কংগ্রেসকে এই আশা করা বন্ধ করতে হবে যে, রাহুল গান্ধী একাই দলটিকে নির্বাচনী সাফল্যের বৈতরণী পার করিয়ে দেবেন। তিনি একই সঙ্গে দলের বার্তাবাহক, সংগঠন চালক, প্রার্থী, প্রচারক এবং ভোট-রূপান্তরের কারিগর হতে পারেন না। রাহুল গান্ধী যদি সত্যিই নিজেকে বদলে থাকেন, তাহলে কংগ্রেসকেও তাঁর সঙ্গে তাল মিলিয়ে বদলাতে হবে। ‘ব্র্যান্ড রাহুল’ গড়ে তুলতে যতটা বিনিয়োগ তিনি করেছেন, ‘ব্র্যান্ড কংগ্রেস’ পুনর্গঠনে দলকে ততটাই বিনিয়োগ করতে হবে। লিখতে হবে রাজদীপ সরদেশাই।
দু’সপ্তাহ আগে পুনেতে বেশ অস্বাভাবিক একটি বিষয় চোখে পড়ল। হোর্ডিং থেকে ল্যাম্পপোস্ট, সাইনবোর্ড থেকে ব্যানার– যেদিকেই তাকাই, সর্বত্র একটিই রাজনৈতিক মুখ: রাহুল গান্ধী। সত্যি না কি চোখের ভুল, ঠাহর করতে মুহূর্তের জন্য চোখ কচলে আবার তাকালাম। নাহ্, ঠিকই দেখছি! বিজেপি-শাসিত একটি রাজ্যের রাজনৈতিক আকাশজুড়ে রাহুল গান্ধী? তাও আবার এলেবেলে বিজেপি-শাসিত রাজ্য নয়, মহারাষ্ট্রে! যেখানে বিজেপি কিনা ক্ষমতার শীর্ষে ও সাম্প্রতিক সময়ে কংগ্রেসের সাংগঠনিক পুনরুজ্জীবনের বিশেষ কোনও লক্ষণও দেখা যায়নি?
আরও পড়ুন:
এবার বলি, কোন উপলক্ষে সেখানে এমন সাজো-সাজো রব। রাহুল গান্ধীর ‘ছাত্রো কি গুঞ্জ’ অনুষ্ঠানে আর সে-অনুষ্ঠানের প্রচারে স্থানীয় কংগ্রেস শাখা যে কোনও কসুর রাখেনি, তা স্পষ্ট। আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, অনুষ্ঠানটির মূল লক্ষ্য ছিল তরুণীরা– সেই জেন জি প্রজন্ম, যাদের কাছে ‘পৌঁছতে চাই’ বলে প্রত্যেক রাজনৈতিক দলই দাবি করে, অথচ তাদের মন বোঝার ক্ষমতা গোটা কয়েকের কাছেই সীমিত। এই কথা না মেনে উপায় নেই– রাহুল গান্ধীর বক্তৃতাও নানা দিক থেকে ভারতীয় রাজনীতির ‘প্রচলিত’ ভাষা থেকে বেশ আলাদা ছিল। অনুষ্ঠানে উপস্থিত এক তরুণীর প্রশ্নের উত্তরে তিনি যুক্তি দেন, পুরুষের সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তিতে নারীদের সংজ্ঞায়িত করা অনুচিত; তারা নিজের স্বতন্ত্র পরিচয়ের অধিকারী। বলেন মেয়েদের বিরুদ্ধে সংগঠিত হিংসা শুধুমাত্র গার্হস্থ্য বা শারীরিক হিংসায় সীমাবদ্ধ এমন নয়। মেয়েদের সমানাধিকার ও সুযোগ থেকে বঞ্চিত করাও এক ধরনের ‘হিংসা’। দৈনন্দিন জীবনে মেয়েরা যে নানা ধরনের নিয়ন্ত্রণের মুখোমুখি হয়, তাও হিংসারই স্বরূপ। আসলে, তাঁর মূল বক্তব্য যদি তিনটি শব্দের স্লোগানে তুলে ধরা যায় তাহলে দাঁড়ায়: ‘পিতৃতন্ত্র গুঁড়িয়ে দাও।’
রাহুল গান্ধীর রাজনৈতিক অবস্থান হয়তো শক্তিশালী হচ্ছে। কিন্তু কংগ্রেসের অবস্থান? এখনও নয়। কেন নয়, সেটাই বলি। পুনের মাত্র কয়েক দিন পর গোয়া গিয়েছিলাম– আরও একটি বিজেপি-শাসিত রাজ্য, যেখানে আগামী বছরের গোড়াতেই নির্বাচন হওয়ার কথা। সেখানেও সেই চেনা কংগ্রেস-সমস্যাই চোখে পড়ল।
এবার আপনি রাহুল গান্ধীর রাজনীতির সঙ্গে সহমত পোষণ করতেও পারেন, নাও পারেন। কংগ্রেসকে সমর্থন করতে পারেন, বিরোধিতাও করতে পারেন। কিন্তু অন্তত একটি বিষয় অস্বীকার করার জায়গা নেই– এই ভাষা, এই শব্দচয়ন ভারতের রাজনৈতিক সভা-সমাবেশের চেনা ভাষা নয়। ফলে তাঁর সম্মোহক বক্তৃতায় অনুষ্ঠানে উপস্থিত তরুণীদের প্রতিক্রিয়াও ছিল বিপুলভাবে ইতিবাচক।
কিন্তু এখানেই বড় প্রশ্নটি এসে যায়: ওই তরুণীদের মধ্যে ক’জন বাস্তবে ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচন বা মহারাষ্ট্র বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেসকে ভোট দেবে? উত্তর: অজানা। কারণ শ্রোতাদের মন জয় করা আর নির্বাচন জেতার মধ্যে বিরাট ফারাক। রাহুল গান্ধীর রাজনৈতিক অবস্থান হয়তো শক্তিশালী হচ্ছে। কিন্তু কংগ্রেসের অবস্থান? এখনও নয়। কেন নয়, সেটাই বলি। পুনের মাত্র কয়েক দিন পর গোয়া গিয়েছিলাম– আরও একটি বিজেপি-শাসিত রাজ্য, যেখানে আগামী বছরের গোড়াতেই নির্বাচন হওয়ার কথা। সেখানেও সেই চেনা কংগ্রেস-সমস্যাই চোখে পড়ল। দলটি তার প্রধান প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়ার বদলে নিজেদের মধ্যেই লড়াই করছে– গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, নেতৃত্বের প্রবল টানাপোড়েন।
কংগ্রেসের প্রধান প্রতিপক্ষ মোদি-শাহ চালিত বিজেপি, সম্ভবত গত কয়েক দশকে ভারতের দেখা সবচেয়ে শক্তিশালী নির্বাচনী রাজনৈতিক যন্ত্র। সেই যন্ত্রের বিরুদ্ধে শুধু বক্তৃতা দিয়ে নির্বাচন জেতা যাবে না।
বিজেপিকে হারাতে হলে যে বৃহত্তর রাজনৈতিক জোট অপরিহার্য, তা গড়ে তুলতে সামূহিক ব্যর্থতা। কংগ্রেস জাতীয় স্তরে ঐক্যের কথা বলে। কিন্তু রাজ্যের পর রাজ্যে সাংগঠনিকভাবে সেই ঐক্যের চর্চা করতেই হিমশিম খায়। তারপর রয়েছে কর্নাটক– বড় রাজ্যগুলির মধ্যে হাতেগোনা কয়েকটি রাজ্যের একটি– যেখানে এখনও কংগ্রেস ক্ষমতায় এবং তাদের শক্তিশালী তৃণমূল সংগঠন রয়েছে। উপমুখ্যমন্ত্রী ডি কে শিবকুমার নিঃসন্দেহে সংগঠনে বহু-প্রয়োজনীয় উদ্যম ও রাজনৈতিক আগ্রাসন ফিরিয়ে এনেছেন। কিন্তু তঁার মন্ত্রিসভার দিকে তাকান। ৩৩ জন সদস্য। একজনও মহিলা নন!
বৈপরীত্যটি চোখে পড়ার মতো নয় কি? রাহুল গান্ধী যদি পুনেতে তরুণীদের সামনে দাঁড়িয়ে ক্ষমতায়ন, সুযোগ এবং নিয়ন্ত্রণের কাঠামো ভেঙে দেওয়ার মতো আবেগী সংলাপ বলেন, তাহলে কংগ্রেসের নিজের শাসনব্যবস্থায় কি সেই বার্তার প্রতিফলিত হওয়া উচিত নয়? তা না হলে এটি রাজনৈতিক রূপান্তরের বদলে নিছক রাজনৈতিক লোকদেখানো প্রচার মনে হওয়ার ঝুঁকি প্রবল। আর এখানেই বর্তমান কংগ্রেসের সবচেয়ে বড় সমস্যা নিহিত। দলের নেতৃত্ব এমন অনেক কথাই বলছে, যেগুলি বলা উচিত। কিন্তু জীর্ণ সংগঠনটি এখনও সেই কথা কাজে পরিণত করতে অপারগ।
প্রশ্নটি হল: রাহুল গান্ধী যদি তরুণ ভারতের সঙ্গে কথা বলার ধরন বদলাতে পারেন, তাহলে কংগ্রেস তার কাজের ধরন বদলাতে পারে না কেন? দলটি এখনও তার নিজের নেতার থেকে এত কয়েক ধাপ পিছিয়ে কেন?
সারা দেশের দিকে তাকান। পাঞ্জাবেও কয়েক মাসের মধ্যে নির্বাচন। সেখানে কংগ্রেস এখনও ভীষণভাবে বিভক্ত। রাজ্যের পর রাজ্যে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব রাজনৈতিক শক্তি ও সময় কুরে খাচ্ছে– যে শক্তি বিজেপির বিরুদ্ধে কাজে লাগানো উচিত ছিল। সংগঠনের বহু স্তরেই দলটি এখনও প্রবলভাবে পুরুষনির্ভর। তরুণ নেতাদের জন্য প্রকৃত পরিসর তৈরি করতেও দল যারপরনাই ব্যর্থ। ২০২২ সালের উদয়পুর চিন্তন শিবির এবং তার অসংখ্য প্রতিশ্রুতির কথা মনে আছে? কংগ্রেস বলেছিল, তরুণ নেতৃত্বকে আরও বেশি প্রতিনিধিত্ব দেওয়া হবে; এমনকী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, সাংগঠনিক পদগুলির ৫০ শতাংশ ৫০ বছরের কম বয়সিদের দেওয়া হবে। সেই প্রতিশ্রুতির কতটা বাস্তবে দৃশ্যমান? দল বলেছিল– ওবিসি, দলিত ও আদিবাসীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রস্থলে নিয়ে আসা হবে। প্রতিশ্রুত মাত্রায় কি তা ঘটেছে? নারীদের নেতৃত্বে আরও বড় ভূমিকা দেওয়ার কথাও বারবার বলা হয়েছে। আবারও সংগঠনের দিকে তাকিয়ে দেখুন: কোথায় সেই রূপান্তর? এ শুধু বাহ্যিক চেহারা বা ভাবমূর্তির প্রশ্ন নয়।
এ বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন। কারণ আপনি কোনও তরুণ ভোটারকে ‘নতুন ভারত’-এর স্বপ্নে বিশ্বাস করতে বলতে পারেন না, যদি আপনার নিজের দল এখনও ‘পুরনো ভারত’-এর অভ্যাস ও রীতি দ্বারা পরিচালিত হয়। কংগ্রেসের প্রধান প্রতিপক্ষ মোদি-শাহ চালিত বিজেপি, সম্ভবত গত কয়েক দশকে ভারতের দেখা সবচেয়ে শক্তিশালী নির্বাচনী রাজনৈতিক যন্ত্র। সেই যন্ত্রের বিরুদ্ধে শুধু বক্তৃতা দিয়ে নির্বাচন জেতা যাবে না। তবু এক্ষেত্রে আমার মনে হয়, রাহুল গান্ধীর কিছুটা কৃতিত্ব অবশ্যই প্রাপ্য। গত কয়েক বছরে তিনি ক্রমশ একটি বাস্তব অনুভূতিকে ধারণ করতে পেরেছেন– তরুণ ভারতের ক্ষোভ, উদ্বেগ এবং আকাঙ্ক্ষা। বেকারত্ব, বৈষম্য, সম্পদের কেন্দ্রীভবন, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার চাপ, ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসা চাকরির বাজার নিয়ে ভয়, কিংবা রাজনৈতিক ব্যবস্থা তাদের কথা শুনছে না– এমন অনুভূতি বহু তরুণের মধ্যেই রয়েছে। মূলধারার অধিকাংশ রাজনীতিকের তুলনায় রাহুল সেই অসন্তোষের মুখোমুখি হতে অনেক বেশি আগ্রহী হয়েছেন।
তাহলে স্বাভাবিক প্রশ্নটি হল: রাহুল গান্ধী যদি তরুণ ভারতের সঙ্গে কথা বলার ধরন বদলাতে পারেন, তাহলে কংগ্রেস তার কাজের ধরন বদলাতে পারে না কেন? দলটি এখনও তার নিজের নেতার থেকে এত কয়েক ধাপ পিছিয়ে কেন? না কি রাহুলও সমস্যারই অংশ– তিনি নিজের ছন্দে এগিয়ে চলেছেন, কিন্তু দলকে সঙ্গে নিয়ে এগচ্ছেন না? কংগ্রেসের জন্য অস্বস্তিকর সত্যটি হল: রাহুল গান্ধী হয়তো রাজনৈতিকভাবে নিজেকে নতুন করে নির্মাণ করছেন, কিন্তু কংগ্রেস সংগঠন এখনও তার অতীতের বোঝা বড্ড ভারী। শুধু ব্যক্তিনির্ভর হয়ে নির্বাচন জেতা যায় না। দরকার এমন দ্বিতীয় সারির নেতৃত্ব, যারা উচ্চাকাঙ্ক্ষী, বিশ্বাসযোগ্য এবং কয়েক দশকের গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের ভারে ন্যুব্জ নয়। সর্বোপরি দরকার একটি শক্তিশালী সংগঠন, যা বছরে ৩৬৫ দিন মাঠে থাকবে– ভোটের মাত্র ৪৫ দিন আগে নয়।
কংগ্রেসকে এই আশা করা বন্ধ করতে হবে যে, রাহুল গান্ধী একাই দলটিকে নির্বাচনী সাফল্যের বৈতরণী পার করিয়ে দেবেন। তিনি একই সঙ্গে দলের বার্তাবাহক, সংগঠন চালক, প্রার্থী, প্রচারক এবং ভোট-রূপান্তরের কারিগর হতে পারেন না। রাহুল গান্ধী যদি সত্যিই নিজেকে বদলে থাকেন, তাহলে কংগ্রেসকেও তাঁর সঙ্গে তাল মিলিয়ে বদলাতে হবে। ‘ব্র্যান্ড রাহুল’ গড়ে তুলতে যতটা বিনিয়োগ তিনি করেছেন, ‘ব্র্যান্ড কংগ্রেস’ পুনর্গঠনে দলকে ততটাই বিনিয়োগ করতে হবে দলের বার্তা ঠিক হতে পারে, কিন্তু সেই বার্তা পৌঁছে দেওয়ার সাংগঠনিক নেটওয়ার্কেও ভুল থাকলে চলবে না। একজন নেতা যেমন ক্রমশ প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে পারেন, তাঁর সংগঠনও ক্রমশ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়তে পারে। কংগ্রেস সামাজিক মাধ্যমে বয়ানের লড়াই জিততে পারে, অথচ নির্বাচনের দিন বুথের লড়াইয়ে হেরে যেতে পারে।
পুনশ্চ পুরনো কংগ্রেস দিয়ে নতুন ভারত জেতা যায় না। এটাই রাহুল গান্ধী এবং কংগ্রেসের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। নেতা হয়তো এগচ্ছেন। কিন্তু দল যদি প্রতিশ্রুতির সঙ্গে কাজের মিল না ঘটাতে পারে, তাহলে কংগ্রেস সেখানেই থেকে যাবে যেখানে এখন রয়েছে– পরিবর্তনের বুলি আওড়াবে, অথচ নিজে চলবে শম্বুক গতিতে।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
হিন্দি সিরিয়ালের প্রস্তাব ফিরিয়েছেন! ‘গোয়েন্দা গিন্নি’র দ্বিতীয় সিজন চাইছেন ইন্দ্রাণী
-
পচা মাছ-মাংসের মাঝেই বিপদ কাজুবরফিতেও, চকচকে রাংতাই বিকল করবে লিভার-কিডনি!
-
কোথায় মহিলা ‘কমরেড’রা? আন্দোলনে থাকলেও সংগঠনে নেই বহু তরুণ তুর্কি, নয়া উদ্বেগ সিপিএমে
-
পুলিশ-রাজনৈতিক নেতাদের নাম করে অসহায় মহিলাকে হুমকি! ভবানীপুরে পুলিশের জালে ‘গবেষক’
-
পরিচারিকাকে যৌন হেনস্তা! বোলপুরে গ্রেপ্তার বিজেপি যুবনেতা, বহিষ্কার করল দল