Advertisement
Advertisement
Advertisement
Sangbad Pratidin
  • ২৪ আষাঢ় ১৪৩৩
  • শুক্রবার
  • ১০ জুলাই ২০২৬
Ram Mandir

রাম মন্দিরে চুরি প্রকাশ্যে আনা হিন্দু ধর্মের বিরুদ্ধে আক্রমণ নয়, পবিত্র তীর্থের মর্যাদারক্ষার প্রয়াস

অনুদানের সঠিক হিসাব কি রাখা হয়েছিল? পর্যাপ্ত তদারকি ছিল কি?

Advertisement
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: জুলাই ১০, ২০২৬, ১৩:৪৬

link
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: জুলাই ১০, ২০২৬, ১৩:৪৬

options
link
রাম মন্দিরে চুরি প্রকাশ্যে আনা হিন্দু ধর্মের বিরুদ্ধে আক্রমণ নয়, পবিত্র তীর্থের মর্যাদারক্ষার প্রয়াস zoom
রাম মন্দিরে তিন হাজার কোটি টাকার চুরি নিয়ে দেশজুড়ে হইচই।

রাম মন্দিরে ভক্তদের দান করা অর্থ যদি দীর্ঘ দিন ধরে আত্মসাৎ হয়ে থাকে, তবে তা প্রকাশে‌্য আনা হিন্দু ধর্মের বিরুদ্ধে আক্রমণ নয়; বরং অন্যতম পবিত্র তীর্থের মর্যাদারক্ষার প্রয়াস। জবাবদিহি করাকে কেবল এই কারণে ‘হিন্দু-বিরোধী’ বলা যায় না, যদিও তা ক্ষমতাসীনদের স্পষ্টত অস্বস্তিতে ফেলছে। লিখছেন রাজদীপ সরদেশাই।

সংঘ পরিবারের নেতৃত্বের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ১৯৮৯ সালে, তৎকালীন ‘বিশ্ব হিন্দু পরিষদ’-এর (‘ভিএইচপি’) সভাপতি প্রয়াত অশোক সিংহলের সাংবাদিক সম্মেলন ‘কভার’ করতে গিয়ে। তখন রাম জন্মভূমি আন্দোলন উত্তুঙ্গে। বিশ্ব হিন্দু পরিষদ তখন ‘রাম শিলা পূজন’ কর্মসূচির মাধ্যমে জনসমর্থন কুড়োতে ব‌্যস্ত। অযোধ্যায় প্রস্তাবিত রাম মন্দির নির্মাণের জন্য দেশজুড়ে ভক্তদের কাছ থেকে ‘পবিত্র’ ইট এবং আর্থিক অনুদানও সংগ্রহ করা হচ্ছে। সেই সাংবাদিক সম্মেলনে সিংহলকে একটি প্রশ্ন করেছিলাম– “সংগৃহীত অর্থের যথাযথ হিসাব কি ‘ভিএইচপি’ রাখছে?” তিনি ঝাঁজিয়ে উঠে বলেছিলেন, ‘এ আবার কেমন প্রশ্ন? আপনি কি মনে করেন, আমরা কোটি কোটি হিন্দুর ধর্মীয় অনুভূতি নিয়ে ছেলেখেলা করার মতো লোক?’ প্রায় চার দশক পরও সেই সংলাপ আমার স্মৃতিতে অম্লান।

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'ফুটবল বিশ্বযুদ্ধ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন
Advertisement

এখন সময়ের চাকা, বা বলা ভালো, অযোধ্যার রথ, পূর্ণবৃত্ত সম্পন্ন করেছে। ১৯৮৯ সালে যে-প্রশ্ন করা প্রায় ধর্মদ্রোহিতার শামিল মনে করা হত, এখনও সেই একই প্রশ্ন করতে ইচ্ছা করছে রাম মন্দিরের বর্তমান পরিচালকদের উদ্দেশে। অনুদানের সঠিক হিসাব কি রাখা হয়েছিল? পর্যাপ্ত তদারকি ছিল কি? লক্ষ লক্ষ ভক্তের বিশ্বাস ও অনুদানে নির্মিত এই মন্দিরে চুরি ও অর্থ তছরুপের অভিযোগ উঠল কীভাবে?

মজার বিষয় দেখুন, এতদিন পর সেই এক অস্বস্তিকর প্রশ্নের মুখোমুখি হচ্ছেন ‘শ্রীরাম জন্মভূমি তীর্থ ক্ষেত্র ট্রাস্টের’ সাধারণ সম্পাদক চম্পত রাই– যিনি বিতর্কের জেরে পদত্যাগ করতেও বাধ্য হয়েছেন। প্রসঙ্গত জানিয়ে রাখি, তিনি ছিলেন অশোক সিংহলের অন্যতম ঘনিষ্ঠ সহযোগী, ‘ভিএইচপি’-র আজীবন সংগঠক। রাম মন্দির আন্দোলনের প্রতি তঁার নিষ্ঠার জন্য তিনি বিশেষ পরিচিত। যারা তঁাকে ব্যক্তিগতভাবে চেনেন, তঁারা অবশ‌্য তঁার সরল জীবনযাপন ও ব্যক্তিগত সততার প্রশংসা করেন। কিন্তু ‘ব্যক্তিগত’ সততা কখনওই ‘প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা’-র ‘বিকল্প’ হতে পারে না। কোটি কোটি টাকার তহবিল পরিচালনাকারী একটি ট্রাস্টের জন্য প্রয়োজন স্বচ্ছ হিসাবরক্ষণ, পেশাদার প্রশাসন এবং কঠোর নজরদারি। এই ব্যবস্থাপনা যদি ব্যর্থ হয়ে থাকে, তবে তা কেবল প্রশাসনিক গাফিলতি নয়; বরং ফৌজদারি মামলার ধার ঘেঁষে পার পাওয়ার মতো অপরাধ। এবং অবশ‌্যই এটি লক্ষ লক্ষ ভক্তের আস্থার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা-সম।

১৯৮৯ সালে যে-প্রশ্ন করা প্রায় ধর্মদ্রোহিতার শামিল মনে করা হত, এখনও সেই একই প্রশ্ন করতে ইচ্ছা করছে রাম মন্দিরের বর্তমান পরিচালকদের উদ্দেশে। অনুদানের সঠিক হিসাব কি রাখা হয়েছিল?

এ কারণেই মন্দিরের অনুদান চুরির অভিযোগ সংঘ পরিবারের জন্য সম্ভবত সবচেয়ে গুরুতর সংকট, বিশেষ করে এমন এক সময়ে, যখন ভারতীয় জনজীবনে তাদের প্রভাব সর্বকালীন সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বহু দশক ধরে ‘রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ’ (আরএসএস) নিজেকে প্রচলিত রাজনীতির থেকে আলাদা একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন হিসাবে তুলে ধরে এসেছে– যার মূলমন্ত্র: শৃঙ্খলা, সেবা, এবং জাতি গঠন। দুর্নীতি বা বংশানুক্রমিক রাজনীতির অভিযোগে অভিযুক্ত রাজনৈতিক দলগুলির বিপরীতে সংঘ দাবি করত, তাদের কর্মীরা ব্যক্তিগত লাভের জন্য নয়, বৃহত্তর জাতীয় আদর্শে নিঃস্বার্থভাবে অনুপ্রাণিত।

এখন সেই নৈতিক দাবিই কঠিন পরীক্ষার মুখে। আরএসএসের সাধারণ সম্পাদক দত্তাত্রেয় হোসাবলে এই অভিযোগের নিন্দা করে দোষীদের কঠোর শাস্তির দাবি তুলেছেন। কিন্তু একই বিবৃতিতে তিনি এও বলেছেন, কিছু ‘হিন্দুবিরোধী’ ও ‘দেশবিরোধী’ শক্তি এই ঘটনাকে ব্যবহার করে হিন্দু সমাজকে কলঙ্কিত করার ‘ষড়যন্ত্র’ করছে। হোসাবলে মহাশয়ের কাছে জানতে ইচ্ছে করে: এই ‘ষড়যন্ত্র’টি ঠিক কী?

দুর্নীতি বা বংশানুক্রমিক রাজনীতির অভিযোগে অভিযুক্ত রাজনৈতিক দলগুলির বিপরীতে সংঘ দাবি করত, তাদের কর্মীরা ব্যক্তিগত লাভের জন্য নয়, বৃহত্তর জাতীয় আদর্শে নিঃস্বার্থভাবে অনুপ্রাণিত।

যদি ভক্তদের দান করা অর্থ দীর্ঘ দিন ধরে আত্মসাৎ হয়ে থাকে, তবে তা প্রকাশে‌্য আনা হিন্দু ধর্মের বিরুদ্ধে আক্রমণ নয়; বরং হিন্দু ধর্মের অন্যতম পবিত্র তীর্থের মর্যাদারক্ষার প্রয়াস। জবাবদিহি দাবি করাকে কেবল এই কারণে ‘হিন্দু-বিরোধী’ বলা যায় না, যদিও তা ক্ষমতাসীনদের অস্বস্তিতে ফেলছে। একদিকে রাম মন্দির আন্দোলনের ঐতিহাসিক সাফল্যের নৈতিক কৃতিত্ব দাবি, আবার বিপদে পড়লেই মুহূর্তে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা– একসঙ্গে তো সম্ভব নয়!

রাম জন্মভূমি আন্দোলন কোনও সাধারণ রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়; এটি সংঘ পরিবারের আদর্শগত প্রকল্পের কেন্দ্রবিন্দু– জনসমর্থন সংগঠনের নেতৃত্বে ছিল ‘ভিএইচপি’, বিজেপি তা নজিরবিহীন নির্বাচনী সাফল্যে রূপান্তরিত করে, আর আদর্শগত কাঠামো নির্মাণ করে ‘আরএসএস’। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে মন্দিরের প্রাণপ্রতিষ্ঠার সময় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই ঘটনাকে ‘নতুন যুগের সূচনা’ এবং ‘সভ্যতার ন্যায়বিচার’-এর প্রতীক হিসাবে বর্ণনা করেন।

যদি ভক্তদের দান করা অর্থ দীর্ঘ দিন ধরে আত্মসাৎ হয়ে থাকে, তবে তা প্রকাশে‌্য আনা হিন্দু ধর্মের বিরুদ্ধে আক্রমণ নয়; বরং হিন্দু ধর্মের অন্যতম পবিত্র তীর্থের মর্যাদারক্ষার প্রয়াস। জবাবদিহি দাবি করাকে কেবল এই কারণে ‘হিন্দু-বিরোধী’ বলা যায় না, যদিও তা ক্ষমতাসীনদের অস্বস্তিতে ফেলছে।

কাগজে-কলমে মন্দির ট্রাস্টের নিয়োগ স্বায়ত্তশাসিত হলেও বাস্তবে তারা সংঘ পরিবার ও কেন্দ্রীয় সরকারের আস্থাভাজন ছিল। ট্রাস্ট পরিচালনার জন্য প্রার্থী বেছে নেওয়া হয়, আরএসএস-বিজেপি-ভিএইচপি নেতৃত্বের অনুমোদনেই। তাই প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব কেবল কয়েকজন কর্মকর্তার ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে নেতৃত্ব নিজেদের দায় এড়াতে পারে না। ঐতিহাসিক সাফল্যের কৃতিত্ব যেমন নেতৃত্বের, তেমনই ব্যর্থতার দায়ও তাদের উপর বর্তায়।
মন্দির প্রশাসন নিয়ে প্রশ্ন ওঠা অবশ্য নতুন ঘটনা নয়। ২০২২ সালেই অযোধ্যার বিতর্কিত জমি লেনদেন নিয়ে একাধিক অভিযোগ ওঠে, স্বচ্ছতা ও সুশাসন নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। অভিযোগ শেষমেষ প্রমাণিত হোক বা না হোক, কঠোর বিচারের প্রয়োজন অস্বীকার করা যায় না। জনবিশ্বাসের উপর প্রতিষ্ঠিত কোনও প্রতিষ্ঠানের উপর সামান্যতম অস্বচ্ছতার ছায়াও বিপজ্জনক।

হালের বিতর্ক তাই কেবল অপরাধমূলক দায় কার– সেই প্রশ্ন ঘিরে দানা বঁাধেনি। আদালত ও তদন্তকারী সংস্থা ঠিক করবে কে অপরাধ করেছে এবং কার কী শাস্তি প্রাপ্য। কিন্তু তার চেয়েও সত্ত্বর প্রয়োজন– প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি। ক্ষমতায় এলে প্রতে‌্যক রাজনৈতিক আন্দোলনকেই এক সময় নানা প্রলোভনের মুখোমুখি হতে হয়। ‘জরুরি অবস্থা’-র সময় কংগ্রেসও একই কাণ্ড ঘটিয়েছিল। দীর্ঘ দিন ক্ষমতায় থাকার পর বহু আঞ্চলিক দল পৃষ্ঠপোষকতা ও দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে। অযোধ্যা সংঘ পরিবারের আদর্শগত বিজয়ের প্রতীক। তবু যদি রাম মন্দিরে অনুদান চুরির অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হয়, তবে সেই বিজয়ই পরিণত হতে পারে এক চেতাবনিতে– বিশ্বাসের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানও কীভাবে অর্থের প্রলোভনের সামনে নতিস্বীকার করে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়।

এ কারণেই রাম মন্দির আন্দোলন থেকে রাজনৈতিক এবং নৈতিকভাবে লাভবান ব্যক্তিরা এখন বলতে পারেন না যে, সমস্ত দায় কেবল নিম্নস্তরের কর্মচারী বা মাঝারি সারির কর্মকর্তাদের। নেতৃত্বের প্রকৃত অর্থ কেবল সাফল্যের কৃতিত্ব নেওয়া নয়; প্রয়োজনে ব্যর্থতার দায় স্বীকার করা। লক্ষ লক্ষ ভক্তের বিশ্বাস বলির পঁাঠা খুঁজে রক্ষা করা যায় না।
আমি নিশ্চিত, মন্দিরে নতুন প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে উঠবে। আর্থিক ব্যবস্থাও সম্ভবত আরও শক্তিশালী হবে। দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিদের কঠোর সাজা হবে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের চেয়ে সুনাম পুনর্গঠন করা যাবে তো! এ তো বড় কঠিন কাজ। দীর্ঘ দিন ধরে সংঘ পরিবার দাবি করে এসেছে যে তারা সাধারণ রাজনীতির ঊর্ধ্বে এক উচ্চতর নৈতিক আদর্শের প্রতিনিধি। অযোধ্যার এই বিতর্ক সেই দাবিকে আরও উসকে দিল। এটি আমাদের মনে করিয়ে দিল– যে কোনও প্রতিষ্ঠান, তার লক্ষ্য যতই পবিত্র হোক বা ভাষণ যতই মহৎ হোক না কেন, ক্ষমতা, অর্থ ও আত্মতুষ্টির প্রলোভন থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত নয়।

বিশ্বাসে মিলায়ে বস্তু। রাজনৈতিক সংগঠনগুলি সেই বিশ্বাসের প্রতিনিধিত্ব করতে পারে, কিন্তু সেই বিশ্বাসের নামে কখনওই জনসমালোচনা বা জবাবদিহি থেকে অব্যাহতি দাবি করতে পারে না। হালে আরএসএস ভারতীয় জনজীবনে তাদের সর্বকালের সর্বাধিক প্রভাব বিস্তার করছে। আর সেই প্রভাবের সঙ্গে আসে আরও বড় দায়িত্ব। অতীতে যে নৈতিক মানদণ্ড তারা অন্যদের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে বলত, এখন সেই একই মানদণ্ড তাদের নিজেদের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়া উচিত।

পুনশ্চ প্রায় চার দশক আগে অশোক সিংহল আমার আর্থিক জবাবদিহি সংক্রান্ত প্রশ্নকে ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। কারণ তঁার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল– রাম মন্দির আন্দোলন কখনও হিন্দু ভক্তদের বিশ্বাসভঙ্গ করবে না। এখন চিন্তা হয়, তাঁর দলের অন‌্য সদস‌্যরা একই কথা ২০২৬ সালে দঁাড়িয়ে বলতে পারবেন তো! কারণ রাজনীতিতে ক্ষমতা আসবে-যাবে, কিন্তু নৈতিক কর্তৃত্ব হাতছাড়া হলে তাকে বাগে আনা খুব কঠিন।

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'ফুটবল বিশ্বযুদ্ধ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Advertisement

Share this article on

The article link is copied.