Advertisement
Advertisement
West Bengal Assembly Election 2026

‘মেরুকরণের এপিসেন্টার’ বেলডাঙায় চতুর্মুখী লড়াই, হুমায়ুন বাধা কাটিয়ে বিজেপিকে হারাতে পারবে তৃণমূল?

বেলডাঙার ভাগ্য এবার উন্নয়ন বনাম মেরুকরণের  লড়াইয়েই নির্ধারিত হবে। সিএএ থেকে শুরু করে পরিযায়ী শ্রমিক মৃত্যু, কয়েক বছরে বহু হিংসা দেখেছে বেলডাঙা। কী বলছে ভোটের অঙ্ক?

Advertisement
সংবাদ প্রতিদিন ব্যুরো
সংবাদ প্রতিদিন ব্যুরো

শেষ আপডেট: এপ্রিল ৯, ২০২৬, ০৮:৫৯

link
সংবাদ প্রতিদিন ব্যুরো
সংবাদ প্রতিদিন ব্যুরো

শেষ আপডেট: এপ্রিল ৯, ২০২৬, ০৮:৫৯

options
link
‘মেরুকরণের এপিসেন্টার’ বেলডাঙায় চতুর্মুখী লড়াই, হুমায়ুন বাধা কাটিয়ে বিজেপিকে হারাতে পারবে তৃণমূল? zoom
হটস্পট বেলডাঙা।

কাতারে কাতারে ছুটছে উন্মত্ত জনতা। কারও হাতে জাতীয় পতাকা। কেউ ইসলামের ধর্মীয় পতাকা হাতে। অনেকের হাতেই লাঠি, বাঁশ বা অন্য কোনও ধারালো অস্ত্র। মুখে নারা-এ-তকবীর স্লোগান। ভারত সরকারের পাশ করা সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনের তথাকথিত ‘প্রতিবাদে’ ওই উন্মত্ত জনতার ‘রণহুঙ্কারে’ যে কোনও ‘বীরপুরুষ’ও আতঙ্কিত হবেন! কথা হচ্ছে ২০১৯ সালের। অমিত শাহর পাশ করানো সিএএর প্রতিবাদে সাত বছর আগের ওই ‘গোষ্ঠী সংঘর্ষ’ মুর্শিদাবাদ তথা বাংলার রাজনীতিকে অনেকাংশ বদলে দিয়েছে।

ট্রেন জ্বলছে, ভাঙচুর হচ্ছে দোকানপাট, জাতীয় সড়ক অবরুদ্ধ, আগুন গাড়িতে, পুলিশ প্রশাসনও অসহায়। এ ছবি দেখতে বাংলা বা মুর্শিদাবাদ কেউই অভ্যস্ত ছিল না। সেদিনের সেই অশান্ত দৃশ্যপট যেন ঘৃণার বীজ বপন করে দিয়েছে গোটা জেলায়। এরপর ওই একই ধরনের ছবি দেখা গিয়েছে ২০২৪ সালে রামনবমীকে কেন্দ্র করে, একই ছবি দেখা গিয়েছে কয়েক মাস আগে কার্তিক পুজোকে কেন্দ্র করে। তারপর ছোটবড় হিংসা একদিকে জেলার নিরিখে সংখ্যালঘু হিন্দুদের ‘আতঙ্কিত’ করছে। উলটো ছবিও আছে। রামনবমীর শোভাযাত্রার নামে সংখ্যালঘু এলাকায় উৎপীড়ন, উন্মত্ততা পালটা সন্ত্রস্ত করেছে সংখ্যালঘু মনকেও। বেলডাঙার ওই ছবি প্রভাবিত করছে গোটা রাজ্যের রাজনীতিকেও। পরিস্থিতি এতটাই সঙ্গিন যে এখন রামনবমীর মিছিল দেখলে দোকানপাট খোলা রাখার সাহস পান না সংখ্যালঘু ব্যবসায়ীরা। একই ছবি দেখা যায় ইসলামিক জালসার বা মহরমের মিছিল হলেও। অথচ তার আগে প্রায় দু’দশক প্রায় ৬৫ শতাংশ সংখ্যালঘু অধ্যুষিত জেলা মুর্শিদাবাদে সেভাবে বড় কোনও ধর্মীয় হিংসার ঘটনা ঘটেনি। 

Advertisement

এই আবহে ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনে (West Bengal Assembly Election 2026) পা রাখছে বেলডাঙা। বহরমপুর লাগোয়া এই শহরে একসময় মুর্শিদাবাদের মধ্যে এগিয়ে থাকা এলাকা হিসাবে পরিচিত ছিল। আদি ও বর্ধিষ্ণু ‘ভদ্রলোক’দের এই এলাকায় সাম্প্রদায়িকতার রাজনীতি বাসা বাঁধার আগে উন্নয়ন, কর্মসংস্থানের মতো ইস্যুতে নির্বাচন হত। বেলডাঙার গামছা শিল্প একসময় বহু মানুষের রুজিরুটির সংস্থান করছে। সেই গামছা এখন কৌলিন্য হারিয়েছে। তবে এখনও কোথাও কোথাও বেলডাঙার গামছা বিক্রি হয়। বেলডাঙায় একসময় বহু মানুষের কর্মসংস্থান হত চিনির মিলে। সেই চিনির মিল বহুদিন আগেই দেহ রেখেছে। শোনা যায় সেই চিনিমিলের জমির মালিকানা নাকি এখন শাসকদলের নেতাকর্মীদের হাতে। কর্মসংস্থান ছাড়া পুর পরিষেবা, রাস্তাঘাটের সমস্যা, বেলডাঙা শহরের অন্দরে উড়ালপুলের দাবি, এসব বহু অভাব অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু সেসব ছাপিয়ে এখন ধর্মই যেন ভোটের মূল ইস্যু। মেরুকরণের সেই রাজনীতিতে উসকানি দিয়েছে হুমায়ুন কবীরের প্রস্তাবিত বাবরি মসজিদ। বেলডাঙা শহরের অদূরে যে কর্মযজ্ঞ চলছে, সেটা জেলার অন্য প্রান্তের মতো বেলডাঙার ভোট অঙ্কও বিগড়ে দিতে পারে। বেলডাঙা বিধানসভায় ৪৪ শতাংশ হিন্দু জনসংখ্যা। ৫৬ শতাংশ মুসলিম ভোট। অর্থাৎ হিন্দু-মুসলিমের ফারাক বেশি নয়। এই জনবিন্যাস কিন্তু মেরুকরণের রাজনীতির জন্য একেবারে উর্বর জমি।

West Bengal Assembly Election 2026: Hotspot Beldanga
বেলডাঙার তৃণমূল প্রার্থী রবিউল আলম চৌধুরী। ফাইল ছবি।

ওয়াকিবহাল মহল মনে করছে, বেলডাঙার এ বছরের লড়াই একেবারে চতুর্মুখী। মূল লড়াইয়ে তৃণমূল, বিজেপি, হুমায়ুন কবীরের আম জনতা উন্নয়ন পার্টি, এবং কংগ্রেস। বামেদের তরফে আরএসপি ওই কেন্দ্রে প্রার্থী দিয়েছে বটে, তবে তাঁর লড়াই মূলত জামানত বাঁচানোর। বেলডাঙায় তৃণমূল প্রার্থী করছে বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ রবিউল আলম চৌধুরীকে। বেলডাঙার বাসিন্দা হলেও তাঁর রাজনীতি এতদিন মূলত ছিল রেজিনগর কেন্দ্রিক। এবার রেজিনগর এবং বেলডাঙা দুই কেন্দ্রেই প্রার্থী বদলেছে শাসকদল। রবিউলকে রেজিনগর থেকে আনা হয়েছে বেলডাঙায়। টিকিট পাননি বিদায়ী বিধায়ক হাসানুজ্জামান। তবে জেলার অন্য কেন্দ্রের মতো বেলডাঙায় তৃণমূলের গোষ্ঠীকোন্দল সমস্যার নয়। বিজেপি প্রার্থী করেছে প্রাক্তন তৃণমূল নেতা তথা প্রাক্তন পুরপ্রধান ভরত ঝাওয়রকে। দু’জনেই এলাকায় সজ্জন ব্যক্তি হিসাবে পরিচিত। রবিউলের দীর্ঘদিনের বন্ধু ভরত ঝাওর। একদা দু’জনে চুটিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল করতেন। কংগ্রেসের প্রার্থী সাহারুদ্দিন শেখ প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। তিনিও প্রচারে কম যান না। হুমায়ুনের দল আম জনতা উন্নয়ন পার্টি প্রার্থী করেছে দলের যুব সভাপতি সৈয়দ আহমেদ কবীরকে। তিনি স্থানীয় নন। তবে একসময় তৃণমূল করতেন। অভিনয়ও করেছেন। তাছাড়া হুমায়ুনের পাশাপাশি এখন আসাদউদ্দিন ওয়েইসির হাতও রয়েছে তাঁর মাথায়। ২০১১ সালের আগে পর্যন্ত বেলডাঙার দখল ছিল আরএসপির হাতে। এবার তারা নিজেদের পুরনো গড় উদ্ধারে প্রার্থী করেছে রাজেশ দাসকে।

West Bengal Assembly Election 2026: Hotspot Beldanga
বিজেপি প্রার্থী ভরত ঝাওর। ফাইল ছবি।

বেলডাঙার ভাগ্য এবার উন্নয়ন বনাম মেরুকরণের  লড়াইয়েই নির্ধারিত হবে। শহরের বাসিন্দারা মানছেন বেলডাঙার সার্বিক বিকাশে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের অবদান কম নয়। তা ছাড়া সামাজিক সুরক্ষার একাধিক প্রকল্পে সব শ্রেণির মানুষের আর্থিক অবস্থাও বদলেছে। তুলনায় কেন্দ্রের প্রতি অনেকে বীতশ্রদ্ধ। কিন্তু এসব পেরিয়ে চলে আসছে ধর্মীয় রাজনীতির অঙ্ক। প্রায় ৪৪ শতাংশ হিন্দু ভোট মূল পুঁজি বিজেপির। অন্তত শহরের হিন্দু ভোটারদের সিংহভাগ পদ্মে পড়বে বলে আশাবাদী বিজেপি প্রার্থী ভরত ঝাওর। তাছাড়া পুরপ্রধান হিসাবে তাঁর কাজের খতিয়ানও প্রচারে তুলে ধরছেন তিনি। পুর এলাকার বাইরে এই বিধাসভার অন্তত গোটা তিনেক পঞ্চায়েতে ভালো প্রভাব রয়েছে গেরুয়া শিবিরের। উলটো দিকে রয়েছে সংখ্যালঘু ভোট কাটার অঙ্ক। বাবরির আবেগে ৫৬ শতাংশ মুসলিম ভোটের কিছুটাও যদি হুমায়ুনের দলে যায়, বা কংগ্রেস প্রার্থী সাহারুদ্দিন যদি আগেরবারের কংগ্রেসের পাওয়া ভোটের চেয়ে সামান্যও বাড়ান বা সেই ভোটটা ধরে রাখেন, তাহলে সংখ্যালঘু ভোটের ভাগাভাগি চিন্তার কারণ হতে পারে শাসকদলের। ভুলে গেলে চলবে না ২০১১ থেকে ২০২১ পর্যন্ত এই কেন্দ্রে কংগ্রেসের বিধায়ক ছিল। ২৪-এর লোকসভায় ভোটেও অধীর রঞ্জন চৌধুরী বেলডাঙায় ভালো ভোট (West Bengal Assembly Election 2026) পান।   

West Bengal Assembly Election 2026: Hotspot Beldanga
কংগ্রেস প্রার্থী শেখ সাহারুদ্দিন। ফাইল ছবি।

যদিও স্থানীয় তৃণমূল নেতৃত্বের বক্তব্য, সংখ্যালঘু-সংখ্যাগুরু বলে কোনও কথা নেই। সার্বিকভাবে গোটা বেলডাঙা বিধানসভাতেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উন্নয়নের সুবিধা পেয়েছেন মানুষ। তাছাড়া এলাকায় শাসক দলের সংগঠন পোক্ত। পুরসভা এখনও শাসকদলের দখলে। একটি বাদে সব পঞ্চায়েতও তাদের হাতে। তাছাড়া শেষবেলায় ভোটে যদি হিন্দুদের মেরুকরণ হয়, তাহলে পালটা সংখ্যালঘুরাও একজোট হয়ে মমতার পাশে দাঁড়াবেন। কিছুদিন আগেই বিজেপিশাসিত ওড়িশায় গিয়ে আক্রান্ত হতে হয়েছে বেলডাঙার সংখ্যালঘু পরিযায়ী শ্রমিকদের। যার জেরে বিক্ষোভও হয়। সেই স্মৃতি এখনও টাটকা সংখ্যালঘুদের মনে। তাছাড়া SIR-এ যেভাবে মুখ্যমন্ত্রী লড়ছেন সংখ্যালঘুদের জন্য, সেটার প্রভাবও পড়বে।

কিন্তু সংখ্যালঘুরা একজোট হলে সেক্যুলার তৃণমূলের পাশে দাঁড়াবে, নাকি ‘সংখ্যালঘুদের দল’ হুমায়ুন কবীরের আম জনতা উন্নয়ন পার্টির পাশে দাঁড়াবেন, সেটাই লাখ টাকার প্রশ্ন।

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Advertisement

Share this article on

The article link is copied.