Advertisement
Advertisement
Advertisement
Sangbad Pratidin
  • ২৮ শ্রাবণ ১৪৩৩
  • শুক্রবার
  • ১৪ আগস্ট ২০২৬
Political Landscape

রাজনীতিতে উঠে আসছে নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগ! বুঝিয়ে দিচ্ছে টিভিকের উত্থান

শুধু বংশপরিচয়, পুরনো ভোটব্যাঙ্ক বা দীর্ঘ দিনের সংগঠনের জোরে কি আর রাজনীতিতে টিকে থাকা সম্ভব?

সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: আগস্ট ১৪, ২০২৬, ১৪:২৯

link
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: আগস্ট ১৪, ২০২৬, ১৪:২৯

options
link
রাজনীতিতে উঠে আসছে নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগ! বুঝিয়ে দিচ্ছে টিভিকের উত্থান zoom
তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী বিজয়। ছবি: এএনআই।
Advertisement

‘টিভিকে’ শুধু একজন জনপ্রিয় অভিনেতার নির্বাচনী সাফল্য নয়। বংশ পরিচয়, পুরনো ভোটব্যাঙ্ক বা দীর্ঘ দিনের সংগঠনের জোর নয়– নতুন প্রজন্ম আরও বেশি করে জানতে চায়, তাদের জীবনে রাজনীতি কতখানি ‘বাস্তব’ পরিবর্তন আনতে সক্ষম। লিখছেন সুজনকুমার দাস।

গত সাত দশক ধরে ভারতের রাজনীতি যেন একটি নির্দিষ্ট ছকের মধ্যেই আবর্তিত হয়েছে। কোথাও জাতপাতের সমীকরণ, কোথাও ধর্মীয় মেরুকরণ, কোথাও আবার রাজনৈতিক পরিবারের উত্তরাধিকার। নেহরু ও গান্ধী পরিবার, উত্তরপ্রদেশে যাদব পরিবার, বিহারে লালুপ্রসাদ যাদবের পরিবার, মহারাষ্ট্রে ঠাকরে পরিবার কিংবা পাওয়ার পরিবার– ভারতের রাজনীতিতে বংশপরম্পরায় নেতৃত্বের উদাহরণ কম নেই। অর্থাৎ রাজনীতিও একপ্রকার মনোপলি বাজারের মতো কাজ করে চলেছে। নির্বাচনী সাফল্যের এই পুরনো সূত্রগুলিই বহু দিন ধরে রাজনীতির বাজার নিয়ন্ত্রণ করেছে। নতুন কেউ সেই বাজারে ঢুকতে চাইলে তার হাতে থাকা দরকার ছিল কোনও শক্তিশালী সামাজিক ভিত্তি, সংগঠন অথবা রাজনৈতিক পরিচিতি। কিন্তু সাম্প্রতিক কয়েক বছরের ভারতীয় রাজনীতিতে সেই চিত্রে ধীরে ধীরে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। বাণিজ্য জগতে যেমন নতুন স্টার্টআপ এসে পুরনো ব্যবসার নিয়ম বদলে দিয়েছে, রাজনীতিতেও তেমনই উঠে আসছে নতুন ধরনের রাজনৈতিক উদ্যোগ।

Advertisement

এ পরিবর্তনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় উদাহরণ তামিলনাড়ু। প্রায় ছ’-দশক ধরে ডিএমকে ও এআইএডিএমকে-র দ্বিমেরু রাজনীতিতে ‘তৃতীয়’ কোনও শক্তির পক্ষে জায়গা তৈরি করা সহজ ছিল না। সেই জায়গাতেই অভিনেতা থলপতি বিজয়ের তামিলগা ভেট্রি কাজাগামের (‘টিভিকে’) উত্থান নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে টিভিকে ২৩৪টির মধ্যে ১০৮টি আসন জিতে একক বৃহত্তম দল হয়। পরে কংগ্রেস, ভিসিকে, আইইউএমএল এবং বাম দলগুলির সমর্থনে তাদের সংখ্যা ১২১-এ পৌঁছয় এবং বিজয় সরকার গঠনের আমন্ত্রণ পান।

নির্বাচনী সাফল্যের পুরনো সূত্রগুলি বহু দিন ধরে রাজনীতির বাজার নিয়ন্ত্রণ করেছে। নতুন কেউ সেই বাজারে ঢুকতে চাইলে তার হাতে থাকা দরকার ছিল কোনও শক্তিশালী সামাজিক ভিত্তি, সংগঠন অথবা রাজনৈতিক পরিচিতি। কিন্তু সাম্প্রতিক কয়েক বছরের ভারতীয় রাজনীতিতে সেই চিত্রে ধীরে ধীরে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।

এখানে আসল বিষয় শুধু একজন জনপ্রিয় অভিনেতার নির্বাচনী সাফল্য নয়। বরং গুরুত্বপূর্ণ হল, কীভাবে তারকাখ্যাতিকে একটি রাজনৈতিক সংগঠনে রূপান্তর করা হয়েছে। তরুণ প্রজন্ম, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, নারীকল্যাণ, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা– এই ধরনের বিষয়কে সামনে রেখে টিভিকে প্রচলিত রাজনৈতিক ভাষার বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। অবশ্যই এটিকে জাতপাত বা পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতির সম্পূর্ণ অবসান বলা যাবে না। কিন্তু পুরনো রাজনৈতিক সমীকরণের বাইরে নতুন ভোটারদের আকৃষ্ট করার সম্ভাবনা যে তৈরি হয়েছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।

এই পরিবর্তনের আর-একটি ভিন্ন উদাহরণ– প্রশান্ত কিশোর। দীর্ঘ দিন অন্য নেতাদের নির্বাচনী কৌশল তৈরি করার পর তিনি নিজেই জন সুরযের মাধ্যমে বিহারের রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। ২০২২ সালে শুরু হওয়া তাঁর দীর্ঘ পদযাত্রার ‘লক্ষ্য’-ই ছিল গ্রাম ও পঞ্চায়েত স্তরে গিয়ে মানুষের সমস্যা বোঝা এবং জাতপাতের বাইরে কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও উন্নয়নকে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে আনা। জন সুরযের নিজস্ব বক্তব্যেও এই বিষয়ভিত্তিক রাজনীতির উপর জোর দেওয়া হয়েছিল।

এ পরিবর্তনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় উদাহরণ তামিলনাড়ু। প্রায় ছ’-দশক ধরে ডিএমকে ও এআইএডিএমকে-র দ্বিমেরু রাজনীতিতে ‘তৃতীয়’ কোনও শক্তির পক্ষে জায়গা তৈরি করা সহজ ছিল না। সেই জায়গাতেই অভিনেতা থলপতি বিজয়ের তামিলগা ভেট্রি কাজাগামের (‘টিভিকে’) উত্থান নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ।

কিন্তু ২০২৫ সালের বিহার বিধানসভা নির্বাচনে সেই পরীক্ষার প্রথম ফল ছিল হতাশাজনক। ২৩৮টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেও জন সুরয একটিও আসন জিততে পারেনি; ভোটের হার ছিল প্রায় ৩.৪৪ শতাংশ। কিন্তু গল্প সেখানেই শেষ হয়নি। সম্প্রতি, বাঁকিপুর উপনির্বাচনে প্রশান্ত কিশোরের জয় দেখিয়ে দিল, একটি রাজনৈতিক উদ্যোগের প্রথম ব্যর্থতা তার শেষ পরিচয় নয়। বরং নির্বাচনী ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সংগঠন ও কৌশল বদলানোর সুযোগও থাকে। সাম্প্রতিক সেই জয় জন সুরজকে আবার জাতীয় রাজনৈতিক আলোচনায় ফিরিয়ে এনেছে।

তবে নতুন রাজনীতির সবচেয়ে আকর্ষণীয় পরীক্ষাগুলির একটি সম্ভবত কে. আন্নামালাইয়ের ক্ষেত্রে। প্রাক্তন আইপিএস অফিসার এবং তামিলনাড়ু বিজেপির প্রাক্তন সভাপতি ২০২৬ সালের ৫ জুন দল ছাড়ার পর ‘উই দ্য লিডার্স’ নামে একটি নতুন রাজনৈতিক আন্দোলনের সূচনা করেছেন। তাঁর বক্তব্যে ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতি, বংশগত প্রভাব ও অন্ধ আনুগত্যের পরিবর্তে নাগরিক অংশগ্রহণ, প্রযুক্তি এবং তথ্যনির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণের উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, আন্দোলনটি ভবিষ্যতে রাজনৈতিক দলে রূপ নিতে পারে এবং ২০৩১ সালের তামিলনাড়ু বিধানসভা নির্বাচনকে ‘লক্ষ্য’ করা হচ্ছে।

বাঁকিপুর উপনির্বাচনে প্রশান্ত কিশোরের জয় দেখিয়ে দিল, একটি রাজনৈতিক উদ্যোগের প্রথম ব্যর্থতা তার শেষ পরিচয় নয়। বরং নির্বাচনী ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সংগঠন ও কৌশল বদলানোর সুযোগও থাকে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত রয়েছে। নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক উদ্যোগগুলি সবসময় সঙ্গে সঙ্গে নির্বাচনে জিততে চাইছে না। কেউ সংগঠন তৈরি করছে, কেউ নাগরিক আন্দোলন গড়ে তুলছে, কেউ আবার দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক বিনিয়োগের পথে হাঁটছে। অর্থাৎ, রাজনীতিতেও আগে ভিত শক্ত করা,
পরে বড় পরিসরে যাওয়ার মতো একটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

এর সবচেয়ে অভিনব উদাহরণ ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। ২০২৬ সালের মে মাসে অভিজিৎ দিপকের নেতৃত্বে এই ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক আন্দোলনের জন্ম। একটি সুপ্রিম কোর্টের শুনানিতে করা ‘ককরোচ’ মন্তব্যকে কেন্দ্র করে ক্ষুব্ধ তরুণদের অনলাইন প্রতিক্রিয়া দ্রুত একটি সংগঠিত রাজনৈতিক পরিচয়ে পরিণত হয়। কয়েক দিনের মধ্যেই সেটি সমাজমাধ্যম থেকে রাস্তায় নেমে আসে।

সিজেপিকে অবশ্য প্রচলিত রাজনৈতিক দল হিসাবে দেখলে ভুল হবে। তাদের বর্তমান অবস্থান বরং একটি চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠীর মতো। সাম্প্রতিকে তারা জানিয়েছে, আপাতত নির্বাচনে না গিয়ে শিক্ষা, বেকারত্ব ও প্রশাসনিক সমস্যাকে কেন্দ্র করে জনমত গড়ে তুলবে। অর্থাৎ, রাজনীতির ময়দানে প্রবেশের পথ যে শুধু নির্বাচনী দল গঠনই হতে হবে, এমন নয়। সিজেপি তার একটি নতুন উদাহরণ।

এই পরিবর্তনের নেপথ্যে রয়েছে ভোটারেরও পরিবর্তন। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের কাছে নেতার পারিবারিক পরিচয়ের চেয়ে তাঁর কাজ, যোগাযোগের ক্ষমতা, স্বচ্ছতা এবং ফল দেওয়ার সামর্থ্য অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম রাজনীতির পুরনো একমুখী যোগাযোগের ধারা বদলে দিয়েছে। এখন নেতা শুধু মঞ্চে বক্তৃতা দেন না। তাঁকে প্রতিদিন মানুষের প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়। নিজের কাজের হিসাব দিতে হয়। দ্রুত প্রতিক্রিয়াও জানাতে হয়।

তবে এটাও ঠিক যে, নতুন প্রযুক্তি, পেশাদার নির্বাচনী প্রচার কিংবা সমাজমাধ্যম কোনওটিই জাতপাত, ধর্ম বা পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতিকে রাতারাতি শেষ করে দেয় না। বরং পুরনো রাজনৈতিক সমীকরণের সঙ্গে নতুন প্রযুক্তি মিলেও নতুন ধরনের রাজনীতি তৈরি হতে পারে। তাই ‘স্টার্টআপ রাজনীতি’ মানেই পুরনো রাজনীতির মৃত্যু– এমন সিদ্ধান্ত এখনই নেওয়া সম্ভব নয়।

বরং পরিবর্তনটি হচ্ছে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার পদ্ধতিতে। আগে যেখানে সংগঠন তৈরি হতে দশক লেগে যেত, এখন সমাজমাধ্যমে কয়েক মাসের মধ্যে একটি রাজনৈতিক বক্তব্য বা প্রচার তৈরি হতে পারে। আগে যেখানে কোনও নতুন নেতার গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হত, এখন একটি জনপ্রিয় আন্দোলন বা শক্তিশালী ডিজিটাল প্রচার মুহূর্তের মধ্যে জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসতে পারে।

আগামী দিনে আসন পুনর্বিন্যাস বা ‘ডিলিমিটেশন’-ও ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্রে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে। ফলে পুরনো রাজনৈতিক দলগুলির সামনে চ্যালেঞ্জ শুধু বিরোধীদের মোকাবিলা করা নয়; নিজেদেরও বদলে ফেলা। দীর্ঘ রাজনৈতিক ঐতিহ্য কোনও দলের সম্পদ হতে পারে। কিন্তু সেটি যদি পরিবর্তনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তবে সেই ঐতিহ্যই একদিন বোঝা হয়ে উঠতে পারে।

ভারতের রাজনীতিতে তাই একটি নতুন প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। লড়াইটা শুধু কে কত পুরনো, তা নিয়ে নয়। লড়াইটা কে সময়ের সঙ্গে কতটা বদলাতে পারে, তা নিয়েও। নতুন রাজনৈতিক স্টার্টআপের সবাই যে সফল হবে, এমন নয়। কেউ হয়তো ব্যর্থ হবে। কেউ হারিয়ে যাবে। আবার কেউ একদিন প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হবে। কিন্তু তাদের উত্থান পুরনো দলগুলির সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রেখে দিয়েছে। শুধু বংশপরিচয়, পুরনো ভোটব্যাঙ্ক বা দীর্ঘ দিনের সংগঠনের জোরে কি আর রাজনীতিতে টিকে থাকা সম্ভব? নতুন প্রজন্ম আরও বেশি করে জানতে চায়, তার জীবনে রাজনীতি কী বাস্তব পরিবর্তন আনতে সক্ষম। ভারতের রাজনীতির এই নতুন অধ্যায় কোথায় গিয়ে শেষ হবে, তা এখনই বলা কঠিন। তবে একটা বিষয় পরিষ্কার– রাজনীতির পুরনো বাজারে নতুন খেলোয়াড় ঢুকে পড়েছে। আর তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হলে পুরনোদেরও বদলাতে হবে।

(মতামত নিজস্ব)

Advertisement

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Share this article on

The article link is copied.