‘আমি অত প্রতিভাবান নই’, সম্প্রতি ‘পূর্ব পশ্চিম’ নাট্যদলের পক্ষ থেকে জীবনকৃতি সম্মান পাওয়ার পর মেগা ধারাবাহিকের শুটিং ফ্লোর থেকে বললেন অভিনেতা দেবশঙ্কর হালদার। মঞ্চে তাঁকে ক্রমে দেখা যাবে শক্তি চট্টোপাধ্যায় এবং সমরেশ বসুর চরিত্রে। কথোপকথনে বিদিশা চট্টোপাধ্যায়।
এই মুহূর্তে আপনি ধারাবাহিক ‘কমলা নিবাস’-এর শুটিং করছেন? কতবছর পর ছোটপর্দায় ফিরলেন?
আরও পড়ুন:
… হ্যাঁ, প্রায় চার বছর বাদে ছোটপর্দায় ফেরা। এর আগে যেটা করেছিলাম সেটাও প্রায় বছর দশেক বাদে হয়েছিল।
তার মানে বিরতির সময়টা কমেছে?
…কমেছে ঠিকই, কিন্তু এই সিরিয়াল আমি করার মতো অবস্থায় ছিলাম না। জি বাংলার সঙ্গে আমি অনেকগুলো কাজ করেছি, ওরা প্রায় নাছোড়বান্দা হয়েই আমাকে রাজি করিয়েছিল।
আপনি এবং সোহিনী সেনগুপ্ত বোধহয় দেবাদৃতার অভিভাবকের চরিত্রে।
…হ্যাঁ, বেশি বয়সের দুজন মানুষের সাংসারিক যাপন, প্রেম, দাম্পত্য যেমন আছে, এছাড়াও নানাবিধ ঘটনা ঘটে। অনেক শাখা-প্রশাখা আছে। সোহিনীর সঙ্গে টেলিভিশনে এই প্রথম।
মঞ্চে আপনার শততম নাটকে অভিনয় এবং তার জন্য ‘পূর্ব ও পশ্চিম’-এ পক্ষ থেকে সম্মানিত করা হল।
অভিনেতা দেবশঙ্কর

… আমি এসব খবর বা হিসাব রাখিও না। থিয়েটারে কিন্তু ছেলেমেয়ে আছে যারা এগুলোর খেয়াল রাখে। তারা সব নথিবদ্ধ করেছে, সেখান থেকেই খবর পেলাম শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে কেন্দ্র করে ‘পূর্ব পশ্চিম-এর ‘আসক্তি’ বলে যে নাটক সেটাই শততম নাটক।
এই যে জীবনকৃতি সম্মান আপনি পেলেন- পুরস্কার বা এই ধরনের সম্মান আপনার কাছে কতটা মূল্যবান?
…বয়সটা বাড়ল আমার, এটা বুঝতে পারছি। ‘৮৬ বা ‘৮৭ সালে এই ধরনের সাক্ষাৎকার নিলে বোধহয় খুব বেশি আনন্দ হাত, সত্যিই বলছি। নাট্যমুখপত্র নামে নাটকের একটি পত্রিকা আছে, তারা যখন প্রথম আমার সাক্ষাৎকার নিতে চেয়েছিল তখন এত আনন্দ হয়েছিল যে মনে হয়েছিল গোটা পৃথিবীকে ডেকে বলি। পরবর্তীকালে এইরকম বোধ হৃদয় থেকে একেবারে চলে গিয়েছে সেটা বলব না-কিন্তু ওই প্রথম প্রেম, প্রথম রোজগার, প্রথম যা কিছুর তো একটা আলাদা মাধুর্য থাকে সেই তীব্রতাটা হয়তো নেই। এত সাক্ষাৎকার দিয়ে ফেলেছি, এখন কথা বলতে গেলে মনে হয় এই কথাগুলো তো আগেই বলা হয়ে গিয়েছে, যারা জানার তারা জানেও, হয়তো আবার একই কথা বলে ফেলব। ওই যে একটা আনপ্রেডিক্টিবিলিটি, বা নিজেকে উন্মোচন করার, আবিষ্কার করার ক্ষেত্রে রোমাঞ্চ একটু কম হয়।
এই যে অপ্রত্যাশিতের কথা বললেন, মঞ্চে একই চরিত্রে বারবার অভিনয় করতে গিয়ে সেই খোঁজ থাকে?
…একদম গোড়ার দিকে ‘নান্দীকার’-এর একটা নাটক করতাম ‘শেষ সাক্ষাৎকার’ বলে। বাইশ বছর বয়সে আমি একজন আমলার চরিত্র করতাম, ১৭-১৮ বছর নাটকটা চলেছে। তখন আমার বয়স চল্লিশ। তখনও একই সংলাপ বলতাম কিন্তু আমার চুলে পাক লাগতে শুরু করেছে। মনের ভিতর অনেক অভিজ্ঞতার সঞ্চার হয়েছে, বাইরের জগৎটা সম্পর্কে আরও অনেক কিছু জেনেছি। তখন আর অভিনয়টা এক থাকছে না। নতুন নাটকের ক্ষেত্রে প্রেম একটা থাকে। ওটা যখন পুরনো হতে থাকে তখন সেটাকে পুনর্নির্মাণ করতে হয়। প্রতিদিনই তাকে গড়ে তুলতে হয়। লোকে বলে বটে যে, রোজই এক সংলাপ বলো কী করে- এটা তো আর নামতা নয়। কারণ সংলাপ বললে শরীরে, মনে প্রভাব পড়ে। সেটা হতেই হবে, না হলে সংলাপ মনে পড়বে না। অনেকে বলে, এত সংলাপ মনে রাখ কী করে। আমি বলি, মনে রাখি না মনে পড়ে।
প্রায় তিরিশ বছর কাটিয়ে ফেলেছেন নাট্যজগতে, ছবিতেও কাজ করেছেন- এই সময়ে দাঁড়িয়ে বাংলা শিল্প মহলে আপনি অপ্রত্যাশিতের মুখোমুখি হন বা অবাক হন?
…খুব যে অবাক হয়ে, চমকিত হয়ে প্রকাশ করতে পারি তা নয়, অবাক হওয়া কিন্তু চলতেই থাকে।
মানুষের ভালো দিক না খারাপ দিক, কোনটা আপনাকে বেশি সারপ্রাইজ করে এই সময়ে দাঁড়িয়ে?
…আমি তো সুপ্রিম কোর্ট নই যে কোনটা ভালো, কোনটা খারাপ সেটার বিধান দিতে পারব। তবে যে সৎ প্রবৃত্তির কথা সারা পৃথিবী আমাদের শিখিয়েছে। তা থেকে খারাপ-ভালো বোধ তৈরি হয়। কিন্তু ‘আন্তিগোনে’ নাটকের সেই ক্রেনানের সংলাপে আমি বিশ্বাস করি, বলিও ভালো-খারাপ, উচিত-অনুচিত, সমস্ত মিলিয়েই তো গোটা কাজটা, সেই কাজটা তো কাউকে না কাউকেই করতেই হয়। সত্য-মিথ্যা, ভালো-খারাপের স্বরূপও পরিস্থিতি
নতুন কোনও নাটক?
…আমি তো প্রায় বছরে চারটে করে নতুন নাটক করি। এই বছর যেমন ‘আসক্তি’ রয়েছে। এছাড়া সমরেশ বসুকে নিয়ে একটি কাজ চলছে। সেটার নাম ‘অমৃতসন্ধান’। সমরেশ বসুর জীবন নিয়ে এই নাটক। তার সঙ্গে আরও গল্প জুড়েছে। সেটা মে মাসে মঞ্চস্থ হবে। ‘দৃশ্যপট’ নামের একটি দল, ওরা করছে। সেটারই রিহার্সাল চলছে।

এতগুলো দলের সঙ্গে এতদিন সুসম্পর্ক নজায় রেখে কাজ করে যাচ্ছেন কীভাবে?
… সুসম্পর্ক না দুঃসম্পর্ক জানি না। একবার কাজে সম্মত হলে আমি নির্দেশকের ভাবনাকে সবসময়ই গুরুত্ব দিই। আর কাজটা সূচারুভাবে সম্পন্ন করার চেষ্টা করি। আজকে করছি, কাল ভালো লাগছে না বলে করব না বলার মতো স্পর্ধা এবং অহংকার যেন আমার না হয়। কারণ চারপাশের অনেক। কিছুই বদলে যায়। তখন এটা বা ওটা কেন হল না এসবের মধ্যে না ঢুকে যদি নিজের মতো করে একটা সমাধান বের করতে পারি তাহলে বোধহয় ভালো হয়। এই ভাবনা থেকেই এতদিন কাজ করে এসেছি। সবাইকে নিয়ে থিয়েটার করতেও আমার প্রবল ভালো লাগে। আর আমি হয়তো তেমন প্রতিভাবান নই। শুনেছি খুব প্রতিভাবান যারা তারা কোনও কিন্তু মেনে মানিয়ে নেন না। আমি ততটা নই বলে হয়তো একটু মেনে মানিয়েও নিয়েছি।
এটা কী বলছেন?
…হ্যাঁ, কারণ আমি শুনেছি, বাজারে এই কথা প্রচলিত আছে। (হাসি) আমি এই কথাটার প্রবল প্রতিবাদ করি। মেনে-মানিয়ে নেওয়ার কথাই যদি বলি- মেনে মানিয়ে নিতে তো হবেই। আমার কথাই ধ্রুব সত্য, আমি যা বললাম সেটাই শেষ কথা এটা বলার মধ্যে তো বোকামো আছে।
দলীয় রাজনীতি কি শিল্পের পথে অন্তরায়?
… রাজনীতি, দল, সংগঠন, রাজনীতির ভালো-মন্দ, যদি মানুষের জীবনযাপনে ছাপ ফেলে, তা হলে শিল্পেও ফেলবে। এবার শিল্পের কারিগর মাঁয়া তাঁরাই ঠিক করবেন কোন রাজনীতির হাত ধরবেন, কীভাবে চলবেন, কতটা সমঝোতা করবেন, কতটা করবেন না, কতটা প্রতিবাদী হবেন। কতটা বের্টোল্ট রেশট-এর মতো হবেন আর কতটা জোয়ান অফ আর্কের মতো হলেন।
আর কোনও ‘প্রথম’ কিছু করা বাকি?
… হ্যাঁ, আমার অনেকগুলো ইচ্ছে আছে, তার মধ্যে একটা ইচ্ছে ছিল, সেটা একজন বিখ্যাত অভিনেতা থেকে প্রভাবিত বলতে পারেন। রাতের কলকাতায় ট্যাক্সি বা উত্তর গাড়ি চালানোর, নানা মানুষ পিছনে এসে বসবে, তারা গল্প করবে, আমি শুনব, তাদের গন্তব্যে পৌঁছে দিয়ে তাদের জীবন থেকে উধাও হয়ে যাব। কিন্তু থেকে যাবে কিছু শব্দ, কিছু কথা, দুটো তিনটে চোখের জল কিংবা হাসি যা দিয়ে আমি হয়তো নিজেকে গড়ে তুলতে পারব।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
পার্টনারের সঙ্গে কখনওই ঝগড়া হয় না বলে গর্ব করেন? নেপথ্যে থাকতে পারে ৪ জটিল মনস্তত্ব
-
চিরকালের জন্য বাকিংহাম প্যালেস ছাড়লেন রাজা চার্লস! হঠাৎ কেন এই সিদ্ধান্ত?
-
স্বাস্থ্যকর খাবার বানাতে সর্বক্ষণ এয়ার ফ্রায়ারের ব্যবহার, ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে না তো?
-
প্রাক্তন-বর্তমানের ‘ভয়ংকর পুনর্মিলন’ হবে ‘আজও অর্ধাঙ্গিনী’তে, সম্পর্কের জটিল ধাঁধায় জয়া-চূর্ণী
-
মেয়ের আবদারে কাজে যাননি, যমদুয়ার থেকে তারাতলার শ্রমিক বাবাকে ফেরাল খুদে