ইউটিউব শর্টসে ‘ডিসলাইক’ চিহ্ন সরিয়ে দেওয়া কি নিছক পরিষেবা উন্নত করার পদক্ষেপ, না কি ব্যবহারকারীর অপছন্দ জানানোর অধিকার কেড়ে নেওয়ার কৌশল? কনটেন্টের নিয়ন্ত্রণ ব্যবহারকারীর হাতে থাকবে, না কি তা চলবে মুষ্টিমেয় সংস্থার মর্জিমাফিক? রিলসের দুনিয়ায় মতপ্রকাশের অধিকার কি সংকুচিত হচ্ছে?
মনে করুন, ইউটিউবের একটি স্বল্প দৈর্ঘ্যের ভিডিও বা শর্টস দেখছেন। হয়তো সেটা দেখে আপনার ভাল লাগল না। আপনি কিন্তু আর আপনার অসন্তুষ্টি ‘ডিসলাইক’ চিহ্নে ব্যক্ত করতে পারবেন না। কারণ ইউটিউবের চালনাকারী সংস্থা ‘অ্যালফাবেট’ সেই সুযোগটাই রাখেনি। ‘ডিসলাইক’-এর চিহ্ন-ই আর নেই। স্বল্প দৈর্ঘ্যের ভিডিও অপছন্দ হলে কেউ কোনও মতামত আর দিতে পারবে না। বড়জোর কোনও ‘রিঅ্যাকশন’ না দিয়েই সেখান থেকে চলে যেতে পারে।
আরও পড়ুন:
সোশ্যাল মিডিয়ার সব জায়গায় অবশ্য এখনও অবধি এই অসুবিধা নেই। যেমন– ‘মেটা’-র ফেসবুকে স্বল্প দৈর্ঘ্যের ভিডিওতে (ফেসবুক আর ইনস্টাগ্রামের স্বল্প দৈর্ঘ্যের ভিডিও আমজনতার ভাষায় ‘রিলস’) ব্যবহারকারী ‘নট ইন্টারেস্টেড’ চিহ্নে তার অপছন্দের কথা জানাতে পারে। এই চিহ্ন ব্যবহার করলে সঙ্গে সঙ্গে শুধু যে সেই ভিডিও সরে যাচ্ছে তা-ই নয়, জানতে চাওয়া হচ্ছে কেন ভিডিওটি অপছন্দ। অবশ্য ‘মেটা’র আর-এক অবতার ইনস্টাগ্রামের রিলসে ব্যবহারকারীর না-পছন্দ বাছার কোনও জায়গাই নেই।
২০২৪ সালে ইউটিউব তার শর্ট ভিডিওতে ‘ডিসলাইক’ চিহ্নটা তুলে দেয়। কিন্তু সেই পদক্ষেপ যে সাময়িক, তা বোঝা যায় কিছু দিন বাদেই যখন ‘ডিসলাইক’ চিহ্ন ফিরে আসে। এবার কিন্তু এখনও পর্যন্ত চিহ্ন ফেরত আনার কোনও লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ফলে স্থায়ীভাবেই ইউটিউব শর্ট ভিডিওতে ‘ডিসলাইক’ চিহ্নের অবসান হয়েছে– ধরেই নেওয়া যায়। প্রশ্ন: অন্যরাও কি একে একে ইউটিউবের পদাঙ্ক অনুসরণ করবে? আর তাই যদি হয়, তাহলে এর কারণ কী?
গুগল অবশ্য এসব নিয়ে অন্য ব্যাখ্যা দিয়েছে। তাদের মতে, ‘ডিসলাইক’ দেওয়ার সুযোগ সরিয়ে নেওয়া পরিষেবাকে আরও উন্নত করার লক্ষ্যে করা হয়েছে। প্রথমত, সমস্ত সুযোগকে একটি চিহ্নের মধ্যে আনা হচ্ছে, যাতে গ্রাহককে কমেন্ট, লাইক, শেয়ারের মতো সুবিধা একসঙ্গে দেওয়া যায়। এতে গ্রাহকেরই সুবিধা হবে। এছাড়া গ্রাহককে আরও দ্রুতগতিতে দীর্ঘ রিলস দেখার সুবিধা দেওয়া হয়েছে। ফলে দীর্ঘ রিল দেখতে গ্রাহকের আর বেশি সময় ব্যয় করতে হবে না। ‘ডিসলাইক’ চিহ্ন সরিয়ে ভালবাসার চিহ্ন ‘রেড হার্ট’ রাখা হয়েছে। সংস্থার মতে, এতে গ্রাহকের পছন্দ আরও ভালভাবে প্রতিফলিত হবে। কিন্তু ‘অপছন্দ’ হলে তা প্রকাশের কোনও সুবিধা নেই। প্রশ্ন উঠেছে ঠিক এখানেই।
সোশ্যাল মিডিয়ার জন্মই হয়েছে যাতে আমজনতা বিভিন্ন মিডিয়া হাউসের নানাবিধ স্বার্থসিদ্ধির চক্র থেকে বেরিয়ে এসে স্বাধীনভাবে নিজের মতপ্রকাশ করতে পারে। তাই নানা অছিলায় তার একটি রাস্তা রুদ্ধ করা হলে প্রশ্ন উঠবেই। অদূরভবিষ্যতে সোশ্যাল মিডিয়া কোন পথে বাঁক নেবে– তা তো সাধারণ ব্যবহারকারীর বোঝাও দরকার। এরকম না হয়ে যায়– ব্যবসায়িক মিডিয়া হাউসগুলির ছায়া থেকে বেরিয়ে সাধারণ ব্যবহারকারী অতিকায় বহুজাতিক সোশ্যাল মিডিয়া সংস্থার চক্রবূ্যহে পড়ে গেল! নিন্দুকরা আবার প্রশ্ন তুলছে– ধীরে ধীরে পছন্দসই কনটেন্ট কোটি কোটি ব্যবহারকারীর উপর চাপিয়ে দেওয়ার দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের এটা ট্রেলার নয় তো?
এসব কারণেই সোশ্যাল মিডিয়ার খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন। যাতে উত্তরের আভাস মেলে। পরিসংখ্যান বলছে– আমাদের দেশে তো বটেই, সঙ্গে তামাম বিশ্বেও সোশ্যাল মিডিয়া এখন সর্বোচ্চ প্রভাবশালী। তাই তার ছোট-বড় সব পরিবর্তনই কোটি কোটি মানুষের উপর প্রভাব ফেলে। আর, পরিসংখ্যান এও বলছে, এ দেশে ‘জেন জি’-র ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ সোশ্যাল মিডিয়াতে ঢুকছেই রিলস দেখতে। তাই হয়তো শেষ বিচারে এটা নিছক ‘ডিসলাইক’ সরানোর মধ্যে নাও সীমাবদ্ধ থাকতে পারে।
ভুলে গেলে চলবে না, ভুবনজুড়ে জনমত গঠনে সোশ্যাল মিডিয়া এখন জনমত গঠনেও অগ্রণী। বিগত দেড় দশকে ‘আরব বসন্ত’, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার জন বিক্ষোভ এর সাক্ষী। ফলে সোশ্যাল মিডিয়ার প্রতিটি পদক্ষেপই এখন বৃহত্তর আতশ কাচের তলায় চলে আসছে। পরিসংখ্যান এই খোঁজার এক পদ্ধতি হতে পারে। তাই পরিসংখ্যানের ছঁাকনিতে এই রিলস ইস্যু ছেঁকে দেখাই যেতে পারে।
সোশ্যাল মিডিয়ার ভুবনে রিলস আন্তর্জাতিক ডেটা অ্যানালিসিস সংস্থা ‘অ্যাক্সিস ইন্টেলিজেন্স রিসার্চ’-এর ২০২৬ সালের ৪ জুলাইয়ের রিপোর্ট অনুসারে– বিশ্বের ৫৭৯ কোটি মানুষ দিনে গড়ে ২ ঘণ্টা ২১ মিনিট সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে। এবং সোশ্যাল মিডিয়া দিনে দিনে কতখানি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, তা বোঝা যায় আর-একটি পরিসংখ্যান থেকে। ব্যবহারকারী দিনে এখন গড়ে ৬ ঘণ্টা ৬৩ মিনিট নেট রাজ্যে থাকে। অর্থাৎ সেই হিসাবে সোশ্যাল মিডিয়াতেই নেট-ভুবনের এক-তৃতীয়াংশ সময় ব্যয় হচ্ছে।
এবার রিলস কীরকমভাবে এই সোশ্যাল মিডিয়া জমানার বেতাজ বাদশা হয়ে উঠেছে তা দেখা যাক। অন্য একটি পরিসংখ্যান অনুসারে, ২০১৯ সালে বিশ্বে দিনে গড়ে ২ ঘণ্টা ২৫ মিনিট সোশ্যাল মিডিয়ায় থাকা হত, যার মধ্যে গড়ে ১৫ মিনিট টিকটক রিলস দেখা হত। ভারতের চিত্রটিও প্রায় একইরকমের। এ-দেশে দিনে গড়ে ১ ঘণ্টা ৩৫ মিনিট নেটরাজ্যে কাটাত ব্যবহারকারীরা, যার মধ্যে গড়ে ১০ মিনিট টিকটক রিলস দেখত। উল্লেখ্য, ২০১৯ সালে ফেসবুক বা গুগ্ল কেউই তাদের রিলস পরিষেবা চালু করেনি।
পরের বছর থেকেই বিশ্বের সোশ্যাল মিডিয়া জগতে রিলস তার উপস্থিতি জানান দিতে শুরু করে। ভারতেও তার প্রভাব এসে পড়ে। ওই বছরে বিশ্ব যেখানে গড়ে ২ ঘণ্টা ২৭ মিনিট সোশ্যাল মিডিয়াতে কাটিয়ে ২৭ মিনিট রিলস দেখে, সেখানে ভারতে দিনে গড়ে ১ ঘণ্টা ৪০ মিনিট সোশ্যাল মিডিয়ায় ঢুকে ২০ মিনিট রিলস দেখায় ব্যয় হয়। অর্থাৎ এক বছরের মধ্যে রিলস দেখার সময় দ্বিগুণ হয়ে গেল। অবশ্য এর নেপথ্যে ২০২০-র মাঝামাঝি এসে চিনা সমাজমাধ্যম টিকটকের ভারতে ‘নিষিদ্ধ’ হওয়া আর অাগস্ট মাসে ইনস্টাগ্রাম রিলসের আত্মপ্রকাশ বড় প্রভাব ফেলেছিল।
এ তো গেল সোশ্যাল মিডিয়ায় রিলস দেখার সময় ব্যয়ের খতিয়ান। অন্যদিক থেকে দেখলে, এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে মেটা, অ্যালফাবেট, টিকটকের মতো অতিকায় বহুজাতিক সংস্থার সোশ্যাল মিডিয়া ভুবনে অর্থ উপার্জনের চাবিকাঠি। কারণ ব্যবহারকারীর অভ্যাস, রুচি আর চাহিদার উপরেই দঁাড়িয়ে রয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার পুরো ব্যবসায়িক মডেল। তাহলে দেখা যাক কত রিলস বছরের পর বছর ধরে ব্যবহারকারীরা বিশ্বে ও ভারতে দেখছে। সঙ্গে সংস্থাগুলির ব্যবসাও কেমন হয়েছে।
২০১৯ সালের কথা ধরা যাক। অন্য কোনও সংস্থার রিলস না থাকায় চিনা বহুজাতিক টিকটক একচেটিয়া রাজ করে। বিশ্বে প্রতিদিন গড়ে ৩০০ কোটি বার টিকটকের রিলস দেখা হয়।
ফলে বিজ্ঞাপনবাবদ সোশ্যাল মিডিয়া সংস্থাগুলির আয় হয় প্রায় ৫০০ কোটি ডলার। ভারত অবশ্য এই রিলস পথে তখন নবাগত। ফলে ওই বছরে এ দেশে রিলসের ‘ভিউ’ যেখানে ৫০ কোটি, সেখানে আয়ও ৫০ কোটি ডলার ছোঁয়।
২০২৬ সালে এসে দেখা যাচ্ছে বিশ্ব সোশ্যাল মিডিয়া মানচিত্রে ভারত এখন আর নবাগত তো নয়ই, বরং সে এক অগ্রণী সদস্য। সোশ্যাল মিডিয়ার রিলস ও ভিডিওর ভুবনে এখন টিকটক ছাড়াও মুখ্যত রয়েছে দুই মার্কিন অতিকায় বহুদেশীয় সংস্থা মেটা (যার আওতায় রয়েছে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ আর ইনস্টাগ্রাম) আর অ্যালফাবেট (যার আওতায় রয়েছে গুগল ও তার নানাবিধ পরিষেবা এবং ইউটিউব)। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৬ সালে বিশ্ব সোশ্যাল মিডিয়া ভুবনে দিনে গড়ে ২৫ হাজার কোটি থেকে ২৬ হাজার কোটি ‘ভিউ’ হয় রিলসের। এর সিংহভাগই ইউটিউব ভিডিও, যার পরিমাণ দিন প্রতি গড়ে ২০ হাজার কোটি ‘ভিউ’। এই ভিডিও থেকে আয়ের পরিমাণও আকাশচুম্বী– প্রায় ৯ হাজার কোটি ডলার থেকে ১০ হাজার কোটি ডলার।
অন্যদিকে ২০২৬ সালের পরিসংখ্যানে ভারতীয় চিত্রও উঠে এসেছে। এ-দেশে দিনে গড়ে ৩ হাজার কোটি থেকে সাড়ে ৩ হাজার কোটি ভিউ হয়। শুধু তাই নয়, ভারতীয়রা এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় ঢুকে ৭৫ ভাগ সময় কাটায় রিলস দেখে। বলা হচ্ছে মূলত ইনস্টাগ্রাম রিলস আর ইউটিউবের শর্ট ভিডিও দেখে তারা। তাই এদেশেও সোশ্যাল মিডিয়ার ঝঁাপিও মন্দ ভরছে না। অন্য একটি হিসাব বলছে সংখ্যাটি ১ হাজার কোটি ডলার থেকে ১২০০ কোটি ডলার। অর্থাৎ ভারত দ্রুত সোশ্যাল মিডিয়ার এই রিলস বিভাগের চালিকাশক্তি হয়ে উঠছে।
সমালোচকরা ঠিক এখানেই প্রশ্নটা তুলেছেন। তঁাদের মতে, পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট: রিলস ও শর্টস ঝিমিয়ে পড়া সোশ্যাল মিডিয়া ভুবনকে ফের সজীব করে তুলেছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই সোনার ডিম পাড়া হঁাসের রক্ষণাবেক্ষণে একটু বেশি সক্রিয় হয়ে পড়েছে সংস্থাগুলি। এমনিতেই রিলস, শর্ট ভিডিও আর পোস্টের বিষয়বস্তু নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দেশে আপত্তির মুখোমুখি হয়েছে তারা।
ফলে, সাধারণ ব্যবহারকারীর আপত্তিকে কি এবার কৌশলে পাশ কাটিয়ে যাওয়া হল? ভবিষ্যতে কি মুষ্টিমেয় সংস্থার মর্জিমাফিক কনটেন্ট দেখতে হবে বিশ্বের কোটি কোটি ব্যবহারকারীকে? সন্দেহটা কিন্তু রয়েই যাচ্ছে। সবশেষে নিন্দুকদের একটি প্রশ্ন। সাধারণ মিডিয়ার কনটেন্টে আমজনতার কার্যত ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বলার কোনও অধিকার নেই। সোশ্যাল মিডিয়ায় সে ওই অধিকারটি পেয়েছে। তাই এখন ‘না’ বলার অধিকার হরণ করা হলে দুই মিডিয়ার মধ্যে সত্যিই ফারাক থাকবে তো?
(মতামত নিজস্ব)
লেখক সাংবাদিক
সর্বশেষ খবর
-
পুড়ল হেমন্ত-রাহুলের কুশপুতুল, পদত্যাগের দাবিতে মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবন ঘেরাওয়ের ডাক ঝাড়খণ্ডের ছাত্রবিক্ষোভে
-
ঢাকার পাক দূতাবাসের মদতে পাকিস্তানে ভারতীয় সিমকার্ড পাচার! কোচবিহার কাণ্ডে চাঞ্চল্যকর মোড়
-
পঞ্চভূতে বিলীন রাজা সেন, চোখের জলে বিদায় জাতীয় পুরস্কারজয়ী পরিচালককে
-
‘কী করছেন, সমস্ত রিপোর্ট আছে’, দলের বিধায়কদের চরম হুঁশিয়ারি শমীকের
-
ত্রুটি ছিল ‘নেট’ প্রশ্নপত্রেও, তিন বিষয়ে পুনঃপরীক্ষায় নির্দেশ এনটিএ-র, কোন বিষয়ে কবে পরীক্ষা?