Advertisement
Advertisement
Advertisement
Sangbad Pratidin
  • ১৪ ভাদ্র ১৪৩৩
  • মঙ্গলবার
  • ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
AI banking

ব্যাঙ্কে ‘এআই’, প্রযুক্তির বেড়াজাল কাটিয়ে প্রয়োজনে মানবিক হবে কি সিস্টেম?

ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার ‘মূল উদ্দেশ্য’ মানুষের অর্থনৈতিক জীবনে নিরাপত্তা ও আস্থা তৈরি করা। অথচ কখনও কখনও সেই ব্যবস্থাই এমন গোলকধাঁধায় পরিণত হয়– যেখানে নিরক্ষর, দরিদ্র, প্রবীণ, প্রতিবন্ধী কিংবা ডিজিটাল ব্যবস্থায় অনভ্যস্ত মানুষ পথ হারিয়ে ফেলেন।

সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: সেপ্টেম্বর ১, ২০২৬, ১৪:৩৭

link
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: সেপ্টেম্বর ১, ২০২৬, ১৪:৩৭

options
link
ব্যাঙ্কে ‘এআই’, প্রযুক্তির বেড়াজাল কাটিয়ে প্রয়োজনে মানবিক হবে কি সিস্টেম? zoom
প্রতীকী ছবি।
Advertisement

ব্যাঙ্কিং সিস্টেমে ‘এআই’ প্রবেশ যদি অবাধ হয়ে ওঠে? ঋণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত, গ্রাহকের ঝুঁকি নির্ধারণ, প্রতারণা শনাক্তকরণ, পরিচয় যাচাই, গ্রাহক পরিষেবা– সব ক্ষেত্রেই ‘এআই’ অনেক দ্রুত, দক্ষ, নির্ভুল। যে-মানুষটি সবচেয়ে ধীর, অসহায়, প্রান্তিক; সেই মানুষটির জন্যও ‘এআই’ কার্যকর হবে তো? লিখছেন, আদিত্য ঘোষ

‘নিরক্ষর’ একজন জনজাতি মানুষ, জিতু মুন্ডা, মৃত দিদির সঞ্চয়ের টাকা তুলতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত কবর থেকে তাঁর কঙ্কাল তুলে ব্যাঙ্কে নিয়ে এসেছিলেন। ঘটনাটির প্রশাসনিক ও আইনি প্রেক্ষাপট নিয়ে পরে নানা তথ্য সামনে এসেছিল। ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ সাফাই দিয়ে বিবৃতি দিয়েছিল– ‘মৃত’ ব্যক্তিকে হাজির করতে বলা হয়নি। প্রয়োজন ছিল ‘মৃত’ ব্যক্তির ডেথ সার্টিফিকেট ও উত্তরাধিকার-সংক্রান্ত নথির। তবু ঘটনাটি যে অস্বস্তিকর প্রশ্নটির জন্ম দিয়েছিল, তা ব্যাঙ্কের নেহাত কর্মবিধির প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়।

দুর্গাপুজো ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'দেবীপক্ষ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন
Advertisement

প্রকৃত বিষয়: অভিপ্রায়। ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার ‘মূল উদ্দেশ্য’ মানুষের অর্থনৈতিক জীবনে নিরাপত্তা ও আস্থা তৈরি করা। অথচ কখনও কখনও সেই ব্যবস্থাই এমন গোলকধাঁধায় পরিণত হয়– যেখানে নিরক্ষর, দরিদ্র, প্রবীণ, প্রতিবন্ধী কিংবা ডিজিটাল ব্যবস্থায় অনভ্যস্ত মানুষ পথ হারিয়ে ফেলেন। উত্তরপ্রদেশে অসুস্থ একজন প্রবীণ মহিলাকে প্রচণ্ড গরমের মধ্যে ঠেলাগাড়িতে করে ব্যাঙ্কে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা যেমন প্রশ্ন তোলে– তেমনই অন্যদিকে এমন উদাহরণও রয়েছে, যেখানে ব্যাঙ্ককর্মী স্বয়ং প্রতিবন্ধী গ্রাহকের প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করেছেন। লকডাউনের সময় বহু ক্ষেত্রে ব্যাঙ্ক ও ডাকবিভাগের কর্মীরা প্রবীণ পেনশনভোগীদের বাড়িতে গিয়ে টাকা পৌঁছে দিয়েছেন। অর্থাৎ একই ব্যবস্থার ভিতরেই রয়েছে দুই বিপরীত ছবি। একদিকে নিয়মের অক্ষরে আটকে থাকা, এবং অন্যদিকে নিয়মের উদ্দেশ্যটি বুঝে মানুষের কাছে যাওয়া।

পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, মানবিকতা মানেই নিয়ম ভাঙা নয়। বরং অনেক সময় নিয়মের প্রকৃত উদ্দেশ্যকে সফল করার জন্যই প্রয়োজন মানবিকতার। একজন অসুস্থ বৃদ্ধর ব্যাঙ্কে পৌঁছনোর সামর্থ‌্য নেই। তাঁকে সাহায্য করার অর্থ: নিয়মের অবমাননা নয়। তাঁকে আর্থিক পরিষেবার আওতায় রাখাই নিয়মের আসল উদ্দেশ্য। একজন নিরক্ষর গ্রাহক ফর্মের ভাষা বুঝতে পারছেন না। তাঁকে শুধু নিয়ম মেনে চলুন বলা যথেষ্ট নয়। নিয়মটি তাঁর বোধগম্য করে তোলাও প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব। একটি সুস্থ ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা তাই কেবল নিয়ম তৈরি করে না, নিয়মের সামনে মানুষের অসহায়তাকেও চিনতে শেখে।

‘ডেটা’ মানুষের জীবনের রেকর্ড হতে পারে, কিন্তু মানুষের জীবন স্বতঃই ‘ডেটা’ নয়। তাই ভবিষ্যতের ‘এআই’-নির্ভর ব্যাঙ্কিংয়ে কোনও সিদ্ধান্ত, ঋণ প্রত্যাখ্যান, ‘কেওয়াইসি’-তে ব্যর্থতা, কিংবা সন্দেহজনক লেনদেনের কারণে পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া যেন অ্যালগরিদমের শেষকথা না-হয়ে ওঠে।

তবে একটি কঠিন সত্যস্বীকার করাও প্রয়োজন। কাউন্টারের ওপারে মানুষ বসে থাকলেই যে মানবিকতা নিশ্চিত হয়, এমন নয়। মানুষের হাতেও ভুল হয়েছে, অবহেলা হয়েছে। কোনও গ্রাহককে তাঁর পোশাক, ভাষা, শিক্ষাগত যোগ্যতা কিংবা আর্থিক সক্ষমতা দিয়ে বিচার করার ঘটনাও বিরল নয়। ফলে সমস্যার সমাধান শুধু মানুষের হাতে পুরোপুরি ব্যাঙ্কিং পরিষেবা থাকা এমন দাবিতে নয়। প্রশ্ন হল, প্রযুক্তি যখন ক্রমশ ব্যাঙ্কের সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রে চলে আসছে, তখন মানুষের যে মানবিক সক্ষমতাগুলি আমরা মূল্যবান বলে মনে করেছি, তার কতটা প্রযুক্তির ভিতরে রাখা সম্ভব?

এখানেই ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’-র প্রশ্নটি জরুরি হয়ে ওঠে। ঋণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত, গ্রাহকের ঝুঁকি নির্ধারণ, প্রতারণা শনাক্তকরণ, পরিচয় যাচাই কিংবা গ্রাহক পরিষেবা সব ক্ষেত্রেই ‘এআই’ দ্রুত, দক্ষ এবং অনেক ক্ষেত্রে মানুষের তুলনায় বেশি নির্ভুল হতে পারে। কিন্তু দক্ষতা আর ন্যায়বিধান, দ্রুতি ও সমতা আনয়ন– এক জিনিস নয়। একটি অ্যালগরিদম কোনও গ্রাহককে ঝুঁকিগ্রস্ত বলে চিহ্নিত করতে পারে, কিন্তু সে কি বুঝতে পারবে, কেন সেই গ্রাহকের আয় অনিয়মিত? একটি স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা কোনও প্রবীণের বায়োমেট্রিক প্রমাণীকরণ ব্যর্থ হলে লেনদেন আটকে দিতে পারে; কিন্তু সে কি বুঝবে বৃদ্ধ আঙুলের ছাপটি যন্ত্রে ধরা পড়ছে না? একটি ডিজিটাল ব্যবস্থা কোনও নিরক্ষর গ্রাহকের আবেদন অসম্পূর্ণ বলে বাতিল করতে পারে; কিন্তু সে কি প্রশ্ন করবে, মানুষটি আদৌ জানতেন কি না কোন ঘরটি কীভাবে পূরণ করতে হয়?

এ জায়গাটি ভবিষ্যতের ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। ‘এআই’ যেন নিয়মকে আরও দ্রুত প্রয়োগ করার যন্ত্র না হয়ে ওঠে; বরং নিয়মের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, সমান সুযোগ এবং মানুষের প্রতি ন্যায্যতা আরও কার্যকর করার মাধ্যম হয়ে ওঠে। অ্যালগরিদম সিদ্ধান্ত নিতে পারে, কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রশ্ন করার অধিকার মানুষের থাকা চাই। কোনও গ্রাহক যখন বলবেন, ‘আমি এই নিয়মের মধ্যে পড়ছি না, আমার পরিস্থিতিটা একটু শুনুন’, তখন তাঁর সামনে যেন আর একটি যন্ত্রের বন্ধ দরজা না থাকে।

‘এআই’ কত দ্রুত পরিষেবা দিতে পারে। আদত প্রশ্নটিকে হতে হবে, যে-মানুষটি সবচেয়ে ধীর, সবচেয়ে অসহায়, সবচেয়ে প্রান্তিক; সেই মানুষটির জন্য ব্যবস্থাটি কতটা জায়গা রাখে।

ব্যাঙ্কিংয়ের ভবিষ্যৎ শুধু এ প্রশ্নে নির্ধারিত হবে না যে, ‘এআই’ কত দ্রুত পরিষেবা দিতে পারে। আদত প্রশ্নটিকে হতে হবে, যে-মানুষটি সবচেয়ে ধীর, সবচেয়ে অসহায়, সবচেয়ে প্রান্তিক; সেই মানুষটির জন্য ব্যবস্থাটি কতটা জায়গা রাখে। প্রযুক্তি যদি শক্তিশালীকে আরও দ্রুত এবং দুর্বলকে আরও অদৃশ্য করে তোলে, তবে তা আধুনিকায়ন নয়; তা বৈষম্যের নতুন অবকাঠামো। আর যদি ‘এআই’ মানুষের অপারগতার জায়গাগুলি শনাক্ত করে, সেখানে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় এবং প্রয়োজনের মুহূর্তে একজন মানবকর্মীর কাছে পৌঁছনোর পথ খোলা রাখে, তবেই প্রযুক্তির প্রকৃত গণমুখীকরণ সম্ভব।

শেষ পর্যন্ত তাই প্রশ্নটি ‘এআই বনাম মানুষ’ নয়। প্রশ্নটি হল: ‘এআই’-নির্ভর ব্যাঙ্কিংয়ে মানুষকে কতটা দেখা হবে। যে-ব্যাঙ্কে ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’ থাকবে, সেখানে মানবিক বুদ্ধিরও কি জায়গা থাকবে? যে-ব্যবস্থায় নিয়ম থাকবে, সেখানে নিয়মের ব্যতিক্রমী মানবিক পরিস্থিতিকে বোঝার ক্ষমতাও কি থাকবে? এবং সবচেয়ে বড় কথা, ব্যাঙ্কের দরজায় দঁাড়িয়ে থাকা মানুষটি যেন কোনও দিন এমন অনুভব না করেন যে, তঁার সামনে একটি নিখুঁত ব্যবস্থা রয়েছে, কিন্তু তাঁকে বোঝার মতো কেউ নেই এই নিশ্চয়তা কি আমরা দিতে পারব?

ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থায় মানুষের পরিচয় ক্রমশ তাঁর ডিজিটাল তথ্যের মধ্য দিয়ে নির্ধারিত হচ্ছে। নিয়মিত ব্যাঙ্ক লেনদেন, ইউপিআই ব্যবহার, ক্রেডিট হিস্ট্রি, আয়-ব্যয়ের তথ্য– সব মিলিয়ে তৈরি হচ্ছে একজন গ্রাহকের এক ধরনের ‘ডিজিটাল ছায়া’। যাঁর এই তথ্য যত বেশি, অ্যালগরিদম তাঁকে তত সহজে বুঝতে পারে। কিন্তু গ্রামের কৃষক, অনিয়মিত আয়ের শ্রমিক, প্রবীণ নাগরিক কিংবা ডিজিটাল ব্যবস্থার বাইরে থাকা মানুষের তথ্য যদি কম থাকে, তবে সেই তথ্যের অভাবই কি তাঁর আর্থিক যোগ্যতার অভাব বলে বিবেচিত হবে? ‘ডেটা’ মানুষের জীবনের রেকর্ড হতে পারে, কিন্তু মানুষের জীবন স্বতঃই ‘ডেটা’ নয়। তাই ভবিষ্যতের ‘এআই’-নির্ভর ব্যাঙ্কিংয়ে কোনও সিদ্ধান্ত ঋণ প্রত্যাখ্যান, ‘কেওয়াইসি’-তে ব্যর্থতা, কিংবা সন্দেহজনক লেনদেনের কারণে পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া যেন অ্যালগরিদমের শেষকথা না-হয়ে ওঠে। গ্রাহকের নিজের পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করার ও একজন মানবকর্মীর কাছে সেই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার সুযোগ থাকা জরুরি। প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, মানুষের জীবনের ব্যতিক্রমকে বোঝার জন্য শেষ পর্যন্ত মানুষের কাছেই ফিরে যাওয়ার একটি দরজা খোলা রাখতে হবে।

দুর্গাপুজো ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'দেবীপক্ষ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন
Advertisement

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Share this article on

The article link is copied.