এই লেখা উপায়হীন, ভিনিসিয়াস জুনিয়রকে দিয়েই শুরু হবে। ফুটবল-বিশেষজ্ঞ থেকে সমর্থকদের একাংশের ধারণা, এবারের বিশ্বকাপে নেইমারের মতো ‘খোঁড়া’ ব্রাজিল বুঝি গ্রুপ পর্যায়েই হোঁচট খাবে। ৫ বারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ান গতবার তবু কোয়ার্টার ফাইনালের সিঁড়ি চড়েছিল, এবার তার আগেই হয়তো হলুদ সূর্যাস্ত! কিন্তু তিনি ভিনিসিয়াস জোসে পাইশাও দে ওলিভেইরা জুনিয়র, বর্তমান ব্রাজিল দলের আশা-ভরসা। ইতিমধ্যে ৩ ম্যাচে ৪ গোল করে পেলের দেশকে নতুন স্বপ্ন দেখাচ্ছেন। এমনকী, ছুঁয়ে ফেলেছেন কিংবদন্তি বড় রোনাল্ডোর ২৪ বছরের পুরনো রেকর্ড। দেশের জার্সিতে ১৩ গোলের মালিক, ক্লাব ফুটবলেও অবিকল্প তারকা। একাধিক সিজন মিলিয়ে রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে ঝুলিতে ৭৭ গোল। ব্রাজিলের এই ‘কালো হরিণ’ সমসাময়িক বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিভা।
অথচ, সেই তিনিই কিনা ফুটবল দুনিয়ার ঢাকাচাপা কলঙ্ক– বর্ণবিদ্বেষের ‘ব্র্যান্ড অ্যাম্বাস্যাডার’! কেন? যেহেতু তিনি ‘কালো মানুষ’। আলোকসামান্য বিশ্ব ফুটবলের আড়ালে যে-অন্ধকার, তাকেই উসকে দেয় ভিনিসিয়াসের দুঃখ? ২০২৩ সালে একটি সাক্ষাৎকারে ভিনি জানান, লা লিগায় খেলার সময় মোট ১০বার বর্ণবিদ্বেষের শিকার হয়েছেন। তাঁর উদ্দেশে গ্যালারি থেকে ভেসে ‘বঁাদর’ অপশব্দ। এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে বর্ণবিদ্বেষী সমর্থকদের আজীবন স্টেডিয়ামে ‘নিষিদ্ধ’ করার দাবি জানিয়েছিলেন তিনি।
যেটা সমস্যা– বিদ্বেষমূলক মন্তব্যের অভিযোগ কেবল সমর্থকদের বিরুদ্ধে নয়, খেলোয়াড়দের বিরুদ্ধেও। চলতি বছরের শুরুতে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ম্যাচে বেনফিকার উইঙ্গার জিয়ানলুকা প্রেসতিয়ান্নি ভিনির উদ্দেশে বর্ণবিদ্বেষী মন্তব্য করেছেন বলে অভিযোগ ওঠে। এই ঘটনায় হইচই শুরু হলে ফিফার ‘প্লেয়ার্স ভয়েস কমিটি’ তড়িঘড়ি বৈঠকে বসে। বর্ণবিদ্বেষ রুখতে কড়া আইন আনার বিষয়ে আলোচনা হয়। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো বিবৃতি দেন, ‘আমাদের খেলায় ও সমাজে বর্ণবিদ্বেষের স্থান নেই।’ যদিও বেপরোয়া বাস্তব বারবার অন্য কথা বলেছে।
উৎস সম্ভবত সস্তার রাজনীতি। ভিলেন বিশ্বের অসংখ্য রাষ্ট্রনেতা। ক্ষমতা চেখে তাঁরা সার বুঝেছেন: বিভাজনের চেয়ে জনপ্রিয় অ্যাজেন্ডা পৃথিবীতে নেই। বলা বাহুল্য, এই বিষয়ে নেতৃত্ব দিচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
যে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ বিশ্বের ফুটবলপ্রেমীদের নয়নের মণি, গত শতব্দীর আটের দশকে সেই ইপিএলে বর্ণবিদ্বেষ চরম সীমায় পৌঁছেছিল। উগ্র ইংরেজ সমর্থক এবং অভব্য সতীর্থদের অত্যাচারে ইউরোপের বিভিন্ন ক্লাবে খেলা হাতেগোনা কৃষ্ণাঙ্গ ফুটবলার সংঘবদ্ধ হয়েছিলেন। তাঁদেরই একজন পল ক্যানোভিল। ১৯৮২ সালে চেলসি তাঁকে ক্লাবে নিয়ে আসে। এ ক্লাবের ইতিহাসে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ ফুটবলার। সময়ের হিসাবে ‘বিপ্লব’ বটে। যদিও পলের অভিজ্ঞতা ছিল দুঃসহনীয়। সংবাদসংস্থা এপি-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, চেলসিতে তাঁর সতীর্থরা চূড়ান্ত দুর্ব্যবহার করতেন। তাঁর দিকে কলা ছুড়ে দিতেন। যদিও সরাসরি কেউ বলেনি ক্লাব ছেড়ে বেরিয়ে যাও। পলের প্রশ্ন, ‘কেন তাঁরা আমার দিকে বারবার কলা ছুড়ে দিতেন? আমাকে কি বাঁদরের মতো দেখতে?’ খেলা ছাড়ার বেশ কয়েক বছর পরে ২০০৮ সালে প্রকাশিত হয় পল ক্যানোভিলের বিস্ফোরক আত্মজীবনী– ‘ব্লু অ্যান্ড ব্ল্যাক’।
ফুটবলে বর্ণবিদ্বেষের গল্প যতখানি পুরনো, ততটাই নতুন। ভিনি, পলের যে ‘কালো পৃথিবী’, সেই দুঃখের আঁধারে ঠেলে দেওয়া হয়েছে মার্কাস র্যাশফোর্ড, বুকায়ো সাকা, ও জ্যাডন মালিক স্যাঞ্চো-কে। যেহেতু তাঁরা ইউরো ২০২০-র ফাইনালে ইতালির বিরুদ্ধে টাইব্রেকারে গোল মিস করেছিলেন। তিন কৃষ্ণাঙ্গ ইংলিশ ফুটবলার সোশাল মিডিয়ায় তীব্র বর্ণবাদী আক্রমণ ও ট্রোলের শিকার হন। কতকটা একই ধরনের কাণ্ড ঘটে ২০২২ সালে, কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালে পেনাল্টি মিস করায় ফ্রান্সের দুই কৃষ্ণাঙ্গ ফুটবলার কিংসলে কোমান ও অরেলিয়েঁ সুয়ামেনি উগ্র সমর্থকদের তীব্র বর্ণবিদ্বেষী আক্রমণের মুখে পড়েন। ইংল্যান্ড ও চেলসির ফরোয়ার্ড রহিম স্টার্লিং দীর্ঘ দিন ধরে মাঠে এবং সোশাল মিডিয়ায় বর্ণবিদ্বেষের শিকার। ইতালির এক সময়ের তারকা স্ট্রাইকার মারিও বালোতেল্লি ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই বর্ণবিদ্বেষে বিদ্ধ। এই তালিকায় আছেন দানি আলভেস, মার্সেলো, কেভিন প্রিন্স বোয়াতেংয়ের মতো তারকা।

মেরেকেটে এক দশক আগের কথা, বর্ণবিদ্বেষের বেদনায় ও অভিমানে মাত্র ২৯ বছর বয়সে অবসর নেন জার্মান সুপারস্টার মেসুট ওজিল (পারফর্ম করতে পারা, না-পারা এটিও অন্যতম কারণ)। তাঁর কথায়, ‘যখন জিততাম, তখন আমাকে জার্মান রূপে ধরা হত। টিম হারলেই বলা হত অনাবাসী।’ তালিকা দীর্ঘ করে লাভ নেই। কিন্তু ওজিলের ঘটনায় একটি বিষয় স্পষ্ট, কেবল ‘কালো মানুষ’রা বর্ণবিদ্বেষের শিকার নন, অনাবাসী বা অভিবাসী হলেও আপনি বর্ণবিদ্বেষের আগুনে পুড়তে পারেন। বেলজিয়ামের খ্যাতনামা স্ট্রাইকার রোমেলু লুকাকু, ফ্রান্সের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার করিম বেঞ্জেমার গলাতেও হাহাকার। ফুটবলারদের এক পত্রিকায় লুকাকু লেখেন, ‘আমরা যখন খুব ভাল খেলি, তখন খবরের কাগজে লেখা হয়, রোমেলু লুকাকু বেলজিয়ান স্ট্রাইকার। আর যখন জাতীয় টিম খারাপ খেলে, তখন বলা হয়, রোমেলু লুকাকু কঙ্গো-জাত বেলজিয়ান স্ট্রাইকার।’ করিম বেঞ্জেমা মন্তব্য করেন, ‘আমি যদি গোল করি, তাহলে আমি ফরাসি। যদি গোল করতে না পারি, তা হলে আমি আরব।’ এই ধারাবাহিক ঘটনাবলি প্রমাণ করে তুমি যত বড় ফুটবলারই হও না কেন, যে ‘শিক্ষিত’ দেশেই থাকো না, বর্ণবিদ্বেষের নিঃশব্দ ছুরি তোমাকে বিদ্ধ করবেই। কোটি টাকার প্রশ্ন হল, এই বিষোদগারের উৎস কী? প্রকৃত ভিলেন কে?
উৎস সম্ভবত সস্তার রাজনীতি। ভিলেন বিশ্বের অসংখ্য রাষ্ট্রনেতা। ক্ষমতা চেখে তাঁরা সার বুঝেছেন: বিভাজনের চেয়ে জনপ্রিয় অ্যাজেন্ডা পৃথিবীতে নেই। বলা বাহুল্য, এই বিষয়ে নেতৃত্ব দিচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর ‘আমেরিকান ফার্স্ট’ নীতির আড়ালে রয়েছে কালো ও অভিবাসীদের প্রতি তীব্র ঘৃণা। যুদ্ধবাজ সেই ট্রাম্পকেই কিনা ‘ফিফা পিস প্রাইজ’ দেওয়া হয়েছে গত ডিসেম্বরে! মোদ্দা বিষয়টি হল, যে-পৃথিবীতে ঘৃণা-হিংসা-যুদ্ধকে প্রমোট করা হয়, সেই পৃথিবীতে শরণার্থীর সংখ্যা বুকফাটা কান্নার মতো হুহু করে বাড়বেই। মজার কথা হল, সেই পাঁকেও ফুটে চলেছে ইয়ামাল, দেম্বেলে, পোগবার মতো পদ্মফুল। সুগন্ধ ছড়াচ্ছে তাঁরা বিশ্ব ফুটবলের অপূর্ব বাগানে। সে-কারণে বিভিন্ন ধর্ম, গাত্রবর্ণ, অভিবাসী বাদ দিয়ে এখনকার ক্লাব ফুটবল, এমনকী দেশের ফুটবলও ভাবা যায় না। সেক্ষেত্রে ঠগ বাছতে গাঁ উজাড় হওয়ার সম্ভাবনা দুশো শতাংশ।
আগামী কাল যদি জাতীয়তাবাদের ধুয়ো তুলে ডোনাল্ড ট্রাম্প নয়া নিয়ম বাতলান: আমার দেশের বিশ্বকাপে প্রত্যেক দেশ কেবলমাত্র সাদা চামড়াওলা, অমুসলিম ও ভূমিপুত্রদেরই খেলাতে পারবে, সেক্ষেত্রে বিশ্বফুটবলের রান্না থেকে নুনটাই বাদ পড়ে যাবে! দেম্বেলেকে ছাড়া ফ্রান্স, ইয়ামাল ছাড়া স্পেন, লুকাকুকে ছাড়া বেলজিয়াম, সাকাকে ছাড়া ইংল্যান্ড, ভিনিকে ছাড়া ব্রাজিলের প্রথম একাদশ সম্ভব তো?
আমাদেরই সোচ্চার হয়ে বলতে হবে– বিশ্বগ্রামই মানব সভ্যতার স্বভাবিক চরিত্র। তাই ১৫ হাজার কিলোমিটার দূরের লাতিন আমেরিকার দুই দেশের হলুদ ও নীল-সাদা পতাকা ঝোলে উত্তর কলকাতার সরু কোমরের মতো গলিতে, মেসি-রোনাল্ডকে নিয়ে তর্কের তুফান ওঠে শহরতলি মধ্যমগ্রাম স্টেশন বাজারের চায়ের দোকানে।
এ হেন বিভাজনকে রুখতে একটি রাস্তা কঠোর আইনের প্রবর্তন। ভিনির দাবি মেনে বর্ণবিদ্বেষী সমর্থকদের আজীবন স্টেডিয়ামে ‘নিষিদ্ধ’ করা হোক। কড়া পদক্ষেপ চাই বর্ণবিদ্বেষী ফুটবলার, কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও। কারণ অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন লুইস সুয়ারেস, জন টেরি, সের্খিও বুসকেতস, পিটার স্কিমিচেলের মতো নামও। ইতিমধ্যে ব্রাজিল যা করেওছে। ভিনির দুঃখমোচনে তাঁর নামেই বর্ণবিদ্বেষ বিরোধী ‘ভিনি জুনিয়র আইন’ এনেছে তারা। তথাপি প্রশ্ন ওঠে, কেবল আইন দিয়ে কি ঘৃণার বিরুদ্ধে এত বড় যুদ্ধ জেতা যাবে? মনে হয় না, বরং একমাত্র অস্ত্র হতে পারে পালটা তুমুল ভালবাসার চাষ। বিশ্বজুড়ে সস্তা রাজনীতির সাপ যে বিষ ঢালছে প্রতিদিন, ধর্ম-বর্ণ-জাতের নামে, তার অ্যান্টিভেনাম হতে পারি আমরা, বিশুদ্ধ ফুটবলপ্রেমী সমর্থকরা।
আমাদেরই সোচ্চার হয়ে বলতে হবে– বিশ্বগ্রামই মানব সভ্যতার স্বভাবিক চরিত্র। তাই ১৫ হাজার কিলোমিটার দূরের লাতিন আমেরিকার দুই দেশের হলুদ ও নীল-সাদা পতাকা ঝোলে উত্তর কলকাতার সরু কোমরের মতো গলিতে, মেসি-রোনাল্ডকে নিয়ে তর্কের তুফান ওঠে শহরতলি মধ্যমগ্রাম স্টেশন বাজারের চায়ের দোকানে। আমরা আসলে বাঁক খাওয়ানো ফ্রিকিক, দুরন্ত ড্রিবল, অসামান্য ট্যাকল ও ট্যাকটিক্সের দিবানা ফ্যান। ওই ফ্রিকিক মারছে বা ট্যাকটিক্স গোছাচ্ছে– তাঁর জাত, ধর্ম, বর্ণের প্রশ্নে আমরা উদাসীন, নিরুদ্বিগ্ন। আমাদের এই মনের কথাটিই যে ব্যাকগ্রাউন্ডে বেজে চলে অনর্গল: “Imagine there’s no countries/ It isn’t hard to do/ Nothing to kill or die for/ And no religion too.”
পুনশ্চ: ২৪ জুন, ১৯৯০। ফুটবল বিশ্বকাপ। জার্মানির স্ট্রাইকার রুডি ফলারের চুলে থুতু ছিটিয়ে দিয়েছিলেন নেদারল্যান্ডসের ফ্রাঙ্ক রাইকার্ড। ফলার শ্বেতাঙ্গ। রাইকার্ড কৃষ্ণাঙ্গ, তঁার বাবা সুরিনাম-জাত, মা ডাচ। এ ঘটনা মাঠে ঘটে দু’-দু’বার। কথিত, কোচের কথায় ফলারকে উত্ত্যক্ত করতে তিনি এ-কাজ করেছিলেন। কিন্তু রাইকার্ডের বেড়ে ওঠার কোনও মোড়ে বর্ণবিদ্বেষ ও সাদা চামড়ার উচ্চাভিমান-পুষ্ট আগ্রাসনের হাতে নিগৃহীত হওয়ার কোনও স্মৃতি লুকিয়ে ছিল কি না বলা শক্ত। রাইকার্ড পরে ক্ষমা চেয়ে নেন। কিন্তু গায়ের রং দেখে কারও চুলে থুতু দেওয়া, যতই অন্যের কথায় প্রভাবিত হয়ে করা হোক না কেন, ক্ষমার যোগ্য কি!
সর্বশেষ খবর
-
মোদির আমেরিকা সফরের পরেই ভারতে আসবেন ট্রাম্প! জানালেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত গোর
-
হার্ট অ্যাটাকের পর ২৭ কেজি ওজন কমালেন অনুরাগ কাশ্যপ, কেন ক্র্যাশ ডায়েট নিয়ে সতর্ক করছেন চিকিৎসকেরা?
-
ব্যবসায়িক স্বার্থেই বিশ্বকাপে হাইড্রেশন ব্রেক! বিরক্ত স্কালোনি-টুখেলরা, বিতর্কে মুখ খুলল ফিফা
-
রণবীর না আলিয়া, বাড়ির ‘আলফা-অ্যানিম্যাল’ কে? অবিশ্বাস্য উত্তর কাপুরবধূর!
-
চরমে কুসংস্কার, মেসি-ভোজিনহা দ্বৈরথে শিরোনামে বিখ্যাত মূর্তি, দলকে জেতাতে এ কী করছেন ভক্তরা!