লন্ডনে কুণাল ঘোষের সঙ্গে রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের অতীত সফরের ছবি।
লন্ডন সফরে বিশ্বকবির বিলেতবাড়িতে গিয়েছিলেন রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়, কুণাল ঘোষ। আজ অন্য কাজে কুণাল লন্ডনে। রঞ্জন একটু অসুস্থ, কলকাতায়। মিস করছেন বলে হোয়াটসঅ্যাপ করেছিলেন কুণালকে। তারপর কলকাতা লন্ডন কথোপকথন পুরোটাই তুলে ধরা হল।
রঞ্জন: কুণাল জানি তুমি খুব ব্যস্ত। তবু লন্ডনের দু-একটা ছবি পাঠিও। যে লন্ডনের জন্যে মন কেমন করে তোমার-আমার। যদি পারো আরও একবার বসে এসো হ্যামস্টেডের সেই স্বর্গসোপানে। খুব ভালো কাটুক তোমার সময়। এখন বোধহয় ওখানে সন্ধে ৬টা। এখানে রাত ১০টা ২০। নিঃসঙ্গ পান করছি নিজের ঘরের শোবার চৌকিতে। ছবি পাঠালাম। আর পারলে কুণাল আমাকে একটা টাইম মেশিন দিতে পারো? ফিরে যেতে চাই।
কুণাল: রঞ্জনদা, আপনাকে মিস করছি। আপনি থাকলে জরুরি খবরের ফাঁকে অন্য এক অনুভূতির আকাশে ভেসে থাকা যেত। আমরা রুমমেটও থাকতাম। ভোরের সূর্যর প্রথম আলো থেকে কথা, গল্প, কবিতা, গান শুরু হত। আর হ্যাম্পস্টেড তো এক স্বর্গীয় আবিষ্কার। এবার যেতে পারব বলে মনে হচ্ছে না। তবে মনে পড়ছে খুব। রবিঠাকুরের বিলেতবাড়ি। তারপর তো কত কী হয়ে গেল। আজ ভাবলে রূপকথা মনে হয়। প্রথম যাওয়া মনে আছে?
রঞ্জন: মনে থাকবে না? আমার জীবনে অলৌকিক স্মৃতির একটি হলো তোমার সঙ্গে হ্যাম্পস্টেডে রবীন্দ্রনাথের ভাড়াবাড়ির সিঁড়িতে চুপ করে ভীষণ শীত, ঝিরঝিরে বৃষ্টি, ম্লান আলোর মধ্যে বসে ১৯১২ সালের রবীন্দ্রনাথকে স্মরণ করা। তিনি এই বাড়িতে গীতাঞ্জলির অনুবাদে ফাইনাল টাচ দিচ্ছিলেন। পরের বছর নোবেল প্রাইজ। কিন্তু এই বাড়িতে যে আফগান ড্রাইভার আমদের নিয়ে এসেছিল, তার কথা মনে আছে?
কুণাল: আছে তো। কাবুলের বাসিন্দা। রবীন্দ্রনাথের বাড়ি শুনেই অবাক। বলেছিল, ওঁকে ফোন করে ডিরেকশন নিন বাড়িটা হ্যাম্পস্টেডের ঠিক কোথায়! তারপর তো পাওয়া গেল। মেঘলা আকাশ, উইপিং উইলোর সবুজে ঢাকা পাহাড়ি ঢালের এলাকা। তার মাঝে সেই বাড়ি। নীল তবকে লেখা – Indian poet Rabindranath Tagore Stayed here in 1912. আফসোস, বাড়িটায় ঢোকা গেল না। সিঁড়িতে বসেই কাটল। কিন্তু সেই মুহূর্তটাও স্বপ্নের মতো ছিল না?
রঞ্জন: কুণাল, ওই বাড়ির দরজায় বসে তুমি হঠাৎ বললে মাস দেড়েকের মধ্যে ফিরে এই বাড়িতেই আমরা ২৫শে বৈশাখের অনুষ্ঠান করব। বিশ্বকবির জন্মসার্ধশতবর্ষের প্রথম অনুষ্ঠান বিশ্বের বুকে এখানে আমরাই করব, এই ২০১০-এ। আপনি স্ক্রিপ্টটা লিখে ফেলুন রঞ্জনদা। তার পর তুমি কয়েকটা ফোন করলে। তারপর তোমার মুখে এই দৈববাণী : ব্যবস্থা হয়ে গেল। আমরা আসছি। পুরো টিম নিয়ে। স্ক্রিপ্টটা যেন ফাটাফাটি হয়। আমার মুখে তখন রবীন্দ্রনাথ : যে পারে সে আপনি পারে পারে সে ফুল ফোটাতে। কী করে পারলে কুণাল? পরের দৃশ্য, আমরা প্লেনে মহড়া দিচ্ছি! মনে আছে? লন্ডনের উড়ানে?
কুণাল: ভাবা যায় সেটা! এমিরেটসে রাত জেগে মহড়া আকাশে। তারপর তিনদফা অনুষ্ঠান। ২৫শে বৈশাখ সকালে সেই বিলেতবাড়ির সামনে, তারপর হিথের সবুজ প্রান্তরে, সন্ধেয় টাউন হলে আপনার দুরন্ত স্ক্রিপ্ট ‘মিলন বিরহে রবীন্দ্রনাথ’। প্রবাসীরাও সাড়া দিয়েছিলেন। আর বাড়ির সামনের অনুষ্ঠানটি, ছবি আমরা নিয়ে গিয়েছিলাম, ওখানে গান, আবৃত্তি, পাঠ; ভাবা যায়? সাহেব প্রতিবেশীরা অবাক হয়ে দেখছিলেন। রঞ্জনদা, সন্ধের টাউন হলের পরিবেশটি মনে আছে?
রঞ্জন: সাহেব প্রতিবেশীদের কথায় মনে এল। প্লেনের মধ্যে রবীন্দ্রনাথের গান কবিতা সংলাপ। এক বেয়াড়া সাহেব অ্যাংলো স্যাকসন মেজাজে বলল, হোয়াট দা হেল ইজ গোয়িং অন? আর আমরা প্রায় সমবেত ভাবে বললাম রবীন্দ্রনাথ টেগোর। নামের ধাক্কায় সাহেব ঘাবড়ে চুপ। স্ক্রিপ্টে একটু-আধটু ইংরেজিও ছিল বিদেশি শ্রোতাদের কথা ভেবে। চেনা ঘাসের গন্ধে যেমন গরুর মুখে হাসি ফোটে, ইংরেজি শুনে সাহেবের মুখেও হাসি দেখা দিল। কিন্তু ওই শীতের মধ্যে লন্ডনের হাইড পার্কে ধুতি-শাড়ি পরে আমাদের রবীন্দ্রসন্ধের অবস্থাটা মনে আছে? কোঁচার তলায় বরফ? কিন্তু সেই দূরের সন্ধেটা আজ একলা ঘরে বসে যখন মনে পড়ছে, হুইস্কির সঙ্গে বরফের কুয়াশায় জমে উঠছে বেদনা।
কুণাল: আপনাকে আমিও মিস করছি রঞ্জনদা। একাধিকবার একসঙ্গে আসা, সফর, ঘোরা, আবিষ্কার, রুমমেট। আপনি এখানে আমার গাইড এবং অভিধান। ব্রেকফাস্ট টেবিলের রোস্টেড মৌচাক থেকে কিটসের বাড়ির মৃত্যুমাখা উঠোন। আপনিই তো ছিলেন চোখ। ধারাভাষ্যে অনুভূতিকে কথা বলাতেন আপনি। মিস করছি পিতৃসম বন্ধু, আপনাকে। মন খারাপ করবেন না।
রঞ্জন : কুণাল, লন্ডনের ওই দিনগুলো আমাদের কেটেছিল ম্যাজিক রিয়েলিটি বা শৌভিক বাস্তবে। মনে আছে আমার, তুমি আর আমি দাঁড়িয়ে আছি ধুতি পাঞ্জাবি শাল গায়ে হাইড পার্কের সেই সরোবরের পাশে চাঁদের আলোয় যে সরোবরে শেলির প্রথম স্ত্রী হ্যারিয়েট ওয়েস্টব্রুক আত্মহত্যা করেছিলেন। আর তুমি মনপ্রাণ ঢেলে গাইছ, তবু মনে রেখো। আমি জানি এমন দিন আর ফিরবে না। ক্রমশই বাড়তে থাকবে স্মৃতির পরিসর। জীবন হয়ে উঠবে অতীতে ফিরে যাওয়ার বাসনা, না ফিরতে পারার বেদনা। যার গ্রিক নাম নস্টালজিয়া। তবু বলি, এই যে আমার কথা মনে পড়েছে তোমার, আমার সঙ্গে এতক্ষণ লন্ডন থেকে যুক্ত হলে সংলাপে, সেটাই তো আমার ফিরে যাওয়া। তুমি সম্ভব করলে সেই উষ্ণ সান্নিধ্য, যা লন্ডনে পেয়েছি তোমার রুম মেট হয়ে বেশ কিছুদিন জীবনের কোনো এক সোনালি অতীতে। পিছন ফিরে তাকালে মনে আসে পাবলো নেরুদার সেই বেদনার বাণী: লাভ ইজ শর্ট, ফরগেট ইজ লঙ!
কুণাল: রঞ্জনদা, আপনি সুস্থ হয়ে উঠুন। হাঁটু আরও জোরদার হোক। শতায়ুর দিকে এগোন আপনি। আবার আমরা দুজন কখনও লন্ডনে আসব। টেমসের ধারে বসে বৃষ্টিতে এক ছাতার নিচে বসে থাকব। আপনি বলে যাবেন রবীন্দ্রনাথ থেকে কিটসের কথা; প্রেম, বিরহের কথা; তৃপ্তি আর যন্ত্রণা থেকে গান, কবিতার সৃষ্টির কথা। শুনব। সমৃদ্ধ হব। আমরা আবার আসব রঞ্জনদা।
খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ
Copyright © 2025 Sangbad Pratidin Digital Pvt. Ltd. All rights reserved.