সনাতন বাঙালির নাড়ির সঙ্গে মিশে আছে দুর্গাপুজো। আবহমানকাল ধরে শরৎকালে মর্তে মায়ের আগমন ধ্বনি শোনার অপেক্ষায় সারা বছর দিন গোনেন আপামর বাঙালি সমাজ। এই বসুন্ধরায় দুর্গা আগমনের আর মাস দেড়েক বাকি। এখনই বাংলার ঘরে ঘরে সাজ সাজ রব। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শারদোৎসবে সাবেকিয়ানার সঙ্গে মিশেছে রকমারি থিমের ছোঁয়া। এপার বাংলায় তো বটেই, এবার ওপার বাংলাতেও ভিন্ন রূপ পাচ্ছেন মৃন্ময়ী। দেশলাই কাঠি আর রেশমি সুতোয় গড়া হচ্ছে প্রতিমা।
সাধারণত মাটি দিয়ে গড়া দশভুজার পুজোয় অভ্যস্ত। তবে ভিন্ন আঙ্গিকে মাতৃরূপে গড়া হয়, তা শুধু কলকাতায় চোখে পড়ে। তবে এবার ব্যতিক্রম ঘটেছে বাংলাদেশের দক্ষিণের জেলা সাতক্ষীরায়। সেখানে এবার দুর্গাপুজোকে সামনে রেখে এক ব্যতিক্রমী আয়োজন করেছে সাতক্ষীরার সদর উপজেলার ধুলিহর ইউনিয়নের ব্রহ্মরাজপুর সর্বজনীন শ্রী শ্রী দুর্গাপুজো মন্দির। প্রচলিত মাটি, খড় ও বাঁশের কাঠামোর বাইরে এবার প্রতিমার সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে দেড় লাখের বেশি দেশলাই কাঠি এবং ১০ কেজির বেশি রেশমি সুতোর নিখুঁত কারুকাজে। ব্যতিক্রমী এই প্রতিমা দেখতে মন্দির প্রাঙ্গণে ভিড় করছেন স্থানীয় মানুষ। কেউ বিস্মিত হয়ে দেখছেন, কেউ মোবাইল ফোনে ছবি ও ভিডিও তুলে রাখছেন। আয়োজকদের প্রত্যাশা, দুর্গাপুজোর দিনগুলোতে সাতক্ষীরার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকেও দর্শনার্থীরা আসবেন এই প্রতিমা দেখতে।
স্থানীয় বাসিন্দা স্বপ্নারানির কথায়, ‘‘প্রতি বছরই এই মন্দিরে নতুন কিছু করার চেষ্টা থাকে। গত বছর ধানের প্রতিমা দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করেছিল। এবার দেশলাই কাঠি ও রেশমি সুতোর প্রতিমা আরও বেশি মানুষের আগ্রহ তৈরি করবে।”
মন্দির প্রাঙ্গনে প্রতিমাশিল্পীরা রাত-দিন এক করে কাজ করছেন। মাটির অবয়বের উপর একে একে বসানো হচ্ছে দেশলাইয়ের কাঠি। তার সঙ্গে রেশমি সুতোর কারুকাজ। প্রতিটি অংশে নিখুঁতভাবে কাঠি বসাতে হচ্ছে শিল্পীদের। সামান্য ভুলেও নষ্ট হতে পারে পুরো নকশা। তাই প্রতিমা তৈরিতে সময় ও শ্রম দুটিই লাগছে বেশি। প্রতিমাশিল্পী নবদ্বীপ সরকার বলেন, ‘‘আমরা ২০২৩ সালে কলকাতায় গিয়ে এ ধরনের কাজ দেখেছিলাম। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই এবার সাতক্ষীরায় দেশলাই কাঠি ও রেশমি সুতো দিয়ে ব্যতিক্রমী প্রতিমা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চারজন শিল্পী দিন-রাত পরিশ্রম করে কাজ করছেন। কখনও কখনও রাত ২টো থেকে ৩টে পর্যন্ত কাজ করতে হচ্ছে।”
আয়োজকরা জানান, প্রতিমা তৈরির কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে দেড় লাখের বেশি দেশলাই কাঠি। এর সঙ্গে লাগছে ১০ কেজির বেশি রেশমি সুতো। শুধু প্রতিমা তৈরির কাজেই শিল্পীদের পারিশ্রমিক নির্ধারণ করা হয়েছে এক লক্ষ ৩০ হাজার টাকা। সবমিলিয়ে এবার পুজোর আয়োজনের ব্যয় দাঁড়াচ্ছে প্রায় পাঁচ লক্ষ টাকা। ব্রহ্মরাজপুর সর্বজনীন পুজো উদযাপন কমিটির সহ-ক্যাশিয়ার অমিত ঘোষ বলেন, ‘‘গত বছর আমরা ধানের প্রতিমা তৈরি করেছিলাম। তখন মোট খরচ হয়েছিল তিন লক্ষ টাকা। এবার দেশলাই কাঠি ও রেশমি সুতো দিয়ে প্রতিমা তৈরি করায় খরচ কিছুটা বেড়েছে। প্রতিমা শিল্পী-সহ সবকিছু মিলিয়ে প্রায় পাঁচ লক্ষ টাকা ব্যয় হবে।”
ব্যতিক্রমী প্রতিমা তৈরির এই আয়োজন অবশ্য ব্রহ্মরাজপুরে নতুন নয়। গত বছর ১০০ কেজি চিনির গুঁড়ো ধান দিয়ে তৈরি প্রতিমা দেখতে দূরদূরান্ত থেকে দর্শনার্থীরা এসেছিলেন। সেই সাড়া থেকেই এবার আরও নতুন কিছু করার পরিকল্পনা নেয় পুজো উদযাপন কমিটি।
কমিটির উপদেষ্টা কানাইলাল শাকানু বলেন, ‘‘গত বছর ধানের প্রতিমা তৈরির পর থেকেই আমাদের চিন্তা ছিল আগামী বছর আরও আকর্ষণীয় কিছু করা হবে। সেই চিন্তা থেকেই এবার দেড় লাখের বেশি দেশলাই কাঠি দিয়ে প্রতিমা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আমরা মনে করি, সাতক্ষীরায় এমন আয়োজন দর্শনার্থীদের মধ্যে নতুন আগ্রহ তৈরি করবে।” তাঁর দাবি, বাংলাদেশে দেশলাই কাঠি দিয়ে এ ধরনের প্রতিমা তৈরির ঘটনা বিরল। তবে এই আয়োজনকে ঘিরে দর্শনার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। কারণ দেশলাই কাঠি দাহ্য হওয়ায় প্রতিমাটির নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আয়োজকরা জানিয়েছেন, ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে প্রতিমায় বিশেষ রাসায়নিক ব্যবহার করা হচ্ছে। এরই মধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে সেটি প্রয়োগ করে দেখা হয়েছে বলেও জানান তারা। ব্রহ্মরাজপুর সর্বজনীন পুজো উদযাপন কমিটির সভাপতি গৌতম কুমার বিশ্বাসের দাবি, ‘‘প্রতিমাটির দাহ্যতা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠছে, সেটিকে আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। বিশেষ কেমিক্যাল ব্যবহার করে দাহ্য ক্ষমতা কমানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। ভাস্কর ও কমিটির সদস্যদের উপস্থিতিতে এর ট্রায়ালও করা হয়েছে। প্রতিমা তৈরির কাজ দেখতে আসা স্থানীয়দের মধ্যেও রয়েছে ব্যাপক আগ্রহ।”
স্থানীয় বাসিন্দা স্বপ্নারানির কথায়, ‘‘প্রতি বছরই এই মন্দিরে নতুন কিছু করার চেষ্টা থাকে। গত বছর ধানের প্রতিমা দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করেছিল। এবার দেশলাই কাঠি ও রেশমি সুতোর প্রতিমা আরও বেশি মানুষের আগ্রহ তৈরি করবে।” স্থানীয় এক গৃহবধূ বলেন, ‘‘গত বছর ১০০ কেজি চিনিগুঁড়া ধানের প্রতিমা হয়েছিল। এবার দেশলাই কাঠি ও রেশমি সুতোর প্রতিমা হচ্ছে। ধর্ম যার যার, উৎসব সবার। আমরা চাই সবাই এখানে আসুক, প্রতিমা দেখুক এবং আনন্দ করুক।” শুধু দর্শনার্থীদের আকর্ষণ নয়, পুজোকে ঘিরে সম্প্রীতির পরিবেশ বজায় রাখার উপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন স্থানীয়রা। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে এই এলাকায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশে দুর্গাপুজো অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এবারও গ্রামের মানুষ, পুজো কমিটি ও প্রশাসনের সমন্বয়ে নিরাপদ পরিবেশে উৎসব আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে।
প্রতিমাশিল্পী নবদ্বীপ সরকারের জন্যও এটি অন্যরকম একটি কাজ। তিনি জানান, ২০২৬ সালে চারটি দুর্গাপ্রতিমা তৈরির কাজ করছেন। এর মধ্যে ব্রহ্মরাজপুরের প্রতিমাটি সবচেয়ে ব্যতিক্রমী। কাজ শেষ করার জন্য সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দিন-রাত পরিশ্রম করছেন শিল্পীরা। এদিকে, সাতক্ষীরা জেলাজুড়েও দুর্গাপুজোকে ঘিরে চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি। বাংলাদেশ পুজো উদযাপন পরিষদ, সাতক্ষীরা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক বিশ্বনাথ ঘোষ জানান, ২০২৫ সালে জেলায় ৫৮৭টি পুজো মণ্ডপ হয়েছিল। এবার তার চেয়ে বেশি পুজো হতে পারে।
সর্বশেষ খবর
-
কলকাতায় অপরাধের ‘হটস্পট’ কোনগুলি? ওসিদের কী নির্দেশ দিলেন পুলিশ কমিশনার?
-
সিকিম ঘুরতে যাচ্ছেন পুজোতে? বড় বদল পর্যটনে, জেনে নিন নয়া নিয়ম-নীতি
-
‘৯০ শতাংশ ভোটার সরে যেতে দ্বিধা করবে না’, বিজেপির ‘তৃণমূলীকরণে’ সতর্কবার্তা সংঘ মুখপত্রে
-
বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সহবাস, ছড়াল টলিউড অভিনেত্রীর ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ছবি! ধৃত ‘প্রাক্তন’ প্রেমিক
-
কলকাতা-হাওড়া পুরভোটে রণকৌশল কী হবে? বৈঠকে তৃণমূলের ঋতব্রত শিবির