম। বিভাজিত সমাজবাস্তবতায় উত্তমকুমার ছিলেন সেই সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনকারী শক্তি, যিনি তাঁর পরিশীলিত বাচনভঙ্গি ও শালীন দেহাভিনয় দিয়ে এক সর্বজনীন ও প্রগতিশীল ‘বাঙালি ভদ্রলোক’ চেতনাকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন।
এখনকার ওটিটি, রিয়েলিস্টিক থিয়েটার ও আধুনিক ডিজিটাল সিনেমার যুগে দাঁড়িয়ে– যেখানে ‘ন্যাচারাল অ্যাক্টিং’-এর চর্চা নিয়ে নতুন করে গবেষণা হচ্ছে– সেখানে পাঁচ দশক আগেই উত্তমকুমার তাঁর হাঁটাচলা, সংলাপ এবং চোখের ভাষায় সেই মাইলফলক স্পর্শ করে গিয়েছেন। বর্তমান প্রজন্মের নাট্যমঞ্চ ও চলচ্চিত্র অভিনয়-শিল্পীদের জন্য উত্তমকুমার তাই কেবল স্মৃতির অ্যালবাম নন, তিনি অভিনয়বিদ্যার এক জীবন্ত পাঠশালা।
কৌশল ও প্রযুক্তির মারপ্যাঁচে অভিনয় যখন মাঝেমধ্যে প্রাণহীন হয়ে পড়ে, কিংবা সামাজিক অস্থিরতায় সংস্কৃতি পথ হারায়, তখন উত্তমকুমারের সেই সংযম, চোখ ও গলার সূক্ষ্ম মডিউলেশন এবং চরিত্রের গভীরে প্রবেশের ব্যাকরণই হতে পারে নতুন অভিনেতাদের মূল নির্দেশিকা। জন্মশতবর্ষের এই ঐতিহাসিক লগ্নে দাঁড়িয়ে বাংলা সংস্কৃতির এই কালজয়ী পথিকৃৎ ও মহানায়কের প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা। থিয়েটারের মঞ্চ থেকে সেলুলয়েডের রাজত্ব– তিনি ছিলেন, আছেন, বাঙালির সাংস্কৃতিক ভাবনায় অমলিন থাকবেন।
(মতামত নিজস্ব)
সর্বশেষ খবর
-
সময় বদলালেও টিকে থাকবে বন্ধুত্ব, সম্পর্ক অটুট রাখতে মেনে চলুন এই ৫ উপায়
-
উইপ্রো, টাটা গ্রুপে হাজার হাজার চাকরির সুযোগ! রাজ্যে প্রথমবার ‘কৌশল মহোৎসব’
-
জাতীয় পুরস্কার পেয়েই প্রযোজকের ভূমিকায় কার্তিক আরিয়ান, কার বায়োপিক দিয়ে হাতেখড়ি?
-
স্বাধীনতা দিবসে ধর্মীয় স্লোগান সংখ্যালঘু ছাত্রীদের! ভিডিও ভাইরাল হতে সাফাই, ‘লাড্ডু খেতে এসেছিলাম’
-
জাদেজার উত্তরসূরি পেয়ে গেল ভারত! শ্রীলঙ্কার কোমর ভেঙে সুথার কৃতিত্ব দিলেন জাড্ডুকেই