Advertisement
Advertisement
Advertisement
Sangbad Pratidin
  • ১ শ্রাবণ ১৪৩৩
  • শনিবার
  • ১৮ জুলাই ২০২৬
Garry Sobers

‘মহারাজ এ কী সাজে’! সোবার্স মৃত, চিরজীবিত থাকবে তাঁর ক্রিকেট গরিমা

কালো কয়লার পাহাড়ের সামনে, কলার তুলে, ব্যাট কাঁধে, ধীরে ধীরে প্যাভিলিয়নের দিকে হাঁটছেন এক মানুষ। সেই হাঁটাটুকুই যেন বলে দিচ্ছিল, কিংবদন্তিরা শুধু ক্রিকেট খেলেন না, তাঁরা একটি শহরের স্মৃতির ভেতর চিরকাল বেঁচে থাকেন।

Advertisement
প্রসেনজিৎ দত্ত
প্রসেনজিৎ দত্ত

শেষ আপডেট: জুলাই ১৭, ২০২৬, ২২:২৯

link
প্রসেনজিৎ দত্ত
প্রসেনজিৎ দত্ত

শেষ আপডেট: জুলাই ১৭, ২০২৬, ২২:২৯

options
link
‘মহারাজ এ কী সাজে’! সোবার্স মৃত, চিরজীবিত থাকবে তাঁর ক্রিকেট গরিমা zoom
চিরজীবিত থাকবে সোবার্সের ক্রিকেট গরিমা।

ইংল্যান্ডের শিল্পাঞ্চল স্টোক-অন-ট্রেন্টে আকাশ কখনও খুব নীল নয়। চিমনির ধোঁয়া, কয়লার ধুলো আর কারখানার শব্দ মিলে সেখানে দিনেরও যেন একধরনের ধূসরতা। মাঠের এক প্রান্তে কালো স্ল্যাগ হিপ। খনি থেকে ধাতু তোলার উঠে আসা কয়লার বর্জ্যের পাহাড়। বাতাসে ধোঁয়া। মাটিতে অম্লীয় ভাব। সেখানকার মাঠেই একদিন এলেন ক্যারিবিয়ান সূর্যের সবচেয়ে উজ্জ্বল আলো। গ্যারি সোবার্স। 

ওয়েস্ট ইন্ডিজের কিংবদন্তিদের সঙ্গে ইংল্যান্ডের লিগ ক্রিকেটের সম্পর্ক বহু পুরনো। লিয়ারি কনস্ট্যান্টাইন যখন তিরিশের দশকে নেলসনের হয়ে খেলতেন, তাঁকে দেখতে হাজার হাজার মানুষ ভিড় জমাতেন। জিতিয়েছিলেন একের পর এক ল্যাঙ্কাশায়ার লিগ। তারপর এভারটন উইকস, ক্লাইড ওয়ালকট, ফ্র্যাঙ্ক ওরেল, ওয়েস হল, চার্লি গ্রিফিথ, ক্লাইভ লয়েড, ভিভ রিচার্ডস, মাইকেল হোল্ডিং, কার্টলি অ্যামব্রোস, ব্রায়ান লারা– প্রজন্মের পর প্রজন্ম সেই পথেই হেঁটেছে। এর মধ্যেও গ্যারি সোবার্স যেন অন্য গ্রহের বাসিন্দা।

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'ফুটবল বিশ্বযুদ্ধ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন
Advertisement

১৯৬৩ সালে নর্থ স্ট্যাফোর্ডশায়ার অ্যান্ড সাউথ চেশায়ার লিগের নতুন ‘সদস্য’ নর্টন ক্রিকেট ক্লাব দুঃসাহসী সিদ্ধান্ত নেয়। ক্লাবের চেয়ারম্যান টমি ট্যালবট পাঁচ বছরের জন্য চুক্তিবদ্ধ করেন ২৬ বছরের সোবার্সকে। সপ্তাহে ৫০ পাউন্ড পারিশ্রমিক! তখনকার দিনে যা অবিশ্বাস্য। ট্যালবট জানতেন, তিনি কেবল তারকা ক্রিকেটারকেই কিনছেন না, কিনছেন এক সুপার আইকনকে। তখন পর্যন্ত ৪২ টেস্ট খেলে সোবার্সের ব্যাটিং গড় ৬০.৯। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অপরাজিত ৩৬৫ রানের বিশ্বরেকর্ড ইতিমধ্যেই তাঁর নামের পাশে। বহুমুখী বোলিংয়েও যে কোনও দলের মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে পারতেন। একই সঙ্গে করতেন বাঁ-হাতি ফাস্ট মিডিয়াম, স্লো অর্থোডক্স স্পিন, রিস্ট স্পিনও। তাঁর চায়নাম্যান বোলিং সামলাতে তাবড় ব্যাটারদের পর্যন্ত পা কাঁপত। এর আগে র‍্যাডক্লিফের হয়ে পাঁচ বছরে ৫,৭০৮ রান আর ৫৩২ উইকেট নিয়ে তিনি প্রমাণ করে ফেলেছেন। তাই ইংল্যান্ডের লিগ ক্রিকেট তাঁর জন্য শুধু উপার্জনের জায়গা ছিল না, ছিল একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তারের মঞ্চও।

১৯৬৪ সালের এপ্রিল। নিউজ ক্যামেরা ঘিরে আছে তাঁকে। কোনও সাংবাদিক জানতে চাইলেন, রোদ ঝলমলে ক্যারিবিয়ান ছেড়ে ধোঁয়াটে স্টোক-অন-ট্রেন্টে এসে কেমন লাগছে? সোবার্সের উত্তর ছিল, “রোদ থেকে একটু দূরে ভালোই লাগছে। এই লিগ আমাকে অনেক কিছু দিয়েছে।” কথার মোচড়েই ধরা পড়ে তাঁর স্বভাব। কোনও আড়ম্বর নেই, অথচ কি আভিজাত্যপূর্ণ শব্দচয়ন!

প্রথম দিকে মানুষ শুধু তাঁর ক্রিকেট দেখতে আসত। কিছুদিনের মধ্যেই তাঁকে ঘিরেই আবর্তিত জনস্রোত। ট্যালবট কাপে নর্টনের প্রতিপক্ষ গ্রেট চেল। একদিকে গ্যারি সোবার্স, অন্যদিকে ক্যারিবিয়ান সতীর্থ ওয়েস হল। প্রায় ১,৮০০ দর্শক ভিড় করেছিলেন। নর্টনের অফস্পিনার ফ্র্যাঙ্ক রেনল্ডস স্মৃতিচারণায় বলেছিলেন, “ওয়েস হলের রান-আপ এত বড় ছিল যে, বল ছোড়ার আগে আমি উইকেটকিপারের সঙ্গে গল্পই করে ফেলতাম। তারপর একটা বলে বোল্ড হলাম। যদিও সেটা নো বল ছিল। বল বাউন্ডারিতে চলে যায়। চার বাই হয়। আর সেই রানেই আমরা ম্যাচ জিতে যাই।” দু’সপ্তাহ পর আবার মুখোমুখি দুই দল। এবার এলেন আড়াই হাজার দর্শক। সোবার্স করলেন ৫৯ রান। সঙ্গে পাঁচ উইকেট। তাঁর সঙ্গে ব্যাট করা তরুণ ডেভ ব্রকের কাছে দিনটি অবিস্মরণীয়। “গ্যারির সঙ্গে ব্যাট করা স্বপ্নের মতো ছিল। তিনি খুব বেশি পরামর্শ দিতেন না। শুধু বলতেন, ‘নিজের খেলাটা খেলো’। অধিনায়কও ওকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারত না। টমি ট্যালবটও না।” সোবার্স ছিলেন ভিন্ন মেজাজের ক্রিকেটার। ছোট লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে অনেক সময় তিনি পাঁচ নম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করতেন। ইংলিশ ক্রিকেটার পিটার গিবস একসময় লিখেছিলেন, দর্শকরা কিন্তু সেটা মোটেই ভালোভাবে নিতেন না। সবাই সোবার্সকে ব্যাট করতে দেখতে চাইত।

চা পানের বিরতিতে কখনও তিনি সোজা ক্লাব সচিবের ঘরে গিয়ে একটু ব্র্যান্ডি খেয়ে আসতেন। তারপর মাঠে নেমে জিতিয়ে ফিরতেন। গিবসের স্মৃতিতে সোবার্স যেন সিনেমার নায়ক। বলেছিলেন, “ওর ব্যাগ একজন বয়ে নিয়ে যেত। ব্যাট আরেকজন। প্যাড অন্য কেউ। সবাই শুধু ওর কাছাকাছি থাকতে চাইত। তারপর একেবারে সিনেমার নায়কের মতো হেঁটে প্যাভিলিয়নে ঢুকত গ্যারি।”

সতীর্থ ফ্র্যাঙ্ক রেনল্ডসের চোখে সেটাই ছিল বিস্ময়। “রাতভর আড্ডা, পানীয়– সবই চলত। কিন্তু পরদিন মাঠে নেমে মনে হত, কিছুই হয়নি। এমন ফিট ক্রিকেটার আমি খুব কম দেখেছি।” ১৯৬৪ সালে নর্টন চ্যাম্পিয়ন হল। সোবার্সের ঝুলিতে ৫৪৯ রান, ৯৭ উইকেট। বোলিং গড় মাত্র ৮.৪০। সেই উইকেটের রেকর্ড ভাঙতে লেগেছিল ৩৮ বছর। এক বছর পর তিনি ওয়েস্ট ইন্ডিজের অধিনায়ক হন। নেতৃত্বের ব্যাটন হাতে নেওয়ার আগে তিনি নর্টনের অধিনায়ক জিম ফ্ল্যানারির সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন। নিজের স্বাধীন জীবনযাপন কি অধিনায়কত্বের সঙ্গে মানাবে? শেষ পর্যন্ত তিনি যে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন, সেটাই ছিল সোবার্সের চরিত্রের প্রতিচ্ছবি। “রাতে কে কোথায় গেল, সেটা আমার বিষয় নয়। মাঠে নামলে সবাই নিজের সেরাটা দেবে। এইটুকুই চাই।” বলেছিলেন স্যর সোবার্স। তাঁকে পরিসংখ্যান দিয়ে মাপা যায় না। তাঁর অপরাজিত ৩৬৫, তাঁর শত শত উইকেট, অসংখ্য শিরোপা– এসব ইতিহাসের অলিন্দে আজও পায়চারি করে। কিন্তু স্টোক-অন-ট্রেন্টের মানুষ আজও অন্য একটি দৃশ্য মনে রাখে…

কালো কয়লার পাহাড়ের সামনে, কলার তুলে, ব্যাট কাঁধে, ধীরে ধীরে প্যাভিলিয়নের দিকে হাঁটছেন এক মানুষ। তাঁকে ঘিরে শিশুরা ব্যাট ধরতে চাইছে। বড়রা চাইছে কিটব্যাগ কাঁধে তুলে নিতে। সেই হাঁটাটুকুই যেন বলে দিচ্ছিল, কিংবদন্তিরা শুধু ক্রিকেট খেলেন না, তাঁরা একটি শহরের স্মৃতির ভেতর চিরকাল বেঁচে থাকেন। শুক্রবার সন্ধ্যায় তাঁর প্রয়াণ সংবাদ মিলতেই সেই সব ধুলোমলিন স্মৃতি আরও টাটকা। 

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'ফুটবল বিশ্বযুদ্ধ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Advertisement

Share this article on

The article link is copied.