মানুষ আর বিড়াল– দু’জনেই চায় অন্যজন তাকে ভালবাসুক। শুধু বিড়াল ব্যাপারটা একটু বেশি আত্মসম্মানের সঙ্গে চায়। সে আমাদের ভালবাসার উপর নিজের শর্ত বসিয়ে দেয়, কিন্তু নিজের ‘সম্পত্তি’ মনে করে না। লিখছেন দীপ্র ভট্টাচার্য।
রাতে নিজের ঘরে শুয়ে আছেন। সংসার ঘুমোচ্ছে। পৃথিবী আপাতত আপনার বিরুদ্ধে কোনও নতুন সিদ্ধান্ত নেয়নি। এমন সময় আপনার বুকের উপর একটি আড়াই কি তিন কেজি ওজনের লোমশ প্রাণী এসে বসে পড়ল। সে আপনার মুখের দিকে তাকাল। আপনি তাকে সরালেন না। বরং হাত বাড়িয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। কেন? কারণ আপনি মানুষ। আর, সে বিড়াল। এই দুইয়ের মধ্যে সভ্যতার যাবতীয় পার্থক্য থাকলেও একটি জায়গায় অদ্ভুত মিল– দু’জনেই চায় অন্যজন তাকে ভালবাসুক। শুধু বিড়ালটি ব্যাপারটি একটু বেশি আত্মসম্মানের সঙ্গে চায়। এজন্যই সম্ভবত বিড়ালকে ভালবাসা
এত পুরনো, অথচ এখনও এত আধুনিক। ৮ আগস্ট ছিল আন্তর্জাতিক বিড়াল দিবস। এই উপলক্ষটি তাই নিছক একটি দিবসের গল্প নয়। এর ভিতরে আছে মানুষের এক অদ্ভুত মনস্তত্ত্ব– আমরা এমন একটি প্রাণীর প্রেমে পড়ি, যে আমাদের ভালবাসে ঠিকই, কিন্তু সেই ভালবাসার উপর নিজের শর্ত বসিয়ে দেয়। কুকুর আপনার কাছে ছুটে আসে। বিড়াল কিন্তু আসে নিজের মর্জিতে। কুকুরকে ডাকলে সে আসে। আর, বিড়ালকে ডাকলে সে প্রথমে ভাবে– কেন? এই সামান্য বিরহই সম্ভবত প্রেমটাকে আরও গভীর করে।
আরও পড়ুন:
ভালবাসার একটা অদ্ভুত রোগ আছে। যত বাড়ে, তত তার প্রমাণ চাই। তাই বিড়ালকে শুধু খাবার দিলেই হল না। তার জন্য আলাদা বাটি চাই। সেই বাটির দাম অনেক টাকা হলেও ক্ষতি নেই। ফরাসি বিলাসপণ্যের সংস্থা লুই ভিতোঁ-র ভারতীয় তালিকায় এমন একটি বিড়ালের বাটি রয়েছে। মৃৎপাত্রের বাটিতে বিড়াল ও ইঁদুরের নকশা, ভিতরে সোনালি রঙের বিড়ালের মুখ। দাম ৩৯ হাজার টাকা। একই সংস্থার বিড়ালের গলার ফিতের দাম ৫৪ হাজার টাকা। বিড়ালটির কাছে দু’টির কোনওটিরই নকশা গুরুত্বপূর্ণ নয়। সে সম্ভবত বাটিটা উল্টে দেবে। তারপর আপনার দিকে তাকাবে। আপনি বুঝবেন– এটিই তার শিল্পবোধ। মানুষের বিলাসের জায়গাটা এখানেই মজার। আমরা বিড়ালের প্রয়োজন মেটাই, কিন্তু তার সঙ্গে মেটাই নিজেদেরও একটা প্রয়োজন– আমরা যে তাকে কতটা ভালবাসি, সেটা দেখানোর প্রয়োজন।
বিষয়টি নিছক আবেগের নয়। গবেষণাতেও মানুষ ও বিড়ালের সম্পর্ককে গভীর সামাজিক সম্পর্ক হিসাবে দেখা হয়েছে। প্রায় ৪ হাজার বিড়াল-মালিকের উপর করা একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে, মানুষের সঙ্গে বিড়ালের সম্পর্কের ধরন একরকম নয়। কোথাও মালিকের আবেগের বিনিয়োগ বেশি, কোথাও বিড়াল মানুষের সান্নিধ্য বেশি চায়, কোথাও আবার বিড়াল যথেষ্ট দূরত্ব বজায় রাখে। অর্থাৎ বিড়ালের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কও ব্যক্তিভেদে আলাদা, এবং সেই সম্পর্কের মধ্যে আবেগ, সান্নিধ্য ও দূরত্ব– সবই কাজ করে। আরও সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, মালিকের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার সময়ে নিরাপদ সম্পর্কযুক্ত বিড়ালের দেহে অক্সিটোসিনের মাত্রার পরিবর্তন অন্য ধরনের সম্পর্কযুক্ত বিড়ালের তুলনায় আলাদা হতে পারে। গবেষকরা মালিকের আচরণ ও বিড়ালের আবেগগত সম্পর্কের মধ্যে যোগসূত্রের কথাও বলেছেন। অর্থাৎ যে-মানুষটি সারা দিন বলে, ‘আমার বিড়ালটা আমাকে ভালবাসে না’, সে হয়তো ভুল করছে। বিড়াল ভালবাসে। শুধু তার ভালবাসার ভাষা মানুষের মতো নয়। মানুষ ভালবাসে কাছে এসে। বিড়াল কখনও কখনও ভালবাসে পাশে এসে বসে। দু’জনের মধ্যে এক হাত দূরত্ব রেখে।
জাপানের তাশিরোজিমা দ্বীপকে বলা হয় বিড়াল দ্বীপ। সরকারি পর্যটন দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে মানুষের তুলনায় বিড়ালের সংখ্যা অনেক বেশি।
মানুষের অবকাশযাপন ছিল। এখন বিড়ালেরও আছে। দুবাইয়ের একটি বিশেষ বিড়াল-আবাসে একটি বিড়ালের থাকার খরচ প্রতি রাতে ১০৫ দিরহাম। একই পরিবারের দুই বিড়ালের জন্য ২১০ দিরহাম। আলাদা পরিচর্যার খরচও আছে– বিশেষ পরিচর্যার জন্য ২৮০ দিরহাম পর্যন্ত। অসুস্থ বা সংক্রামক অবস্থার বিড়ালের জন্য আলাদা থাকার ব্যবস্থাও রয়েছে। একটা সময় বিড়ালের ছুটি মানে ছিল বাড়ির জানলার ধারে শুয়ে থাকা। এখন তার জন্য আবাস আছে। মানুষ অবশ্য নিজের অবকাশে গিয়ে অন্য মানুষের সঙ্গে লিফটে ওঠে, একই প্রাতরাশের টেবিলে বসে, অপরিচিত লোকের সঙ্গে ছবি তোলে। বিড়াল বলে– না, ধন্যবাদ। আমার আলাদা ঘর চাই।
জাপানের তাশিরোজিমা দ্বীপকে বলা হয় বিড়াল দ্বীপ। সরকারি পর্যটন দফতরের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে মানুষের তুলনায় বিড়ালের সংখ্যা অনেক বেশি। রেশম কীটের গুটি ইঁদুরের হাত থেকে বাঁচাতে এক সময় দ্বীপে বিড়াল রাখা হত। জেলেরা তাদের মাছের অবশিষ্টাংশ খাওয়াত। মানুষের সংখ্যা কমতে কমতে এখন বিড়ালই দ্বীপটির সবচেয়ে পরিচিত বাসিন্দা। সেখানে একটি বিড়াল মন্দিরও রয়েছে। এমনকী সেখানে বিড়াল আকৃতির থাকার ঘরও আছে। অর্থাৎ মানুষ এমন এক জায়গায় যায়, যেখানে বিড়াল মানুষকে ‘পর্যটক’ মনে করে। সভ্যতার চূড়ান্ত সাফল্য সম্ভবত এটাই– একদিন মানুষ এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে সে নিজেই ‘অতিথি’, আর বিড়াল ‘স্থানীয়’। ওসাকার ‘নেকো নো জিকান’ ২০০৪ সালে শুরু হয়েছিল এবং প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের জাপানের প্রথম বিড়াল-আড্ডা বলে পরিচয় দেয়। সেখানে মানুষ টাকা দিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ঢোকে এবং বিড়ালের সঙ্গে সময় কাটায়। প্রতি ঘণ্টার জন্য সাধারণ দিনে ১২০০ ইয়েন, ছুটির দিনে ১৩০০ ইয়েন নেওয়া হয়। খেয়াল করুন, মানুষ এখানে টাকা দিয়ে কী কিনছে? খাবার নয়। পোশাক নয়। বিনোদনের কোনও যান্ত্রিক ব্যবস্থা নয়। একটি বিড়াল তাকে পছন্দ করবে কি না– এই অনিশ্চয়তা। মানুষের মন বোধহয় এমনই। যে ভালবাসা নিশ্চিত, তার মূল্য কমে যায়। যে ভালবাসা পেতে একটু অপেক্ষা করতে হয়, তার দাম বাড়ে। বিড়াল সেই মনস্তত্ত্ব বহু শতাব্দী ধরে বুঝে বসে আছে।
বিড়ালের বিলাস নিয়ে হাসা যায়। ৫৪ হাজার টাকার গলার ফিতে দেখে চোখ কপালে তোলা যায়।
ভারতও পিছিয়ে নেই। ২০২৪ সালে ভারতের বিড়াল-পরিচর্যা বাজারের মূল্য ছিল প্রায় ১,০৩০ কোটি টাকা। এর মধ্যে খাবারের অংশই ছিল ৬৭৭ কোটি টাকা। গবেষণা অনুযায়ী, বিড়ালকে পরিবারের সদস্য হিসাবে দেখার প্রবণতা এবং উন্নত খাবার, পরিচর্যা, খেলনা ও চিকিৎসায় বাড়তি খরচ এই বাজার বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। এখানেই আসল প্রশ্ন। ভাল খাবার কি বিলাস? চিকিৎসা? নিরাপদ আশ্রয়? তাহলে বিলাস কোথায়? যেখানে বিড়ালের প্রয়োজন শেষ হয়ে মানুষের প্রদর্শন শুরু হয়। ৩৯ হাজার টাকার বাটি হয়তো বিড়ালের কাছে কোনও অর্থই বহন করে না। কিন্তু সেই বাটি কিনে মানুষ হয়তো নিজের কাছে একটা কথা বলে– ‘আমি ওকে খুব ভালবাসি।’ এবং সম্ভবত সেই কথাটাই আসল। কারণ মানুষ শুধু বিড়ালকে পোষে না। মানুষ নিজের একাকিত্ব, উদ্বেগ, ব্যস্ততা, নিঃসঙ্গতা– এসবের মধ্যেও একজন নীরব সঙ্গী খোঁজে। এমন একজন, যে তার সাফল্যের হিসাব রাখবে না। ব্যর্থতার বিচার করবে না। অফিসে কী হল, কে অপমান করল, কত টাকা রোজগার হল– কিছুই জানতে চাইবে না। সে শুধু সন্ধেবেলা এসে আপনার পায়ের কাছে বসবে। কখনও কোলে উঠবে। কখনও উঠবে না।
তাই বিড়ালের বিলাস নিয়ে হাসা যায়। ৫৪ হাজার টাকার গলার ফিতে দেখে চোখ কপালে তোলা যায়। ৩৯ হাজার টাকার বাটি দেখে মনে মনে বলা যায়– ‘বাটিতে কি গলানো সোনা দিয়ে মাছ ভাজে?’ কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্যাপারটা বাটি, ফিতে, খেলনা বা দামি আবাসের নয়। ব্যাপারটা মানুষের। মানুষ এমন এক প্রাণীকে ভালবাসতে শিখেছে, যে তাকে নিজের সম্পত্তি মনে করে না। এই কারণেই বিড়ালের সঙ্গে সম্পর্কটা এত সুন্দর। আপনি তাকে কিনতে পারেন, কিন্তু তার ভালবাসা কিনতে পারেন না।
আপনি তার জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে দামি বাটি আনতে পারেন, কিন্তু সে হয়তো পাশের পুরনো কাগজের বাক্সটাকেই বেছে নেবে। আপনি তার জন্য নরম বিছানা কিনবেন, সে আপনার জামাকাপড়ের স্তূপে গিয়ে শুয়ে পড়বে। আপনি তাকে ডাকবেন। সে আসবে না। তারপর কোনও এক রাতে, কোনও ঘোষণা ছাড়াই, যখন আপনার মনটা খুব খারাপ– সে নিঃশব্দে এসে আপনার পাশে বসবে। সেই মুহূর্তে বোঝা যাবে, আসলে কে কাকে পুষছে। মানুষ বিড়ালকে ঘর দিয়েছে। বিড়াল– মানুষকে ঘর দেওয়ার একটি কারণ দিয়েছে। আর পৃথিবীর সব বিলাসের শেষে, সম্ভবত এর চেয়ে দামি উপহার আর নেই।
(মতামত নিজস্ব)
লেখক ম্যানেজমেন্ট কনসালট্যান্ট ও
‘এআই’ স্ট্র্যাটেজিস্ট
[email protected]
সর্বশেষ খবর
-
খেলার সময় ৪ ভাইঝিকে পরপর হাসুয়ার কোপ কাকার! মৃত্যু এক শিশুর, সুতিতে ব্যাপক চাঞ্চল্য
-
হাঁটুর কটকট শব্দকে হালকা ভাবে নিচ্ছেন? এই লক্ষণগুলো দেখলে সাবধান
-
ভারতের বিরুদ্ধে সিরিজের আগেই দুঃসংবাদ, ক্রিকেটারদের সঙ্গে হাতাহাতিতে মৃত্যু শ্রীলঙ্কার কোচের
-
‘ভাইয়ের গ্রেপ্তারির পর অপমানে বাবা দূরে চলে যান’, আইনে আস্থা রেখে বলছেন নির্মলকন্যা
-
কৃষ্ণনগরের বুড়িমার প্রণামী-গয়নাগাটি ‘আত্মসাৎ’, কাঠগড়ায় ধৃত প্রাক্তন তৃণমূল কাউন্সিলর