এবারের ২১ জুলাইয়ের আবহটি মনে করাচ্ছে ১৯৯৭ সালের ৯ আগস্টকে। তখন সাংবাদিকতা জীবনের প্রথম ধাপ। যদিও ‘পলিটিক্যাল বিট’-এ কাজ করার সুযোগ এসে গিয়েছে। বিশেষ করে কংগ্রেসের খবর ‘কভার’ করার দারুণ একটা মজা ছিল। সিপিএমের ভিতরের খবর বের করা যতটা শক্ত, ততটাই সহজ কংগ্রেসের খবর সংগ্রহ করা। কারণ, খবর প্রকাশের জন্য নেতারাই ছিলেন উৎসাহী। কংগ্রেসে তাবড় সব নেতা তখন! প্রণববাবু, সিদ্ধার্থবাবু, প্রিয়বাবু, বরকতসাহেব, সুব্রতদা, সোমেনদা, অজিত পাঁজা– কে নেই! মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তখন এঁদের তুলনায় বয়সে অনেক ছোট। এই শীর্ষ নেতারা প্রত্যেকে নিজেকে ‘কেন্দ্রশাসিত’ মনে করতেন। ফলে প্রদেশে তীব্র কলহ সংঘাত লেগেই থাকত। বিবৃতি, পাল্টা বিবৃতি। কমিটি দখল, ভোটের টিকিট নিয়ে লড়াই বড় আকার নিত। ছিল হরেক মুখরোচক খবরও। তখন সোশাল মিডিয়া ছিল না। ছিল না টিভি চ্যানেলের রমরমা।
১৯৯৩ সালে ২১ জুলাই বাম সরকারের পুলিশ গুলি চালায় তৎকালীন যুব কংগ্রেস নেত্রী মমতার মহাকরণ অভিযান কর্মসূচিতে।
যদি এখনকার মতো ফেসবুক, পোর্টাল থাকত– তাহলে যে কী হত! সকালে খবরের কাগজই ছিল ভরসা। ‘কংগ্রেস’ বিট করা মানে রিপোর্টারদের দৌড়তে হত নেতাদের বাড়ি-বাড়ি। ৯ আগস্ট। সকালে একটু তাড়াতাড়ি ডোরিনা ক্রসিং পেরিয়ে হাজির হলাম নেতাজি মূর্তির সামনে। ডানদিকে সীতারাম কেশরীর ছবি। তিনি তখন কংগ্রেস সভাপতি। অন্য নেতাদের বড় বড় কাটআউট। অনেক গাড়ি নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামের দিকে চলেছে। বাঁদিকে প্রেস ক্লাবের সামনে গান্ধীমূর্তির নিচে মমতার মঞ্চ ইন্ডোরের দিকে মুখ করে। ইন্ডোরে ‘এআইসিসি’-র ‘প্লেনারি সেশন’ বসেছে। প্রদেশ কংগ্রেসের নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ ঘিরে সোমেন-মমতার দ্বন্দ্বে রাজ্যে কংগ্রেস কার্যত দু’-ভাগ। হাইকমান্ড সোমন মিত্রর পক্ষে। তাঁকেই প্লেনারির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। মমতা তাতে আরও চটেছেন। দল ছাড়ার প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছেন। কোনও কোনও কংগ্রেস নেতা মমতাকে পিছন থেকে মদত করলেও– প্রকাশ্যে নেই।
প্লেনারির দিনই নিজেদের ‘আসল’ কংগ্রেস দাবি করে গান্ধীমূর্তির নিচে সমাবেশ ডেকে দিয়েছেন মমতা। ‘ইন্ডোর আউটডোর’ নামে বিখ্যাত হয়ে যাওয়া দিনটি এখনও আলোচনায় আসে। কারণ, সেদিনই কংগ্রেসের ভাঙন স্পষ্ট হয়ে ‘তৃণমূল’ নামটি সামনে এসেছিল।
ওই সভা থেকে ছাত্র-যুব-মহিলা ইত্যাদি শাখা সংগঠন ‘তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম দিয়েই তৈরি করে দিয়েছিলেন মমতা। অস্বীকার করার উপায় নেই– সেদিন প্রদেশ কংগ্রেস নেতারা ছিলেন ইন্ডোরে, কর্মীরা ছিলেন ‘অাউটডোর’, অর্থাৎ গান্ধীমূর্তির পাদদেশে।
২৯ বছর পর আবার সেই ধর্মতলা ময়দান চত্বরে সভা ঘিরে তীব্র কৌতূহল। সেই ‘আসল’-‘নকল’ দ্বন্দ্ব নিয়ে টানাটানি। সেদিনই কার্যত কংগ্রেস ভেঙেছিল, জন্ম হয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেসের। আর আগামী ২১ জুলাই প্রকট হবে তৃণমূলের ভাঙন। মমতা এবং বিদ্রোহী, কাদের সভা কেমন রূপ নেয় তার উপরই নির্ভর করবে তৃণমূলের ভবিষ্যৎ।
১৯৯৩ সালে ২১ জুলাই বাম সরকারের পুলিশ গুলি চালায় তৎকালীন যুব কংগ্রেস নেত্রী মমতার মহাকরণ অভিযান কর্মসূচিতে। ১৩ জন প্রাণ হারান। আহত বহু। তারপর থেকে ওই দিন ধর্মতলায় ভিক্টোরিয়া হাউসের সামনে শহিদ তর্পণ সমাবেশ হয়ে আসছে। কংগ্রেস ছেড়ে নতুন দল করলেও তর্পণের দাবি নিজের হাতে রাখেন মমতা। যুব কংগ্রেসের তরফ থেকে অবশ্য কিছু-না-কিছু কর্মসূচি করা হয় এদিন। কিন্তু মমতার সভার বহরের কাছে তা গুরুত্বহীন হয়ে যায়। তিনি বরাবর এই সমাবেশকে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরার মঞ্চ হিসাবে ব্যবহার করেছেন। অনেক বড় বড় সিদ্ধান্ত এই সমাবেশ থেকে ঘোষিত হয়েছে। এবারও তেমনই এক কঠিন এক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়। কিন্তু দলের রাশই তাঁর হাতের বাইরে। নিজের দেওয়া নাম, নিজের তৈরি প্রতীক বেহাত হয়ে যাওয়ার পরিস্থিতি।
মমতা শিবির চেয়েছিল বরাবরের মতো ভিক্টোরিয়া হাউসের সমানের অংশটি তাদেরও দেওয়া হোক। সরকার বদলেছে। রাস্তা আটকে সভা না-করার নিয়মগুলি প্রাণ পেয়েছে।
মাত্র ২ মাস আগে যে-দলটির ২২০ জন বিধায়ক ছিল, ৪১ জন সাংসদ ছিল, সবক’টি জেলা পরিষদ, সব পুরসভা, পুরনিগম হাতে ছিল, তাদের দল ভেঙে তিন টুকরো। ২০ জন লোকসভার সদস্য ভেঙে বেরিয়ে নতুন দল ‘এনসিপিআই’-তে যোগ দিয়েছেন। ৩ জন রাজ্যসভার সদস্য ইস্তফা দিয়ে বিজেপির টিকিটে আবার রাজ্যসভায় প্রার্থী। ভেঙে যাচ্ছে একের পর এক পুরসভা, জেলা পরিষদ। ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ৬৫ জনই কালীঘাটের ছত্রছায়ার বাইরে এসে নিজেদের ‘আসল’ তৃণমূল দাবি করেছে। মমতাকে বাদ দিয়ে গড়া হয়েছে রাজ্য ও জাতীয় কমিটি। জেলা সভাপতিদের নামও বলা হয়েছে। দলের নাম, প্রতীক, দপ্তর, অর্থ সবই তারা নিজেদের কাছে রাখতে চায়। বল গড়িয়েছে আদালতে। নির্বাচন কমিশন দুই শিবিরের কাছ থেকে তথ্য চেয়েছে। পরিস্থিতি এতটাই প্রতিকূল যে, মমতার হাত থেকে দল ও প্রতীক চলে গেলে আশ্চর্য হওয়ার থাকবে না। এরকম সংকটময় পরিস্থিতিতে ২১ জুলাইয়ের মুখোমুখি আগে কখনও হননি মমতা।
কেন মনে পড়ছে ২৯ বছর আগের কথা? ‘২১ জুলাই’ এবার তিন ভাগ। সব ঠিকঠাক থাকলে খুব অল্প ব্যবধানের মধ্যে ৩টি সভা থেকে ‘শহিদ তর্পণ’ হবে। একটি সভা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। একটি তাঁর সঙ্গ ত্যাগ করে নিজেদের ‘আসল তৃণমূল’ দাবি করা বিধায়কদের। অপরটি প্রদেশ যুব কংগ্রেসের। মমতার সভার অনুমতি এখনও মেলেনি। তবে তিনি জানিয়েছেন, সভা হবেই। প্রয়োজনে রাস্তায় রিকশার উপর দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দেবেন। অন্যদিকে, বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় শিবিরকে পুলিশ গান্ধীমূর্তির নিচে সমাবেশ করার অনুমতি দিয়েছে। প্রদেশ যুব কংগ্রেস আবার শহিদ মিনারে সভা করবে। অনেক আগেই তারা সমাবেশস্থল বুকিং করে রেখেছে। তাহলে তথাকথিত ‘কালীঘাট তৃণমূল’-এর সভা হবে কোথায়?
তুঙ্গে জটিলতা। মমতা শিবির চেয়েছিল বরাবরের মতো ভিক্টোরিয়া হাউসের সমানের অংশটি তাদেরও দেওয়া হোক। সরকার বদলেছে। রাস্তা আটকে সভা না-করার নিয়মগুলি প্রাণ পেয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই কলকাতা পুলিশ অনুমতি দেয়নি। এক্ষেত্রে লালবাজার হাতিয়ার করেছে একবছর আগে কলকাতা হাই কোর্টেরই একটি নির্দেশকে। যে-রায়ে ২০২৫ সালের সমাবেশে যান চলাচল ও জনজীবন স্বাভাবিক রাখার নানা নির্দেশিকা জারি করে বলা হয়েছিল, ২০২৬ সাল থেকে অন্য স্থানে সমাবেশ করতে হবে। ভিক্টোরিয়া হাউসের সামনে রাস্তা আর বন্ধ করা যাবে না। ফলে ২১-এর ত্রিমুখী সভার মধ্যে দু’টি ক্ষেত্রে পুলিশ অনুমতি দিলেও একটি ক্ষেত্রে আবেদন নাকচ হয়।
গত ৩৩ বছর ধর্মতলার সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় মমতার সমাবেশ হয়ে এসেছে। শহরের কেন্দ্রস্থল আটকে সভায় কোনওকালেই পুলিশের সম্মতি ছিল না। যদিও মমতার দাবি ছিল, মহাকরণ অভিযানে পুলিশের গুলিতে নিহতদের দেহগুলি পড়েছিল এই এলাকায়। ফলে সেখানেই সভা হবে। বামফ্রন্ট আমলেও সমাবেশ স্থল নিয়ে পুলিশের বাধা এসেছে। কিন্তু শেষ অবধি ঝামেলায় যায়নি জ্যোতিবাবু ও বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যর প্রশাসন। তৃণমূলের ১৫ বছর কোনও সমস্যা হওয়ার কথা ছিল না।
মমতা শিবির যেখানেই অনুমতি পাক, সভায় লোক আনা চ্যালেঞ্জের। কারণ, প্রতিকূল পরিস্থিতি। নেতা নেই, ভরসা কর্মীরাই।
কিন্তু এবার বাংলার বাতাসে গেরুয়া হাওয়া। নীল-সাদা মুছে গিয়েছে। পুলিশ জানিয়ে দিয়েছে, প্রত্যেককে আইন মানতেই হবে। রাস্তা আটকে ওই স্থানে সভা নয়। বল গড়িয়েছে হাই কোর্টে। সেই রায় এলে জানা যাবে, কোথায় মমতা সভা করার অনুমতি পাবেন। না কি অনুমতি দেওয়া
হবে না। রাজনৈতিক মহল অবশ্য মনে করছে, কোর্ট হয়তো সভা করার অনুমতি দেবে। কিন্তু ভিক্টোরিয়া হাউসের সামনে নয়। সেক্ষেত্রে স্থান? বিষয়টি জটিল বুঝতে পেরেই কালীঘাট শিবির তাদের পোস্টারে ‘কলকাতা চলো’-র ডাক দিয়েছে। ‘ধর্মতলা চলো’ নয়। এই পোস্টারের অর্থ: কলকাতায় সভা হবে, কিন্তু কোথায় সেটা জানা যায়নি। অপেক্ষা আদালতের রায়ের।
ইতিমধ্যে কলকাতা পুলিশের তরফে একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ধর্মতলায় পূর্বের ১৪৪ ধারা, বর্তমানের ন্যায় সংহিতা অনুযায়ী ১৬৩ ধারা জারি করে
সভা-সমাবেশ ‘নিষিদ্ধ’ করা হয়েছে। ঠিক এমনই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে ২১ জুলাই দিনটি।
মমতা শিবির যেখানেই অনুমতি পাক, সভায় লোক আনা চ্যালেঞ্জের। কারণ, প্রতিকূল পরিস্থিতি। নেতা নেই, ভরসা কর্মীরাই। এই সুযোগে ঋতব্রত শিবির শক্তি দেখাতে সক্রিয় হয়েছে। দুই তৃণমূলের মধ্যে ‘বিকল্প’ হয়ে উঠতে চাইছে কংগ্রেস। শহিদ মিনার ভরিয়ে দুই শিবিরকে টেক্কা দিতে তারা মরিয়া।
২১-এর ইতিহাসে এমন অভিনব পরিস্থিতি আগে দেখিনি। এবার হয়তো ইন্ডোর নেই, কিন্তু যে-আউটডোরে তৃণমূলের জন্ম– সেখানেই এবার অস্তিত্বরক্ষার লড়াই।
সর্বশেষ খবর
-
‘উনি যদি দিদিমণিকে ছেড়ে চলে যান…’, মমতা ‘মিত্র’হারা হতেই কোন ভবিষদ্বাণী মনে করালেন সুকান্ত?
-
উজ্জ্বল লাল নাকি কোমল ন্যুড? পছন্দের লিপস্টিকই বলে দেবে আপনি কেমন মানুষ
-
এবার তোলাবাজির অভিযোগ নকভির বিরুদ্ধে! পাক বোর্ডের অদ্ভুত নীতিতে অথৈ জলে ক্রিকেটাররা
-
মারাদোনার জন্যই আর্জেন্টিনা ভক্ত, আজ রাত জেগে মেসির জন্য গলা ফাটাবেন ঈশান?
-
বিশ্বকাপ থেকে ‘তাড়ানো’ হোক মেসিদের, পড়ল ১ কোটি ভোট! দেখে নিন ভোটদানের পদ্ধতি