Advertisement
Advertisement
Advertisement
Sangbad Pratidin
  • ২৯ শ্রাবণ ১৪৩৩
  • শনিবার
  • ১৫ আগস্ট ২০২৬
Chilbolton Observatory

পৃথিবীর মতো মহাকাশেও বর্জ্য পদার্থ, অদৃশ্য যানজট রুখতে নীরব প্রহরী চিলবোল্টনের বিশাল রাডার

পৃথিবীর কক্ষপথে ৪৬ হাজারেরও বেশি তুলনামূলক বড় মহাকাশ-বর্জ্য শনাক্ত হয়েছে। যার সম্মিলিত ওজন প্রায় ১৭ হাজার টন।

সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: আগস্ট ১৫, ২০২৬, ১২:৪৬

link
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: আগস্ট ১৫, ২০২৬, ১২:৪৬

options
link
পৃথিবীর মতো মহাকাশেও বর্জ্য পদার্থ, অদৃশ্য যানজট রুখতে নীরব প্রহরী চিলবোল্টনের বিশাল রাডার zoom
দক্ষিণ ইংল্যান্ডের চিলবোল্টন পর্যবেক্ষণকেন্দ্র। ছবি: সংগৃহীত
Advertisement

পৃথিবীর কক্ষপথে ৪৬ হাজারেরও বেশি তুলনামূলক বড় মহাকাশ-বর্জ্য শনাক্ত হয়েছে। যার সম্মিলিত ওজন প্রায় ১৭ হাজার টন। রয়েছে পুরনো উপগ্রহ, রকেটের বিচ্ছিন্ন অংশ এবং বিভিন্ন মহাকাশ অভিযানের সময় তৈরি হওয়া ধ্বংসাবশেষ। সংঘর্ষের সম্ভাবনা অমূলক নয়। লিখছেন উজ্জ্বলকুমার দত্ত। 

রাতের আকাশের দিকে তাকালে এখনও মনে হয়, পৃথিবীর উপর এক বিশাল নীরবতা ছড়িয়ে আছে। চাঁদ, তারা ও অসীম অন্ধকারের সেই জগৎ যেন মানুষের দৈনন্দিন কোলাহল থেকে বহু দূরে। অথচ বাস্তব ছবিটি সম্পূর্ণ আলাদা। পৃথিবীর চারপাশে প্রতিদিন ঘুরে চলেছে হাজার হাজার কৃত্রিম উপগ্রহ। তাদের সঙ্গে রয়েছে পরিত্যক্ত উপগ্রহ, রকেটের অংশ, মহাকাশযানের ভাঙা টুকরো এবং নানা ধরনের ধাতব বর্জ্য। মানুষের তৈরি এই অদৃশ্য যানজট ক্রমশ ঘন হচ্ছে। তার সঙ্গে বাড়ছে সংঘর্ষের আশঙ্কাও।

Advertisement

এই বিপদের দিকে নিরন্তর নজর রাখছে ব্রিটেনের দক্ষিণ ইংল্যান্ডের চিলবোল্টন পর্যবেক্ষণকেন্দ্র (Chilbolton Observatory)। সেখানে বসানো বিশাল রাডার পৃথিবীর কক্ষপথে ঘুরে বেড়ানো বিভিন্ন বস্তুর গতিবিধি অনুসরণ করে। নিয়ন্ত্রণকক্ষের কম্পিউটার পর্দায় একের-পর-এক বস্তু চিহ্নিত হয়। কোন উপগ্রহ কোথায় রয়েছে, কোনও পুরনো রকেটের অংশ কোন পথে এগচ্ছে, কোনও বস্তু অন্য কোনও উপগ্রহের বিপজ্জনক কাছাকাছি চলে যাচ্ছে কি না– এসব তথ্য বিশ্লেষণ করেন বিজ্ঞানীরা।

মহাকাশের এই নজরদারির গুরুত্ব বোঝা যায় বর্জ্যের পরিমাণ থেকেই। ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, পৃথিবীর কক্ষপথে ৪৬ হাজারেরও বেশি তুলনামূলক বড় মহাকাশ-বর্জ্য শনাক্ত হয়েছে। তাদের সম্মিলিত ওজন প্রায় ১৭ হাজার টন। এর মধ্যে রয়েছে পুরনো উপগ্রহ, রকেটের বিচ্ছিন্ন অংশ এবং বিভিন্ন মহাকাশ অভিযানের সময় তৈরি হওয়া ধ্বংসাবশেষ। এই সংখ্যা স্থির নয়, সময়ের সঙ্গে তা বাড়ছে।

বিপদের কারণ শুধু বর্জ্যের সংখ্যা নয়, তাদের গতি। পৃথিবীর কক্ষপথে ঘুরে বেড়ানো এই বস্তুগুলি প্রচণ্ড বেগে ছুটে চলে। ফলে আকারে ছোট কোনও ধাতব টুকরো সক্রিয় উপগ্রহে আঘাত করলে মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। একটি উপগ্রহ ধ্বংস হলে সেখান থেকে তৈরি হতে পারে আরও অসংখ্য টুকরো। সেসব টুকরো আবার অন্য উপগ্রহে আঘাত করতে পারে। অর্থাৎ একটি সংঘর্ষ থেকেই সূচিত হতে পারে আরও বহু সংঘর্ষের সম্ভাবনা।

বিপদের কারণ শুধু বর্জ্যের সংখ্যা নয়, তাদের গতি। পৃথিবীর কক্ষপথে ঘুরে বেড়ানো এই বস্তুগুলি প্রচণ্ড বেগে ছুটে চলে। ফলে আকারে ছোট কোনও ধাতব টুকরো সক্রিয় উপগ্রহে আঘাত করলে মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে।

এই আশঙ্কার একটি পরিচিত নাম ‘কেসলার সিনড্রোম’। কোনও সংঘর্ষে তৈরি হওয়া বর্জ্য যদি পরবর্তী সংঘর্ষের ‘কারণ’ হয়ে ওঠে, এবং সেই সংঘর্ষ থেকে আরও বর্জ্য তৈরি হয়, তখন একটি আত্মবর্ধনশীল ধ্বংসচক্র তৈরি হতে পারে। পরিস্থিতি চরমে পৌঁছলে পৃথিবীর কক্ষপথের কোনও কোনও অঞ্চল এতটাই বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে যে, সেখানে নিরাপদে মহাকাশযান পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়বে।

অথচ উপগ্রহের উপর মানুষের নির্ভরতা প্রতিদিন বাড়ছে। বর্তমানে পৃথিবীর কক্ষপথে প্রায় ১৪ হাজার উপগ্রহ রয়েছে। যোগাযোগ, আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ, কৃষি, নৌ ও বিমান চলাচল, মানচিত্র তৈরি এবং দুর্যোগ মোকাবিলার মতো বহু গুরুত্বপূর্ণ পরিষেবা উপগ্রহনির্ভর। আগামী বছরগুলিতে আরও বিপুল সংখ্যক উপগ্রহ উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে পৃথিবীর কক্ষপথ আরও ব্যস্ত হয়ে উঠবে।

এই আশঙ্কার একটি পরিচিত নাম ‘কেসলার সিনড্রোম’। কোনও সংঘর্ষে তৈরি হওয়া বর্জ্য যদি পরবর্তী সংঘর্ষের ‘কারণ’ হয়ে ওঠে, এবং সেই সংঘর্ষ থেকে আরও বর্জ্য তৈরি হয়, তখন একটি আত্মবর্ধনশীল ধ্বংসচক্র তৈরি হতে পারে।

চিলবোল্টনের কাজ তাই শুধু মহাকাশ-বর্জ্যের হিসাব রাখা নয়। পৃথিবীর কাছাকাছি আসা ক্ষুদ্র গ্রহাণু এবং ধূমকেতুর গতিপথের উপরও নজর রাখা হয়। কোনও পুরনো উপগ্রহ বা রকেটের অংশ যখন পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ফিরে আসে, তখন তার সম্ভাব্য গতিপথ ও পতনস্থলও পর্যবেক্ষণ করা হয়। মানুষের বসতি বা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার উপর কোনও ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে মনে হলে আগাম সতর্কতা জারি করা সম্ভব হয়।

চিলবোল্টন থেকে পাওয়া তথ্য পৌঁছে যায় ব্রিটেনের জাতীয় মহাকাশ পরিচালনা কেন্দ্রে। সম্ভাব্য সংঘর্ষের আশঙ্কা দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট উপগ্রহের গতিপথ পরিবর্তনের জন্য সতর্কবার্তা দেওয়া হয়। প্রতি মাসে এমন হাজার-হাজার সতর্কতা জারি হয়। মহাকাশে কখনও কখনও সামান্য গতিপথ পরিবর্তনই একটি বড় দুর্ঘটনা এড়িয়ে যেতে পারে। এই নজরদারির সঙ্গে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার প্রশ্নও জড়িয়ে। বিজ্ঞানীরা শুধু মহাকাশ-বর্জ্য কিংবা প্রাকৃতিক মহাজাগতিক বস্তুর গতিপথ দেখেন না, বিভিন্ন দেশের উপগ্রহ এবং তাদের গতিবিধিও পর্যবেক্ষণ করেন। কোনও উপগ্রহ অস্বাভাবিকভাবে অন্য একটি উপগ্রহের কাছে চলে গেলে– তথ্য নথিভুক্ত করা হয়। এর ফলে সম্ভাব্য দুর্ঘটনা কিংবা নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ঝুঁকি সম্পর্কে আগাম ধারণা পাওয়া সম্ভব। এই ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে ব্রিটেন সরকার ৮৫ মিলিয়ন পাউন্ড বিনিয়োগ করছে। কারণ মহাকাশ এখন আর কেবল গবেষণার ক্ষেত্র নয়।

মানুষ ইতিমধে‌্যই নদী, সমুদ্র, পাহাড় ও শহরকে আবর্জনায় ভরিয়ে তুলেছে। এবার সেই অভ্যাসের ছাপ পড়ছে মহাকাশেও। পৃথিবীর আবর্জনা চোখে দেখা যায়, মহাকাশের আবর্জনা দেখা যায় না। অথচ তার বিপদ অনেক সময় আরও সুদূরপ্রসারী। তাই আগামী দিনের মহাকাশ অভিযানের সাফল্য শুধু আরও বেশি উপগ্রহ পাঠানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না।

মানুষ ইতিমধে‌্যই নদী, সমুদ্র, পাহাড় ও শহরকে আবর্জনায় ভরিয়ে তুলেছে। এবার সেই অভ্যাসের ছাপ পড়ছে মহাকাশেও। পৃথিবীর আবর্জনা চোখে দেখা যায়, মহাকাশের আবর্জনা দেখা যায় না। অথচ তার বিপদ অনেক সময় আরও সুদূরপ্রসারী।

পুরনো উপগ্রহের ভবিষ্যৎ কী হবে, রকেটের পরিত্যক্ত অংশ কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে, কক্ষপথ থেকে বর্জ্য কীভাবে সরানো সম্ভব– এই প্রশ্নগুলির উত্তরও খুঁজতে হবে।

মহাকাশ অসীম। কিন্তু মানুষের ব্যবহারের কক্ষপথ অসীম নয়। সেই সীমিত পরিসরকে নিরাপদ রাখার লড়াই ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে। চিলবোল্টনের বিশাল রাডার সেই লড়াইয়ের এক নীরব প্রহরী। মহাকাশের অন্ধকারে তার নজরদারি হয়তো পৃথিবী থেকে দেখা যায় না, কিন্তু আগামী দিনের মহাকাশযাত্রা কতখানি ‘নিরাপদ’ হবে, তার উত্তর অনেকটাই লুকিয়ে রয়েছে এই অদৃশ্য নজরদারির মধ্যে।

(মতামত নিজস্ব)
লেখক শিক্ষক
[email protected]

Advertisement

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Share this article on

The article link is copied.