Advertisement
Advertisement
West Bengal Assembly Election 2026

স্টিং কাটায় বিদ্ধ হুমায়ুন, ভোট কাটাকাটির আশঙ্কা কাটিয়ে ভরতপুর ধরে রাখতে পারবে তৃণমূল?

২০২১-এ হুমায়ুন কবীরের হাত ধরে ভরতপুরে প্রথমবার জোড়াফুল ফুটেছিল। তারপরই ভরতপুর রাজ্য রাজনীতির মানচিত্রে হাইপ্রোফাইল কেন্দ্র হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। এবার কী বলছে সেখানকার ভোট অঙ্ক?

Advertisement
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: এপ্রিল ১০, ২০২৬, ১৮:১৮

link
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: এপ্রিল ১০, ২০২৬, ১৮:১৮

options
link
স্টিং কাটায় বিদ্ধ হুমায়ুন, ভোট কাটাকাটির আশঙ্কা কাটিয়ে ভরতপুর ধরে রাখতে পারবে তৃণমূল? zoom
হটস্পট ভরতপুর।

মুর্শিদাবাদের ভরতপুর। রাজ্য রাজনীতিতে কোনওকালেই হাই প্রোফাইল বিধানসভা কেন্দ্র নয়। বাংলার আর পাঁচটা গড়পড়তা বিধানসভার মতোই ভরতপুরের রাজনীতি রাজ্যে রাজনীতির হাওয়ার অনুকূলে বয়। বাম আমলে দীর্ঘদিন এই আসন আরএসপির দখলে ছিল। মাঝে ২০১৬ সালে এই কেন্দ্রে একবার কংগ্রেস জিতেছিল বটে, একুশে ফের ভরতপুর ঝুঁকে যায় শাসকের দিকে। ২০২১-এ হুমায়ুন কবীরের হাত ধরে ভরতপুরে প্রথমবার জোড়াফুল ফুটেছিল। তারপরই ভরতপুর রাজ্য রাজনীতির মানচিত্রে হাইপ্রোফাইল কেন্দ্র হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে।

আসলে হুমায়ুন কবীর (Humayun Kabir) তৃণমূলের অন্দরে ছিলেন ‘উড়ে এসে জুড়ে’ বসা নেতা। কোনওকালেই তৃণমূলের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেননি। সেই প্রথম দফায় শাসক শিবিরে ছিলেন মাত্র বছর চারেক। পরের দফায় যখন যোগ দিলেন তখন তাঁর নিজের কেন্দ্র রেজিনগর তৃণমূলেরই দখলে। বিধায়ক পদে প্রভাবশালী সজ্জন নেতা রবিউল আলম চৌধুরী। তাই রেজিনগর বিধানসভায় হুমায়ুন কবীরকে প্রার্থী না করে তাঁকে তৃণমূল নেতৃত্ব পাঠিয়ে দেয় ভরতপুরে। একুশের তৃণমূল পন্থী হাওয়ার সুবাদে মুর্শিদাবাদের বাকি ২০টি কেন্দ্রের মতো হুমায়ুনও ৪৩ হাজার ভোটের বিরাট ব্যবধানে জিতে এলেন। বিধায়ক হলেন।

Advertisement

কিন্তু সমস্যা হল, ভরতপুরের স্থানীয় নেতৃত্বের সঙ্গে ‘বহিরাগত’ হুমায়ুনের বনিবনা হচ্ছিল না। দলের ব্লক সভাপতিদের সঙ্গে নিত্য বিবাদ শুরু করলেন তিনি। এমনকী রাজ্য নেতৃত্বের কাছে বারবার দরবার করা শুরু করলেন ভরতপুরের ব্লক সভাপতি মুস্তাফিজুর রহমানকে সরিয়ে আজহারউদ্দিন সিজারকে বসানোর দাবিতে। এই সিজার আবার হুমায়ুনের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। কিন্তু হুমায়ুনের সেই দাবি পূরণ হয়নি। শেষে তিনি তৃণমূল ছেড়ে গড়লেন আমজনতা উন্নয়ন পার্টি। আর তাঁর ঘনিষ্ঠ অনুগামী সিজার হুমায়ুনের সঙ্গ ছেড়ে অধীর চৌধুরীর হাত ধরে যোগ দেন কংগ্রেসে। এ বছর তৃণমূলের প্রার্থী হুমায়ুনের সেই পুরনো শত্রু মুস্তাফিজুর। আর হুমায়ুনের ঘনিষ্ঠ সিজার প্রার্থী হয়েছেন কংগ্রেসের টিকিটে। ভরতপুরের বিদায়ী বিধায়ক নিজের দল আম জনতা উন্নয়ন পার্টির তরফে টিকিট দিয়েছিলেন পীরজাদা খোয়ায়েব আমিনকে। কিন্তু পরে মুস্তাফিজুরকে হারাতে নিজের প্রার্থী প্রত্যাহার করে সিজারকে সমর্থনের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। ফলে বকলমে ওই কেন্দ্রের লড়াই গিয়ে দাঁড়িয়েছে তৃণমূল বনাম হুমায়ুন কবীরের আমজনতা উন্নয়ন পার্টি সমর্থিত কংগ্রেস প্রার্থী আজাহারউদ্দিন সিজারের। লড়াইয়ে অবশ্য আরও দু’জন রয়েছেন। বিজেপির প্রার্থী অনামিকা ঘোষ। তিনি এলাকায় বিজেপির লড়াকু মুখ হিসাবে পরিচিত। বামেদের তরফে প্রার্থী আরএসপির টিকিটে নওফেল মহম্মদ সফিউল্লা। তাঁর লড়াই মূলত জামানত বাঁচানোর। মূল লড়াই প্রথম তিন জনের মধ্যে। এবং কোথাও গিয়ে ভরতপুরের লড়াইয়ের সূত্রধর সেই হুমায়ুন কবীর।

ভরতপুরের বিদায়ী বিধায়ক নিজের দল আম জনতা উন্নয়ন পার্টির তরফে টিকিট দিয়েছিলেন পীরজাদা খোয়ায়েব আমিনকে। কিন্তু পরে ‘চক্ষুশূল’ মুস্তাফিজুরকে হারাতে নিজের প্রার্থী প্রত্যাহার করে সিজারকে সমর্থনের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। ফলে বকলমে ওই কেন্দ্রের লড়াই গিয়ে দাঁড়িয়েছে তৃণমূল বনাম হুমায়ুন কবীরের আমজনতা উন্নয়ন পার্টি সমর্থিত কংগ্রেস প্রার্থী আজাহারউদ্দিন সিজারের।

West Bengal Assembly Election 2026: Hotspot Bharatpur
তৃণমূল প্রার্থী মুস্তাফিজুর রহমান। ফাইল ছবি।

এমনিতে ভরতপুরে উন্নয়নের ছাপ বিশেষ পড়েনি। আবার এলাকা খুব পিছিয়ে পড়াও নয়। এলাকার অর্থনীতি পুরোটাই কৃষিনির্ভর। ছোট খাটো কয়েকটি ধানকল আছে বটে, কিন্তু সেখানেও কর্মসংস্থানের বিশেষ সুযোগ নেই। এলাকার আরও একটা ফি বছর জল জমা। বেশ কয়েকটি ছোট ছোট নদী রয়েছে ভরতপুরকে ঘিরে। সেগুলি মূলত ভাগীরথীর উপনদী। ওই নদীর জলে বন্যা পরিস্থিতিও তৈরি হয় মাঝে মাঝেই। সে সমস্যা এখনও মেটেনি। তবে সেগুলি নির্বাচনী এজেন্ডা হিসাবেও বিশেষ গুরুত্ব পায় না। আপাতত ভরতপুরের রাজনীতিও মুর্শিদাবাদের অন্যান্য কেন্দ্রের মতো উন্নয়ন বনাম মেরুকরণ এজেন্ডার উপর ঘোরাফেরা করছে। আর অবশ্যই ফ্যাক্টর হুমায়ুন কবীরের প্রভাব, স্থানীয় সংগঠন, এবং গোষ্ঠীকোন্দল।

West Bengal Assembly Election 2026: Hotspot Bharatpur
কংগ্রেস প্রার্থী আজহারউদ্দিন সিজার। ফাইল ছবি।

ভরতপুর বিধানসভায় ৫৮ শতাংশ ভোটার মুসলিম। হিন্দু ভোট ৪২ শতাংশ। ফলে জনসংখ্যার হিসাবে মেরুকরণের রাজনীতি কার্যকরী হতে পারে। এই বিধানসভাতেও SIR-এ হাজার দশেক নাম বাদ পড়েছে। তবে এসআইআর নিয়ে বিশেষ বিক্ষোভ দেখা যায়নি। যদিও তৃণমূল প্রচারে SIR-কে ব্যবহার করতে চাইছে। বিজেপি লড়ছে মেরুকরণের অঙ্কে। আর কংগ্রেস প্রার্থী আজাহারউদ্দিন সিজার হাতিয়ার করছেন নিজের প্রতিপত্তি এবং স্থানীয় স্তরের তৃণমূল নেতা তথা তৃণমূল প্রার্থীর দুর্নীতির অভিযোগকে হাতিয়ার করে। এলাকার হাওয়া বলছে, হিন্দু ভোটের একটা বড় অংশ ঝুঁকে বিজেপির দিকে। বিজেপি প্রার্থী বেশ লড়াকু হওয়ায় হিন্দু ভোটারদের আস্থা অর্জন করতে পারবেন বলে আশাবাদী শাসক শিবির। তবে এলাকায় আজহারউদ্দিন সিজারের ভাবমূর্তি ভালো। তিনিও হিন্দু ভোটের একাংশে থাবা বসাতে পারেন। সংখ্যালঘু ভোট (West Bengal Assembly Election 2026) গত দুই নির্বাচনে শাসকদলের সঙ্গেই থেকেছে। ২০২৪ লোকসভাতেও এই কেন্দ্র থেকে তৃণমূলকে ভালো লিড দিয়েছিলেন হুমায়ুন কবীর। এলাকায় সাংগঠনিক শক্তির নিরিখে এখনও শাসকদল বেশ ভালো জায়গায়। ভরতপুর বিধানসভায় একটি পঞ্চায়েত বিজেপির দখলে, একটি কংগ্রেসের ও বাকি তৃণমূলের। জেলা পরিষদের দু’টি আসন তৃণমূলের দখলে, একটি কংগ্রেসের।

West Bengal Assembly Election 2026: Hotspot Bharatpur
বিজেপি প্রার্থী অনামিকা ঘোষ। ফাইল ছবি।

কিন্তু পঞ্চায়েত ও লোকসভা ভোটের পর ভাগীরথী দিয়ে বহু জল গড়িয়ে গিয়েছে। তৃণমূলের সংগঠনে একটা বড় ঝাঁকুনি এসেছে। সংগঠনের অন্দরে বা তৃণমূলের মধ্যে যে হুমায়ুন কবীর পন্থীরা ছিলেন তাঁরা এখন সিজারের পাশে। পাশাপাশি ব্লক সহ-সভাপতি হওয়ার দরুণ সিজারের নিজেরও একটি প্রভাব রয়েছে। তিনি কংগ্রেসের প্রার্থী হয়ে যাওয়ায় লড়াইটা অনেকাংশে কঠিন হয়েছে শাসকদলের। তাছাড়া তৃণমূলের প্রার্থী মুস্তাফিজুর রহমানের উপর খাপ্পা স্থানীয় হিন্দুদের একটা বড় অংশ। মুস্তাফিজুরের বিরুদ্ধে বছর চারেক আগে একবার পাকিস্তানের পতাকা হাতে এলাকায় হুজ্জুতি করার অভিযোগ উঠেছিল। সেই নিয়ে চাপা ক্ষোভ রয়েছে। তাছাড়া জেলা পরিষদের কর্মাধ্যক্ষ থাকাকালীন কিছু দুর্নীতির অভিযোগও ওঠে। যদিও শাসকদলের নেতাকর্মীরা এ সবকিছুকেই বিরোধীদের অপপ্রচার বলে উড়িয়ে দিচ্ছে। শাসকদলের বক্তব্য, “প্রার্থী এলাকায় যথেষ্ট জনপ্রিয়। তাছাড়া মুখ্যমন্ত্রীর উন্নয়ন এবং বিজেপি বিরোধী লড়াই সংখ্যালঘুদের মনে দাগ কাটবেই।” তাছাড়া তৃণমূলের আশা, হুমায়ুন কবীরের বিজেপির সঙ্গে ‘ডিল’ করার ভিডিও প্রকাশ্যে আসার পর সংখ্যালঘুরা একজোট হয়ে বিজেপিকে রুখতে তৃণমূলের পাশেই দাঁড়াবেন।  

তবে বিজেপির অঙ্ক অন্য। অনামিকা ঘোষের অনুগামীরা বলছেন, সিজার এবং মুস্তাফিজুরের যত বিবাদ হবে তত তাঁদের লাভ। সংখ্যালঘু ভোটের ভাগাভাগিতে আসল ফায়দা বিজেপির। কোনওক্রমে হিন্দু ভোটের বেশিরভাগটা পেলেই কেল্লাফতে। বিজেপির এই সমীকরণ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল এলাকার ভোটাররাও। তাই সংখ্যালঘু ভোটাররা শেষমেশ একপক্ষ নিয়ে ভোট (West Bengal Assembly Election 2026) দিতেই পারেন। কিন্তু সেই একপক্ষটি কে? মুস্তাফিজুর নাকি সিজার? সবটাই ঠিক হবে ভোটের এক দু’দিন আগে।

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Advertisement

Share this article on

The article link is copied.