বৃদ্ধ ও মধ্যবয়সিদের একটা বড় সমর্থন এখনও আওয়ামি লিগের প্রতি। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যেভাবে মুছে ফেলার চেষ্টা হচ্ছে, তার বিরুদ্ধে শিক্ষিত শ্রেণির প্রবল ক্ষোভ রয়েছে। এই সব মানুষের কেউ জামায়েতকে ভোট দেবে না। তাহলে কাকে দেবে?
আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচন। ‘মুক্তিযুদ্ধ’-র দল আওয়ামি লিগকে ‘নিষিদ্ধ’ করে মানুষের রায় চাওয়া হলেও শেষ অবধি পড়শি দেশে যে সাধারণ নির্বাচন হচ্ছে এটাই যথেষ্ট। নির্বাচন ছাড়া গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয় না। বাংলাদেশ জুড়ে গত দেড় বছর যেভাবে অাইন হাতে তুলে নেওয়ার একের-পর-এক ঘটনা ঘটেছে, জেলের ফটক খুলে খুনের অাসামিকে বের করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, ফঁাসির সাজাপ্রাপ্ত বেকসুর হয়েছে, প্রকাশে্য সংখ্যালঘুদের পুড়িয়ে মারার ঘটনা ঘটেছে, তার একমাত্র কারণ গণতন্ত্রহীনতা। দুষ্কৃতীরা প্রকাশে্য অপরাধ করার সাহস পায় তখন, যখন তারা জানে, পুলিশ চুড়ি পরে বসে অাছে। ক্ষমতা নেই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার। বাংলাদেশে এখন যঁারা ক্ষমতা দখল করে বসে অাছেন, তঁাদের কেউই নির্বাচিত নন। সরকার চালানোর কোনও অভিজ্ঞতা তঁাদের প্রায় কারও নেই। ভোটে দঁাড়ালে নিজের স্ত্রীর ভোটটিও পেতেন কি না সন্দেহ। কিন্তু বহু মানুষের ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে তঁারা দাদাগিরি করে যাচ্ছেন। নিজের অাখের গুছিয়ে নিলেন।
আরও পড়ুন:
ফলে তিতিবিরক্ত মানুষ অপেক্ষা করছিল একটা ভোটের জন্য। অবশেষে সেটি হচ্ছে। প্রাণভয়ে শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর এই লুটপাটের শক্তি খুব বুদ্ধি করে এমন এক ব্যক্তিকে সামনে খাড়া করে যঁার অান্তর্জাতিক পরিচয় রয়েছে। পকেটে নোবেল। ধারণা কাজে দেয়। মুহাম্মদ ইউনূসের নামটি শুনে চরম দুর্দিনে পদ্মাপারের মানুষ মনে করে, ইউনূস পারবেন খাদের কিনারা থেকে একটা জাতিকে তুলে ধরতে। তিনি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করবেন। সমাজে শান্তি ফেরাবেন। সব ধর্ম-জাতির পক্ষে ঐকে্যর ধারক বাহক হবেন। কিন্তু ইউনূস সাহেব মেরুদণ্ডটা প্যারিসে রেখে ঢাকার বিমান ধরেছিলেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পুতুল নবাব মিরজাফরের মতোই থাকতে হবে বুঝেও তিনি পড়ে পাওয়া চোদ্দো অানা অঁাকড়ে ধরলেন। মৌলবাদী জামায়েত ও হঁাটুর বয়সি কিছু ছেলেপুলের কাছে অাত্মসমর্পণ করলেন।

বাংলাদেশে এখন যঁারা ক্ষমতা দখল করে বসে অাছেন, তঁাদের কেউই নির্বাচিত নন। সরকার চালানোর কোনও অভিজ্ঞতা তঁাদের প্রায় কারও নেই। ভোটে দঁাড়ালে নিজের স্ত্রীর ভোটটিও পেতেন কি না সন্দেহ।
১৭ কোটির দেশের প্রধান উপদেষ্টা মানে তো প্রধানমন্ত্রীর পদ। হাসিনার সরকারের প্রতি ‘জেন জি’-র ক্ষোভকে সামনে রেখে জীবন-সায়াহ্নে দেশের দায়িত্ব পেয়ে তিনি অারও ভেবেছিলেন, ভোট না করে সংস্কারের দোহাই দিয়ে সুখভোগ করে যাবেন। তঁার সমর্থক তথাকথিত বৈষম্যবিরোধী ছাত্রনেতারাও চাইছিল না ভোটটা হোক। কারণ, ‘এনসিপি’ নামক যে-দলটি তারা তৈরি করে, সেই দলের সভায় মাইক বঁাধার লোক ছাড়া কেউ যাচ্ছিল না। ভাবতে অবাক লাগে, স্রেফ ভারতের বিরুদ্ধে অযৌক্তিক, ভিত্তিহীন গরম গরম কথা বলে টিকে থাকা খানকতক ডেঁপো ছোকরার নির্দেশে এই দেড় বছর কাটিয়েছেন একজন নোবেলজয়ী। তিনি জানতেন, ভোট হলেই খেল খতম। তাই চুপ করেছিলেন। ভোটের কথা জিজ্ঞেস করা হলেই বলছিলেন, সংস্কার চলছে। সংস্কার তঁার সময়ে কতটা হল সেই তালিকা অবশ্য পেশ করা যায়নি। বরং বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য সংকটের মুখে।
বিশ্বজুড়ে ইউনুস কতটা বিরাগভাজন হয়েছেন তা স্পষ্ট হল টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে। ভারতকে ইগনোর করতে গিয়ে বাংলাদেশ একঘরে হয়ে গেল। বোকার মতো ‘ভারতে খেলব না’ বলে জেদ ধরে থেকে বাদ পড়তে হল। একটি দেশও তাদের পাশে থাকল না। মনে করা হচ্ছিল, পাশে থাকবে একমাত্র ‘মিত্র’ পাকিস্তান। কিন্তু তারাও গাছে তুলে মই কেড়ে নিল। অাহাম্মকের জেদের জেরে বাংলাদেশের ছেলেরা বঞ্চিত হল বিশ্বকাপের মতো বড় অাসর থেকে। ভারত একটি গণতান্ত্রিক দেশ। এখানে জনগণ প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা করে, কিন্তু তঁার বাড়ি থেকে অন্তর্বাস লুট করে না। কোনও নেতাকে পালিয়ে অন্য দেশে অাশ্রয় নিতে হয় না। ভোটই মানুষের অস্ত্র। মানুষ ক্ষমতায় বসায়, দরকার হলে শাসককে জনগণ কান ধরে নামায় ক্ষমতার চেয়ার থেকে। এই দেশ ক্রিকেটপ্রেমী। খেলোয়াড়দের প্রতি কোনও ক্ষোভ নেই। তারা খেলত অবাধে। নিরাপত্তা নিয়ে কোনও প্রশ্নই ছিল না।
বিশ্বজুড়ে ইউনুস কতটা বিরাগভাজন হয়েছেন তা স্পষ্ট হল টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে। ভারতকে ইগনোর করতে গিয়ে বাংলাদেশ একঘরে হয়ে গেল। বোকার মতো ‘ভারতে খেলব না’ বলে জেদ ধরে থেকে বাদ পড়তে হল।
তবে অামার মনে হয়, বাংলাদেশের এই ভারতে খেলতে অস্বীকার করার সিদ্ধান্তের পিছনে ভোটের কূটবুদ্ধি অাছে। শাসক শ্রেণি ভোটের অাগে জনগণকে দেখাতে চাইল তারা কতটা ভারতবিরোধী। রাজনীতি করতে গিয়ে তারা বাংলাদেশ ক্রিকেটকে কয়েক দশক পিছিয়ে দিল। যাই হোক, ইউনুস ঠেকাতে পারেননি। ঘরে-বাইরে চাপের মুখে রাজি হতে হয় নির্বাচনে। বিশেষ করে নেপালে অভু্যত্থানের পর তদারকি সরকারের প্রধানমন্ত্রী সুশীলা কার্কি ছ’মাসের মধ্যে নির্বাচন করার প্রতিশ্রুতি দিলেন, তাতে অার কিছু করার ছিল না ইউনুসের। সেই চাপেই ভোট বাংলাদেশে।
এখন প্রশ্ন, ভোটের ফল কী হবে। দু’টি বড় ঘটনা এই সময় ঘটেছে। বিএনপি নেত্রী, দেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া প্রয়াত হয়েছেন। মায়ের মৃতু্যর অাগে ১৭ বছর পর ইংল্যান্ড থেকে দেশে ফিরেছেন পুত্র তারেক রহমান। তিনি অাসায় বিএনপি শিবির চাঙ্গা। ভোটের সমীকরণও নির্দিষ্ট হয়ে গিয়েছে। একদিকে জামায়েত, এনসিপি-সহ ১০-১২টি দল। অন্যদিকে বিএনপি। তৃতীয় শক্তি প্রয়াত সেনাপ্রধান হুসেন মহম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টি। তঁাদের অবশ্য জনবল রংপুরে সীমাবদ্ধ। বহু দিন পর বাংলাদেশে ভোট হচ্ছে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া– এই বাইনারি সরিয়ে। তিন শক্তির মধে্য বিএনপিরই অভিজ্ঞতা সবচেয়ে বেশি। সব এলাকায় তাদের সমর্থন অাগে থেকেই ছিল। পক্ষান্তরে দীর্ঘ নির্বাসনে থাকা জামায়াতের দফতর খুলল ২০২৪ সালের ৫ অাগস্টের পর। যেহেতু তাদের একটা অতীত ইতিহাস অাছে, সেজন্য অচিরেই অফিসগুলিতে ভিড় বাড়তে থেকেছে। জামায়াতের সঙ্গী হয়েছে এনসিপির ছাত্ররা, যাদের ভোটে লড়ার অভিজ্ঞতাই নেই। ফলে স্বাভাবিক অঙ্কে বাংলাদেশের জনমত সমীক্ষায় এগিয়ে গিয়েছে বিএনপি। তারেক রহমানকে প্রধানমন্ত্রী দেখতে চাইছে বহু মানুষ। বিএনপি সমর্থন পাচ্ছে ধর্মনিরপেক্ষ, মুক্তিযুদ্ধপন্থী সাধারণ মানুষের।
বহু দিন পর বাংলাদেশে ভোট হচ্ছে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া– এই বাইনারি সরিয়ে। তিন শক্তির মধে্য বিএনপিরই অভিজ্ঞতা সবচেয়ে বেশি। সব এলাকায় তাদের সমর্থন অাগে থেকেই ছিল।
প্রশ্ন হচ্ছে, কী করবে আওয়ামি লিগের সমর্থকরা। যুবকদের মধে্য হাসিনা জনপ্রিয়তা হারালেও, বৃদ্ধ ও মধ্যবয়সিদের একটা বড় সমর্থন এখনও আওয়ামি লিগে প্রতি। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যেভাবে মুছে ফেলার চেষ্টা হচ্ছে, তার বিরুদ্ধে শিক্ষিত শ্রেণির প্রবল ক্ষোভ রয়েছে। এই সব মানুষের কেউ জামায়েতকে ভোট দেবে না। তাহলে কাকে দেবে?
বিএনপি ছাড়া অাপাতত কোনও চয়েস তাদের নেই। তারেক যদি জয়ী হন তাহলে তঁাকে বঁাচাবে অাওয়ামিপন্থী জনতাই। অঙ্কটা বোঝেন বলেই বাংলাদেশে ফিরে অাওয়ামী লীগ অথবা হাসিনার বিরুদ্ধে একটি কথা বলেননি তিনি। বলেননি ভারত অথবা পাকিস্তানের বিপক্ষেও। বরং তঁার স্লোগান, দিল্লি বা পিন্ডি নয়– ‘অামার লক্ষ্য বাংলাদেশ’।
হাত কামড়াচ্ছেন দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়া আওয়ামি লিগ নেতারা। তঁাদের অনেকের সঙ্গেই এই সময় কথা বলার সুযোগ অামার হয়েছে। তঁারা ভেবেছিলেন, ইউনূসের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হবে। ভারত তঁাদের ফিরে যেতে সাহায্য করবে। তঁারা বোঝেননি, ভারতের পক্ষে এখন অার এটা সম্ভব নয়। ভোটটা হয়ে গেলে অাওয়ামী লীগ অারও অস্বস্তিতে পড়বে। মরিয়া হয়ে হাসিনা প্রকাশে্য এসে ‘নো ভোট’-এর ডাক দিয়েছেন। মানুষ সাড়া দেবে? বাংলাদেশের একজন সাংবাদিক বন্ধু জানালেন, নেতারা প্রাণ বঁাচাতে পালিয়ে রয়েছে। কর্মীরা কত দিন মার খাবে! যারা রয়ে গিয়েছে তারা ভাবছে ভোট দিতে গেলেও ভয়, না গেলেও ভয়। হেরে গেলে বলবে, তোরা হারিয়ে দিয়েছিস। জিতলে বলবে, আওয়ামি বলে কিছু অার নেই। এই একই ভয় হিন্দুদেরও। ফলে বাংলাদেশের ভোটে এটা স্পষ্ট, নিষিদ্ধ হয়েও ভোটে থাকছে হাসিনার দলের প্রভাব। আওয়ামির অদৃশ্য ভোটেই হয়তো ঠিক হবে খালেদার ছেলের ভাগ্য।
তবে ভোট কতটা স্বচ্ছ হবে, তা নিয়ে ঘোরতর সন্দেহ। মেশিন ফেলে দিয়ে অাবার ব্যালট ফেরানো হয়েছে। অর্থাৎ, ভোট প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রিতায় রিগিং, বুথ দখল, ব্যালট লুটের অাশঙ্কা রয়েছে। ক্ষমতাসীন শিবিরে চাপ কতটা বিএনপি কর্মীরা রাখতে পারবে বুথে দঁাড়িয়ে তা বলা শক্ত। হাসিনার দল শেষদিকের নির্বাচনগুলিকে প্রহসনে পরিণত করেছিল মানুষকে ভোট দিতে না দিয়ে। সেই অভ্যাস থেকে বাংলাদেশ বেরিয়ে অাসতে পারবে কি না দেখার। ভোট শেষ হলে ভোটকেন্দ্রে গণনা হবে। স্বাভাবিকভাবেই এ অাইনহীন সমাজে ব্যাপারটা কত অবাধ এবং শান্তিপূর্ণ হবে বলা সম্ভব নয়।
অার ইউনুস? জামায়েত ও ছাত্রদের দল এলে তঁাকে রাষ্ট্রপতি করবে কি না সেটা বলার সময় এখনও অাসেনি। তবে এটা এখনই বলা যায়, বিএনপি এলে ইউনুসকে অাবার প্যারিসের বিমান ধরতে হবে। তবে হাসিনার ঢাকার বিমান ধরা হবে কি না, তা বলতে পারবে না পদ্মাপারের কেউ-ই।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
‘ববিদাকে ফোন করব’, ফিরহাদের পদত্যাগের পরই জল্পনা বাড়ালেন ‘আসল তৃণমূল’ ঋতব্রত
-
‘ইন্ডাস্ট্রিতে কেউ কচি নয়’, স্বরূপের শ্লীলতাহানি মামলায় রূপার নিশানায় কারা? কী বলছেন স্বপন দাশগুপ্ত?
-
দিল্লি দরবারে বৈঠক শেষে ‘খুশি’ মনে রাজ্যে ফিরছেন মুখ্যমন্ত্রী, আজ রাতেই দপ্তর বণ্টন!
-
অভিষেকের কথাই শেষ কথা নয়! দলের খোলনলচে বদলে বড় সিদ্ধান্ত বিদ্রোহে ‘বিপন্ন’ মমতার
-
ভারতে ইবোলার হানা! জয়পুরে উগান্ডার পর্যটকের শরীরে সংক্রমণের লক্ষণ ঘিরে চর্চা