Advertisement
Advertisement
West Bengal Assembly Election 2026

নস্ট্যালজিয়া উসকে ‘শেষ ভরসা’ বহরমপুরের লড়াইয়ে অধীর ‘মস্তান’, দুই ফুলের বাধা টপকাতে পারবেন?

তাল ঠুকছে তৃণমূল, হিন্দুত্বে ভরসা বিজেপির, বৃদ্ধ অধীর কি বিধানসভায় যেতে পারবেন, কী বলছে বহরমপুরের ভোটচিত্র?

Advertisement
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: এপ্রিল ৭, ২০২৬, ২২:৩৬

link
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: এপ্রিল ৭, ২০২৬, ২২:৩৬

options
link
নস্ট্যালজিয়া উসকে ‘শেষ ভরসা’ বহরমপুরের লড়াইয়ে অধীর ‘মস্তান’, দুই ফুলের বাধা টপকাতে পারবেন? zoom
হটস্পট বহরমপুর।

হাতি চলে বাজার, কুত্তে ভৌকে হাজার! পর পর তিনদিন বহরমপুরের অলিগলিতে প্রচারে গিয়ে বাধা। গো ব্যাক স্লোগান। একটা সময় যে শহরে তাঁর রাজত্ব চলত, সেই শহরে অবাধে চলাফেরা করাটাই যেন কঠিন হয়ে যাচ্ছে তাঁর পক্ষে! শেষে মেজাজ ধরে রাখতে না পেরে ‘পুরনো মেজাজে’ চমকানি, ধমকানি শুরু করলেন ৭০ বছরের বৃদ্ধ। নিজের শেষ ভরসা, নিজের প্রিয় শহরে এবার তাঁকে লড়তে হচ্ছে অস্তিত্বরক্ষার সংগ্রাম।

৭০ বছরের ওই ভদ্রলোকের নাম অধীর রঞ্জন চৌধুরী! একটা সময় বহরমপুর তথা গোটা মুর্শিদাবাদ জেলার ‘বেতাজ বাদশা’ বলা হত যাঁকে। অনুগামীরাও আজও যাঁকে বলেন ‘রবিনহুড’। একটা সময় জেলার বেশিরভাগ বিধায়ক, বেশিরভাগ পুরসভা, জেলা পরিষদ, পঞ্চায়েত সর্বত্র যাঁর ‘ডি ফ্যাক্টো’ শাসন চলত। যিনি নিজে একবারের বিধায়ক, পাঁচবারের সাংসদ, প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, লোকসভায় কংগ্রেসের প্রাক্তন দলনেতা হয়েছেন। কংগ্রেসের রাজনীতিতে সাফল্যের শিখরে ছিলেন। সেই অধীর রঞ্জন চৌধুরী আজ রাজনৈতিকভাবে নিঃস্ব হয়ে নিজের শহরেই খড়কুটো আঁকড়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছেন। জেলা পরিষদ, পুরসভা, সব হারিয়েছেন। চব্বিশের লোকসভা ভোটে ইউসুফ পাঠানের বিরুদ্ধে হারের পর রাজনীতিতে অধীরের অবস্থা সেই জমিদারের মতো যার রাজপাট আর নেই, শুধু মেজাজটা রয়ে গিয়েছে।

Advertisement

এবারের বিধানসভা নির্বাচনে (West Bengal Assembly Election 2026) বহরমপুর থেকে প্রার্থী হয়ে সবার প্রথম যে প্রশ্নের মুখোমুখি অধীরকে হতে হচ্ছে, সেটা হল নিজেকে সর্বভারতীয় স্তরের নেতা বলে এতদিন দাবি করার পর তাঁকে কেন বিধানসভায় লড়তে হচ্ছে? আমতা আমতা করে তাঁর উত্তর, ‘দল নির্দেশ দিয়েছে তাই।’ কিন্তু সে উত্তর যে বিশেষ বিশ্বাসযোগ্য নয়, অধীর নিজেও জানেন। সত্যিটা হল, কংগ্রেসের প্রাক্তন লোকসভার সাংসদ বিধানসভায় গিয়ে স্রেফ ভেসে থাকতে চাইছেন। আর তাতে তাঁর মূল ভরসা, নিজের শহর বহরমপুর।

West Bengal Assembly Election 2026: Hotspot Baharampur
বহরমপুরে জনসংযোগে অধীর। ছবি সোশাল মিডিয়া।

বহরমপুর শহর অধীরের উত্থানের আগে থেকেই কংগ্রেসের শক্ত ঘাঁটি ছিল। অবশ্য দীর্ঘদিন এই কেন্দ্রে বিধায়ক ছিলেন আরএসপিরও। তবে ১৯৯৬ থেকে ২০২১ পর্যন্ত বহরমপুর কেন্দ্রে হয় কংগ্রেস কিংবা অধীরের অনুগামী কোনও নির্দল প্রার্থী জিতে এসেছেন। ছবিটা চট করে বদলে যায় ২০২১ সালে। গোটা বাংলার মতো বহরমপুরেও তৃণমূল-বিজেপির ‘দ্বিমুখী রাজনীতির’ শিকার হয় কংগ্রেস। যে মনোজ চক্রবর্তী অধীরের বদান্যতায় একসময় বহরমপুর থেকে নির্দল হয়ে জিতে এসেছিলেন, তিনিই চলে এলেন তৃতীয় স্থানে। ঝুলিতে মোটে হাজার চল্লিশেক ভোট। বহরমপুর চলে গেল বিজেপির দখলে। তৃণমূল দ্বিতীয় স্থানে। এবারে বহরমপুরের বুকে প্রথমবার জোড়াফুল ফোটাতে মরিয়া রাজ্যের শাসকদল। তৃণমূল প্রার্থী করেছে নাড়ুগোপাল মুখোপাধ্যায়কে। যিনি শহরের পুরপ্রধান। এলাকার পরিচিত নাম। বিজেপির প্রার্থী বিদায়ী বিধায়ক তথা সমাজসেবী সুব্রত মৈত্র (কাঞ্চন)। লড়াই মূলত ত্রিমুখী।

West Bengal Assembly Election 2026: Hotspot Baharampur
বিজেপি প্রার্থী সুব্রত মৈত্র। ফাইল ছবি।

এ কথা অস্বীকার করার কোনও জায়গা নেই যে একটা সময় অধীর চৌধুরী এবং বহরমপুর ছিল সমার্থক। কিন্তু সেই অধীরের সঙ্গে আজকের অধীরের তফাৎ অনেক। আগেকার অধীর বহরমপুরেই থাকতেন, স্থানীয় রাজনীতি করতেন। মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। কিন্তু আজকের প্রজন্মের অনেকের কাছেই তিনি অচেনা। মাঝে দীর্ঘদিন দিল্লিবাসী ছিলেন। তাছাড়া পুরসভা, পঞ্চায়েতগুলি হাতছাড়া হওয়ার পর সেভাবে নাগরিক পরিষেবাও দিতে পারেন না তিনি। নীচুতলায় জনপ্রতিনিধি না থাকায় সংগঠন রুগ্ন ও ভগ্ন। এখন বহরমপুর শহরের সব বুথেও এজেন্ট দেওয়ার ক্ষমতা অধীরের নেই। উলটো দিকে রয়েছেন তৃণমূল প্রার্থী নাড়ুগোপাল। পুরপ্রধান হওয়ার সুবাদে যিনি নিয়মিত মানুষের পাশে। নাগরিকদের সুখ-দুঃখের সঙ্গী। নিচুতলার সংগঠনও শক্তিশালী। আবার বিজেপির প্রার্থীও এলাকায় থাকেন। একটা সময় সমাজসেবী হিসবে পরিচিত ছিলেন। তাঁর সবচেয়ে বড় অ্যাডভান্টেজ, ২০১৯ সালের পর বহরমপুর শহরে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির উত্থান। মুর্শিদাবাদের অন্য প্রান্তের তুলনায় বহরমপুরের ফারাকটা হল, এখানে সংখ্যালঘু ভোট মাত্র ২৫ শতাংশ। ৭৫ শতাংশই হিন্দু। ফলে বহরমপুর বিজেপির উর্বর জমি। এখন হিন্দু ভোট একজোট করাটাই বিজেপির মূল লক্ষ। যেটা ২০২১ এবং ২০২৪ দুই নির্বাচনেই করতে সক্ষম হয়েছে গেরুয়া শিবির। তাছাড়া কংগ্রেস এবং তৃণমূলের মধ্যে সংখ্যালঘু ভোটের ভাগাভাগি হলে, সেই সুবিধাও পাওয়ার আশায় সুব্রত মৈত্র।

প্রচারে নাড়ুগোপাল মূলত তোপ দাগছেন অধীরকেই। তাঁর বক্তব্য, “অধীর চৌধুরীর বয়স হয়েছে, এই কেন্দ্রে তিনি জিতলেই বা করবেন কী? সরকার গঠন করতে পারবেন না। মন্ত্রী হতে পারবেন না। এমনকী বিরোধী দলনেতাও হতে পারবেন না। ৭০ বছর বয়স হয়েছে। আমরা তরুণ, মানুষের পাশে থাকি আমাদের সুযোগ দিন।” তাঁর আরও বক্তব্য, “অধীর এখন জনবিচ্ছিন্ন। মানুষকে পরিষেবা দিতে হলে তাঁদেরই জেতাতে হবে যারা পরিষেবা দিতে পারবে?” বিজেপির কাঞ্চনের প্রচারের একটাই লাইন, “এবার পরিবর্তনের ভোট। তাই বিজেপিই জিতবে। তাছাড়া ভুলে গেলে চলবে না এই অধীর চৌধুরী বার বার হিন্দুদের উপর আক্রমণে নীরব থেকে গিয়েছেন।” আর অধীর, তিনি কী করছেন? বাড়ি বাড়ি গিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করছেন, “আমি তোমাদেরই লোক।” বলে বেড়াচ্ছেন, “এই শহরের এই বাজার আমি নিজের হাতেই সব তৈরি করেছি। সবাই আমাদের চেনা। নতুন করে চেনানোর কিছু নেই। চেনা বামুনের পৈতে লাগে না।”

West Bengal Assembly Election 2026: Hotspot Baharampur
মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে রোড শো-তে নাড়ুগোপাল। ফাইল ছবি।

বহরমপুরের রাজনীতি সম্পর্কে যারা খোঁজখবর রাখেন, তাঁরা বলছেন এখানে যদি কংগ্রেসের টিকিটে অন্য কেউ লড়তেন, তাহলে নিঃসন্দেহে বলা যেত লড়াইটা শুধু বিজেপি-তৃণমূলের। কংগ্রেস অনেক পিছিয়ে ৩ নম্বর হত। কিন্তু ‘দাদা’ যেহেতু নিজেই লড়ছেন, তাই বলা মুশকিল। তাছাড়া তৃণমূলের পুরপ্রধানের বিরুদ্ধেও কিছু অভিযোগ রয়েছে। তাঁর নিজের সম্পত্তিবৃদ্ধি, পুরসভার বহু টেন্ডার তাঁর শাশুড়ির সংস্থার পাওয়া, এসব নিয়ে বহু মানুষ ক্ষুব্ধ। আবার বিজেপির বিধায়ককেও নাকি পাঁচ বছর বহরমপুরে সেভাবে দেখা যায়নি। শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, কিছু রাস্তাঘাট নিয়ে মানুষের অভিযোগের সুরাহা হয়নি। ফলে ‘দুর্বলতা’ তাঁরও রয়েছে। তৃণমূল বলছে, এবার বহরমপুরে জোড়াফুল ফুটবেই। ইতিমধ্যেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শহরে রোড শো করেছেন। তাতে মানুষের ব্যাপক সাড়া পাওয়া গিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর উন্নয়নের ছোঁয়া শহরবাসীও পেয়েছে।

এসবের মাঝে অধীরের ইউএসপি একটাই। তাঁর নিজের ভাবমূর্তি। আসলে বহরমপুরের বহু মানুষের সঙ্গে তাঁর আবেগের টান যে রয়েছে, সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই। তাই চরম দুর্দিনেও বহরমপুর তাঁকে হতাশ করেনি। ২০২৪ লোকসভাতেও বহরমপুর বিধানসভায় তিনি বিজেপির থেকে ৬ হাজার এবং তৃণমূলের থেকে প্রায় ২৬ হাজার ভোটে এগিয়ে ছিলেন। অধীর সুকৌশলে শুধু বহরমপুরবাসীর নস্ট্যালজিয়া উসকে দিতে চাইছেন। কখনও বলছেন, “বহু মস্তানকে সাইজ করে অধীর চৌধুরী হয়েছি।” কখনও বলছেন, “সাঁতার আমরাও কাটতে জানি।” আসলে একটা সময় এই বহরমপুরের বুকে অধীরের নিজস্ব ‘রাজত্ব’ চলত। সেখানে পুলিশ প্রশাসনের ঊর্ধ্বে উঠে আইনশৃঙ্খলার দায়িত্বও থাকত তাঁর বাহিনীর হাতে। সেসময় লোকে তাঁকে বলত অধীর মস্তান। আইনি হোক বা বেআইনি, অধীরের সেই ‘শাসন’ বহরমপুরের বহু মানুষ পছন্দ করতেন। কারণ শহরের ‘দুষ্কৃতীরাজ’ তাতে অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত ছিল। সেই সোনালি সময় এখনও হাতিয়ার কংগ্রেসের বর্ষীয়ান নেতার। কিন্তু প্রশ্ন হল, শুধু নস্ট্যালজিয়া দিয়ে কি ভোটে জয় সম্ভব? সংগঠন, নিচুস্তরের লোকজনের অভাবে একসময়ের ‘বেতাজ বাদশা’ পিছিয়ে পড়ছেন না তো? কংগ্রেস সমর্থকরা অবশ্য বলছেন, “হয়তো হাতি কাদায় পড়লে ব্যাঙেও লাথি মারে। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না মরা হাতির দামও লাখ টাকা।”

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Advertisement

Share this article on

The article link is copied.