বন্ধ হতে চলেছে মস্কোর গুলাগ মিউজিয়াম। ইতিহাসের ধারা-ই হয়তো এমন। এক আমলের সংগ্রাম, ভিন্ন আমলের শাসক এসে আড়াল করে দিতে চায়। তবু, মুছে কি দেওয়া যায় সবকিছু? লিখছেন নীলাঞ্জন মুখোপাধ্যায়।
সংবাদে প্রকাশ, মস্কোর গুলাগ ইতিহাসের মিউজিয়াম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। জোসেফ স্তালিনের তৈরি শ্রমশিবিরের নানা নিদর্শন, সংরক্ষণ করে রাখার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ছিল এইটি। এর বদলে, তৈরি হচ্ছে হিটলারের অত্যাচারের ইতিহাস ধরে রাখার জন্যে জাদুঘর। সোভিয়েত দেশের জনগণের উপর কত অন্যায় অবিচার গণহত্যা হয়েছে, তার বিবরণ থাকবে সেখানে।
আরও পড়ুন:
অগ্নি-সুরক্ষা বিধি যথাযথ অনুসরণ করা হচ্ছে না– এই অভিযোগে মিউজিয়ামে জনগণের প্রবেশ ‘নিষিদ্ধ’ করা হয়েছিল ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে। নগরোন্নয়ন দপ্তরের সংস্কৃতি বিভাগের এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছিল সে-কথা। নাৎসি যুগের অত্যাচারে পীড়িত সোভিয়েত মুলুকের মতোই যেন হালের ইউক্রেন দ্বারা আক্রান্ত রাশিয়ার; প্রেসিডেন্ট পুতিন যেন এমনই একটা বার্তা দিতে চাইছেন। হ্যাঁ, সাবেক সোভিয়েত যুগে এখানকার নাগরিকদের উপর নাৎসি অত্যাচার হয়েছিল বটে। তার চেয়ে অনেক বেশি অত্যাচার করেছিল সোভিয়েত তার নিজেদের নাগরিকদের উপর, স্তালিনের আমলে, এমনই জনশ্রুতি। ক্রেমলিনের শাসকরা বাইরের দুনিয়া থেকে সেসব আড়ালে রাখতে চেয়েছেন অনেক দিন।
অগ্নি-সুরক্ষা বিধি যথাযথ অনুসরণ করা হচ্ছে না– এই অভিযোগে মিউজিয়ামে জনগণের প্রবেশ ‘নিষিদ্ধ’ করা হয়েছিল ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে। নগরোন্নয়ন দপ্তরের সংস্কৃতি বিভাগের এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছিল সে-কথা।
নিকিতা সলকভ একজন ইতিহাসবিদ, নিজের দেশ ছেড়ে এখন জার্মানিতে থাকেন; বলেছেন, রাশিয়া নিজের নাগরিকদের উপর যে অন্যায়-অত্যাচার করেছে, তার বিশদ বিবরণ বর্তমান শাসকদের কাছে খুব অস্বস্তিকর। নিজেকে যারা বিশ্বের এক বিশাল শক্তি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়, তাদের উজ্জ্বল ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় যেন কোনও কালো ছায়া না থাকে, এমনই শাসক-মনোভাব।
গুলাগ মিউজিয়ামে নানা সেমিনারে একদা অংশগ্রহণ করেছেন নিকিতা। স্তালিনের আমলে গণহত্যা ও আনুষঙ্গিক অমন অনেক কিছু সেখানে চর্চিত হয়েছে। লক্ষাধিক নাগরিকের বন্দি দশার বিবরণ প্রকাশ্যে এসেছিল ১৯৯১ সালের পর। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙেচুরে পালটে যখন রাশিয়ায় রূপান্তরিত হল। কিন্তু গত এক দশক ধরে, যখন থেকে ভ্লাদিমির পুতিন এসেছেন ক্রেমলিনের শীর্ষে, সেসব বৃত্তান্ত ছোট করে দেখানোর চেষ্টা চলছে।
গুলাগ বন্দিশিবিরে, কাঠের কী কী জিনিস তৈরি করানো হত বন্দিদের দিয়ে, রক্ষীদের সঙ্গে কী কী নিয়ে সংঘাত হত, তাও নিখুঁত ধরে রাখা ছিল মিউজিয়ামে। ২০১৫ সালে সেসব সরিয়ে ফেলা হয়। ২০২২ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছিল ‘মেমোরিয়াল’ নামেরই এক মানবাধিকার সংস্থা, স্তালিনের অপরাধের বিবরণ বিধৃত ছিল তাদের নথিপত্রে। সংস্থাটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, কর্মীরা প্রায় প্রত্যেকেই দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছেন। নিকিতা সলকভ কিছু পঞ্জীকরণের দায়িত্বে ছিলেন। স্তালিনের অত্যাচারে নিহত বা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হওয়া মানুষদের বাড়িঘর, ফলক লাগিয়ে চিহ্নিত করার দায়িত্ব পালন যিনি করেছেন, এখন তিনি নিজেই দেশান্তরি। ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধ বাধল যখন, তখন থেকেই শুরু হয়েছে সে-সব ফলক নষ্ট করে দেওয়া, তিনিই জানালেন।
২০২২ সাল, মানে ইউক্রেন যুদ্ধের শুরুর বছর থেকেই বন্ধ হয়েছে রাজনৈতিকভাবে অত্যাচারিত নাগরিকদের স্মরণ অনুষ্ঠান উদ্যাপন। সোভিয়েত যুগে যারা নিহত ও অত্যাচারিত, তাদের নাম উচ্চরবে পাঠ করা হত পুলিশের সদর দপ্তরের সামনে। গুলাগ মিউজিয়াম স্থাপিত হয় ২০০১ সালে। আন্তনভ অভসেয়েঙ্ক এর অন্যতম স্থপতি। তঁার পিতা যুদ্ধ করেছিলেন বলশেভিকদের হয়ে। মাকে কারাগারে ফঁাসিতে ঝোলানো হয়। মস্কো শহরের উপকণ্ঠে খুবই ছোট আকারে আরম্ভ হয়েছিল মিউজিয়ামটি। নতুন ভবন হল ২০১৫ সালে।
স্তালিনের অত্যাচারে নিহত বা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হওয়া মানুষদের বাড়িঘর, ফলক লাগিয়ে চিহ্নিত করার দায়িত্ব পালন যিনি করেছেন, এখন তিনি নিজেই দেশান্তরি।
আলেকজান্ডার সল্ঝেনিতসিনের লেখা পড়ে বিশ্ববাসী প্রথম জেনেছিল গুলাগ নির্বাসন প্রসঙ্গ। তঁার স্ত্রী, নাতালিয়া রিশেতভস্কায়া, যিনি নির্বাসিত মানুষদেরই একজন, এই মিউজিয়ামের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, এখনকার প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা জানেই না, কত নিহত মানুষের হাড়গোড়ের উপর দিয়ে তারা হেঁটে চলেছে…।
ইতিহাসের ধারাই হয়তো এই। এক আমলের সংগ্রাম, ভিন্ন আমলের শাসক এসে আড়াল করে দিতে চায়। তবু, মুছে কি দেওয়া যায় এভাবে সবকিছু? ভাঙা দরজা জানালার কনসেনট্রেশন ক্যাম্প থেকে কিছু ডায়েরির লিখিত ইতিহাস, বন্দিদের অঁাকা কার্টুন ছবি, রয়ে যায় সব-ই। বরং মুখে মুখে গল্প ছড়ায় অনেক বেশি।
এক আমলের সংগ্রাম, ভিন্ন আমলের শাসক এসে আড়াল করে দিতে চায়। তবু, মুছে কি দেওয়া যায় এভাবে সবকিছু?
(মতামত নিজস্ব)
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
আন্সেলোত্তি বোঝালেন, কেন তিনি সেরা, এই ব্রাজিল স্বপ্ন দেখাচ্ছে ব্যারেটোকেও
-
অভিষেকের সেবাশ্রয়ে দুর্নীতির পাহাড়, হোমিওপ্যাথি ডাক্তারদের দিয়ে মর্ডান চিকিৎসা! আর কী হত?
-
নার্সের সামনে স্যালাইনের চ্যানেল খুলতে গিয়ে সদ্যোজাতের আঙুল কাটল ওয়ার্ড বয়! চাঞ্চল্য মালদহে
-
‘আমার বায়ুমণ্ডল…’, জন্মদিনে শ্রীময়ীকে আদুরে শুভেচ্ছা জানিয়েও কেন সতর্ক করলেন কাঞ্চন?
-
বিশ্বকাপে ব্যর্থতাতেও নেতৃত্বে হরমনই, অলিম্পিকের ছক কষে ঘোষিত এশিয়াডে ভারতের মহিলা দল!