পরিবারের কোনও সদস্য মারা গেলে তার স্মৃতিতে একটি গাছ রোপণ করার রীতি জনজাতি সমাজে বহু দিন ধরে প্রচলিত। শুধু মায়ের নামে নয়– বাবা, দাদু, দিদা যে কারও নামে বৃক্ষরোপণ করা হয়। এ প্রথায় নিহিত রয়েছে স্মৃতির আগ্নেয়গিরি ও সুদূরপ্রসারী পরিবেশ-দর্শন। লিখলেন অভিমন্যু মাহাত।
একটি গাছ, একটি প্রাণ। বাস্তবে একটি গাছ, অনেক প্রাণ। ভুবন জুড়ে ছড়িয়ে আছে তার অস্তিত্ব, কুহক, শরীরী ঘ্রাণ। তা সত্ত্বেও গাছের দেহে যে প্রাণ আছে, তার অকুণ্ঠ স্বীকৃতি দিতে বোধ করি রাজি নই আমরা। সেজন্য গাছের প্রাণস্পন্দনকে প্রায়ই অলীক ও অবিশ্বাস্য মনে হয় আমাদের! এমতাবস্থায়, এই বছর বিশ্ব পরিবেশ দিবসে, ‘মায়ের নামে একটি গাছ’ রোপণের আহ্বান জানিয়েছে রাজ্য সরকারের নব কর্মসূচি। পরিবেশ সচেতনতার ইতিবাচক বার্তা। তবে যে-ভাবনাকে রাষ্ট্র নতুন সামাজিক অভিযানের রূপ দিচ্ছে, সেই চিন্তার বীজ বহু শতাব্দী আগেই জনজাতির সমাজজীবনে রোপিত।
মূলধারার ইতিহাসচর্চা জনজাতি সমাজকে প্রান্তিক, অনগ্রসর কিংবা ‘অসভ্য’ সম্প্রদায় রূপে দাগিয়ে দিয়েছে। অথচ প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের যে নৈতিকতা এখন আন্তর্জাতিক পরিবেশ রাজনীতির অন্যতম আলোচিত বিষয়, তার বাস্তব প্রয়োগ এই জনজাতি সমাজ আদিকাল থেকেই করে এসেছে। পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা বা ছত্তীসগড়ের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বসবাসকারী কুড়মি-সহ বিভিন্ন জনজাতির মধ্যে এখনও এই রীতি প্রচলিত– পরিবারের কোনও সদস্য মারা গেলে তার স্মৃতিতে একটি গাছ রোপণ করা। শুধু মায়ের নামে নয়– বাবা, দাদু, দিদিমা কিংবা পরিবারের অন্য যে কোনও প্রয়াত সদস্যের নামেও বৃক্ষরোপণ করা হয়।
এই রীতির মধ্যে একদিকে যেমন রয়েছে স্মৃতির আগ্নেয়গিরি, অন্যদিকে নিহিত সুদূরপ্রসারী পরিবেশ-দর্শন।
মূলধারার ইতিহাসচর্চা জনজাতি সমাজকে প্রান্তিক, অনগ্রসর কিংবা ‘অসভ্য’ সম্প্রদায় রূপে দাগিয়ে দিয়েছে। অথচ প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের যে নৈতিকতা, তার বাস্তব প্রয়োগ জনজাতি সমাজ আদিকাল থেকেই করে এসেছে।
কুড়মি জনজাতির মানুষের মধ্যে বিশেষভাবে দেখা যায় মায়ের নামে ‘আম গাছ’ রোপণের প্রথা। আম গাছ এখানে কেবল ফলবতী বৃক্ষ নয়– তা মাতৃত্ব, আশ্রয়, প্রজন্মের ধারাবাহিকতার প্রতীক। বাবার নামে ‘শাল’, ‘সেগুন’, ‘মহুয়া’ প্রভৃতি বৃক্ষ রোপণ করা হয়, যেগুলি শক্তি, স্থায়িত্ব ও সামাজিক অস্তিত্বের প্রতীক। শুধু মৃত আত্মীয়ের নামে বৃক্ষরোপণ নয়, গাছকে বিয়ে করার রীতিও বহুকাল ধরে প্রচলিত কুড়মি জনজাতির সামাজিক তন্তুতে। ফলে গাছ এখানে নিছক প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, তা হয়ে ওঠে পারিবারিক ইতিহাস, আবেগ, এবং সাংস্কৃতিক স্মৃতির জীবন্ত ধারক। এ রীতির মধ্যে এমন এক মনস্তাত্ত্বিক বোধ কাজ করে, যা আধুনিক পরিবেশ আন্দোলনের বহু তত্ত্বকে সহজে অতিক্রম করে যায়।
জনজাতি সমাজের পূর্বপুরুষরা হয়তো জলবায়ু পরিবর্তন, কার্বন নিঃসরণ কিংবা বিশ্ব উষ্ণায়নের মতো কড়া কড়া বৈজ্ঞানিক পরিভাষা জানত না। কিন্তু তারা জানত, মানুষের বেঁচে থাকার জন্য গাছ অপরিহার্য। তারা উপলব্ধি করেছিল, একদিন বনভূমি কমে যাবে, গাছের সংখ্যা হ্রাস পাবে, আর তখন প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্ক বিপন্ন হয়ে উঠবে। সেই কারণেই গাছগাছালিকে কেবল অর্থনৈতিক সম্পদ রূপে দেখেনি তারা। বরং আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ করেছিলেন। তারা বুঝতে পেরেছিল অব্যর্থ: একটি গাছ যদি মায়ের স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকে, তবে সেই গাছ আর কেবল কাঠের সম্ভাব্য বাজারমূল্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না।
গাছ এখানে নিছক প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, তা হয়ে ওঠে পারিবারিক ইতিহাস, আবেগ, এবং সাংস্কৃতিক স্মৃতির জীবন্ত ধারক।
তা হয়ে উঠবে আবেগের উত্তরাধিকার। ফলে পরবর্তী প্রজন্ম সহজে সেই গাছ কাটতে চাইবে না। বরং গাছটিকে রক্ষা করাকে নৈতিক দায়িত্ব বলে মনে করবে। আধুনিক পরিবেশ আইন যেখানে শাস্তি ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বন রক্ষার চেষ্টা করে, সেখানে আদিবাসী সমাজ আবেগ, সংস্কৃতি এবং স্মৃতির মাধ্যমে প্রকৃতিকে সংরক্ষণের পথ নির্মাণ করেছিল।
এই রীতির আরও একটি সাংস্কৃতিক তাৎপর্য রয়েছে। দ্রুত নগরায়নের যুগে মানুষ ক্রমশ শিকড়হীন হয়ে পড়ছে। যৌথ পরিবার ভেঙে যাচ্ছে, পূর্বপুরুষের স্মৃতি মুছে যাচ্ছে, সম্পর্ক ক্রমশ যান্ত্রিক ও ভার্চুয়াল হয়ে উঠছে। এই পরিস্থিতিতে একটি গাছ, যার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মা বা বাবার স্মৃতি, সেই গাছ হয়ে ওঠে পারিবারিক ইতিহাসের জ্যান্ত স্মারক। সেই গাছের ছায়ায় দঁাড়ালে মানুষ শুধু প্রকৃতির সান্নিধ্যই অনুভব করে না, ফিরে যায় আপনজনের স্মৃতিতেও। অর্থাৎ, বৃক্ষ এখানে পরিবেশের রক্ষক হওয়ার পাশাপাশি আত্মীক সম্পর্কেরও ধারক হয়ে ওঠে।
‘শিক্ষিত’ সমাজ জনজাতির সংস্কৃতিকে ‘লোক’ তকমা দিয়ে সীমাবদ্ধ রেখেছে। অথচ, এখন বিশ্বের পরিবেশবিদরা যে ‘সাস্টেইনেবল লিভিং’, ‘কমিউনিটি ফরেস্ট ম্যানেজমেন্ট’ কিংবা ‘ইকোলজিক্যাল হারমনি’-র কথা বলছেন, তার বাস্তব রূপ জনজাতিরা অনাদি অনন্ত কাল থেকেই স্বীয় জীবনচর্চার মধ্যে প্রতিষ্ঠা করেছিল। ফলে জনজাতি সংস্কৃতিকে আর করুণা কিংবা লোকসংস্কৃতির প্রদর্শনী রূপে দেখার প্রেক্ষিতটিকে বদলানো দরকার। বরং প্রয়োজন তাদের জীবনদর্শনকে ভবিষ্যতের পরিবেশ নীতির অন্যতম ভিত্তি হিসাবে পুনর্মূল্যায়ন করা।
এখন ‘উন্নয়ন’ আর ‘বনভূমি ধ্বংস’ যেন-বা সমার্থক! অভিযোগ, পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়ে টুর্গা প্রকল্পে পূর্বতন রাজ্য সরকার কয়েক লক্ষ গাছ কাটার পক্ষে ছিল। এই লক্ষ লক্ষ বৃক্ষনিধনের প্রতিবাদে আন্দোলন হয়েছে। অভিযোগ, সেই আন্দোলনে দমনপীড়ন চালানো হয়। অনেক আন্দোলনকারীর জেল হয়। এমনকী অভিযোগ রয়েছে, মিথ্যা মামলা দায়ের করার। আরও অভিযোগ, বীরভূমের দেউচা পঁাচামি কয়লাখনি প্রকল্পের স্বার্থে বৃক্ষনিধন চলেছে।
২০০৬ সালের ‘অরণ্য অধিকার আইন’ এখনও সঠিক পদ্ধতি মেনে লাগু হয়নি। বনজ-ভাবনা, পরিবেশ-ভাবনা দৃশ্যমান কেবল উপন্যাস আর রাজনৈতিক পরিকল্পনায়। বাস্তবে তার প্রতিফলন কতটুকু দেখতে পাই? আদিবাসীরা বুকের পঁাজরে আগুন পোষে। তাদের সংস্কৃতিই তাদের ইতিহাস, প্রামাণ্য বই। জীবনযাপনেই প্রজ্জ্বল তাদের সংগ্রামের ইতিবৃত্ত। জনজাতি সমাজের প্রতিনিধি রূপে তাই মনে করি– ‘মায়ের নামে একটি গাছ’ কর্মসূচিটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয়, এ তবে প্রকল্পের প্রকৃত সাফল্য আসবে, যখন এটি কেবল সরকারি আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং সাধারণ মানুষের আবেগ ও সামাজিক চেতনার অংশ হয়ে উঠবে। বৃক্ষরোপণ যত সহজ, বৃক্ষকে বঁাচিয়ে রাখা তার চেয়ে অনেক কঠিন। সেই দায়বদ্ধতা সৃষ্টি করতে হলে মানুষকে প্রকৃতির সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। আর, সেই শিক্ষা জনজাতি সমাজ বহু আগেই দিয়ে রেখেছে। এবং যা পরীক্ষিত।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
‘বুঝেছেন ভুল সিঁড়িতে পা পড়েছে’, কোয়েলের পদত্যাগে মন্তব্য় রুদ্রনীলের, উঠল ডিম প্রসঙ্গও!
-
টি-২০ অধিনায়ক হতেই মুম্বইয়ে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ভাড়া নিলেন শ্রেয়স, প্রতি মাসে কত খসবে?
-
সুযোগ পেলেই নাবালক-নাবালিকাদের যৌন হেনস্তা তরুণীর! কুকর্মের বিরুদ্ধে দায়ের মামলা
-
‘ওর জন্য লোকে চোর বলছে’, বলেছিলেন কল্যাণ, ২৪ ঘণ্টা পর মুখ খুললেন অভিষেক
-
‘খারাপ ঘটনা’, হরমুজে ভারতীয় জাহাজে হামলায় ইরানের উপর দোষ চাপালেন ট্রাম্প