‘লেখক’ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বিভায় ঢাকা পড়ে গিয়েছে ‘সম্পাদক’ শরৎচন্দ্র। ১৩১৯ বঙ্গাব্দের পর থেকেই তিনি ‘যমুনা’ পত্রিকার সম্পাদক ফণীন্দ্রনাথ পালকে পত্রিকা সম্পাদনায় সাহায্য করতে শুরু করেন। ২ বছর পরে এই পত্রিকার অন্যতম সম্পাদক রূপে তাঁর নাম ছাপা হতে থাকে। ‘রূপ ও রঙ্গ’ নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকার যুগ্ম-সম্পাদকও হয়েছিলেন পরে। লিখছেন মানস ভট্টাচার্য।
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সাহিত্যজীবনকে মোটামুটি দেবানন্দপুর-ভাগলপুর, ব্রহ্মদেশ ও হাওড়া–কলকাতা এই তিনটি পর্যায়ে ভাগ করা যায়। ভাগলপুরের ছোট সাহিত্যগোষ্ঠী কেন্দ্র করে ‘সম্পাদক’ শরৎচন্দ্রের আবির্ভাব। সমমনস্ক বন্ধুদের নিয়ে ‘সাহিত্য-চক্র’ গড়ে শুরু করেছিলেন সম্পাদনার কাজ। অল্প বয়সেই ‘কুঁড়ি সাহিত্যিক’ সাহিত্যসভার আয়োজনের মাধ্যমে হাতে লেখা পত্রিকা ‘ছায়া’ সম্পাদনায় সহযোগিতা করেন বাল্যবন্ধু গিরীনকে।
প্রতিটি শুরুরও একটি শুরু থাকে, তা অবশ্য হয়েছিল দেবানন্দপুরে। ছোট থেকে প্রতি সন্ধেয় নিয়ম করে ঠাকুমার কাছে শুনতেন রামায়ণ-মহাভারতের গল্প, আর বাবার লেখার
ঘরের খাতাগুলির প্রতি ছিল তাঁর অমোঘ আকর্ষণ। মাসি কুসুমকামিনীদেবীর কাছে ‘কপালকুণ্ডলা’ গল্প শুনে শরৎচন্দ্রের মনে হয়েছে, ‘নবকুমারকে কাপালিক কি কেটে ফেলবে?’ তারপরে নিজেই ভাবলেন, ‘কেটে ফেললেই তো গল্প শেষ হয়ে যাবে। ও কাটবে না।’ এই যে গল্পের ঘটনা পারম্পর্য বিচার ও বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা তা তাঁর সম্পাদক সত্তার বহিঃপ্রকাশ। যে-সত্তার নেপথ্যে তাঁর বাবার অবদান ছিল সবথেকে বেশি।
উত্তরাধিকারসূত্রে যে গভীর সাহিত্যানুরাগ পেয়েছিলেন সেই স্বভাবধর্মে তাঁর বাবার অসমাপ্ত লেখাগুলির সমাপ্তি কীরকম হতে পারে তা শরৎচন্দ্রকে আজীবন ভাবিয়েছিল। গ্রামের জমিদারমশাই তাঁকে মাঝেমধ্যে কলকাতায় থিয়েটার দেখিয়ে বিষয়বস্তুটিকে গল্পাকারে লিখে দিতে বলতেন, এবং এই কাজের জন্য তিনি শরৎচন্দ্রকে আর্থিক পুরস্কারও দিতেন। শরৎচন্দ্রের প্রথম-জীবনের এই সমস্ত টুকরো টুকরো ঘটনা তাঁকে সম্পাদনার বিষয়ে আগ্রহী করেছিল। যার মধ্য দিয়ে খুব অল্প বয়সে তৈরি হয়েছিল অন্যের সাহিত্য-সৃষ্টির মূল্যায়নের নিজস্ব ক্ষমতা।
পত্রিকার সম্পাদককে নির্দ্বিধায় জানিয়েছেন, পত্রিকাতে লেখাগুলির মধ্যে এমন একটা জিনিস নিয়মিত থাকা দরকার– যার জন্য গ্রাহকদের মনে সেই পত্রিকা সম্বন্ধে আশা জাগবে, দরকার সঠিক ‘রিভিউ’-এর।
‘বাল্যস্মৃতি’ প্রবন্ধে শরৎচন্দ্র লিখেছেন, ভাগলপুরে তাঁদের সাহিত্য-সভায় গিরীন ছিলেন একাধারে সাহিত্যসভার সম্পাদক, সাহিত্যসভার মুখপত্র ‘ছায়া’-র সম্পাদক, এবং ‘অঙ্গুলী-যন্ত্র’ পত্রিকার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। এই সভা পরিচালনা ও পত্রিকার সম্পাদনার কাজে শরৎচন্দ্র তাঁর বন্ধু, সম্পাদক গিরীনকে সাহায্য করতেন। ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় শরৎচন্দ্রের জীবনীতে দেখিয়েছেন– ১৩১৯ বঙ্গাব্দের পর থেকেই শরৎচন্দ্র ‘যমুনা’ পত্রিকার সম্পাদক ফণীন্দ্রনাথ পালকে পত্রিকা সম্পাদনায় সাহায্য করতেন এবং তার প্রায় ২ বছর পর ১৩২১ বঙ্গাব্দ থেকে ‘যমুনা’ পত্রিকার অন্যতম সম্পাদক রূপে শরৎচন্দ্রের নাম ছাপা হতে থাকে। এছাড়াও ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর মাস থেকে ‘রূপ ও রঙ্গ’ নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকার যুগ্ম-সম্পাদক হিসাবে শরৎচন্দ্রের নাম নির্মলচন্দ্র চন্দ্রের সঙ্গেই ছাপা হয়। পরে ‘গল্প-লহরী’ ও
‘রূপ ও রঙ্গ’ পত্রিকার সম্পাদনার সঙ্গে শরৎচন্দ্র সরাসরি যুক্ত ছিলেন।
বন্ধুর সম্পাদিত ‘যমুনা’ পত্রিকায় প্রতিষ্ঠিত লেখকরা লেখা দিতে অস্বীকার করলে শরৎচন্দ্র স্বয়ং পত্রিকার জন্য ছোটগল্প লিখে দেন। ‘লেখক’ রূপে শরৎচন্দ্র প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। এর আগে অবশ্য শরৎচন্দ্রের ‘বড়দিদি’ ‘ভারতী’ পত্রিকায় তিন কিস্তিতে প্রকাশিত হয়েছিল। সুরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের কাছে রক্ষিত শরৎচন্দ্রের ‘চরিত্রহীন’ উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছিল লেখকের অনুমতি ছাড়া, যে-বই প্রথম দিনেই বিক্রি হয়েছিল প্রায় ৪০০ কপি, যে রেকর্ড পরবর্তীতে ভেঙেছিল তাঁরি ‘পথের দাবী’ উপন্যাসটি। ‘যমুনা’ থেকে ‘ভারতবর্ষ’ হয়ে
শরৎচন্দ্র ‘বঙ্গবাণী’, ‘নারায়ণ’ ও ‘বিচিত্রা’ পত্রিকার অন্যতম প্রধান লেখক হয়ে উঠেছিলেন।
লেখার পাশাপাশি তিনি পত্রিকার সম্পাদনার কাজেও নিয়মিত সাহায্য করতেন।
‘যমুনা’ ও ‘ভারতবর্ষ’ পত্রিকার সম্পাদকদের পাঠানো চিঠিতে সাময়িকপত্র সম্পাদনা সম্পর্কে শরৎচন্দ্রের মূল্যবান মতামত পাওয়া যায়। পত্রিকাগুলির উন্নতি সম্পর্কে তিনি অনেক মূল্যবান সমালোচনা করেন। যেমন– কোনও পত্রিকার সম্পাদককে চিঠিতে জানিয়েছেন, তাঁদের পত্রিকার গল্পের ছবিগুলি গল্পের থেকেও ভালো। পত্রিকার সম্পাদককে নির্দ্বিধায় জানিয়েছেন, পত্রিকাতে লেখাগুলির মধ্যে এমন একটা জিনিস নিয়মিত থাকা দরকার– যার জন্য গ্রাহকদের মনে সেই পত্রিকা সম্বন্ধে আশা জাগবে, দরকার সঠিক ‘রিভিউ’-এর।
নিজে ভালো চিত্রশিল্পী হয়েও সাহিত্য পত্রিকায় গল্পের সঙ্গে ছবি ছাপা সম্পর্কে শরৎচন্দ্রের বিশেষ উৎসাহ ছিল না।
শরৎচন্দ্র নিজেও কয়েকটি গল্প পাঠ করার পরে ‘রিভিউ’ দিয়ে ‘যমুনা’-র সম্পাদককে লিখছেন, ‘এবারের সংখ্যার গল্পগুলি অতি বদ। এই কি তোমাদের selection?’ পত্রিকার উন্নতির জন্য তিনি কতটা নির্মম সমালোচক হতে পারেন এ মন্তব্যই তার প্রমাণ। পত্রিকার সম্পাদককে তিনি লিখছেন, ‘সেদিন হঠাৎ একটা গল্প পড়েছিলুম, শেষ করে মনে হয়েছিল লেখকের বিদ্যের ভারে লেখাটা যেন পথের ওপর মুখ থুবড়ে পড়েচে। এ বস্তুকে কাগজে কখনও প্রশ্রয় দিও না। তবে এমন কথাও মনে কোরো না, গল্পে বুদ্ধি-শক্তির ছাপ থাকা মাত্রই দোষনীয়, হৃদয়বৃত্তির অপরিমিত বাহুল্যতায় লেখকের আহাম্মক সাজা দরকার।’ এই হল সম্পাদনার মূলকথা।
বাঁধাধরা গতে যে-পত্রিকা সম্পাদনা করা যায় না– সে-কথা তিনি বারবার উল্লেখ করে বলেছেন, পত্রিকার জনপ্রিয়তার পিছনে থাকে সম্পাদকের নিরলস পরিশ্রম। পত্রিকার গুণমান ভালো হলে তা পাঠকদের মধ্যে এমনিতেই প্রচারিত হবে এবং জনপ্রিয় হয়ে উঠবে, শুধু শুধু প্রচারের জন্য অযথা প্রচুর অর্থের বিনিময়ে বিজ্ঞাপন দেওয়া তাঁর না পসন্দ ছিল। ‘যমুনা’-র সম্পাদক ফণীন্দ্র পালকে তিনি লিখছেন, “ফণীবাবু, আপনার দোকানের মাল যদি খাঁটি হয়, একদিন পরে হোক পাঁচদিন পরে হোক খদ্দের জুটবে। মাল ভালো না হলে হাজার চেষ্টাতে দোকান চলবে না– দু’চার দিনে হোক, মাসে হোক ফেল হতে হবে।” তাঁর মতে, সম্পাদককে হতে হবে নিরপেক্ষ, ‘মাসিকপত্রের সম্পাদক’ এই মোহ যেন মানুষটিকে গ্রাস না করে।
নিজে ভালো চিত্রশিল্পী হয়েও সাহিত্য পত্রিকায় গল্পের সঙ্গে ছবি ছাপা সম্পর্কে শরৎচন্দ্রের বিশেষ উৎসাহ ছিল না। নিজের লেখার ক্ষেত্রেও তিনি ছবি ব্যবহার করতে চাইতেন না, বলতেন তাঁর লেখা এমনিতেই লোকে পড়বে। ‘স্বদেশ’ পত্রিকার সম্পাদক কৃষ্ণেন্দু ভৌমিককে, ‘বাতায়ন’ পত্রিকার সম্পাদক অবিনাশচন্দ্র ঘোষালকে, ‘বেণু’ পত্রিকার সম্পাদক ভূপেন্দ্রকিশোর রক্ষিত রায়কে নানা সময়ে পত্রিকা বিষয়ে নানা পরামর্শ দিয়েছেন।
নিজের মনের মতো একটি পত্রিকা সম্পাদনার সুযোগ অবশ্য ঘটেছিল অনেকটা পরে।
মাসিকপত্রকে অনেক মানুষের প্রিয় করে তোলার জন্য সবচেয়ে বড় প্রয়োজন লেখার স্নিগ্ধতা এবং সংযম, ‘সম্পাদক’ শরৎচন্দ্র ঠিক এমনটাই মনে করতেন। কাদের কাছ থেকে নিয়মিত লেখা নিতে হবে, পত্রিকার গ্রাহক সংখ্যা ও পত্রিকার ‘কোয়ালিটি’ কীভাবে বাড়াতে হবে– ইত্যাদি নানান বিষয়েও তিনি নিয়মিত পরামর্শ দিতেন। তাঁর মতে, একজন ‘ভালো’ সম্পাদকের কাজ গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ সন্ধানের পাশাপাশি জুতসই সমালোচনা করতে পারা। তবে তিনি চাইতেন এমন একটি পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত হতে, যেখানে একা হাতে সম্পাদনার সমগ্র বিষয়টিকে দেখভাল করতে পারবেন। তাঁর সামনে তখন ছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথের মতো আদর্শ প্রতিথযশা সম্পাদক।
নিজের মনের মতো একটি পত্রিকা সম্পাদনার সুযোগ অবশ্য ঘটেছিল অনেকটা পরে। সক্রিয় রাজনীতিতে তাঁর রাজনৈতিক গুরু ছিলেন নির্মলচন্দ্র, উভয়ে মিলে নাট্যকলা সম্পর্কিত একটি অভিজাত সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘রূপ ও রঙ্গ’ সম্পাদনা করতে লাগলেন। যার প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রকাশ, ১৮ আশ্বিন ১৩৩১ শনিবার। ‘গদাধর প্রিন্টিং ওয়ার্কস্ লিমিটেডের শ্রীজানকীনাথ বসু কর্তৃক মানিকতলা স্ট্রীট, কলিকাতা’ থেকে অনেক ছবি সহকারে উচ্চ মানের কাগজের পৃষ্ঠায় পত্রিকাটি ছাপা হত। পত্রিকাটির যে কয়েকটি সংখ্যা পাওয়া গিয়েছে, তাতে এটুকু নিশ্চিত করে বলা যায় যে, পত্রিকাটি শরৎচন্দ্রের সম্পাদকীয় আদর্শে চিত্তাকর্ষক হয়ে উঠেছিল। প্রথমে কিছু দিন ‘যমুনা’ পত্রিকার যুগ্ম সম্পাদক রূপে, এবং পরে ‘রূপ ও রঙ্গ’ ও ‘গল্প-লহরী’ পত্রিকার অন্যতম প্রধান সম্পাদক রূপে তাঁর সম্পাদকীয় আদর্শ কিছুটা হলেও পত্রিকায় প্রতিফলিত হয়েছিল বলেই মনে করা হয়।
(মতামত নিজস্ব)
লেখক অধ্যাপক
[email protected]
সর্বশেষ খবর
-
মধ্যমগ্রামে মাছচোর! প্রায় চার হাজার টাকার ইলিশ মাছ হাতিয়ে উধাও বৃদ্ধা
-
স্কুলেই নির্যাতনের শিকার ছাত্রীরা! হেনস্তার পর ভিডিও আপলোডের অভিযোগে সাসপেন্ড ২ শিক্ষক
-
‘বাংলাদেশি ইলিশে’র নামে চড়া দামে বিকোচ্ছে ভুয়ো মাছ! থানায় অভিযোগ দায়ের
-
জন্মাষ্টমীর ভোগে তালের বড়া, সুগার থাকলে কি শুধু দেখেই কাটাবেন? খেতে পারেন এই ৩ কৌশলে!
-
শিলিগুড়ি থেকে দক্ষিণ কোরিয়ায় পাড়ি দুর্গার, কীভাবে সোশাল মিডিয়া ঘোরাল বাংলার প্রতিমাশিল্পীর ভাগ্য?