বঙ্গ রাজনীতিতে তখন বাম জমানা। মসনদে দাপুটে মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু। কলকাতার পরিবেশ ছিল আলাদা। বিকেলের দিকে সূর্য গঙ্গাতীরে হেলে পড়লে হাল্কা আরামদায়ক হাওয়া বিবাদী বাগের উপর দিয়ে বয়ে এসে মহাকরণের অলিন্দ পেরিয়ে হু হু করে ঢুকে পড়ত বসুর চেম্বারে। শুধু গঙ্গার হাওয়া নয়, জ্যোতিবাবুর কাছে আরও একজন হাওয়ার মতো পৌঁছে যেতেন। তিনি সুদূর কোচবিহারের দিনহাটার বাসিন্দা কমল গুহ। স্ত্রীর নামের সঙ্গে মিল ছিল বলেই হয়তো কমলবাবুকে বিশেষ গুরুত্ব দিতেন জ্যোতিবাবু!
রাশভারী মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু আর রাশভারী কৃষিমন্ত্রী কমল গুহ। দুজনের দল আলাদা। ছোট বাম দল ফরওয়ার্ড ব্লক। বামফ্রন্টের শরিকমাত্র। দলীয় প্রতীক সিংহ। সেই জমানায় যখন জ্যোতি বাবুর সঙ্গে মতানৈক্য হলে কমল গুহর ‘সিংহ গর্জন’ মাঝেমাঝে শুনতে পাওয়া যেত। কমলবাবুর দাপুটে ব্যক্তিত্বের সঙ্গে আরও একটি প্লাস পয়েন্ট জুড়ে থাকত। তিনি বাংলাদেশের সামরিক শাসক হুসেন মহম্মদ এরশাদের বাল্য বন্ধু। প্রকাশ্যেই বলতেন, “পেয়ারা (এরশাদের ডাকনাম) আর আমি এক স্কুলে পড়েছি।”
আরও পড়ুন:
রাশভারী মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু আর রাশভারী কৃষিমন্ত্রী কমল গুহ। দুজনের দল আলাদা। ছোট বাম দল ফরওয়ার্ড ব্লক। বামফ্রন্টের শরিকমাত্র। দলীয় প্রতীক বাঘ। সেই জমানায় যখন জ্যোতি বাবুর সঙ্গে মতানৈক্য হলে কমল গুহর ‘ব্যাঘ্রগর্জন’ মাঝেমাঝে শুনতে পাওয়া যেত। দিনহাটা তখন বাঘের গুহা! এখানে জ্যোতি বসুর দল সিপিএমের লাল পতাকা উড়ত কম। সুভাষচন্দ্র বসুর দল ফরওয়ার্ড ব্লকের পতাকা উড়িয়ে গর্জন করতেন কমল গুহ। কমলবাবুর দাপুটে ব্যক্তিত্বের সঙ্গে আরও একটি প্লাস পয়েন্ট জুড়ে থাকত। তিনি বাংলাদেশের সামরিক শাসক হুসেন মহম্মদ এরশাদের বাল্যবন্ধু। প্রকাশ্যেই বলতেন, “পেয়ারা (এরশাদের ডাকনাম) আর আমি এক স্কুলে পড়েছি।” এমন আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে খোঁচাতে চাইতেন না জ্যোতি বসুও।
আরও পড়ুন:
বাম জমানা বাংলায় আজ অতীত। কোচবিহারের রাজনীতিতে এখনো কমল-পেয়ারার স্মৃতি টাটকা। কমলপুত্র উদয়ন গুহর কাছে এরশাদ ‘কাকু’। পিতার মতো উদয়ন গুহ দীর্ঘ সময় বাম রাজনীতিক। ফরওয়ার্ড ব্লকের হয়ে হুঙ্কার ছাড়তেন। ২০০৮ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি দিনহাটায় পুলিশের গুলিতে ৫ ফরওয়ার্ড ব্লক কর্মীর মৃত্যু হয়। উদয়ন গুহ সিপিএমের তীব্র সমালোচনা করেন। তবে রক্তাক্ত ফরওয়ার্ড ব্লক মন্ত্রিসভা ত্যাগ করেনি। পিতার মৃত্যুর পর উদয়ন গুহর সঙ্গে বামফ্রন্টের দূরত্ব বাড়ছিল। বাম জমানার পতনের পর তিনি যোগ দেন তৃণমূল কংগ্রেসে। হেভিওয়েট নেতাকে উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন মন্ত্রী করে ঠান্ডা করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তারপর বেশ কয়েকটা নির্বাচন হয়েছে। ছাব্বিশে ফের নতুন করে ভোট পরীক্ষা উদয়নের। আর বঙ্গ রাজনীতির বরাবরের অন্যতম হাইভোল্টেজ কেন্দ্র দিনহাটা আজকের ভোটেও হটস্পট।
ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধনের পর গত ২৮ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর বাদ পড়েছিল ১৬,৪০০ ভোটারের নাম। এখনও বিচারাধীন ৩৫ হাজার। অনুমান, এখান থেকে ১৮ থেকে ২০ হাজার নাম বাদ পড়তে পারে।
২০২১ সালের নির্বাচনের তথ্য অনুযায়ী দিনহাটা বিধানসভা কেন্দ্রের মোট ভোটার সংখ্যা ২,৯৮,৪২৩। এর মধ্যে ১,৫১,২৬৯ জন পুরুষ এবং ১,৪২,০৯৬ জন মহিলা ভোটার রয়েছেন। তবে ছাব্বিশে এই সংখ্যায় খানিকটা অদলবদল হবে। তার মূল কারণ এসআইআর। ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধনের পর গত ২৮ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর বাদ পড়েছিল ১৬,৪০০ ভোটারের নাম। এখনও বিচারাধীন ৩৫ হাজার। অনুমান, এখান থেকে ১৮ থেকে ২০ হাজার নাম বাদ পড়তে পারে। এই বাদ পড়া সংখ্যা চাপে রেখেছে উভয় শিবিরকেই। যদিও এসআইআরে নাম বাদের প্রতিবাদে গত মাসে দলনেত্রী যখন কলকাতায় ধরনা দিয়েছিলেন, সেসময় দিনহাটায় উদয়ন গুহও তাঁকে অনুসরণ করে ২৪ ঘণ্টা অনশন চালান। তার লাভ কি ভোটবাক্সে পাবেন উদয়ন?
দিনহাটা মানেই উদয়ন-গড়। রাজ্যে তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পরও দিনহাটায় সরলরৈখিক শাসক-বিরোধী লড়াই হয় না। উদয়ন গুহ ২০১১ সালেও ফরওয়ার্ড ব্লকের হয়ে জিতে বিধানসভায় যান। তারপর অবশ্য তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে দলবদল করেন। তারপর থেকে অবশ্য দিনহাটায় যুযুধান দু’পক্ষ তৃণমূল-বিজেপিই। ২০১৬ সালে এই কেন্দ্রে প্রাক্তন সতীর্থ ফরওয়ার্ড ব্লকের অক্ষয় ঠাকুরকে হারিয়েছিলেন উদয়ন গুহ, পেয়েছিলেন মন্ত্রিত্বও। ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে ঘাসফুল শিবিরের হয়ে তাঁর লড়াই মনে রাখার মতো। সেবার দিনহাটার ভোটযুদ্ধও ছিল অত্যন্ত আকর্ষণীয়। গণনার দিন সে এক টানটান উত্তেজনা। কখনও নিশীথ এগিয়ে, তো কখনও উদয়ন। শেষমেশ মাত্র ৫৭ ভোটে তিনি তৎকালীন কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিকের কাছে পরাজিত হন। নিশীথ অবশ্য তখন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী থাকায় জিতে যাওয়া বিধায়ক পদটি ছেড়ে দেন। দিনহাটায় উপনির্বাচন হলে বিপুল ভোটে জেতেন উদয়ন গুহ। ছাব্বিশেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সৈনিক তিনিই। জয় নিয়ে ১০০ শতাংশ আত্মবিশ্বাসী উদয়ন। বলছেন, ”পাঁচ বছরে এলাকায় সার্বিক উন্নয়ন হয়েছে। তার উপর ভিত্তি করেই এবার ভোট হবে। মানুষ বুঝেশুনে ভোট দেবেন।”

বাবার উত্তরাধিকার বহন করে ধীরে ধীরে ঘাসফুল বিছিয়ে দিনহাটায় নিজের শক্ত ঘাঁটি তৈরি করলেও উদয়ন গুহকে নিয়ে বিতর্ক কম নেই। তিনি একদা ‘লাল চুল কানে দুল’ বলে তৃণমূল ছাত্র পরিষদকে কটাক্ষ করেছিলেন। সেই কটাক্ষ নিন্দার ঝড় উঠলেও সেটা সামলানো গিয়েছিল ছাত্র, যুবকদের প্রতি খোদ দলনেত্রীর প্রশ্রয়ের অসীম ফল্গুধারায়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বরাবর তরুণদের এগিয়ে দিয়েছেন লড়াই, আন্দোলনের ময়দানে। এমনকি এই মুহূর্তে রাজ্যের বেকার যুবক, যুবতীদের জন্য রয়েছে তাঁর সরকারের ‘যুবসাথী’ প্রকল্প। ২১ থেকে ৪০ বছর বয়সিরা পেয়ে থাকেন মাসে ১৫০০ টাকা ভাতা। যা মমতার ভাষায়, পড়াশোনা বা চাকরি খোঁজাকালীন হাতখরচ মাত্র। ছাব্বিশের ভোটে তার ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলেই মত জেলা রাজনৈতিক মহলের।
অন্যদিকে, এবার গেরুয়া শিবির দিনহাটায় প্রার্থী বদল করেছে। নিশীথের ‘নিরাপদ’ আসনে এবার পদ্ম সৈনিক অজয় রায়। তিনি কার্যত হেভিওয়েট প্রার্থীই। একুশের ভোটের আগে নিশীথ প্রামাণিকের হাত ধরেই যুব তৃণমূল ছেড়ে পদ্ম শিবিরে পা রেখেছিলেন। তারপর থেকে দিনহাটায় যেটুকু শাসকবিরোধী লড়াই, তা একাই চালিয়ে যাচ্ছেন অজয়বাবু। রয়েছেন জেলা সম্পাদকের পদে। এমনকী কেন্দ্রীয় নেতৃত্বও তাঁকে সমীহের চোখে দেখে। কেন্দ্রীয় বাহিনী নিরাপত্তা পান দিনহাটার বিজেপি প্রার্থী। তিনি অবশ্য নিজের পালে ভোট টানতে প্রচার করে চলেছেন, গত ৫ বছরের দিনহাটায় কোনও কাজই হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে একটি কলেজের দাবি ছিল, তাও মেটেনি। তৃণমূল বিধায়ককে নির্বাচিত করে মানুষ এখন বুঝতে পারছেন, কী ভুল করেছেন। এবার তাই ‘পালটানো দরকার’ স্লোগান তাঁর মুখে। এবারও বকলমে দিনহাটায় লড়াই উদয়ন বনাম নিশীথেরই।

আবার ফিরি দিনহাটার ‘সিংহ’ কমল গুহর কথায়। তাঁকে সমঝে চলতেন জ্যোতি বসু। এখনও বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান জেলার ফরওয়ার্ড ব্লক নেতৃত্বের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলেন। প্রতি নির্বাচনে এই আসনে ফরওয়ার্ড ব্লকের প্রার্থী একেবারে বাঁধা। ছাব্বিশে তাঁদের হয়ে ভোটযুদ্ধে নামছেন প্রবীণ নেতা বিকাশ মণ্ডল। তিনি অবশ্য তৃণমূল-বিজেপি বিরোধিতায় তেমন কিছু বলছেন না। বরং নিজেদের দাবিদাওয়া পেশ করে ভোট চাইছেন। কংগ্রেসের হয়ে দিনহাটায় লড়বেন হরিহর রায় সিংহ।

স্থানীয়দের মতে, মূল লড়াই তো হবে উদয়ন গুহ বনাম অজয় রায়ের মধ্যে। বাকিরা কোনও ফ্যাক্টর নয়। আগামী ২৩ এপ্রিল প্রথম দফায় দিনহাটায় ভোটগ্রহণ। প্রাক্তন তৃণমূল, বর্তমান বিজেপি অজয় রায় কি দাপুটে উদয়নের জমি কাড়তে পারবেন? তা বোঝা যাবে ৪ মে।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
আঞ্চলিক মিষ্টির জিআই ট্যাগ নিয়ে তৎপর বঙ্গ বিজেপি! ‘মিষ্টি হাব’ তৈরিরও পরিকল্পনা শমীকদের
-
এবার সপ্তাহে ৬ দিনই শান্তিনিকেতনে ‘হেরিটেজ ওয়াক’, দ্রুত টিকিট মিলবে অনলাইনেও
-
লরি চাপা পড়ে মাইকেল ক্লার্কের গাড়ি! আইপিএল শেষে বিমানবন্দর যাওয়ার পথে দুর্ঘটনা
-
নিজের নিরাপত্তা দিতে চেয়েছিলেন মমতা! এবার এনআইয়ের হাতে গ্রেপ্তার ‘মাছ চোর’ শওকত
-
সমাজকে আদর্শের আয়না দেখায় ‘গোর্কির মা’, কেমন হল? পড়ুন রিভিউ
নিবেদিত


