এখন ২০ সাংসদের দিকে তাকিয়ে হাহাকার করে লাভ নেই। তাদের ‘বেইমান’ বলেই-বা কী হবে! কাদের টিকিট দেওয়া হচ্ছে একবারও কি মূল্যায়ন করা হয়েছিল? ভোটে দাঁড় করানোর সময় তৃণমূল নেতৃত্ব কি নিশ্চিত ছিল– দুর্দিনে এঁরা দলে থাকবেন, পালাবেন না! এঁদের ক’জন আদতে পলিটিশিয়ান! তৃণমূল দলে ছাঁকনির কোনও ব্যবস্থাই নেই। প্রার্থীচয়নে তাৎক্ষণিক পরিস্থিতি প্রাধান্য পায়। প্রকৃত দাবিদার বঞ্চিত হয়। কংগ্রেস ঘরানার দলে প্রার্থী হওয়ার ইঁদুরদৌড় স্বাভাবিক। কিন্তু এই দলে ‘নেপোয় মারে দই’-এর সংখ্যা বেশি। এক সময় ডাক্তার-ব্যারিস্টার, ইঞ্জিনিয়ার-অধ্যাপক-গবেষকদের সাধারণ নির্বাচনগুলিতে প্রার্থী করত কংগ্রেস। শুরুতে তৃণমূলেও সেই ব্যবস্থা ছিল। অজিত পাঁজার মতো আইনজীবী, কৃষ্ণা বসুর মতো শিক্ষাবিদ, রঞ্জিত পাঁজার চিকিৎসক, আইএএস বিক্রম সরকারের মতো ব্যক্তিত্ব মমতার সাংসদ ছিলেন। কিন্তু কালক্রমে অন্য দল থেকে আসার লোক ও ছায়াছবি জগতের আনাগোনা রাজনীতির মেধাকে গ্রাস করে। কবি-গায়ক-চিত্রকররা ভিড় করতে থাকতে থাকেন। আদতে এঁরা প্রত্যেকে রংবদলের যাত্রী। কেউ মনেপ্রাণে তৃণমূল নন। যেমন হাওয়া তেমন ঢেউয়ে ভাসেন।
বলছি না– এঁদের মধ্যে ‘যোগ্য’ কেউ ছিলেন না। কিন্তু মমতার মুখই যখন ভোটে জেতার একমাত্র রসায়ন, তখন এই পরিযায়ী শ্রেণি কেন প্রাধান্য পেতে থাকল ঈশ্বর জানে! এর ফলে অতি সহজে দুর্মূল্য রাজ্যসভা আসন যেমন পেয়ে যেতে লাগলেন অনেক বহিরাগত, তেমন বিধানসভা লোকসভা নির্বাচনের টিকিট বাজারি সিরিয়াল তারকা হাসতে হাসতে নিয়ে চলে গেলেন বুথে লড়াই করা পুরনো দিনের কর্মীর স্বপ্ন চুরমার করে। জাঁকজমক ও চাকচিকে্যর পথে ছুটতে গিয়ে দলের সম্পদ আসলে কারা সেই মূল্যায়ন হারিয়ে যেতে থাকল। এমনই সেই ভুল যে শুভেন্দু অধিকারীর মতো তরুণ তুর্কি নেতাকে দল ছাড়তে বাধ্য করা হল, অথচ বরণ করা হয় অন্য দল থেকে আসা ‘মাছ চোর’ মার্কা নেতাদের। এবারের লোকসভা ভোটে যাঁরা জিতেছিলেন, অনেকেই আছেন যাঁদের দলের লড়াইয়ে বিন্দুমাত্র ভূমিকা নেই। সেক্ষেত্রে এঁদের আপনি ডুবন্ত জাহাজে বসিয়ে রাখবেন কোন আনুগত্যে! স্বাভাবিক নিয়মে ‘লাইফ জ্যাকেট’ জোগাড় করে এঁরা পালিয়েছেন।
আরও পড়ুন:
মমতা বন্দ্যোপাধায় এখন রাজ্যের মুখমন্ত্রী নন। তাঁর হাতে কোনও ক্ষমতা নেই। তাঁর কাছ থেকে কিছু পাওয়ার নেই। ফলে এঁদের থাকার কোনও দায় ও দায়িত্ব নেই। তাই নতুন কিছু ঘটেনি। দলটা যেহেতু সেদিনও দুই-তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে ক্ষমতায় ছিল, লোকসভা রাজসভায় ৪২ সাংসদ, সব পুরসভা পঞ্চায়েত হাতের মুঠোয়, তাই এখন চোখে লাগছে।
আসলে জন্মলগ্ন থেকে তৃণমূলে এভাবে যাওয়া-আসা স্রোতে ভাসা চলছেই। তাতে নেতৃত্বের কোনও শিক্ষা হয় না। আদর্শগতভাবে যেহেতু কেউ এই দল করতে আসে না, অবারিত দ্বার বলে শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা সবসময় ঢোকা যায়, সেজন্য যার যখন প্রয়োজন হয়– এখানে বাজার করতে আসে, আবার ফিরে যায়। কোনও চেক অ্যান্ড বালান্স নেই। ‘সুবিধাভোগী শ্রেণি’ জানে তৃণমূল নেত্রীর নজরে আসতে হবে। তাহলেই কেল্লা ফতে। প্রণব মুখোপাধ্যায় একবার বলেছিলেন, ‘মমতার তৃণমূল কোনও দল নয়, আসলে একটা কোয়ালিশন। সবাই এই জোটে জায়গা পায়।’ কথাটা ভুল নয়। কংগ্রেসের গর্ভ থেকে জন্মালেও তাদের ভোটব্যাঙ্ক শুষে নিলেও পরে দেখা যায় সব ধরনের মানুষের প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠেছে তৃণমূল।
জাতীয়তাবাদী, সমাজতন্ত্রী, সংঘসেবক, বাম, অতি বাম, ধর্মীয় গুরুর সমাহার অভাবনীয়। তাঁরা পদ পান। ভোটে লড়ে মন্ত্রী-সাংসদও হন। প্রত্যেকে নতজানু হয়ে মেনে নেন মমতা বন্দ্যোপাধায়কে। কারণ তিনিই এপিসেন্টার। তাঁর ছবি থাকলে তবেই ভোট। ফলে এঁদের কেউ তেল মারতে বলেছেন, মমতাই সর্বকালের সেরা। কেউ বলেছেন– মমতার পুজো হবে
৩০০ বছর পর। কেউ আবার বলেছেন– মমতা আসলে অতি মানবী, বাঘিনি। কিন্তু কেউ একজন বলেননি– দিদি, এই সিদ্ধান্তটি ভুল, ওই পদক্ষেপ নেওয়া যাবে না। সবাই নিজের নম্বর বজায় রাখতে বলে গিয়েছেন, ঠিক ঠিক ঠিক।
আদতে এই ব্যক্তিরা কালের হাওয়া মোরগ। এঁদের কাছে ক্ষমতা, লাল-নীল বাতি, মঞ্চ-অালো-পদ ইত্যাদি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আলো নেই পদ নেই, তাঁরাও নেই। মমতা পর পর ভোটে সাফল্য পেয়েছেন তাঁর প্রতি সাধারণ মানুষের সমর্থন ছিল বলেই। অগণিত কর্মী, লড়াকু নেতারা পাড়ায় গ্রামে লড়াই করেছিলেন বলেই। কিন্তু পরিতাপ হল এই যে, মমতা বারবার মুখে ‘কর্মীরাই আমার সম্পদ’ বলে তাঁদের খুশি করলেও দলে গুরুত্ব পেয়ে গিয়েছেন ‘বহিরাগত’রাই। তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী বারবার প্রতারিত হয়েও শিক্ষা নেননি। যিনি শত্রু শিবিরে চলে গিয়েছেন, আবার তাঁকে ফিরিয়ে নিয়ে তিনি মালা পরিয়েছেন। শুধু সম্মান নয়, সাংসদ-মন্ত্রী করেছেন। অসংখ্য উদাহরণ গত ২৮ বছরে। বহিরাগতদের দলে নেওয়ায় তত্ত্ব মমতার মাথায় ঢুকিয়ে ছিলেন প্রয়াত নেতা মুকুল রায়। তাঁর থিওরি ছিল, যে আসতে চাইছে তাকে নিতে হবে। বিরোধীদের দুর্বল করতে তাদের ঘর ভেঙে লোক নিতে হবে। মুকুলবাবুর সাংগঠনিক বুদ্ধির তারিফ করতে হয়। কিন্তু এক্ষেত্রে তাঁর পরামর্শ ছিল ভুল। তৃণমূলের গঠনতন্ত্র সংবিধান বিজেপি কংগ্রেস বা সিপিএমের মতো পোক্ত ভিতের উপর দাঁড়িয়ে তৈরি হয়নি। ছিল মূলত আবেগ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাকে শক্তিশালী করার দরকার ছিল। তা না করে দলের ভিতর যদি খাল-বিলের স্রোত ঢুকিয়ে দেওয়া হয় তা হলে নদী নাব্যতা হারাবেই। একদিন দলের পতাকা বেহাত হবে। রাতারাতি সংসদীয় দল অনামী দলের সম্পত্তি হয়ে যাবেই। এখন সেই ছবিটাই সামনে। স্রষ্টাকে বলা হচ্ছে, দল তাঁর নয়!
১৯৯৭ সালে ২২ ডিসেম্বর, যেদিন কংগ্রেস থেকে বহিষ্কৃত হন মমতা, সেদিন তঁার পাশে কিছু যুব নেতা ছাড়া কেউ ছিল না। কিন্তু কংগ্রেসের সমর্থক তথা সিপিএম বিরোধী জনতা নতুন দল তৃণমূল কংগ্রেসকে সমর্থন করছেন বুঝতে পেরে অজিত পাঁজা, সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়দের মতো বহু নেতা মমতার পাশে এসে দাঁড়ান। জিততে পারবেন বুঝেই ভোটপ্রার্থী হন। ১৯৯৮ সালে ৭ আসন, ১৯৯৯ সালের ৮টি লোকসভা আসন জেতার পর সুব্রত মুখোপাধ্যায়ও কংগ্রেস ছেড়ে মমতার দলে নাম লিখিয়ে কলকাতা পুরসভার মেয়র হন। আরও অনেক কংগ্রেস নেতা-বিধায়ক আসতে থাকেন। সেই কংগ্রেসি স্রোত ছিল স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। ২০০১ সালে বিধানসভা ভোটে হারার পর বিপরীতমুখী স্রোত শুরু হয়। অজিতবাবু মমতাকে ছেড়ে চলে যান। প্রেস ক্লাবে সাংবাদিক বৈঠক করে তাঁকে ‘মেগালোম্যানিয়াক’ বলতেও কসুর করেননি। নতুন দল করে মমতাকে দেখে নেওয়ার হুমকিও দেন। ২০০৪ সালে আরও বিপর্যয়। ৯ আসন হারিয়ে লোকসভায় মমতার একা হয়ে যাওয়ার পর তাঁকে ছেড়ে পালানোর হিড়িক পরে। মমতাকে এড়িয়ে বাজপেয়ী সরকারের ঘনিষ্ঠ হতে গিয়েছিলেন সুদীপবাবু। কালক্রমে তাঁকে দল বহিষ্কার করে। ২০০৬ সালে বিধানসভা ভোটে আগে ৬ বছরের শাস্তির খবর শুনে তিনি হিন্দ সিনেমার সামনে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, ‘৬ বছর দলটা টেকে কি না দেখুন।’ পরে তিনি কংগ্রেসের টিকিটে বিধায়ক হন। কিন্তু ২০০৮ সালে সেই সুদীপবাবুকে ফের তৃণমূলে নেন মমতা। সঙ্গে সোমেন মিত্র। যে সোমেনবাবুর সঙ্গে বিরোধের জেরে তৃণমূল কংগ্রেসের জন্ম, তিনি মমতার প্রতীক নিয়ে ২০০৯ সালে ডায়মন্ড হারবারে জয়ী হন। সুদীপবাবু কলকাতা উত্তরে জয়ী। সেদিনও কিন্তু আনুগত্যের দাম পাননি তাপস রায়। ওই লোকসভা ভোটে বামফ্রন্ট পরাজিত হয়। সবাই বুঝতে পারে ২০১১ সালে পরিবর্তন আসন্ন।
তৃণমূল দরজা হাট করে খুলে দেয়। ৩৪ বছর পর সিপিএমের পরাজয়ের পর সবার আশ্রয় হয়ে ওঠে তৃণমূল। দলের বাঁধন আলগা হতে শুরু সেই সময় থেকেই। এখন পঞ্চায়েত থেকে আরও উঁচু স্তরে লুঠপাট আর দুর্নীতির দায়ে বিদ্ধ দল। সে-ই ভুলের মাশুল। ১৫ বছর পর ক্ষমতা হারিয়ে তৃণমূল নেত্রী দেখছেন তাঁর ২০ লোকসভার সদস্য নতুন দলে নাম লিখিয়েছেন, ৬০ বিধায়ক বলছেন, ‘আমরাই আসল তৃণমূল’। ভেঙে যাচ্ছে পুরসভা পঞ্চায়েত থেকে জেলা পরিষদ। জনপ্রতিনিধিদের কারও দলের প্রতি দায় নেই। তাঁরা অপেক্ষা করছেন শাসক কখন দরজা খোলে। এঁরা আর কেউ ‘বিরোধী’ হয়ে কষ্ট ভোগ চায় না।
এ এক আশ্চর্য ‘শেষের কবিতা’! ভোটে হার-জিত থাকেই, কত রাজ্যে কত দল হারছে। কিন্তু তাই বলে এভাবে পলায়ন! ‘আদর্শহীনতা’ আর কাকে বলব!
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
‘মার্ডার করে দিয়েছি, নিয়ে যা’, বিজেপি কর্মীকে খুনের পর পরিবারকে ফোনে জানাল খুনি!
-
বাংলায় ‘ল্যান্ড জিহাদ’! বাজেট ভাষণে রাজ্যপালের শঙ্কা, ‘অনুপ্রবেশে বদলাচ্ছে জনবিন্যাস’
-
ফেসবুক থেকে হোয়াটসঅ্যাপ, মেটা-র অ্যাপ ব্যবহারে এবার খসবে গাঁটের কড়ি! চালু সাবস্ক্রিপশন ফি
-
হিমাচলে ভয়ংকর দুর্ঘটনা, গভীর খাদে পড়ল গাড়ি, মৃত ৭
-
কঠিন সময় মেসির, গোলের পর অঝোরে কান্নার নেপথ্যে বাবার অসুস্থতা?