ফরাসি ড্রেসিংরুমে কিলিয়ান এমবাপেকে সতীর্থরা মজা করে ডাকেন, ‘ডোনাটেলো’। নামটা ফরাসি ড্রেসিংরুমে এসেছে প্যারিস সাঁ জাঁ ড্রেসিংরুম থেকে। প্রখ্যাত কার্টুন চরিত্র, ‘টিনএজ মিউট্যান্ট নিনজা টার্টলস’-এর ডোনাটেলো চরিত্রর সঙ্গে চেহারাগতভাবে দারুণ মিল ফরাসি অধিনায়কের। পিএসজি-তে থাকাকালীন দানি আলভেজ একবার মজা করে এমবাপেকে ডেকেছিলেন এই নামে। তারপর থেকে ফরাসি অধিনায়ককে ড্রেসিংরুমে নাম হয়ে গেল, ‘ডোনাটেলা’।
কার্টুনে ডোনাটেলা ভীষণই ঠান্ডা মাথার এবং যুক্তি দিয়ে কাজ করা চরিত্র। একই সঙ্গে নিনজা দলের মধ্যে সবচেয়ে বুদ্ধিমান সদস্য। এরপর নিশ্চয়ই বলার দরকার নেই। ফরাসি ড্রেসিংরুমে এমবাপেকে শুধু চেহারাগত মিলের জন্যই ‘ডোনাটেলো’ ডাকা হয় না। নামকরণের পিছনে তাঁর চারিত্রিক কারণও রয়েছে। মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি পুরো ঘুরিয়ে দিতে পারেন। প্রথমার্ধে মরক্কোর বিরুদ্ধে এমবাপে পেনাল্টি নষ্ট করার পর, ডাগ আউটে কোচের চেয়ারে বসা দেশঁর মুখাবয়বটা একবার খেয়াল করেছিলেন? শটটা এতটা ক্যাজুয়াল ভাবে মারলেন যে, মরক্কো গোলকিপার ইয়াসিন বোনোর তা আটকাতে কোনও সমস্যাই হয়নি।
আরও পড়ুন:

কিন্তু তিনি কিলিয়ান এমবাপে। কবে আর অন্য কারও মতো করে চলতে চেয়েছেন? মাঠের ভিতর ঔদ্ধত্যই তাঁর আভিজাত্য। নাহলে এই এমবাপেই যখন প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারকে ড্রিবল করে বক্সে ঢুকে কোনাকুনি শটে মরক্কোর জাল কাঁপিয়ে দিলেন, চোখে মুখে কোথায় সেই পেনাল্টি নষ্টের আফসোস? এদিন মরক্কোর বিরুদ্ধে গোল করে পৌঁছনোর সঙ্গে সঙ্গে, মেসির সঙ্গে শুরু হয়ে গিয়েছে ‘গোল্ডেন বুট’ ছিনিয়ে নেওয়ার দ্বৈরথও। বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার লড়াইয়েও ২০ গোল করে মাত্র একধাপ পিছিয়ে রয়েছেন লিওনেল মেসির থেকে। বয়সটা খেয়াল করুন। মাত্র ২৭-এ গড়ে তুলেছেন রেকর্ডের এই সীমাহীন সাম্রাজ্য। সেরার মুকুট পরে সিংহাসনে বসে রাজত্ব চালানোর অন্তিম দিন দেখা তো এখনও বহু বাকি।
পর পর তিনবার বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ফ্রান্স। ইদানীংকালে বিশ্ব ফুটবলে আর কোন দলের এমন গর্ব করার মতো সাফল্য রয়েছে? মায়ামিতে আর্জেন্টিনা ম্যাচে দেখা হয়েছিল প্রাক্তন আর্জেন্টাইন কোচ জোসে পেকেরম্যানের সঙ্গে। তিনিও বলছিলেন, “এখন বিশ্বকাপে বড় দল বলে আর কিছু হয় না। ব্যতিক্রম একমাত্র ফ্রান্স।” যে মরক্কোকে মনে হচ্ছিল কোয়ার্টার ফাইনালে ফরাসিদের কাঁদিয়ে ছাড়বে, সেই দল এভাবে আত্মসমর্পণ করল? বিশ্ব ফুটবলে ফ্রান্স এই মুহূর্তে টেকনিক্যালি এমন এক উচ্চতায় রয়েছে, সেই দলকে আর শুধুই ডিফেন্স করে ৯০ মিনিট আটকে রাখা অসম্ভব। এমবাপে, দেম্বেলে আর ওলিসে। ফরাসি আক্রমণে এই ‘ত্রিভুজ’ এমনভাবে অপারেট করছে, মরক্কো ডিফেন্ডারদের চোখে সর্ষে ফুল দেখা ছাড়া উপায় কী!

ম্যাচের আগে এমবাপেকে উদ্দেশ্য করে প্যারাগুয়ের এক রাজনীতিবিদ বর্ণবিদ্বেষী মন্তব্য করে বসলেন। অন্য সময় হলে, মেজাজ বিগড়ে ম্যাচের আগেই দুম করে কিছু বলে বসতেন এমবাপে। কোচ দেশঁ পুরো দলটাতে এমনভাবে শেষ তিনটে বিশ্বকাপ থেকে তৈরি করেছেন, এদিন ম্যাচের আগে সবাই মিলে অধিনায়কের পাশে দাঁড়িয়ে গেলেন। যার ফল, মাঠের মধ্যে আগুনে পারফরম্যান্স। আর তারপর রঘু ডাকাতের আগাম চিঠি দিয়ে ডাকাতি করার মতো, হুঙ্কার দিয়ে রাখলেন আত্মবিশ্বাসী এমবাপে, “স্পেনকে হারিয়ে ফাইনালে উঠে এবার আর্জেন্টিনাকেও হারাব।”
আসলে চার বছর আগে মেসির কাছে হারটা কিছুতেই যেন হজম করতে পারছেন না ফরাসি অধিনায়ক। তাই মন থেকেই চাইছেন তাঁদের মতো আর্জেন্টিনাও ফাইনালে উঠুক। তারপর চার বছর ধরে বয়ে বেড়ানোর হারের অপমানের মধুর প্রতিশোধ নেবেন। পেনাল্টি মিসের পর প্রথমার্ধে মরক্কো ডিফেন্স যখন চিনের প্রাচীরের মতো দুর্ভেদ্য লাগতে শুরু করেছে, দেশঁ তখন বুদ্ধি করে ওলিসেকে আরেকটু নিচে নামিয়ে এনে খেলাটা ধরতে বলেন। তাতেই বদলে গেল খেলার স্টাইল। আর নিজেই অনেকটা বল টেনে নিয়ে গিয়ে প্রথম পোস্ট দিয়ে ইনসাইড আর ইনস্টেপ মিশিয়ে ইনস্যুইয়ে যে গোলটা ডেম্বেলে করলেন, তারপর কে বলবে, বিশ্বকাপের শুরুর দিকে এই ডেম্বেলে আর এমবাপেকে নিয়ে ফরাসি সংসারে ঘোর অশান্তি ছিল! কিন্তু বিশ্বকাপে সেসব একেবারে উধাও। দেশঁর সংসার এখন সুখী পরিবার।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
জীবিত ব্যক্তির পাঁজর ভেঙে ‘ডানা’! সত্যিই কি নিষ্ঠুরতা আর ভাইকিং ছিল সমার্থক?
-
অধিকৃত কাশ্মীরে গণহত্যার ছক পাকিস্তানের! বিদ্রোহ দমনে আরও ৪০০০ সেনা, ৭ রেঞ্জার্স উইং
-
শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে টানা ১৪ দিন অনশন, অসুস্থ সোনম ওয়াংচুক বলছেন, ‘আমি গান্ধী নই’
-
বঙ্গোপসাগরে ট্রলারডুবি, প্রাণ বাঁচাতে উত্তাল সমুদ্রে ঢেউয়ের সঙ্গে যুদ্ধ ১২ মৎস্যজীবীর!
-
বিশ্বকাপ ফাইনালের মাঠের ঘাস বিক্রি করেও আয় করবে ফিফা! দাম শুনলে ভিরমি খাবেন
