চন্দ্রচূড় ঘোষ: আজকের পশ্চিমবঙ্গ সুভাষচন্দ্রের মূল কর্মভূমি হওয়া সত্ত্বেও এখানে তাঁর প্রতি মনোভাবে একটা অদ্ভুত বৈপরীত্য দেখা যায়। যদিও সাধারণ মানুষের মননে ও আবেগে সুভাষচন্দ্রের প্রভাব ব্যাপক, কিন্তু সমাজে বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে মহাত্মা গান্ধীর প্রতি প্রবল আকর্ষণ বেশি করে চোখে পড়ে। কারণ, তা বেশি করে প্রতিফলিত হয় সাহিত্য ও শিল্পে, আলোচনা ও বিতর্কসভায়। ধরনায় বসতে হলে বা মিছিল করতে হলেও বেছে নেওয়া হয় কোনও গান্ধীমূর্তির পাদদেশ।
সুভাষচন্দ্রের অন্তর্ধান রহস্যের সত্য উদ্ঘাটনেও এক-দুজন ছাড়া বাঙালি সাংসদদের মধ্যে কেন্দ্র সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করার আগ্রহ লক্ষ করা যায় না। অথচ এ কথা সবাই জানেন যে বিয়াল্লিশজন সাংসদের মধ্যে যদি দশজনও এ বিষয়ে সংসদে ধরনায় বসেন, তাহলে কেন্দ্রে কোনও সরকারই তা অগ্রাহ্য করতে পারবে না। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সুভাষচন্দ্রের কার্যকলাপের ফলেই যে ব্রিটিশরাজ তড়িঘড়ি পলায়ন করে, সে কথা প্রাক্তন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্বীকার করলেও জোর গলায় কোনও বাঙালি নেতা বা বুদ্ধিজীবীকে বলতে শোনা যায় না। এর পরিপ্রেক্ষিতেই বিশেষ করে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে গান্ধী-সুভাষের পারস্পরিক সম্পর্কের পুনর্মূল্যায়ন।
১৯৪৪ সালের ৬ জুলাই সুভাষচন্দ্র বসু একটি রেডিও সম্প্রচারে গান্ধীজিকে ‘জাতির পিতা’ বলে সম্বোধন করেন। এই উপাধিটি ‘মহাত্মা’-র মতোই গান্ধীর নামের সঙ্গে চিরকালের মতো জুড়ে যায়। এর ফলে কিছু ইতিহাসবিদ এবং রাজনীতিবিদ দাবি করেন যে গান্ধীর সঙ্গে তীব্র মতবিরোধ থাকা সত্ত্বেও, সুভাষ গান্ধীবাদী রাজনৈতিক দর্শন, কর্মসূচি এবং নেতৃত্ব মেনে নিয়েছিলেন। এই যুক্তিটিকেই সম্প্রসারিত করে বলা হয়ে থাকে যে বিশ্বযুদ্ধের পরে যদি তিনি ভারতীয় রাজনীতিতে ফিরে আসতেন, তাহলে সুভাষচন্দ্র ভারতের সামাজিক ও রাজনৈতিক ভাবমূর্তির কেন্দ্রে গান্ধীকে গ্রহণ করতে দ্বিধা করতেন না। যে প্রশ্নটি এই রাজনীতিবিদ এবং ইতিহাসবিদদের উত্থাপন করা উচিত, কিন্তু তাঁরা করেন না, তা হলে কেন এই উপাধিটি দিয়েছিলেন গান্ধীর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, কোনও গান্ধী-পূজক নেতা নয়? এই আপাত পরস্পরবিরোধী ঘটনাটি বুঝতে হলে দুই নেতার মধ্যে সম্পর্কের সম্পূর্ণতা পরীক্ষা করা অপরিহার্য।
১৯২১ সালে ইংল্যান্ড থেকে আইসিএস থেকে পদত্যাগ করার পর কলকাতায় ফেরার পথে বোম্বেতে গান্ধীর সঙ্গে দেখা করার সময় চব্বিশ বছর বয়সি সুভাষের প্রথম ধারণাটি অনুকূল ছিল না। স্বরাজের জন্য গান্ধীর পরিকল্পনার কার্যকারিতা সম্পর্কে তিনি সন্তুষ্ট হতে পারেননি। তাঁর মনে হয় যে “মহাত্মার পরিকল্পনার মধ্যে স্পষ্টতার শোচনীয় অভাব ছিল এবং ভারতকে তার স্বাধীনতার লক্ষ্যে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সংগ্রামের ধারাবাহিক পর্যায়গুলি সম্পর্কে তাঁর নিজেরই স্পষ্ট ধারণা ছিল না।” বাস্তবতা হল জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে –মানসিক বা শারীরিক – সুভাষ এবং গান্ধীর চেয়ে ভিন্ন ব্যক্তিত্ব কল্পনা করা কঠিন। তাঁদের জীবনদর্শন, ভারতের ঐতিহ্যের ব্যাখ্যা, ধর্মের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি এবং স্বাধীন ভারতের উন্নয়নের ধারণা– প্রায় প্রতি ক্ষেত্রেই তাঁদের ব্যবধান ছিল অনতিক্রমণীয়। স্বাভাবিকভাবেই, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম পরিচালনা করার ক্ষেত্রেও তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল।
১৯২৮ সালের কলকাতার কংগ্রেস অধিবেশনেই সুভাষ প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে গান্ধীর বিরোধিতা করেন। ব্রিটিশ সরকারের কাছে গান্ধীর ভারতকে ডোমিনিয়নের মর্যাদা দেবার প্রস্তাবের বিরোধিতা করে দাবি তোলেন সম্পূর্ণ স্বাধীনতার। ১৩৫০ জন প্রতিনিধি সুভাষের সংশোধনীর বিরুদ্ধে ভোট দিলেও তিনি ৯৭৩ জনের সমর্থন লাভ করেন। গান্ধী তাতে একদমই খুশি হননি। সুভাষের নেতৃত্বে কংগ্রেস স্বেচ্ছাসেবকদের সামরিক স্টাইলে মহড়ায় এতটাই অসন্তুষ্ট হন যে তা নিয়ে বিদ্রুপ করতেও ছাড়েননি। এসব ঘটনার কিছু আগেই সর্বভারতীয় যুব কংগ্রেসের এক সভায় বক্তৃতা দিতে গিয়ে সুভাষ সবরমতী চিন্তাধারার ‘প্রভাব এবং পরিণতি’র তীব্র সমালোচনা করেন। পরের বছর অক্টোবরে, ভাইসরয় লর্ড আরউইন ঘোষণা করেন যে ব্রিটিশ সরকার ভারতের সাংবিধানিক অগ্রগতি – যার লক্ষ্য ডোমিনিয়ন স্ট্যাটাস –নিয়ে আলোচনার জন্য ব্রিটিশ ভারত এবং ভারতীয় রাজ্যগুলির প্রতিনিধিদের একটি সম্মেলন আয়োজন করতে চলেছে।
গান্ধীর নেতৃত্বে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলির নেতারা ভাইসরয়ের ঘোষণার আন্তরিকতার প্রশংসা করে এবং ডোমিনিয়ন সংবিধানের পরিকল্পনা তৈরির প্রক্রিয়ায় সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়ে একটি ইসতেহার জারি করেন। অন্যদিকে সুভাষ লাহোরের সাইফুদ্দিন কিচলু এবং পাটনার আবদুল বারীর সঙ্গে একটি পালটা বিবৃতি জারি করেন যে ভাইসরয়ের ঘোষণায় “এমন কিছু নেই যা নিয়ে আমরা উৎসাহিত হতে পারি”। তাঁর বক্তব্য ছিল, ব্রিটিশ সরকারের বক্তব্য দ্বারা বিভ্রান্ত হওয়ার পরিবর্তে, পরবর্তী সংগ্রামের জন্য প্রস্তুতি শুরু করা উচিত। ২৩ ডিসেম্বর গান্ধী এবং অন্যান্য নেতাদের সঙ্গে এক বৈঠকে ভাইসরয় প্রস্তাবিত সম্মেলনটিকে ডোমিনিয়ন সংবিধান প্রণয়নের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ করতে অস্বীকৃত হলে সুভাষের কথাই সঠিক প্রমাণিত হয়।
এরপর আগামিকাল
সর্বশেষ খবর
-
বদলে যাবে সোদপুর ও খড়দহ স্টেশনের নাম! রেলমন্ত্রকে প্রস্তাব মন্ত্রী কল্যাণ চক্রবর্তীর
-
অধিনায়কত্ব খোয়াচ্ছেন সূর্যকুমার, ভারতের নতুন টি-২০ অধিনায়ক শ্রেয়স আইয়ার!
-
এই ৬ আন্তর্জাতিক গন্তব্যে স্থগিত ইন্ডিগোর বিমান পরিষেবা! বড় সিদ্ধান্ত দেশের বৃহত্তম উড়ান সংস্থার
-
প্রয়াত ‘সংবাদ প্রতিদিন’-এর প্রতিষ্ঠাতা প্রধান কার্যনির্বাহী কর্তা নারায়ণ বসু
-
শ্লীলতাহানি, তোলাবাজির অভিযোগে গ্রেপ্তার স্বরূপ বিশ্বাস, ডিম হাতে থানা ঘেরাও ক্রুদ্ধ জনতার