Advertisement
Advertisement
Advertisement
Sangbad Pratidin
  • ২৭ শ্রাবণ ১৪৩৩
  • বৃহস্পতিবার
  • ১৩ আগস্ট ২০২৬
Sangbad Pratidin 35th Anniversary

‘সংবাদ প্রতিদিন’ এক্সপ্রেস! অপ্রতিহত ৩৫ বছর

টুটু বসুর যেমন স্বপ্ন ছিল মোহনবাগান ক্লাবে দেশের সেরা প্লেয়ারদের খেলিয়ে জাতীয় ট্রফিগুলি জেতা, তেমনই ‘সংবাদ প্রতিদিন’-ও ছিল তাঁর সন্তানসম। বলতেন, ‘আমার তিন সন্তান– টুম্পাই, টুবলাই আর প্রতিদিন।’ 

কিংশুক প্রামাণিক
কিংশুক প্রামাণিক

শেষ আপডেট: আগস্ট ১২, ২০২৬, ১৮:৪২

link
কিংশুক প্রামাণিক
কিংশুক প্রামাণিক

শেষ আপডেট: আগস্ট ১২, ২০২৬, ১৮:৪২

options
link
‘সংবাদ প্রতিদিন’ এক্সপ্রেস! অপ্রতিহত ৩৫ বছর zoom
সংবাদ প্রতিদিনের ৩৫ বছরের জন্মদিনে কেক কাটার আনন্দময় মুহূর্ত।
Advertisement

ট্রেনটা ছুটছে। একটার পর একটা স্টেশন আসছে। যাত্রীরা নামছে, আবার উঠছে। ট্রেনের ছোটা থামছে না। ৩৫ বছর ধরে ছুটছে। ট্রেনের নাম ‘সংবাদ প্রতিদিন’। বাংলা সংবাদপত্রের একটি ‘ব্র‌্যান্ড’! কত মানুষ সেখানে এলেন, কাজ করলেন, প্রতিষ্ঠা পেলেন, পরিচয় পেলেন, আস্থা পেলেন, আবার চলেও গেলেন। কেউ সাংবাদিক তৈরি হতে এলেন, কেউ সাংবাদিক হয়ে এলেন। দেওয়া-নেওয়ার সেই সফর চলমান এক ট্রেনের মতোই।

আমাদের ছেলেবেলায় বাংলা সংবাদপত্র বলতে বাঙালির ঘরে দু’টি মুখ‌্য কাগজ– ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’ ও ‘যুগান্তর’। আটের দশকে পর পর এল ‘আজকাল’ ও ‘বর্তমান’। ‘যুগান্তর’ বন্ধ হল। ১৯৯২ সালে জন্ম ‘সংবাদ প্রতিদিন’-এর। এরপর তিন দশকে অসংখ‌্য বাংলা সংবাদপত্র এসেছে। কারও কারও সারকুলেশন লক্ষের গণ্ডিও পেরিয়েছে। কিন্তু আসতে পারেনি পাদপ্রদীপের আলোয়। ২০১২ সালে ‘টাইমস অফ ইন্ডিয়া’ গ্রুপ বাংলা পত্রিকা ‘এই সময়’ নিয়ে আসে। এখন অবশ‌্য সেটি অন‌্য মালিকানায়।

Advertisement

মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সংবাদপত্রকে জড়িয়ে দেওয়ার যে চেষ্টা সেই সময় শুরু হয়, সংবাদ প্রতিদিন তাতে বিশেষ সাফল‌্য লাভ করে।

২০০০ সালের ২ মার্চ আমি যখন ‘সংবাদ প্রতিদিন’-এ যোগ দিই– তখন সৃঞ্জয় বোস সদ‌্য কাগজ দেখতে শুরু করেছেন। তরতাজা তরুণ। চোখে ভবিষ‌্যতের স্বপ্ন। দুই অভিজ্ঞ অঞ্জন বসু এগজিকিউটিভ এডিটর ও জয়ন্ত চক্রবর্তী চিফ রিপোর্টার। সৃঞ্জয়কে প্রত্যেকেই ‘টুম্পাই’ নামেই বেশি চেনে। দায়িত্ব নিয়ে ও কিছু করতে চাইছিল। কাগজের যখন ১০ বছর বয়স তখন ওরই চেষ্টায় আঙ্গিকে রূপবদল। পরিবর্তনের পোশাকি নাম দেওয়া হল ‘নিঃশব্দ বিপ্লব’ কাগজের মাস্টহেডের স্টাইল বদলে গেল, পাতায় পাতায় যুগোপযোগী বিন‌্যাস।

শুরু থেকে ‘সংবাদ প্রতিদিন’ জনপ্রিয় হয়েছিল তার বিষয়মুখিনতার জন‌্য। সহজ বাংলা, সাধারণ মানুষের খবর একটা ভিন্নতার সৃষ্টি করেছিল। সব রাজনৈতিক মতের কথা লেখা হত। সম্পাদক পদে স্বপনসাধন বোস, আমাদের সবার প্রিয় ‘টুটুদা’ আসার পর কাগজের বৈচিত্র বাড়তে থাকে। বুনিয়াদ দীর্ঘস্থায়ী হয়। সব শ্রেণির মানুষ যাতে কাগজকে নিজের মনে করে, তার জন‌্য শুরু হয় উদ্যোগ। পড়াশোনার পাতা, চাষবাসের পাতা, জেলার খবরের পাতাকে আরও গভীরে নিয়ে যাওয়া, বিনোদন, এমনকী, পাঠকদের অভাব অভিযোগের জবাব দেওয়া নেওয়ার দায়বদ্ধতা ছিল নজরকাড়া। শুধু খবর নয়, মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সংবাদপত্রকে জড়িয়ে দেওয়ার যে চেষ্টা সেই সময় শুরু হয়, সংবাদ প্রতিদিন তাতে বিশেষ সাফল‌্য লাভ করে। খেলার বিশেষ ক্রোড়পত্র ‘খেলার দুনিয়া’, ভ্রমণের পাতা ‘চলো যাই’ সাড়া ফেলে। অন‌্যরা নকল করতে থাকে। ‘নিঃশব্দ বিপ্লব’-এ সব চেয়ে বড় পরিবর্তন হল শহরের পাঠকদের সঙ্গে নেওয়া।

টুটুবাবু ‘সংবাদ প্রতিদিন’-কে একটা ব্র‌্যান্ড হিসাবে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন।

গ্রাম-মফস্‌সল শুধু নয়, কলকাতার মানুষ তথা সমাজের উচ্চশিক্ষিত শ্রেণিকে আকর্ষণ করার লক্ষ্য প্রকাশিত হয় ‘রোববার’। রবিবার মূল কাগজের সঙ্গে বিনামূল্যে ক্রোড়পত্র। প্রয়াত ঋতুপর্ণ ঘোষের সম্পাদনায় অন‌্য মাত্রা নেয়। বিষয় চয়ন, বিশিষ্টদের কলমে বিন‌্যাস এত জনপ্রিয়তা লাভ করে যে রবিবারে কাগজের সারকুলেশন বাড়তে থাকে।

বস্তুত, ৩৫ বছরে বহু নামী সাংবাদিক ‘সংবাদ প্রতিদিন’-এ কাজ করেছেন। বহু কবি-সাহিত্যিক বিশিষ্ট মানুষ নিয়মিত কলাম লিখেছেন। আলাদা করে কারও নাম বলতে চাই না। তাঁদের সবার অবদানের ফলেই কাগজের প্রভাব বাংলার মানুষের মন ছুঁয়েছে। বাঙালির মুখপত্র হয়ে উঠেছে।

টুটুবাবু ‘সংবাদ প্রতিদিন’-কে একটা ব্র‌্যান্ড হিসাবে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। তিনি সফল। মনে রাখতে হবে, উদারীকরণের সময়সরণি বেয়েই ‘সংবাদ প্রতিদিন’ বাংলার খবরের দুনিয়ায় এসেছিল। ফলে শুরুটা সহজ ছিল না। টুটুদার যেমন স্বপ্ন ছিল মোহনবাগান ক্লাবে দেশের সেরা প্লেয়ারদের খেলিয়ে জাতীয় ট্রফিগুলি জেতা– তেমনই তিনি ‘সংবাদ প্রতিদিন’-কেও মনে করতেন নিজের সন্তান বলে। তাঁর মুখে বলতে শুনেছি ‘আমার তিন সন্তান– টুম্পাই, টুবলাই আর প্রতিদিন।’ কথাটা ভুল নয়। গত ৯ আগস্ট কাগজ যখন ৩৫-এ পা দিল (Sangbad Pratidin 35th Anniversary), তার কিছু দিন আগেই তিনি কালের নিয়মে ট্রেন থেকে নেমে গিয়েছেন। তত দিনে অবশ‌্য স্টিয়ারিং দিয়ে গিয়েছেন তৃতীয় প্রজন্মের হাতে। টুটুবাবুর বড় নাতি টুম্পাই-পুত্র অরিঞ্জয় বোস, যাকে আমরা ‘তাতাই’ নামেই চিনি, তিনি এখন কাগজের দায়িত্বে। ৩৫ বছরে বোস পরিবারের তিন প্রজন্মের হাতে সংবাদপত্রের দায়িত্ব। অভাবনীয় রেকর্ড।

‘সংবাদ প্রতিদিন’-কে চিরদিনই মনে হয়েছে ‘শত ঘর এক উঠোন’।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সাংবাদিকতার ধারা বদলে গিয়েছে। বিশেষ করে সোশ‌াল মিডিয়া অাসার পর সংবাদপত্র, এমনকী, ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ার গুরুত্ব কমতে শুরু করে। মুঠোফোনে যেহেতু সোশ‌াল মিডিয়ার খবর, সেজন‌্য মানুষ আর অন‌্যদিকে তাকায় না। তাহলে কি সংবাদপত্র হারিয়ে যাবে? বিশেষজ্ঞদের একটি অংশের অবশ‌্য ধারণা, সংবাদপত্র বন্ধ হবে না। নিউজ প্রিন্টের সারকুলেশন কমতে পারে বড়জোর। কিন্তু ডিজিটাল প্ল‌্যাটফর্মে গুরুত্ব থাকবে। মানুষ ই-পেপার পড়বে। কারণ, বিশ্বাসযোগ‌্যতা, দায়িত্বশীলতা। ছাপার অক্ষরে প্রকাশিত বলেই সংবাদপত্রকে অনেক সতর্ক হয়ে চলতে হয়। বহু মানুষ সকালে উঠে খবরের কাগজ খোঁজেন। এই ভাবনার যে পরিবর্তন আগামী দিনে হবে না, তাও বলা যায় না। তবে সোশ‌্য‌াল মিডিয়া যেভাবে বিশ্বাসযোগ‌্যতা হারাচ্ছে তা সংবাদপত্রের পক্ষে ইতিবাচক।

‘সংবাদ প্রতিদিন’-কে চিরদিনই আমার মনে হয়েছে ‘শত ঘর এক উঠোন’। পদে পদে যৌথ পরিবারের একান্নবর্তিতা। বাড়ির বাইরে আর-একটা বাড়ি। এখানে কখনও একা লাগেনি। অসহায় মনে হয়নি। বিগত সাড়ে ২৬ বছরে সংবাদ প্রতিদিনের হয়ে অসংখ‌্য অ‌্যাসাইনমেন্ট করেছি। বাংলার এমন গ্রাম নেই যেখানে যাইনি। এমন রাজ‌্য নেই যাদের কথা লিখিনি। নির্বাচন, বিস্ফোরণ, দাঙ্গা, রাজনীতি, সংঘাত, সমাজ, একাকী কোনও মা, নির্জলা কোনও গ্রাম, বন‌্যায় ভেসে যাওয়া দিগন্ত, রাজধানীর অলিন্দ, বাণিজ‌্য নগরীতে অভিজাত সম্মেলন, বাকিংহাম প‌্যালেস, ২ হাজার বছরের রোম নগরী, মেসির বার্সেলোনা, কত বলব! একজন একান্ত কর্মী হিসাবে আমি কৃতজ্ঞ ‘সংবাদ প্রতিদিন’-এর প্রতি। বহু গুণী সাংবাদিকের সংস্পর্শে কাজ করলাম। দারুণ সহকর্মী পেয়েছি। দিয়েছিও মন খুলে। সাধারণ রিপোর্টার থেকে সিঁড়ি ভেঙে যখন দায়িত্বের পদে বসেছি, তখন মনে রেখেছি, পা মাটিতেই রাখতে হয়। এসব কারণেই হয়তো কখনও এই সংবাদপত্র ছেড়ে অন‌্যত্র যাওয়ার ইচ্ছা হয়নি। অসংখ‌্যবার সুযোগ এসেছে, কিন্তু ওই যে বললাম, ট্রেনে বসে আছি। অচেনা স্টেশনে নামতে মন চায়নি।

প্রায় ৩২ বছর আগে সাংবাদিকতা শুরু করি পলিটিক‌াল রিপোর্টার হিসাবে। সব ‘বিট’-এ কাজ করেছি। ‘সংবাদ প্রতিদিন’-এ যোগ দেওয়ার পর কাজের গতিমুখ বদলে যায়। বিচিত্র এক রাজনীতির অঙ্গন। এখন রাজনৈতিক খবর মানে অনুষ্ঠানের বক্তৃতা এবং রিঅ‌্যাকশন নির্ভর। আগে অফিস থেকে পলিটিক‌াল রিপোর্টাররা বেরতাম একসঙ্গে। কারণ, অফিসে একটাই গাড়ি। সিপিএম তখন ক্ষমতায়। কংগ্রেস ভেঙে তৃণমূল হব-হব। বিজেপি সবে উঠছে। বাম শরিকরা সক্রিয়। সবচেয়ে বৈচিত্র ছিল কংগ্রেসের খবরে। যেতে হত নেতাদের বাড়ি। সোমেনবাবুর আমহার্স্ট স্ট্রিটের বাড়িতে গেলেই নিশ্চিতভাবে যেতে হবে ৩০বি হরিশ চ‌্যাটার্জি স্ট্রিটে– মমতা বন্দ্যোপাধ‌্যায়ের বাড়িতে।

সংবাদ প্রতিদিনের দীর্ঘ সফর মোটেই কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। অনেক ঝড়ঝাপটা গিয়েছে।

প্রতিক্রিয়ার পাল্টা প্রতিক্রিয়া। প্রণববাবু, প্রিয়বাবু, বরকত সাহেব দিল্লি থেকে ফিরলে তাঁদের বাড়িতে ব্রিফ করতেন। কত খবর! অনিল বিশ্বাস বিমান বসু, অশোক ঘোষ, নন্দদা, সুব্রত মুখোপাধ‌্যায়, তপন সিকদার, কত চরিত্র। কেশপুর, গড়বেতা, কংগ্রেস ভেঙে তৃণমূল, জ্যোতি বসু সরে গিয়ে বুদ্ধবাবুর মুখ‌্যমন্ত্রিত্ব, মমতার জমি আন্দোলন, মাওবাদীদের উত্থান, ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান– কিছু সময় পেরিয়ে এসেছি বটে সাংবাদিকতার সুবাদে। পরের ১৫ বছর আবার ভিন্ন মাত্রা। তৃণমূল জামানার শেষ, বিজেপির ক্ষমতা দখল। সংবাদ প্রতিদিনের দীর্ঘ সফর মোটেই কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। অনেক ঝড়ঝাপটা গিয়েছে। রাজনৈতিক দল ও সরকারকে খুশি না করলেই রোষানলে পড়তে হয়েছে। কখনও কখনও সরকারি বিজ্ঞাপন বন্ধ হয়েছে।

শেষ করব দু’টি দু’রকম সময়ের কথা উল্লেখ করে– এক, ২১ নভেম্বর ২০১১ সালে প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিটে আমাদের অফিসে আগুন লাগল। তিনটি তলই পুড়ে ক্ষতিগ্রস্ত। বহু নথি চিরতরে হারিয়ে গেল। তবু ফিনিক্স পাখির মতো ধ্বংসস্তূপ থেকে আবার ঘুরে দাঁড়ালাম আমরা।

দুই, করোনা। লকডাউন। ভাইরাসের ভয়ে সংবাদপত্র অফিস ধূ ধূ। বিজ্ঞাপন বন্ধ। কাগজ বিক্রি করার হকার নেই। পাঠক কাগজ হাতে নিতে ভয় পাচ্ছেন। কঠিন সেদিনে কীভাবে অফিস করেছি তা জানে শুধু সময়। সেই বাধা পেরিয়ে পৃথিবীর একদিন সুস্থ হল। ট্রেন কিন্তু থামেনি। সে ছিল লাইনেই। অবশেষে ৩৫-এ পা। স্টেশন আসবে, নামা-ওঠাও থাকবে। ‘সংবাদ প্রতিদিন’ এক্সপ্রেস থামেনি, থামবেও না।

Advertisement

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Share this article on

The article link is copied.