সিঙ্গুর পর্বে তৎকালীন বাম সরকারের শিল্পমন্ত্রী নিরুপম সেন প্রায়শই মহাকরণে তাঁর ঘরে সংবাদমাধ্যম কর্মীদের শিল্পায়নের পথ ও পদ্ধতি নিয়ে ‘ক্লাস’ নিতেন। বস্তুত, অঘোষিত সাংবাদিক বৈঠকগুলি ক্লাসে পরিণত হত। সেসব ক্লাসে ‘বিতর্কিত’ জমি অধিগ্রহণের পক্ষে নিরুপম সেনের রুটিন সাফাই ছিল– গোটা দেশে লগ্নি টানার যে ইঁদুর দৌড় চলছে, সেখানে রাজ্য সরকারকে সুবিধাপ্রদানকারীর ভূমিকায় থাকতেই হবে। নচেৎ লগ্নি আকর্ষণ করা যাবে না।
সকলেরই মনে আছে, ২০০৬ সালে বিধানসভা ভোটে শহরাঞ্চলে বিপুল জনরায় পেয়ে পুনরায় মুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ নিয়েই বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য প্রথম যে-কাজটি করেছিলেন– তা হল, সিঙ্গুরে গাড়ি কারখানা করার জন্য রতন টাটার সঙ্গে চুক্তি। কারখানার জন্য যখন সিঙ্গুরকে বাছাই করা হল, তখন আকাশ থেকে পড়েছিলেন ওখানকার সিপিএম নেতারাও। কিন্তু সিঙ্গুরের ওই উর্বর তিন ফসলি জমি টাটাদের দেওয়া ছাড়া ‘বিকল্প’ কোনও পথ ছিল না বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য-নিরুপম সেনদের কাছে। কারণ ওই জমির শর্তেই টাটা মোটরসকে রাজি করা গিয়েছিল সিঙ্গুরে লগ্নির জন্য। প্রাথমিক আলাপ-আলোচনার পর ন্যানো গাড়ির প্রকল্পের জন্য উত্তরাখণ্ডকে বেছেছিল টাটা মোটরসের পরিচালন বোর্ড।
এটি রাজ্যবাসীর পক্ষে খুব আশার দিক যে, সিঙ্গুরের ওই অভিজ্ঞতা থেকেই সম্ভবত শিক্ষা নিয়ে বর্তমান রাজ্যের ডাব্ল ইঞ্জিন সরকার গোড়া থেকেই জানিয়ে দিয়েছে, শিল্পোদ্যোগীদের নানারকম উৎসাহ ভাতা দিয়েই রাজ্যে লগ্নি আকর্ষণের চেষ্টা করা হবে।
এমনকী রতন টাটার আর্জিও খারিজ হয়েছিল। আসলে ন্যানোর নকশা করার পর থেকেই রতন টাটা আগ্রহী ছিলেন বাংলায় লগ্নিতে। কিন্তু টাটা মোটরসের বোর্ডে পাস করতে ব্যর্থ হয়েছিল বাংলা। তখন নাছোড় বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য টাটা মোটরসের বোর্ডকে রাজি করাতে নিরুপম সেনকে মুম্বই পাঠিয়েছিলেন। জলের দরে বিপুল পরিমাণে মহার্ঘ জমি, করে ছাড়, সস্তায় ঋণ ইত্যাদি নানা প্যাকেজ নিয়ে টাটা মোটরসের বোর্ডের সামনে হাজির হয়েছিলেন বাংলার তৎকালীন শিল্পমন্ত্রী। টাটা মোটরসের পরিচালকরা তুল্যমূল্য বিচার করে দেখেছিলেন পশ্চিমবঙ্গ সরকাররের কাছ থেকে কী-কী সুবিধা পেলে কারখানাটি উত্তরাখণ্ডে না করে সিঙ্গুরে করা লাভজনক হবে। যে-যে শর্তে টাটা মোটরস কর্তৃপক্ষ রাজি হয়েছিল, সেগুলি লিপিবদ্ধ হয় সিঙ্গুরের বিখ্যাত বাণিজ্য চুক্তিতে। যেটিকে নিরুপম সেন ‘ট্রেড সিক্রেট’ আখ্যা দিয়ে বিতর্কে জড়িয়েছিলেন।
এটি রাজ্যবাসীর পক্ষে খুব আশার দিক যে, সিঙ্গুরের ওই অভিজ্ঞতা থেকেই সম্ভবত শিক্ষা নিয়ে বর্তমান রাজ্যের ডাব্ল ইঞ্জিন সরকার গোড়া থেকেই জানিয়ে দিয়েছে, শিল্পোদ্যোগীদের নানারকম উৎসাহ ভাতা দিয়েই রাজ্যে লগ্নি আকর্ষণের চেষ্টা করা হবে। বিশেষত, জমি জোগাড়ের ক্ষেত্রে যে রাজ্য সরকার শিল্প সংস্থাকে সবরকম সহযোগিতা করবে, তা মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী খুব স্পষ্ট ভাষায় সম্প্রতি ডানকুনির শিল্পসভা থেকে ব্যক্ত করে দিয়েছেন। সিঙ্গুরের টাটাদের পরিত্যক্ত জমি থেকে ডানকুনির শিল্পতালুকের দূরত্ব সামান্যই। ডাব্ল ইঞ্জিন সরকারের প্রথম লগ্নি সভাটি এই ডানকুনিতে হওয়াটাও খুব তাৎপর্যপূর্ণ।
আসলে বার্তা পরিষ্কার– সিঙ্গুরের কারখানার ধ্বংসাবশেষ রাজ্যের ভবিতব্য নয়, নতুন শিল্পযুগ শুরু করাই ডাব্ল ইঞ্জিন সরকারের লক্ষ্য। এবং এই কাজে যে তাঁর সরকার কোনও খামতি রাখতেই রাজি নয়, তাও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় স্পষ্ট করে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। এক কদম এগিয়ে গিয়ে শিল্পমন্ত্রী তাপস রায় জানিয়েছেন, প্রয়োজনে শিল্পদ্যোগীদের হাতে-পায়ে ধরে তাঁরা রাজ্যে নিয়ে আসবেন।
লগ্নি টানতে কী কী করতে তাঁরা প্রস্তুত– তা জানাতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন, জমির ঊর্ধ্বসীমা আইন বিলোপ ও ১০০ কোটি টাকার বেশি লগ্নির ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনের অনুমতি নেওয়ার প্রথা তুলে দেওয়ার কথা। ১৯৭৬ সালের শহরের জমির ঊর্ধ্বসীমা আইনটি যে এ রাজ্যের উন্নয়নের পক্ষে একটি বড় বাধা– তা উপলব্ধি করতে বর্তমান সরকার বিশেষ সময় নেয়নি। ইন্দিরা গান্ধীর আমলে কেন্দ্র এই আইনটি পাশ করেছিল।
সে-সময় ইন্দিরা গান্ধীর সরকারে সমাজতান্ত্রিক ঝোঁক পুরোমাত্রায়। ব্যাঙ্ক ও খনি জাতীয়করণের এক দশকের মধ্যে ইন্দিরা গান্ধী দেশের শহরাঞ্চলের বড় বড় জমির মালিকদের ঘাড়ে এই আইনটি চাপিয়ে দিয়েছিলেন। এই আইনে শহরে কারও হাতে সাড়ে সাত কাঠার বেশি জমি থাকলেই তা সরকারের ঘরে চলে যাওয়ার কথা। বাস্তবে সরকার সাড়ে ৭ কাঠার অতিরিক্ত জমি কেড়ে না নিলেও, হস্তান্তরের ক্ষেত্রে বা নতুন কেনার ক্ষেত্রে আসে বিস্তর বাধা। কোনও শিল্প বা উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য ঊর্ধ্বসীমার বাইরে জমি রাখতে প্রয়োজন হয় সরকারের অনুমতির, যা জোগাড় করা এ রাজ্যের ক্ষেত্রে আজও যথেষ্ট জটিল ও শ্রমসাধ্য। দেশের অন্য রাজ্যগুলি বহু আগেই ইন্দিরা গান্ধীর এই সমাজতান্ত্রিক ধাঁচের আইনকে অর্ধচন্দ্র দিয়েছে। ব্যতিক্রম একমাত্র বাংলা। বাম সরকার দীর্ঘ ৩৪ বছর বাম-ঘেঁষা আইনটিকে লালন করেছিল।
জমির ঊর্ধ্বসীমা আইন উঠে গেলে শিল্পোদ্যোগীদের বাজারমূল্যে জমি কেনার ক্ষেত্রে প্রথম বাধাটি দূর হবে।
পরবর্তী দেড় দশক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘মা-মাটি-মানুষ’ সরকারও অাইনটি খাতায়-কলমে বিলোপ করার সাহস দেখায়নি। কিন্তু শুভেন্দু অধিকারী দ্ব্যর্থহীন ভাষায় শহরের জমির ঊর্ধ্বসীমা আইন এ রাজ্যেও বিলোপ করার কথা ঘোষণা করেছেন। পর্যায়ক্রমে যে এই সরকারের আমলেই রাজ্যে ভূমি সংস্কার আইনে সংশোধন এনে কৃষিজমির ক্ষেত্রেও ঊর্ধসীমা বিলোপ হবে– তা এখনই বলে দেওয়া যায়।
জমির ঊর্ধ্বসীমা আইন উঠে গেলে শিল্পোদ্যোগীদের বাজারমূল্যে জমি কেনার ক্ষেত্রে প্রথম বাধাটি দূর হবে। একইসঙ্গে শহরাঞ্চলে বহু জমি শিল্প, বড় বড় আবাসন, হোটেল, রিসর্ট, মার্কেট কমপ্লেক্স ইত্যাদি নানা প্রকল্প স্থাপনের জন্য উন্মুক্ত হয়ে যাবে। এককথায় বলা যায়, রাজ্যে লগ্নি আনার পথ এক ধাক্কায় অনেকটা পরিষ্কার হয়ে যাবে। তাছাড়া প্রয়োজনে সরকারও জমি কিনে শিল্পসংস্থার হাতে তুলে দেবে বলে মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন। এর সঙ্গে ১০০ কোটির বেশি লগ্নিতে স্থানীয় প্রশাসনের ছাড়পত্র না লাগার বন্দোবস্ত, রাজ্যে লগ্নির প্রক্রিয়াকে অনেক সহজ-সরল এবং দুর্নীতিমুক্ত করে ‘ইজ অফ ডুয়িং বিজনেস’-কে বৃদ্ধি করবে। শুভেন্দু অধিকারীর শিল্পসভায় ত্রিমুখী ঘোষণা শিল্পায়নের পথে নিঃসংশয়ে রাজ্যকে অনেকটা এগিয়ে দিল। আগামীতে শিল্পোদ্যোগীদের জন্য নানারকম উৎসাহ-ভাতার ঘোষণা হবে বলে মুখ্যমন্ত্রী আগাম জানিয়ে রেখেছেন।
জমি জোগাড়ের প্রক্রিয়া সহজ করা, লাল ফিতের ফাঁস দূর করা এবং নানারকম অার্থিক সুবিধা– সবমিলিয়ে এইরকম আকর্ষণীয় প্যাকেজই আবার ন্যানোর মতো কোনও শিল্প প্রকল্পকে রাজ্যে টেনে আনতে পারে।
সর্বশেষ খবর
-
পুজোর আগেই সরকারি বাসে সিসিটিভি-জিপিএস! মহিলা নিরাপত্তায় বড় ঘোষণা পরিবহণমন্ত্রীর
-
পুণে হত্যা কাণ্ড: ‘মামলাটি যেন ফাইলবন্দি না থাকে’, মোদিকে আর্জি কেতনের মায়ের
-
বিশ্বকাপের সমাপ্তি অনুষ্ঠানে চমক, টম ক্রুজ থেকে নিকোল শেরজিঙ্গার, মঞ্চ মাতাবেন একঝাঁক তারকা
-
আমফান, রেশন থেকে মিড ডে মিল! তৃণমূল জমানায় ‘দুর্নীতি’র তদন্তে বিশেষ কমিশন রাজ্যের
-
বিচ্ছেদ গুঞ্জন উড়িয়ে প্রেমিকের সঙ্গে ‘রো-কো’দের ম্যাচ দেখতে কৃতী, গ্যালারিতে উঁকি ধোনিরও!