বিপদ বুঝতে পেরে ২০২৪ সালে লোকসভা ভোটের পর তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হকার নিয়ন্ত্রণের কথা বলে একটি বৈঠক করেছিলেন। ফুটপাথের কাঠামোয় প্লাস্টিক সরিয়ে, পসরা পথে না রেখে বিভিন্ন গুদামে পাঠাতে তৎকালীন মেয়রকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু কিছুই হয়নি। লিখছেন কিংশুক প্রামাণিক।
ফুটপাথে মানুষ হাঁটবে, না কি তার দখল নেবে হকার, বিতর্ক বহু দিনের। অনেক বড় বড় শহর তথা রাজ্য এই সমস্যার সমাধান করে ফেললেও পশ্চিমবঙ্গ পারেনি। আমরা অনেক কিছুই করতে পারিনি যে-কারণে তার ব্যাখ্যা দিতে একটি শব্দই যথেষ্ট, তা হল ‘রাজনীতি’। এক্ষেত্রেও সেই এক উপসংহার। ‘হকার’ না ‘ভোটার’? অামরা কোন চোখে মানুষগুলিকে দেখেছি। তাদের ‘বসানো’-র পক্ষে কোন পরিচয় প্রাধান্য পেয়েছে! ফলে ফুটপাথ দখল করে বসা, সরকারি জমিতে দোকান করা, রেলের প্ল্যাটফর্মে বসে হকারি করাটাই বঙ্গসমাজে দস্তুর। এটাই যেন অাইন। লক্ষ-লক্ষ ট্রেনযাত্রী অথবা কাজের সন্ধানে ফুটপাতে নামা অসংখ্য পথচারী ব্রাত্য। হঁাটতে চেয়ে অধিকারের কথা স্মরণ করানোর উপায় নেই। তা হলে অাবার ‘অমানবিক’ হিসাবে চিহ্নিত হতে হবে। হকার পথে বসলে মানবিকতার খাতিরে চুপ করে থাকতে হবে। যখন তাকে চলে যাওয়ার কথা বলা হবে, তখন বহু মানুষ বলবে– উচ্ছেদ চলবে না।
আরও পড়ুন:
হকার ভাইটি পথে বসল কবে, তাকে বসাল কে, বসার জন্য কত দিতে হল, অথবা পেটের দায়ে হপ্তায় কত দিতে হয়– অনেক গল্প অাছে ভিতরে। সেই গল্প রাজনৈতিক তোলাবাজির অাস্তাকুঁড়ে নিমজ্জিত। যদি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতেও দেখা হয়, তাহলে হকারদের পক্ষে বলার মতো অাছে অনেক কিছুই। প্রতে্যক মানুষকেই বঁাচার জন্য জীবিকার সন্ধান করতে হয়। জনসংখ্যা বেড়েছে, চাকরির সুযোগ কমেছে। তাতে জীবন থেমে থাকেনি। খিদে মেটাতে কিছু করতেই হয়। অর্থনীতির উদারীকরণ, টেকনোলজির বিকাশের জেরে পৃথিবী কঠোর বাস্তবের মুখোমুখি। এখনকার যুগে রোজগারের বিচিত্র পথ। কৃষি ও শ্রমিকের কাজের মাধ্যমে রোজগারের বাইরে নিজের মতো স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষেত্র বহুমুখী। একটি বড় উপায় হকারি। হকারি অবশ্য নবীনতম পেশা নয়। তার একাল-সেকাল বলতে অনেক কথাই বলতে হয়। রথের মেলার পাপড়ভাজা, গ্রামের হাটের বিকিকিনি অথবা ‘পুতুল নেবে গো’ বলে পসরা সাজিয়ে সেই গান হকারির অাদিমতা মনে করায়। যদিও বর্তমান যুগে বদলে গিয়েছে সংজ্ঞা। তেমন কোনও পথ খোলা না থাকলে হকারি সহজ উপায়।
ফুটপাথ দখল করে বসা, সরকারি জমিতে দোকান করা, রেলের প্ল্যাটফর্মে বসে হকারি করাটাই বঙ্গসমাজে দস্তুর। এটাই যেন অাইন। লক্ষ-লক্ষ ট্রেনযাত্রী অথবা কাজের সন্ধানে ফুটপাতে নামা অসংখ্য পথচারী ব্রাত্য।
হকারিরও রকমভেদ অাছে। এক ভ্রাম্যমাণ, দুই স্থায়ী কাঠামোয়। দু’টি ক্ষেত্রে রোজগারের অাকাশ-পাতাল ফারাক। ফুটপাতে যার চায়ের দোকান অথবা কচুরির স্টল, তার চেয়েও অনেক বড় লড়াই লড়তে হয় ট্রেনে অথবা পথে যারা হকারি করে। কেউ বাদাম বিক্রি করে, কেউ বিক্রি করে পেয়ারা, কেউ অাবার সেফটিপিন থেকে ন্যাপথালিন হরেক কিসিমের জিনিস। রোদে তেতে-পুড়ে, শীতে কুঁকড়ে তাদের কাজ করতে হয়। একদিন অাসতে না পারা, একদিন ট্রেন অবরোধ হওয়া অথবা একদিন বন্ধ মানে পেটে টান। দিন অানা দিন খাওয়া জীবনচক্রে ধাক্কা। হারিয়ে যাওয়া অাট অানা অথবা এক টাকার লাভে একটি-একটি করে মোসম্বি, ডালমুটের প্যাকেট বিক্রি করতে করতে দিনের শেষে হয়তো ১০০ টাকা পকেটে অাসে। সেটাই তার রোজগার।
সাধারণ হকারদের এই দিন গুজরান তাদেরই জানা অাছে যারা মূলত শহরতলির ট্রেনে ভ্রমণ করে অথবা বেসরকারি বাসে চড়ে। সকাল থেকে রাত কি অবর্ণনীয় সেই লড়াই! এই মানুষগুলির জীবন সংগ্রামের সঙ্গে ধর্মতলা ও গড়িয়াহাটের ফুটপাথ দখল করে যারা হকার হয়েছে, তাদের জীবন কোনওভাবেই মেলে না। অায়ের ফারাকের হিসাব নেই। পথের হকার এবং নিত্যযাত্রী একে-অপরের পরিপূরক। খাবার সস্তা ও টাটকা, পসরার দাম কম বলেই সাধারণ মানুষ হকারের উপর নির্ভর।
সাধারণ হকারদের দিন গুজরান তাদেরই জানা অাছে যারা মূলত শহরতলির ট্রেনে ভ্রমণ করে অথবা বেসরকারি বাসে চড়ে। সকাল থেকে রাত কি অবর্ণনীয় সেই লড়াই! এই মানুষগুলির জীবন সংগ্রামের সঙ্গে ধর্মতলা ও গড়িয়াহাটের ফুটপাথ দখল করে যারা হকার হয়েছে, তাদের জীবন কোনওভাবেই মেলে না।
যাই হোক, অাপাতত হকারদের সরিয়ে রাস্তা, স্টেশন খালি করার বিতর্কটি অাবার সামনে এসে গিয়েছে। বঙ্গে পালাবদলের পর নতুন সরকার চাইছে বেঅাইনি সমস্ত দখল ভেঙে দিতে। তার জন্য শুরু হয়েছে উচ্ছেদ। এবং যথারীতি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়টি তুলে বলা হচ্ছে– উচ্ছেদ হলে হাজার হাজার পরিবার বেকার হয়ে যাবে। তাদের সংসার চলবে কী করে? কথাটা অযৌক্তিক নয়। কিন্তু একই সঙ্গে এও সত্য: স্টেশন, ফুটপাথের হাল ফিরবে কবে? কবে পথচারী তার অধিকার ফিরে পাবে? কলকাতা শহরে ধর্মতলা, গড়িয়াহাট, হাতিবাগান, বড়বাজার, রাজাবাজার, শিয়ালদহ, তপসিয়া, মল্লিকবাজারের মতো বহু এলাকায়
মানুষ ফুটপাথে হঁাটতে পারে না। বাধ্য হয়ে নেমে আসে রাস্তায়। তাতে বহু দুর্ঘটনাও ঘটেছে।
সুপ্রিম কোর্ট সম্প্রতি বলেছে, পথ পথচারীদের। সেই অধিকার থেকে তাদের বঞ্চিত করা যায় না। এই বার্তা পেয়ে সরকার উদে্যাগী হবে বলে খবর। জানা গিয়েছে, কলকাতার ৫৮টি মোড় চিহ্নিত করেছে পুরসভা। প্রায় দেড় হাজার রাস্তা হকারমুক্ত করা হবে। সমীক্ষার কাজ চলছে। ইতিমধে্য পালাবদলের পর স্টেশন ও সংলগ্ন এলাকা থেকে হকার উচ্ছেদ শুরু করে রেল। এমন নয় কাউকে নোটিস না দিয়েই হকার উচ্ছেদ করা হয়েছে। বারবার নোটিস দেওয়া সত্ত্বেও তারা কাজটি করতে পারেনি রাজনৈতিক বাধা আসার আশঙ্কা থেকেই। কিন্তু পালাবদলের পর রাজ্য পুলিশ ও প্রশাসনের দিক থেকে আর কেউ পিছন থেকে টেনে ধরবে না বুঝেই সাফাই অভিযানে হাত দেয়। শিয়ালদহ হাওড়া-সহ শহর ও শহরতলির বহু স্টেশনে বুলডোজার চলেছে। বহু স্টেশন চত্বর ফঁাকা করা হয়েছে। এর পর কলকাতা-সহ গোটা রাজ্যজুড়েই ফুটপাথ সাফাই হবে, রাস্তার মধ্যে বেআইনিভাবে ঢুকে আসা কাঠামো সরিয়ে দেওয়া হবে তা জানিয়েও দিয়েছেন বিজেপি সরকারের পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল।
বিরোধিতা করছে বিরোধী দলগুলি। সমস্যা হচ্ছে এমনটা যে কোনও-না-কোনও সময় হবেই। সে কথা রাজনৈতিক নেতারা হকারদের বোঝাননি কেন? কেন তাদের জন্য বিকল্পের সন্ধান করা হয়নি? সরকার বলবে, উচ্ছেদ হচ্ছে অাদালতের অর্ডার হাতে নিয়েই, অাইনত তখন কী করার থাকবে? সাফাই হলে শহর ও শহরতলির রেলস্টেশনগুলির করুণ দশা দূর হবে সন্দেহ নেই। যাত্রীদের প্রাণ হাতে করে স্টেশনে চলতে হবে না। ধর্মতলা থেকে শ্যামবাজার, গড়িয়াহাট– পথের শ্রী ফিরবে। কলকাতার রূপটাই বদলে যাবে। কিন্তু এত কিছুর পরও যে সমস্যাটা সামনে এসে দঁাড়াবে, তা হল: এই উচ্ছেদ কাণ্ডে লক্ষ লক্ষ পরিবার কাজ হারাবে। ইতিমধে্যই রেল স্টেশনগুলিতে কান্নার অাওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। এক্ষেত্রে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী একটি বড় কথা বলেছেন। অব্যবহৃত জমিতে যতদূর সম্ভব পুনর্বাসন যদি দেওয়া যায় তা অাইন অনুযায়ী তঁার সরকার দেখবে।
কলকাতার হকার উচ্ছেদের চেষ্টা হয়েছিল বাম অামলে। তখন অবশ্য গোটা শহর পথচারীদের হাতছাড়া হয়নি। ঘটা করে ‘অপারেশন সানশাইন’ নাম দিয়ে অভিযান হলেও তা সফল হয়নি। প্রতিরোধের মুখে পিছু হটে ভোটব্যাঙ্ক হারানোর ভয়ে পিছিয়ে যায় বামফ্রন্ট সরকার। খালি করা রাস্তায় অাবার বসে পড়ে হকাররা। তৃণমূল অামলে গত ১৫ বছরে উচ্ছেদ তো দূরের কথা, কলকাতার প্রায় সব রাস্তা হকারদের দখলে চলে যায়। অসাধু কাউন্সিলর ও পুলিশের একাংশের টাকার বখরায় বড়-ছোট সব রাস্তায় বসে যায় হকার। ভোট হারানোর ভয়ে তাদের গায়ে হাত দেওয়া হয়নি।
ফুটপাতের এই দুর্দশার জন্যই কলকাতার নিকাশি ব্যবস্থা ইদানীং ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। বিপদ বুঝতে পেরে ২০২৪ সালে লোকসভা ভোটের পর তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দে্যাপাধ্যায় হকার নিয়ন্ত্রণের কথা বলে একটি বৈঠক করেছিলেন। ফুটপাতের কাঠামোয় প্লাস্টিক সরিয়ে, পশরা পথে না রেখে বিভিন্ন গুদামে পাঠাতে তৎকালীন মেয়রকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু কিছুই হয়নি। ৯ অাগস্ট আর জি কর কাণ্ডে সরকারের বিরুদ্ধে জনমত চলে যেতেই সরকার ভয় পেয়ে যায়। হিমঘরে চলে যায় হকার নিয়ন্ত্রণ পর্ব।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে অাবার সেই প্রসঙ্গটি সামনে এসে গিয়েছে। পথচারীদের পথ ফিরিয়ে দেওয়ার কথা ভাবছে নতুন সরকার। নানা উপায় নিয়েও ভাবা হচ্ছে। ব্যাংকক শহরে দু’-দশক অাগে কলকাতার মতো শহরজুড়ে হকার ছিল। বড় বড় বহুতল বানিয়ে তাদের সেখানে ঢুকিয়ে পথ পরিষ্কার করা হয়। পৃথিবীর বহু শহরে এমনই নানা পথে হকার নিয়ন্ত্রণ করে পথ ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে পথচারীদের। নতুন সরকারও কলকাতার ‘শ্রী’ ফেরাতে তেমনই কোনও উদে্যাগ নিক। সীমাহীন অত্যাচারে কলকাতাকে এখন খুব বয়স্ক লাগে। তিলোত্তমার কৌলীন্য রক্ষা করেই এখন তার তারুণ্যের পথে হঁাটা খুব দরকার।
(মতামত ব্যক্তিগত)
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
বারবার পশ্চাৎদেশে ক্যামেরা তাক! পাপারাজ্জিদের ‘কান মুলে’ সভ্যতার পাঠ নেহা ধুপিয়ার
-
‘চোরে চোরে ভায়রাভাই’, কুম্ভমেলার সময় সর্বাধিক চুরি রাম মন্দিরে! প্রকাশ্যে বিস্ফোরক তথ্য
-
‘গ্রেপ্তারির পরোয়া করি না’, ‘স্যাটাভাঙা মার’ মন্তব্যে পুলিশের তলব পেয়েও স্বমেজাজে হুমায়ুন
-
কণ্ঠস্বরের নমুনা দিতেই হবে, ৮ জুলাই ফের অভিষেককে তলব বিধাননগর আদালতের
-
দ্য ব্রাজিলিয়ান জব… জিতেও নিস্পৃহ আন্সেলোত্তি, জোগো বোনিতোয় রিয়াল ‘ডিএনএ’ মেশাচ্ছেন কার্লো